বিদেশে বসেও হৃদয়ে বাংলাদেশ
শাহজাহান কামাল
আমি কানাডায় এসেছিলাম ১৯৯৬ সালের জুন মাসে। দেশে থাকতে ঢাকায় একটি বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানিতে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় কাজ করতাম, আর এর পাশাপাশি সঙ্গীত ছিল আমার আত্মিক চর্চার জায়গা। শিশু-কিশোরদের সংগঠন খেলাঘর করেছি একটানা ৬/৭ বছর। পেশাগতভাবে জীবন ছিল স্থিতিশীল ও সুসংগঠিত, কিন্তু তার চেয়েও বড়ো ছিল আমার সাংস্কৃতিক যাপন। গান, কবিতা, আবৃত্তি- সব মিলিয়ে ঢাকার একটি সাংগঠনিক ও শিল্পমানুষ হিসেবে নিজেকে ভাবতাম। দেশের গলি-রাস্তায়, বন্ধুদের আড্ডায়, চায়ের দোকানে আর বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজনে আমি খুঁজে পেতাম নিজের পরিচয়। সেই আত্মিক পরিচয় ছাপিয়ে বিদেশযাত্রার চিন্তা তখন কল্পনারও বাইরে ছিল।
কিন্তু সময় ও বাস্তবতা সব সময় একরকম থাকে না। একসময় দেখলাম, একে একে সহকর্মীরা উচ্চশিক্ষা, পেশাগত উন্নয়ন বা গবেষণার জন্য আমেরিকা, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া বা জাপানে পাড়ি জমাচ্ছেন। ইমিগ্রেশন বিষয়ক ফর্ম পূরণ, ডকুমেন্ট তৈরি ইত্যাদি কাজে আমি নিয়মিত তাঁদের সহযোগিতা করতাম। তাঁরাই একসময় বললেন, “তুমি নিজেও তো চেষ্টা করতে পারো!” আমি তখন তেমন গুরুত্ব দিইনি। কিন্তু ধীরে ধীরে ভাবতে শুরু করি, নতুন জায়গায় নতুন জীবন ও অভিজ্ঞতা হবে, দেখি না চেষ্টা করে। কয়েক মাসের চিন্তা-ভাবনার পর ১৯৯৫ সালে কানাডায় ইমিগ্রেশনের আবেদন করি এবং পরের বছর জুন মাসে টরন্টোর মাটিতে পা রাখি।
২.
এই লেখার উদ্দেশ্য শুধুমাত্র সেই অভিবাসনের গল্প বলা নয়। বরং আমি বলতে চাই, কীভাবে অনেকের মতো আমিও প্রবাসে থেকেও নিজের শেকড়, সঙ্গীত, সংস্কৃতি ও সমাজ সচেতনতার সঙ্গে সংযোগ ধরে রাখতে চেষ্টা করে আসছি। কীভাবে আমি এই ভিন্ন ভূখণ্ডে থেকেও বাংলাদেশকে হৃদয়ে ধারণ করে এগিয়ে চলেছ- সেটিই এই লেখার মূল উপজীব্য।
টরন্টোতে এসে প্রথমদিকে এক ধরনের ভয়, সংকোচ ও ভিন্নতার অনুভূতি কাজ করছিল- ভাষা, আবহাওয়া, খাবার, সংস্কৃতি, সবকিছুই নতুন এবং অচেনা। বিভিন্ন জাতি ও ভাষাভাষির দেশ কানাডা। রাস্তায় বের হলেই শুধু নতুন ভাষা আর নতুন মুখ। দোকানে গিয়ে পছন্দের জিনিস চাইলেও বুঝিয়ে বলতে হতো অনেকক্ষণ। প্রথম শীতে তুষার দেখে যেমন আনন্দিত হয়েছিলাম তেমন মনে হয়েছিল যেন পুরো পৃথিবীটাই তুষারে মোড়া। অথচ ঢাকার ধুলাবালি, কোলাহল, রোদ-বৃষ্টি সব ছিল চেনা আর আপন। এই টানাপোড়েনের ভিতরেই আমি খুঁজতে থাকি পরিচিত কিছু। খুব দ্রুতই বুঝতে পারি, এই শহর অনেকখানি আলাদা। এখানে প্রবাসী বাংলাদেশিদের একটি সুসংগঠিত, প্রাণবন্ত এবং কর্মঠ কমিউনিটি গড়ে ওঠেছে। আমি আসার অল্পদিনের মধ্যেই কিছু সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষের সঙ্গে পরিচিত হই, যাঁরা বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁদের আন্তরিকতা ও উৎসাহ আমাকে আশ্বস্ত করে তোলে যে, এখানে আমার মতো মানুষের জায়গা আছে।
জানতে পারি, আমার আসার আগেই শহরের প্রধান বাংলাদেশি সংগঠনটি কিছু মতভেদ ও মতানৈক্যের কারণে বিভক্ত হয়ে গেছে। অনেকেই এটিকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখলেও, আমি তেমনটা ভাবিনি। আমি বিশ্বাস করি, একটি দ্রুত বর্ধনশীল প্রবাসী কমিউনিটিতে ভিন্নমত, বিভিন্ন পথ এবং বিকল্প সংগঠন থাকা খুবই স্বাভাবিক এবং প্রয়োজনীয়। একাধিক সংগঠন মানে একাধিক সুযোগ, দৃষ্টিভঙ্গি ও সৃজনশীল অভিব্যক্তি- যা শেষমেশ কমিউনিটিকেই সমৃদ্ধ করে।
৩.
