বোধ
ফারহানা আইরিন
জন্ম নিয়েই কেউ মানুষ হয় না। হয় শিশু। একটা নির্দিষ্ট সময় পার হলে হয় ছেলে বা মেয়ে। আমি যখন থেকে মেয়ে হয়ে ওঠেছি তখন থেকে, অর্থাৎ আমার শৈশব কৈশোর এবং যৌবনের অনেকটা সময় কেটেছে গ্রামেই। গ্রামীণ প্রকৃতি, পরিবেশ, নদী, বন, পাহাড়, সবই আমার অসামান্য ভালোলাগার বিষয়। ভালো লাগতো মানুষের সরলতা, মিলেমিশে একাকার হয়ে থাকার ঐকতান। ভালো লাগতো সবার সাথে আত্মিক সম্পর্কের সেতু বন্ধন। কবির সেই কবিতারই যেন বাস্তবরূপ “মিলেমিশে আছে ওরা আত্মীয় হেন।” আমার এই আঁতুড় ঘর থেকেই আমি বুঝতে শুরু করলাম, ছেলে বা মেয়ে থেকে ‘মানুষ’ হতে হলে জীবনে ভালো শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। দীর্ঘ স্মৃতিখচিত সময় পেরিয়ে বাচ্চাদের পড়াশোনা, নিজের প্রয়োজন, বৃদ্ধ মাকে ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে রাখা, সবকিছু মিলিয়ে শহর গ্রাম, শহর গ্রাম করেই কেটেছে বাকি সবটুকু সময়। বোধ হয়, কোথাও খুঁজে ফেরার তাড়নায় স্থির হতে পারিনি বলে। জীবনের এই দোলাচলের মাঝেই ছেলে পড়াশোনার জন্য পাড়ি জমালো কানাডায়। তারপর মেয়েও। আমি আমার লেখালিখি, সামাজিক কাজকর্ম সবচেয়ে বড়ো যেটা, তা-হলো- আমার মাকে নিয়ে রয়ে গেলাম দেশেই। মা যখন না ফেরার দেশে চলে গেলেন তখন থেকেই শূন্যতায় ভরে গেল আমার চারপাশ। অগত্যা আমিও ভিনদেশে সন্তানের কাছে আসার সিদ্ধান্ত নিলাম। বোধ হয়, শেকড় থেকে ঠিকানাকে আলাদা করার এই আয়োজন।
আমি যখন কানাডায় আসি তখন ছিল আগস্ট মাস। গ্রীষ্মের প্রফুল্লতা নিয়ে ঘুরে বেড়ানো। ফুলে ফুলে সাজানো এক বর্ণীল দেশ। বিশাল বিস্তীর্ণতায় হারিয়ে যাওয়ার মোহনীয় আবেশ। নতুন এক দেশে আসার আগে যেসব জায়গা দেখবো বলে ঠিক করেছিলাম তা রুটিন করে চষে বেড়ানো। বোধ হলে- মানব জন্ম সত্যিই সুন্দর!
ফুরফুরে চঞ্চলতায় মস্তিষ্ক টানটান থাকলেও অসীম আকাশের শূন্যতার মতো বুকের ভিতর শুধু বাংলা শোনার তৃষ্ণা হতো। চৈত্রের দুপুরে একফোঁটা পানির মতো- আমি যেখানেই যেতাম, শুধু বাংলা ভাষাভাষি মানুষ খুঁজতাম। সবার এমন হয়েছে কি-না আমি জানি না, শাড়ি সেলোয়ার-কামিজ পরা কাউকে দেখলেই শুনতে চেষ্টা করতাম সে কোন ভাষায় কথা বলে। অনেকবার এমন হয়েছে তার পিছন পিছন গিয়ে পথও হারিয়েছি। মার্কেটে, পার্কে- যেকোনো লোক সমাগমের জায়গায় গেলেই আমি আমার বাচ্চাদের জোরে জোরে ডাকতাম। বাঙালি কেউ থাকলে বুঝুক যে, আমিও বাঙালি। শুধু শুধু ফোনে কথা বলতাম, যদি বাঙালি কেউ শোনে আর বলে ওঠে, আপনি বাঙালি? দেশের বাড়ি কোথায়? এমন দু-একবার হয়নি যে তা নয়, বাঙালি টের পেলে আমি কথা বলেই ছাড়বো। তা বাসে, ট্রামে, ট্রেনে কিংবা যেকোনো হাঁটা পথেই হোক। এই নিয়ে বাসায় বেশ হাসাহাসিও হতো। বিশেষ কোনো কাজ না থাকলেও ডেনফোর্থে যেতাম সপ্তাহে দু-তিনবার। হেঁটে হেঁটে সাইনবোর্ডে বাংলায় লেখাগুলো দেখাও যেন ভাগ্যের ব্যাপার।
