ভিনদেশে শেকড় স্থাপন
পৃথিবীর মানচিত্রে বিশাল এক শুভ্র ছোপ কানাডা। কানাডার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, অসম্ভব শীতল আবহাওয়া, মানবিক সমাজব্যাবস্থা, অর্থনৈতিক স্বয়ংসম্পূর্ণতা, স্বল্প জনসংখ্যা এবং উন্নত প্রযুক্তির কারণে বিশ্বব্যাপী এই দেশটিতে অভিবাসন অনেকের কাছেই স্বপ্নের মতো। আমরা বাংলাদেশিরাও এর ব্যতিক্রম কিছু নই। আর তাই দিনে দিনে কানাডায় বাংলাদেশি অভিবাসীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
তবে ব্যক্তিগতভাবে কানাডা কেন, দেশ ছেড়ে পৃথিবীর আর কোথাও যাওয়ার কোনো ইচ্ছে কখনও ছিল না আমার। আমি অলস মানুষ, জীবনটা মায়ের কোলে বসে চুপচাপ কাটিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু বিধিবাম আর আমার এই ভাগ্যের কিছুটা নির্মম পরিস্থিতির শিকার হয়ে কোনোমতে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষাটা শেষ করতে না করতেই এই ডিপ ফ্রিজে ঢুকে পড়েছি।
কানাডায় এসে পৌঁছানোর আগে আমি শুধু একটা ব্যাপারেই অবগত ছিলাম আর তা হলো- কানাডা শীতের দেশ তবে গরমের দিনে কিছুদিন অতিরিক্ত গরম থাকে। আর কানাডা জিম ক্যারির আর রকি মাউন্টেনের দেশ। জিম ক্যারি যদিও আমাকে আকর্ষণ করেছে তবে বাকি কোনো কিছুই তেমন বিশাল ব্যাপার মনে হয়নি। দেশটা কেমন হবে, সুন্দর কি না, রাস্তা-ঘাট কেমন, আমি কী করবো এগুলো কিছুই মাথায় ছিল না। আসার আগে অনেকের মনে অনেক ধরনের উত্তেজনা কাজ করে, আমার মাঝে কাজ করেছে আশঙ্কা। অনেকেই অনেক উচ্চাকাক্সক্ষা নিয়ে আসেন আর আমি এসেছি মনে মনে- কী খাব, এই কথা চিন্তা করতে করতে। অলস মানুষের মনে যা হয় আর কী!
তার ওপরে আমার বয়সটাও তো ছিল সতেরো। সেই বয়সের একটা বাঙালি মেয়ের মায়ের কোল ছেড়ে আসাটা খুব সুখকর কিছু ছিল না। স্বপ্ন কল্পনায় অনেক কিছুই সুখকর মনে হলেও বাস্তবতা ভিন্ন হয়ে থাকে। এজন্যই এখানে আসার পরে বহু মানুষের মধ্যে স্বপ্নভঙ্গের একটা ব্যাপার ঘটে।
সুখের বিষয় হচ্ছে যেহেতু নেতিবাচক মানসিকতা নিয়ে এই দেশে পদার্পণ করেছি, স্বপ্নভঙ্গের সাথে খুব বেশি দেখা সাক্ষাৎ হয়নি। দেশটি আমাকে কল্পনার অতীত ভালোবাসা দিয়েছে, দিয়েছে স্বাধীনতা, সুরক্ষা, আত্মবিশ্বাস এবং জীবনটাকে আমার নিজের মতো করে উপভোগ করার অপার সুযোগ। তাই প্রথমেই দেশটি সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করার জন্য আমি প্রায়ই অপরাধবোধে ভুগি।
আমি এদেশে এসেছি ২০০৭ সালের হেমন্তের এক বিশেষ দিন থ্যাংকস গিভিং-এ। গাছে গাছে আগুন লাগা সেই প্রথম সৌন্দর্যই যথেষ্ট ছিল কানাডার প্রেমে পড়ে যাওয়ার। অপার্থিব সেই রং-সৌন্দর্য দিয়েছে আমাকে আত্মবিশ্বাস- এত সুন্দর একটা দেশে একটা সুন্দর জীবন গড়ে নিতে পারবো! আমাকে পারতেই হবে। আজ প্রায় ১৮ বছর পরে নিজেকে যদি জিজ্ঞেস করি কানাডায় আমার জীবনটা সুন্দর কি না? শত শত দিনের বহু সংগ্রামের পরে আমি বলতে পারি- হ্যাঁ সৃষ্টিকর্তার অসীম করুণায় কানাডায় আমার জীবনটা সুন্দর। আর এই সুন্দর জীবনের পিছনে কানাডার বিশাল বড়ো হাত রয়েছে।
কানাডা পদার্পণের পরে প্রথমেই যে সমস্যাটা ছিল, তা হলো ভাষার সমস্যা। আমরা যারা পিউর বাংলা মিডিয়ামের শিক্ষার্থী, তাদের এই একটা দুর্বলতা হয়তো থেকেই যায়; তবে ইংরেজি বই এবং সিনেমার পোকা হওয়ার সুবাদে মোটামুটি দ্রুত গতিতেই ইংরেজিটা কোনোমতে রপ্ত করতে পারি। যদিও ইংরেজি কথার মাঝেও বাঙালি সেই টানটা রয়ে গেছে তবে আমি সেটা হারাতে চাইনি কখনও। এই টান আমার শেকড়ের কথা বলে। আমার ভালোবাসার মাতৃভাষার সাথে সম্পর্কের কথা বলে।
ইংরেজিটা একটু রপ্ত হতেই মনে হলো উপার্জনের একটা উপায় তো দরকার। তখনও ইন্টারনেটে চাকরি খোঁজার মতো যথেষ্ট চালাক-চতুর হয়ে ওঠিনি। কয়েকটা রেজুমি প্রিন্ট করে হেঁটেই বের হয়ে গেলাম চাকরির খোঁজে। হাঁটতে হাঁটতে ড্যানফোর্থ আর কক্সওয়েলের শপার্স ড্রাগ মার্টের মধ্যে ছোট্ট একটা টিম হর্টনসের বাইরে ভ্যাকেন্সির সাইন দেখে ঢুকে গেলাম ভিতরে। ফিলিপিনা মাতৃসুলভ ম্যানেজার ইন্টারভিউ নিলেন সাথে সাথেই। ইন্টারভিউ শেষে বললেন, কল করে জানাবেন যদি হায়ার করেন। পরদিন বিকেলেই জানতে পারলাম চাকরি হয়ে গেছে। আমাকে আর পায় কে? আনন্দে আত্মহারা। চাকরি যোগাড় করে ফেলেছি।
কানাডার আইকনিক ব্যাপারগুলোর মধ্যে টিম হর্টনস একদম এক নম্বরে। ঠান্ডার দেশে সকালবেলাটা ঘুম থেকে ওঠে কাজের জন্য প্রস্তুত হওয়াটা কেনেডিয়ানদের জন্য খুব কষ্টের। এই কষ্টের অন্যতম সমাধান হলো টিম হর্টন্সের জগৎ-বিখ্যাত হৃদয় ভোলানো কফি। এখনও টিম হর্টন্সের কফির কাপটা হাতে নিয়ে প্রথম গন্ধেই মনটা চনমনে হয়ে ওঠে। বেশিরভাগ কেনেডিয়ানই দিনের শুরুটা করে এক কাপ কফি দিয়ে আর কানাডায় কফির রাজ্যে টিম হর্টন্সের রয়েছে একছত্র আধিপত্য।
এক সপ্তাহ পরে জয়েন করলাম। এটা আমার জীবনের প্রথম চাকরি। যা দেখি যা করি সবই নতুন। প্রথমদিকে বহু তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছিল। একজন ম্যানেজার ছিলেন যিনি কোনো এক কারণে আমাকে একেবারেই পছন্দ করতেন না। তার সাথে শিফট পড়া মানেই কোনো না কোনো যন্ত্রণা। আমার কাজ শুরু হতো ভোর ৫.৩০-এ। যেহেতু টিম হর্টন্সটা কক্সওয়েল সাবওয়ের একদম পাশে, আমাদের ভোরের রেগুলার কাস্টমাররা ছিলেন সকল টিটিসি (টরন্টোর লোকাল ট্রান্সপোর্টেশন কোম্পানি) ড্রাইভাররা।