১৯৯৬ সালের ডিসেম্বরে বিজয় দিবস উপলক্ষ্যে আয়োজিত দুটি পৃথক অনুষ্ঠানে অংশ নিই। দেশের বাইরে প্রথমবারের মতো বিজয় দিবস উদযাপন, এবং তার অংশ হিসেবে গান গাওয়া, আবৃত্তি শোনা, নাটক দেখা- আমার কাছে ছিল এক অনন্য অভিজ্ঞতা। মঞ্চে যখন বাংলাদেশের পতাকা, সাভার স্মৃতিসৌধের প্রতিকৃতি, কিংবা রবীন্দ্র-নজরুলের গান বাজে- তখন মনে হয়, আমরা যেন ছোট্ট করে একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলেছি এখানে। এই অভিজ্ঞতা আমাকে ভিতর থেকে নাড়া দেয়, মনে করিয়ে দেয়- শিকড় কোথায়, আপনতা কোথায়।
২০০৪-২০০৫ সাল থেকে বাংলাদেশ থেকে কানাডায় ইমিগ্রেশনের প্রবাহ দ্রুত বাড়তে থাকে। সেই সঙ্গে বাড়তে থাকে প্রবাসীদের সাংগঠনিক ও সামাজিক উদ্যোগ। পেশাভিত্তিক সংগঠন যেমন ফার্মাসিস্ট, ইঞ্জিনিয়ার, কৃষিবিদদের সংগঠন-সহ আরো কিছু গড়ে ওঠে; আবার বিভিন্ন আঞ্চলিক সংগঠনও- যেমন চট্টগ্রাম সমিতি, সিলেট এসোসিয়েশন, নোয়াখালী-বগুড়া সমিতি শহরের সাংস্কৃতিক মানচিত্রে জায়গা করে নেয়। একইসঙ্গে গান, কবিতা, নাটকের জন্যও আলাদা আলাদা সাংস্কৃতিক দল গঠিত হয়। এই দলগুলো কেবল অনুষ্ঠান আয়োজন করেই ক্ষান্ত হয়নি, তারা নতুন প্রজন্মকে জড়িত করারও চেষ্টা করেছে।
আমি নিজে শিল্পী হিসেবে যেমন অংশ নিয়েছি, তেমনি সংগঠক হিসেবেও কাজ করেছি বহুবার। অনেক অনুষ্ঠানে গান গেয়েছি, আবার মঞ্চ নির্মাণ, সাউন্ড সিস্টেম, অতিথি অভ্যর্থনা, এমনকি পোস্টার বিতরণ পর্যন্ত করেছি। কোনো কোনো অনুষ্ঠান আয়োজনে কয়েকমাস রিহার্সেল-সহ নানাবিধ কাজে লম্বা সময় দিতে হয়েছে যা নিজের পরিবারের জন্য নির্ধারিত সময় থেকে নিতে হয়েছে। সেসব শ্রমসাধ্য দিনও ছিল আনন্দময়, কারণ তা ছিল নিজের সংস্কৃতির জন্য।
একটি কথা সত্য যে, নতুন প্রজন্ম আমাদের সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ এবং সম্ভাবনা। তারা এখানে বড়ো হচ্ছে, ইংরেজি ভাষায় শিক্ষিত হচ্ছে এবং অনেক সময় বাংলায় স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। তবুও তারা মঞ্চে দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রসঙ্গীত-নজরুলসঙ্গীত গায়, কবিতা আবৃত্তি করে, এমনকি নাটকে অভিনয় করে। এদের অনেকেই বাংলা ঠিকমতো পড়তে পারে না, তবু মুখস্থ করে সংলাপ বলে। বইমেলা, বৈশাখী উৎসব, একুশে ফেব্রুয়ারি, বিজয় দিবসের আয়োজনে