বাংলা খাবার, দেশি শাক-সবজির ঘ্রাণ। দেশি মানুষের আনাগোনা, তা সে যে অঞ্চলেরই হোক না কেন। বাংলাদেশি দোকানে থরে থরে সাজানো পরিচিত নামের পণ্য দেখে ভিতরটা উদ্বেলিত হতো। যে জিনিস জীবনে কখনও ধরেও দেখিনি তা-ও কত আপন মনে হচ্ছে! দেশের সাথে কানাডার সময়ের ব্যবধান ভুলে গিয়ে সেই সোনার হরিণ দেখানোর জন্য মধ্যরাতেই ভিডিও কল দিয়ে বসতাম স্বজনদের। ভিতরে একটাই শব্দ প্রতিধ্বনিত হতো- আহ্, বাংলা! মাতৃভূমি, মাতৃভাষাকে ধারণ করা, এই জায়গাটা থেকে নিজেকে সরিয়ে বাসায় ফেরা- সত্যিই কষ্টদায়ক ছিল। বোধ হয়, দূর থেকেই ভালোবাসা শক্তিশালী হয়। ভ্রমণে বা কাজের কারণে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দেশে বাঙালি বা বাংলা ভাষাভাষি কাউকে দেখলে আপ্লুত হতাম না, তা নয়, তবে এখানে খুব সম্ভবত ‘ফিরে যাওয়া আর থেকে যাওয়া’ এই দুটো শব্দই বেশ প্রভাব ফেলেছে।
কানাডায় আসার অল্প কিছুদিনের মাথায় আমাদের বাসার গলিতে ঢোকার পথে এক দেশি আপার সাথে আগ বাড়িয়ে পরিচয় করে নিলাম। এরপর থেকেই উনার সাথে বিকেলে হাঁটতে বেরোনো, মসজিদে যাওয়া, দোকানে যাওয়া, মেলায় যাওয়া, এমন কি সিনেমাও দেখা হতো। দেশি কোনো রান্না উনাকে ছাড়া খাওয়া হতো না কখনো। উনি যেন আমার যক্ষের ধনের মতো হয়ে গিয়েছিলেন। কারণ এই টরন্টোতে আমার তেমন কোনো আত্মীয় স্বজন ছিল না। বাচ্চারাও শস্তি পেলো, আমি সময় কাটানোর একজন সঙ্গী পেয়েছি। উনি আমাকে রাস্তা-ঘাট চেনাতেন, নিয়ম-কানুন বলতেন, ছাব্বিশ বছর আগে উনি এখানে আসার পর কখন কী কী সমস্যায় পড়েছেন, সে গল্প শোনাতেন। আমিও খুব মনোযোগ দিয়ে শুনতাম সেগুলো। বোধ হয়, একদিন এরকম গল্প তৈরি করবো বলেই অভিজ্ঞতা নিয়েছিলাম। কাঁচা বাজার করতে গেলেই বাচ্চাদের প্রথম জিজ্ঞাসা- আমি কী খাবো। মাছ-মাংস, শাক-সব্জি, ফল-মূল ইত্যাদি। আমার বরাবরই দেশীয় শাক-সবজির প্রতি দুর্বলতা। তবুও আমার মেয়ে মাঝে-মাঝে তার অভিজ্ঞ হাতে বকচই শাক ভাজি ও চিকেন দিয়ে চিক পি রান্না করলে খেতে মন্দ লাগতো না। এখানে সহজে পাওয়া ও তৈরি করা যায় এমন একটি খাবার হলো পাস্তা, যা আমার বিশেষ পছন্দের ছিল না। তা-ও মেয়ের হাতের নানাবিধ প্রক্রিয়ায় তৈরি পাস্তা ও পিৎজা দু-চার বার খাইনি তা-ও নয়। কিছু কিছু ভিনদেশি খাবার মেয়ের হাতের কৃৎকৌশলে ভালো লাগলেও স্বদেশি খাবারের ঘ্রাণ ও স্বাদ সবসময়ই বোধ হয় অমৃততুল্য। প্রথম প্রথম কানাডায় একা-একা বেরুনো ছিল যেন বিশাল সমুদ্রের গর্ভে নিজেকে ইচ্ছাকৃত হারিয়ে খোঁজার মতো অবস্থা। নিয়মের জালে পা পেতে, পঞ্চ ইন্দ্রিয় সজাগ রেখে তারপর পথ চলতে হতো। নিয়মের একটু ব্যত্যয় হলেই খেসারত দিতে হতো কয়েকঘণ্টা। রাস্তার ডান-বাম বা এপার-ওপার না বুঝে উল্টো বাসে গিয়ে আবার অন্য রুটে যাওয়ার ঘটনাও আমার অনেক। তাই একই রাস্তায় প্রতিদিন গিয়েও মনে হতো এই বুঝি ভুল হলো! চারিদিকে বিশাল শূন্যতা ঠুকরে ঠুকরে বলতো, আরো শক্ত হও, আত্মবিশ্বাসী হও। একদিন বোধ করলাম, ইচ্ছে করলেই এখানে হারিয়ে যাওয়া যায় না। প্রযুক্তির আর্শীবাদে অনেক সহজ কাজও কখনো কখনো অসম্ভব হয়।
এখানে এসে বাসাভাড়া নিতে গিয়ে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হলাম। মা, বাবা, ভাই, বোন নিয়ে অনেকেই বাসাভাড়া দিতে চান না। দুজন প্রাপ্তবয়স্ক আর দুজন অপ্রাপ্তবয়স্ক থাকার ব্যবস্থা আছে, অর্থাৎ স্বামী স্ত্রী তাদের বাচ্চা নিয়ে থাকতে পারবে। আবার তিনজনের জায়গায় চারজন থাকাটাও মুশকিল। অথচ, সন্তানের সাথে বাকিটা জীবন কাটাবার আশায় আমরা যোজন যোজন মাইল পাড়ি দিয়ে এখানে আসি। কিন্তু সযত্নে সন্তানদের কাছ থেকে মা-বাবাকে একসময় আলাদা হতে হয়। রাষ্ট্রের তৈরি করা নিয়মের তাগিদে মনের অজান্তেই কেটে যায় সম্পর্কের সুতো। বোধ হয়, আহ, দূরত্বটাই ভালো ছিল!
এখানে ভাড়া বাসার একটা জিনিস আমার খুবই ভালো লেগেছে, তা হলো- প্রায় সব বাসায়ই প্রয়োজনীয় ফার্নিচার ও ইলেকট্রনিক জিনিস দেওয়া থাকে। এতে করে বাড়তি খরচ যেমন বেঁচে যায়, আবার বাসা ছেড়ে দিলে এ-বাসা ও-বাসা টানাটানির ঝামেলা থেকেও রক্ষা পাওয়া যায়। বাসাভাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে এমন সুন্দর নিয়ম সব দেশে চালু থাকলে বোধ হয় ভালো হতো। কেনাকাটায় পুরো বছরই এখানে প্রায় সব জায়গায় কিছু না কিছু ছাড় থাকে। ছাড়ের জায়গাগুলো খুঁজে খুঁজে প্রয়োজন ছাড়াই কিনতে থাকা এরকম অভ্যাস। দুদিন পর যখন একই জিনিস- হয়তো দাম কম, নয়তো একই দামে পরিমাণ বেশি, তখন মনটা বড়ো মলিন হতো। আর কম দামের জন্য অপেক্ষায় থাকলে দেখা গেছে সেটার দাম বেড়েছে, যেটা কিনেছি ওটা কমেছে। এই রকম বিড়ম্বনায় পড়তে পড়তে একসময় ঠিক করেছি, ছাড়ের ফাঁদে আর পা-ই দেবো না। ঝিম ধরে এই সিদ্ধান্ত নেওয়ায় আর কিছু না হোক, অযাচিত পণ্যে ঘর ভর্তি হওয়া থেকে বাঁচা গেলো বোধ হয়।