চাকরিতে জয়েন করার দুই মাস পরে এক সকালে একজন ম্যানেজার আমার সাথে খুব খারাপ ব্যবহার করেন। তখন প্রায় কুড়িজন কাস্টমারের লাইন ছিল। তার মধ্যে বেশকিছু কাস্টমার খেয়াল করেন যে, ম্যানেজার আমার সাথে ভালো আচরণ করছেন না। একজন কাস্টমার আমার সেই ম্যানেজারকে সবার সামনেই বলে বসেন যে, তিনি লেবার বোর্ডে তার নামে কমপ্লেন করবেন এমপ্লয়িদের হ্যারাস করার জন্য। আমার ম্যানেজার যেমন ভড়কে যান, আমি তেমনই অবাক হয়ে যাই। বাকি শিফট খুব ভয়ে ভয়ে কাটে আমার- ম্যানেজারের সাথে সমস্যা হয়েছে, এখন তো আর আমার চাকরি থাকবে না।
সেদিন আমার শিফট শেষ হতে না হতেই হেড অফিস থেকে হিউম্যান রিসার্চের প্রতিনিধি চলে আসেন আমার সাথে দেখা করতে। আমাকে পার্শ্ববর্তী আরেকটি রেস্টুরেন্টে নিয়ে যান এবং খাবার কিনে দেন। (আমি আবার খাবারে কখনও না করি না, আর মনে মনে চিন্তা করছিলাম চাকরি যদি চলেই যায় অন্তত খেয়ে নিই)। যাই হোক, হিউম্যান রিসার্চের প্রতিনিধির লম্বা বক্তৃতার মোদ্দা কথা হলো, ম্যানেজারের ট্রিটমেন্টের জন্য তাঁরা আসলেই লজ্জিত এবং তারা এমপ্লয়ি হিসেবে আমাকে হারাতে চান না। তিনি আমার বেতন ঘণ্টায় এক ডলার বৃদ্ধি করতে রাজি এবং সেই ম্যানেজারের সঙ্গে আমার আর কোনো শিফট ফেলবেন না এমন কথা দিচ্ছেন, আমি যেন দয়া করে চাকরি ছেড়ে না দিই। কথা শুনে আমার আক্কেল গুড়ুম হয়ে যায়।
যাই হোক, সেই টিম হর্টন্সে আমি মোট পাঁচ মাস কাজ করার পরে টরন্টোর বিখ্যাত ফাইভ স্টার হোটেল ট্রাম্প টাওয়ারে কাজ করার সুযোগ মিলে যায় আর তখন আমি টিম হর্টন্সের চাকরিটি ছেড়ে দিই।
গুনে দেখলাম কানাডায় আমি সর্বমোট ১৪টি ভিন্ন জায়গায় নানারকম রোলে কাজ করেছি। তার মধ্যে আমাকে সবচেয়ে বেশি শিক্ষা দিয়েছে টিম হর্টন্স। সাধারণ কেনেডিয়ানদের সাথে মেশা, তাদের কালচার বোঝা, ভাষার পার্থক্য বোঝা, ওয়েদারকে প্রাধান্য না দিয়ে কাজকে প্রাধান্য দেওয়া এবং সর্বোপরি সবার সাথে তাল মিলিয়ে চলা এবং বিখ্যাত কেনেডিয়ান কাস্টমার সার্ভিসের ট্রেইনিং আমার হয়েছে এই টিম হর্টন্সে। যেই শিক্ষা আমি কেনেডিয়ান কলেজ ইউনিভার্সিটি কিংবা ম্যানেজমেন্টের জব পজিশনেও পাইনি। এই শিক্ষা আমার পার্সোনাল এবং প্রোফেশনাল জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কাজে লেগেছে। সেই সতেরো বছর বয়েসের টিম হর্টন্সের ট্রেইনিং এবং অভিজ্ঞতা আমাকে কানাডার জন্য প্রস্তুত করেছে।
তবে চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পরেও টিম হর্টন্সের সঙ্গে আমার সম্পর্ক কিন্তু কোনোদিন শেষ হয়ে যায়নি। বরং আরও বেশি করে জমাট বেঁধেছে। যেহেতু সেখানে কাজ করার একটা সুযোগ হয়েছিল পরবর্তীতে যখনই কাস্টমার হিসেবে সেখানে গিয়েছি আমি একটা অদৃশ্য সম্পর্ক টিম হর্টন্সের কর্মীদের সাথে অনুভব করেছি। আমি জানি তাদের দিনগুলো