তারা যে আগ্রহ নিয়ে অংশ নেয়, তা দেখে আমাদের আশার আলো জ্বলে। এইজন্য সব বাচ্চার মা বাবা ও ওদের শিক্ষক শিক্ষিকাদের অবশ্যই ধন্যবাদ দিতে হবে। সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো ধারাবাহিকভাবে শিশু-কিশোরদের জন্য অংকন, আবৃত্তি, গানের কর্মশালা ও প্রতিযোগিতার আয়োজন করে থাকে। নতুন প্রজন্মকে বাংলা সংস্কৃতিতে উৎসাহিত করার এই প্রতিযোগিতা বিরাট ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশি কমিউনিটি কেবল সংস্কৃতিমুখী নয়, বরং সামাজিক দায়বদ্ধতাতেও সাড়া দিয়েছে বহুবার। দেশের বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, মহামারি বা অন্যান্য দুর্যোগের সময় আমরা কনসার্ট, নাটক, দাতব্য অনুষ্ঠান আয়োজন করেছি। তহবিল সংগ্রহ করেছি অসহায়দের জন্য। পাঠিয়েছি ওষুধ, খাবার, এমনকি নগদ টাকা। সেইসব মুহূর্তে মনে হয়েছে- আমরা কানাডায় থাকলেও আমাদের হৃদয়ের স্পন্দন বাংলাদেশেই।
এত কিছুর মাঝেও প্রবাসী কমিউনিটিতে মতানৈক্য, বিভক্তি, দলে ভাগ হওয়া এখন একটা রূঢ় বাস্তবতা। টরন্টোতেও বহুবার এমন ঘটনা ঘটেছে– একই সংগঠনের ভিতরে ভিন্নমত, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, নীতিগত মতপার্থক্য, কিংবা কেবল ব্যক্তিগত ইগোর কারণে সংগঠন ভেঙে গেছে। কেউ কেউ এটিকে কমিউনিটির দুর্বলতা বলেন, আমি বলি না। ভিন্নমত থেকে নতুন চিন্তার জন্ম নেয়, বিকল্প সংগঠন গড়ে ওঠে। প্রশ্ন হচ্ছে, সেই নতুন উদ্যোগগুলো কী আদর্শিক ও সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতা নিয়ে এগোচ্ছে? যদি তারা সত্যিকারের সৃজনশীলতা, সম্প্রদায় গঠন এবং সংস্কৃতির প্রসারে কাজ করে, তাহলে বিভাজন নয়, বরং সেটিই হয়ে ওঠে বিকাশের বাহন।
একসময় দুই বাংলার সবাই মিলে উদ্যোগ নিই টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য পড়ানোর জন্য কোর্স চালু করার। আমরা চাইতাম, প্রবাসী সন্তানরা যেন উচ্চশিক্ষার পাঠ্যক্রমেই বাংলার ছোঁয়া পায়। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে, আর্থিক সহায়তা আর প্রচেষ্টার মাধ্যমে বাংলা কোর্স চালু হয়েছিল। যদিও প্রশাসনিক নানা জটিলতায়, অপর্যাপ্ত ছাত্র-ছাত্রীর কারণে তা পূর্ণতা পায়নি, তবু এই উদ্যোগ ছিল আমাদের সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতার প্রমাণ।
৪.