কানাডায় প্রথম ঈদ ছিল আধো আলো, আধো ছায়ার মতো। বহুদিন পর ছেলের সাথে ঈদ করার একটা ভালো লাগা ছিলো। আত্মীয়-স্বজন ও উৎসববিহীন পরিবেশে ধর্মীয় ব্যাপার না থাকলে পুরোটাই যেন আনন্দিত হওয়ার অভিনয়। তবে প্রথম ঈদে আমার খালাতো বোন দেশ থেকে বেড়াতে এসে সপরিবারে ঈদ করলো আমাদের সাথে। শ্রাবণের আকাশে এক ফালি রোদের মতো স্বজনহীন থাকার প্রথম ধাক্কাটা একটু সামলে নিলাম। কিন্তু ভাবলেশহীন কোরবানির ঈদ মনে করিয়ে দিলো, দেশে থাকতে বিশাল আয়োজনের স্মৃতিগুলো। ঈদ আড্ডা, কিছু ঘোরাঘুরি দিয়ে পুষিয়ে নিতে চাইলেও বংশপরম্পরায় মেনে চলা রীতিনীতিগুলোর দগদগে ঘা শুকোয় না কিছুদিন। বোধ হয়, জীবনে রপ্ত করা কিছু ভালো অভ্যাসও কখনো কখনো কষ্টের কারণ হয়। লেখালিখি উত্তরাধিকার সূত্রে কেউ পায় কি-না আমি জানি না, তবে, আমার মা ভালো লিখতেন, আমিও চেষ্টা করি। আমার ছেলেও কিন্তু চমৎকার লেখে। ও সবসময় বলে, “সাহিত্য, সংস্কৃতি, লেখালিখির সাথে থাকলে আপনি ভালো থাকবেন।” এই ভালো লাগার তৃষ্ণা মেটাতেই সুযোগ পেলেই ছুটে বেড়াই বাংলার ঐতিহ্য ধারণ করে এমন সব আয়েজনে।
প্রবাসে থেকে কিছু মানুষ দেশ ও দেশের ঐতিহ্যকে ভালোবেসে কীভাবে হৃদয়ে ধারণ করে- সেরকম কিছু গুণী মানুষের সান্নিধ্য পেয়ে নিজের ভিতরটা প্লাবিত হলো শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতায়। মনে হলো, হ্যাঁ, এখানেই আলো, এখানেই সুবাস, যা মনের অবচেতনে আমার আরাধ্য। কখন, কোথায়, কোন বাংলা অনুষ্ঠান হচ্ছে, উন্মুখ হয়ে থাকতাম আর সোশ্যাল মিডিয়ার গুনে খবরও পেতাম। যদিও তেমন কাউকে চিনি না, তবুও নিজের মতো করে দেখতাম, বুঝতাম, জানতাম। এরকম আসা-যাওয়া করতে করতে কিছু মানুষের সাথে সখ্য গড়ে ওঠলো, কিছু মানুষকে দূর থেকে জেনেছি, কিছু মানুষকে কাছ থেকে। বাংলা সংস্কৃতি নিয়ে যারা কাজ করে সেসব কুশীলবদের কারো কারো সাথে পরিচিত হতে পেরে অভিভূত হয়েছি। ভালো লাগতো গুণী মানুষদের সুবাস ছড়ানো এমন পরিবেশ আমার সবসময়ই প্রিয়।
দেশে থাকতে অনেক সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিলাম, নিজেও কিছু সংগঠন তৈরি করেছি। তাই এখানে এসে সাহিত্য, সংস্কৃতি, লেখালিখি এগুলোর উৎস দেখে একটু লোলুপ দৃষ্টিতেই উৎসুক হয়ে সুযোগ খুঁজি, যদি একটু কোথাও দাঁড়ানো যায়।
একসময় বাসা বদলে বাংলা কমিউনিটি থেকে অনেক দূরে চলে এলাম। কিন্তু আমার যোগাযোগ বা আসা যাওয়ার কোনো সমস্যা হলো না। কোনো অনুষ্ঠান যখন থাকে আমি বাসে, ট্রেনে করে কয়েক ঘণ্টা সময় নিয়ে রওনা দিই, পৌঁছাতে পৌঁছাতে পোশাক-পরিচ্ছেদের সতেজতা ততক্ষণে মলিন হলেও মন কিন্তু একদমই সতেজ। বাংলায় একটা প্রবাদ আছে না-“যদি থাকে বন্ধের মন, গাং পার হতে কতক্ষণ।”