কেমন যায়। ভালোমন্দ একটু হাসি, কান্না আর প্রচণ্ড পরিশ্রমের এই কাজে যেমন আনন্দ আছে, ভবিষ্যতে কিছু একটা করতে পারার স্টেপিং স্টোন আছে তেমনি আছে বিরক্তি বেদনা এবং পরিশ্রম। টিম হর্টন্সের কাজ আমাকে কফির প্রতি আসক্ত করেছে এবং কাজ ছেড়ে দেওয়ার পরেও প্রায় প্রতিদিনই গেছি বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে থাকা নানা রকম টিম হর্টন্সের এমনকি পাশের দেশের ব্যস্ত শহর নিউ ইয়র্কেও। টিম হর্টন্সে ঢোকার সাথে সাথে মনে হয় ফেলে আসা সেই নিজের বাসার লিভিং রুমে ঢুকছি। ছাত্রজীবনের অসংখ্য এসাইনমেন্ট করেছি টিম হর্টন্সের ওয়াই-ফাই ব্যবহার করে। আমার প্রথম বইটির অনেকখানি লিখেছি টিম হর্টন্সে বসে। আমার ব্যবসার অনেক কাজ হয়েছে এই টিম হর্টন্সে। আর কত কত আড্ডা, নতুন বন্ধু, পুরাতন ঝগড়া- কত কিছুর সাক্ষী হয়ে রয়েছে এই টিম হর্টন্স।
টিম হর্টন্সে কাজ ছেড়েছি ২০০৮ সালের প্রথম দিকে। তুষারস্নাত দীর্ঘ শীতকাল শেষে পুরাতন জমাট বাঁধা বরফের ভিতর থেকে যখন হলুদিয়া শিশু ড্যাফোডিল উঁকিঝুঁকি মারছে তখন শুরু করলাম টরন্টোর রায়ার্সন ইউনিভার্সিটির (এখন পরিচিত টরন্টো মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি নামে) প্রোগ্রাম। এমনিতেই বছরখানেক দেরি হয়ে গেছে নতুন দেশ, ভাষা সংস্কৃতি বুঝতে বুঝতে। বাংলাদেশে বড়ো ভাই-বোনদের দেখতাম এক-একজন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া নিয়ে যত আদিখ্যেতা। কত আড্ডা, মজা, নতুন নতুন শাড়ি এবং প্রেমে পড়ার যে ব্যাপারগুলো। এখানে এসে তার কোনোটাই হলো না। নিয়মিত ক্লাস, কাজ আর ঘরের কাজের মধ্যে চিড়ে চ্যাপ্টাভাবে কোন দিক দিয়ে যে তিনটা বছর কেটে গেল, কিছুই বুঝতে পারলাম না।
অতঃপর একদিন ইউনিভার্সিটি ডিগ্রি নিয়ে যখন সাদা কলারের চাকরির জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এপ্লাই করছি তখন অনেকেই বললো কিছু ভলান্টিয়ার কাজের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করলে এই ধরনের চাকরিগুলো একটু সহজে পাওয়া যায়। একটু চেষ্টা করার পরে পেয়ে গেলাম সেই সুযোগ। একটি হাসপাতালের দীর্ঘ মেয়াদি চিকিৎসা শাখায়, মূলত একটি বৃদ্ধাশ্রম বললেই চলে। ঠিক হলো, যতদিন পারি সপ্তাহে তিনদিন দুই-তিন ঘণ্টা করে সময় দেব এখানে।
এ-এক অদ্ভুত জায়গা। প্রথমত যারা টরন্টো থেকেছেন তারা জানেন, পৃথিবীর হরেক দেশের প্রায় আড়াইশ জাতির মানুষ একসাথে মিলেমিশে বাস করে এই শহরে। যারা আমাদের মতো অন্য দেশ থেকে অভিবাসন করেছেন তাদেরকে এই দেশের সবচেয়ে প্রচলিত ভাষা ইংরেজি রপ্ত করতে হয় জীবনযাত্রার জন্যই। ভাষা রপ্ত করার এই ব্যাপারটা কম বয়সের মানুষদের জন্য যতখানি সহজ বেশি বয়সী মানুষদের জন্য ঠিক ততটাই কঠিন।