আজ প্রবাসজীবনের প্রায় তিন দশক পেরিয়ে, ফিরে তাকালে দেখি- টরন্টো আমার কাছে কেবল একটি কর্মক্ষেত্র নয়। এটি হয়ে ওঠেছে বাংলা সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল কেন্দ্র। বৈশাখী উৎসব, বইমেলা, নাট্যোৎসব, রবীন্দ্র-নজরুল জন্মজয়ন্তী, বিজয় দিবস, একুশে ফেব্রুয়ারি- এই আয়োজনগুলোয় দেখা যায় নতুন প্রজন্ম, নতুন মুখ, নতুন ভাবনা। বাংলাদেশি কমিউনিটির সদস্যরা কেবল নিজেদের সংস্কৃতি রক্ষা করছে না, বরং সেটিকে বিশ্বের কাছে পরিচিত করে তুলছে।
এই মঞ্চ, এই গানের আসর, এই মেলার স্টলে লুকিয়ে আছে আমাদের স্বপ্ন, আত্মপরিচয় এবং ঐতিহ্য। যেসব শিশু কানাডায় জন্ম নিয়েছে, তারা যখন স্টেজে ওঠে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানটি করে, তখন মনে হয়- আমাদের শ্রম বৃথা যায়নি।
তিন দশক আগে এখানে মাত্র দু-একটি বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট ছিল। এখন টরন্টো ও আশেপাশে কয়েক ডজন রেস্টুরেন্ট, গ্রোসারি দোকান, ক্লিনিক, আইনজীবী অফিস, প্রিন্টিং প্রেস, রেডিও স্টেশন, এমনকি অনলাইন টিভি চ্যানেল পর্যন্ত রয়েছে। গ্রোসারিতে গেলে পাওয়া যায় ৫০-এরও বেশি রকমের দেশি মাছ, চাল, মসলা এবং সবজি- যা একসময় কল্পনাও করা যেত না। কয়েক বছর হলো টরন্টোতে আমাদের একটা শহিদ মিনার হয়েছে। কাজটি অবশ্যই সহজ ছিল না। গ্রুপিং হয়েছে, বিভাজন হয়েছে, নিজের নাম প্রচারে ব্যস্ত ছিল অনেকে। কিন্তু দিনের শেষে কাজটি হয়েছে সে-জন্য প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত যারা যার যার জায়গা থেকে অবদান রেখেছেন তাদের প্রতি পুরো কমিউনিটি কৃতজ্ঞ। ড্যা নফোর্থের বাঙালি এলাকায় বাংলাদেশ সেন্টার হয়েছে। ছোটো হলেও এখানে আমরা নানা অনুষ্ঠান করতে পারি। এটি করতে নানা ঝড়-ঝাপটা গেছে। নানা সম্পর্ক জটিল হয়েছে। তবে এটিও একটা বড়ো অর্জন।
আমি গর্ব করে বলতে পারি- আমরা যারা টরন্টোতে বসবাস করছি, তারা দুটি দেশের প্রতিনিধিত্ব করি। নাগরিক পরিচয়ে আমরা কানাডিয়ান, কিন্তু হৃদয়ের গভীরে, আত্মার শেকড়ে আমরা এখনো বাংলাদেশি। এই দুই পরিচয়কে একসূত্রে বেঁধে আমরা গড়ে তুলছি এক নতুন রূপ। একটি সাংস্কৃতিক বাংলাদেশ, প্রবাসের বুকে গড়ে ওঠা। নিজের ভাষা ও সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখার এই কার্যক্রম মোটেও সহজ নয়। প্রবাসে থেকে নানা ব্যস্ততার মধ্যেও আমরা আমাদের শিকড়কে নতুনভাবে চিনেছি, মূল্যায়ন করেছি, এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তা রক্ষা করার দায়িত্ব নিয়েছি।
আমি একজন সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে, একজন প্রবাসী হিসেবে এবং একজন বাংলাদেশি হিসেবে গর্বিত যে, আমি এই পরিবর্তনের অংশ হতে পেরেছি। এই পথ চলা সহজ ছিল না, কিন্তু গভীরভাবে অর্থবহ ছিল। বাংলাদেশ আমার ভৌগোলিক ঠিকানা নয় কেবল, এটি আমার হৃদয়ের ঠিকানা। আর সেই হৃদয় নিয়েই আমি প্রবাসে গড়ে তুলেছি একখণ্ড বাংলাদেশ।
লেখক পরিচিতি
সঙ্গীতশিল্পী, সাংস্কৃতিক কর্মী ও সংগঠক। ১৯৯৬ সালে সপরিবার কানাডায় অভিবাসী হন। অন্টারিওতে প্রাদেশিক সরকারে কর্মরত আছেন।