ইতোমধ্যে অনেক ভালোলাগার মানুষও পেয়ে গেলাম। আবৃত্তি, গান, নাচ, মেলা অনেক অনুষ্ঠানে দর্শক হিসেবে আমন্ত্রিত হই। ঝাড়া হাত-পা। কোনো পিছুটান নেই। বাচ্চারা বলে, “আপনার ভালো লাগলে যখন যেখানে ইচ্ছে যাবেন।” জীবনটা কৈশোরের উচ্ছলতায় দ্যুতি ছড়ালো। মনে হলো- আহ, এমন সময় যদি আরো আগে পেতাম! পরক্ষণেই বোধ হলো, তাহলে হয়তো আমাকে অকৃত্রিম ভালোবাসার মায়াবী মুখগুলো (আমার সন্তানরা) পেতাম না।
ইদানীং আমার অনেক নির্ভরতা বেড়েছে বুঝতে পারছি। কারণ, একই জায়গায় পাঁচবার গেলেও দেখি ভুল হচ্ছে। ব্রেন বোধ হয় ধরেই নিয়েছে, ওর কাজ শুধু অন্যকে অনুসরণ করা। খুব বেশি আরামপ্রিয় হলে যা হয়। প্রথম প্রথম নতুন জায়গায় এসে হাঁটার মানুষের অভাব বোধ করছিলাম। সময় থাকলে বাচ্চারাসহ বের হতাম। আমি যখন একা বের হতাম, ওদের দেখানো পথের বাইরে যেতাম না। এভাবে চলতে চলতে স্বভাবসুলভভাবে আমাদের বাড়িওয়ালির সাথে আমার ভাব হলো, যদিও তিনি আমার চেয়ে বয়সে বড়ো। তাতে আমার কোনো সমস্যা হলো না। কারণ, আমার বন্ধুদের বেশির ভাগই আমার সিনিয়র। ছোটোবেলা থেকে আমার পাকনা স্বভাবের কারণে সমবয়সীদের সাথে আমার বন্ধুত্ব হতো না। যাই হোক, উনিও বাঙালি। খুবই অমায়িক ও ভালো মানুষ। এদেশে ভালো বাড়িওয়ালা পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার তার ওপর বাঙালি। আমি একেবারে সোনায় সোহাগা। ওর ছোটো একটা নাতনী আছে, চকলেট দেওয়ার কারণে কিছু দিনের মধ্যে তারও পছন্দের মানুষ হওয়ার সৌভাগ্য হলো।
অনেক কিছুর মতো প্রথম দিকে এখানে ডাক্তার দেখানোটাও মনে হতো একটা মারাত্মক পীড়া। একটা লম্বা সময় ধরে সিরিয়ালে অপেক্ষা করা লাগে। তা সে ফ্যামিলি ডাক্তার হোক বা অন্য। কোনো স্পেশালিস্ট পেতে তো কয়েক মাসও সময় লাগে। তবে এখানে সবকিছুর একটা নিয়মতান্ত্রিক উপসংহার থাকায় ধৈর্য ধরার মজাও পাওয়া যায়। সবচেয়ে ভালোলাগার বিষয় হলো, আমাদের দেশের মতো ঔষধপত্রের গাদা গাদা ফাইলপত্র নিয়ে হাঁটতে হয় না। এমনকি প্রেসক্রিপশনটাও রোগীর কাছে থাকে না। আস্থা ও বিশ্বাসের সংকটহীন চিকিৎসাব্যবস্থা একজন মানুষকে কতটা আত্মবিশ্বাসী করে, তা বোধ করলাম এখানে এসেই। আধুনিক প্রযুক্তি, দায়িত্বশীল আচরণ ভুলিয়ে দেয় কালক্ষেপণের কথা। বুঝলাম, নিয়মের ধারাবাহিকতায় সহনশীল থাকতে পারলেই সুফল পাওয়া যায়।
ঘোরাঘুরিতে আমার এমনিই কোনো ক্লান্তি নেই। সেটা জেনেই বাচ্চারা আমাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে সুন্দর সুন্দর সব জায়গা দেখানোর জন্য। ফুল, প্রকৃতি, লেক। আমিও ভীষণভাবে উপভোগ করি, এখানকার উঁচু-নিচু রাস্তাঘাট, মানুষের আচার-আচরণ, নিয়ম-কানুন সবকিছুই।
দেখতে দেখতে কানাডা তার স্বরূপ দেখালো। নভেম্বর মাস থেকে ঠান্ডার প্রকোপ শুরু হলো। ঢিমে তালে তা বেড়ে জানুয়ারি থেকে কয়েদির মতো প্রায় বন্দি দশা। অনভ্যস্ত জীবনে লঘু পাপে গুরুদণ্ডের মতো অবস্থা। কোনো কাজে বাইরে বেরুনো মানে, নির্দিষ্ট সময়ের আধা ঘণ্টা আগে নিজেকে প্যাকেট করে ফেলার একটা বিষয় থাকে। ফেরত এসে আবার কৃতকর্মের খেসারত দিতে হয় সমান সময় নিয়ে। প্রতিকূল পরিবেশে মানসিকভাবে নিজেকে ঠকিয়ে রাখাটাও একটা যুদ্ধ। কাচের জানালায় দাঁড়িয়ে শ্বেত শুভ্র তুষারের স্তূপ দেখে মনে হতো, এই যে ছবিতে দেখা, বইয়ে পড়া সাদা বরফের দেশ ছুঁয়ে দেখার অনুভূতিগুলোই গলে গলে পড়ছে। কিছু জিনিস আছে, যা বোধ হয় দূর থেকেই সুন্দর।
সময় যেতে যেতে অভিজ্ঞতার আলোকে উপলব্ধি হলো, এই যে একটি দেশ, এখানে নানা ধর্ম, বর্ণ, ভাষাভাষির এত এত মানুষ বসবাস করার পরও কত সুশৃঙ্খল ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে সব কিছু নিঃশব্দে হচ্ছে। সবাই সবকিছু মেনে চলছে নিজ দায়িত্বেই। এমনটাই তো হওয়া উচিত। দেখে দেখে মুগ্ধ হলাম, বিকেল হলেই পার্কের মাঠে ফুটবল, বাস্কেটবল খেলা চলছে, কেউ কেউ সাইকেল চালাচ্ছে। এখানকার বাস্তবতায় শহর বা গ্রাম বলে কিছু নেই। সুবিধার দিক থেকে যেমন সব আছে, প্রকৃতির উদারতারও কমতি নেই কোথাও। একটা নৈতিক পরিবেশের অভাবে নিজের ভিতরের সৎ মানুষটাকে প্রসব করতে না পারার যন্ত্রণা কিছু কিছু লোক সম্ভবত তা বোধ করে। তাই হয়তো আমিও অস্থিরভাবে ছুটে বেড়িয়েছি গ্রাম থেকে শহরে, শহর থেকে অন্য শহরে। গ্রামের মাঠের মতো এখানে শিশুদের কোলাহল, পাখির কুজন, কাঠবিড়ালির ছোটাছুটি যেমন আছে, তেমনি জীবনমানের নিশ্চয়তাও কম নেই। বৈষম্য ঘোচানোর জন্য আপ্রাণ ছুটে চলা জীবনে শখের জন্য ‘আবেগ অনুভূতি’ আর প্রয়োজনের ‘প্রাপ্তি’ একই ছাতার নিচে সমভাবে দেখে এখানেই নিজেকে একজন মানুষ হিসেবে আবিষ্কার করলাম। বিশুদ্ধ বাতাসে শ্বাস নিতে নিতে মনে হলো- পুরো জীবনে বোধহয় এমনটাই চেয়েছি। যেখানে কবিতা রচিত হবে মানবতার, স্থিতিশীলতার, ভালোবাসার।
লেখক পরিচিতি
ফারহানা আইরিন, কবি ও সংগঠক। প্রকাশিত বই: ‘অর্ধযুগ নির্বাসনে আমি’ (কবিতা), ‘ভালোবাসার রক্তকদম’ (উপন্যাস)। সদস্য: উইমেন এন্টারপ্রেনার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ওয়েভ)। কেন্দ্রীয় সদস্য, কবি সংসদ, বাংলাদেশ। সম্মাননাপ্রাপ্তি : নেপাল-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ এওয়ার্ড- ২০২২ (সমাজসেবায়), ফোকাস বাংলাদেশ শাইনিং পার্সোনালিটি এওয়ার্ড- ২০১০ (সংগঠক), বিজয় দিবস সম্মাননা- ২০০৯ (কবিতায়), পরিবেশ সম্মাননা- ২০০৯ (সাহিত্যে)।