বেশিরভাগ বয়স্ক এবং প্রবীণদের জন্য ইংরেজিটা হয়তো কখনোই শেখা হয়ে ওঠে না। এই বৃদ্ধাশ্রমে এই ব্যাপারটা খুব বেশি লক্ষ্য করা যায়। সেখানে ছিল নানা জাতের প্রবীণ নারী পুরুষ। ভাষার পার্থক্যের সাথে সাথে তাদের ছিল সংস্কৃতি, ধর্ম, পোশাক এবং খাদ্যাভ্যাসের পার্থক্য। তাই একই ছাদের নিচে একে অপরের সাথে মানিয়ে চলার চেষ্টা সবসময় থাকলেও বয়স এবং শারীরিক অসুস্থতার কারণে তারা খুব একটা সফল হতে পারতেন না। ফলে একটা অস্বস্তি কাজ করতো তাদের মধ্যে সবসময়। বেশিরভাগ সময়ই তারা তাদের এই ফ্রাস্টেশনের কারণে মেজাজ খিটমিটে করে রাখতেন। এজন্যই সাধারণ মানুষ এই বিশেষ শ্রেণির মানুষদের সাথে খুব একটা মেলামেশা করতে পছন্দ করতেন না।
এটি ছিল সরকারের অনুদানে তৈরি বৃদ্ধাশ্রম, এখানে আসা মানুষগুলো তেমন একটা অর্থবিত্তের মালিক না আর তাদের বেশির ভাগেরই আসলে যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। তবে পরে জানতে পারি তাদের বেশির ভাগেরই ছেলেপুলে, আত্মীয়-স্বজন আছে যারা হয়তো বাবা কিংবা মা দিবসে খুব আয়োজন করে দেখা করতে আসে বৃদ্ধাশ্রমে থাকা বাবা মায়ের সাথে। সেই দিনটা উভয়পক্ষের জন্যই খুব আনন্দের।
এখানে কাজ করতে গিয়ে মানবজীবনের কিছু চরম বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। আমার কাজটা ছিল মূলত সকালে তাদের কিছুটা খুব হালকা ব্যায়াম করানো এবং দুপুরে খেতে সাহায্য করা। বাকি সময়টা তাদের সাথে গল্প করা, সময় কাটানো ও সঙ্গ দেওয়া। যারা ইংরেজি বলতে পারতেন তাদের থেকে শুনতে পেতাম তাদের বর্ণাঢ্য জীবনের নানা গল্প। কতজন কত দেশ ঘুরে এসেছেন, করেছেন কত রং-বেরং-এর চাকরি। কতজন যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ থেকে কোনোমতে জীবনটা নিয়ে পালিয়ে এসেছেন। আমি মুগ্ধ হয়ে শুনতাম তাদের গল্পগুলো।
মজার ব্যাপার হলো, ধীরে ধীরে যারা ইংরেজি বলতে পারেন না, তাদের সাথেও মনের ভাব আদান-প্রদানের ব্যাপারটা বেশ রপ্ত করে ফেলেছিলাম। মূলত আমি আমার মতো করেই কথা বলতাম আর তারাও তাদের মাতৃভাষায় কথা বলতেন কিন্তু কোনো এক আশ্চর্য উপায়ে দুজনেই দুজনকে বুঝতাম। ইন্টারন্যাশনাল বডি ল্যাঙ্গুয়েজে পারদর্শী হয়ে ওঠেছিলাম ধীরে ধীরে। যদিও আমি আগে থেকেই তাদের বেশিরভাগের জীবনবৃত্তান্ত জানতাম পেশেন্টের কেস হিস্টোরি ফাইলের থেকে। তবু তাদেরকে অনেকখানি জানতে পারতাম নিত্যদিনের কথোপকথন থেকে।
আমি কথা বলতে পছন্দ করি। আমি মানুষের সাথে মিশতে পছন্দ করি আর সেই মানুষগুলো যদি হয় বিচিত্র অভিজ্ঞতাসম্পন্ন তাহলে তো আর কথাই নেই। এই বৃদ্ধাশ্রমে আমি সৌভাগ্যক্রমে পেয়ে গেলাম এমনই কিছু মানুষ। এর মধ্যে একটি সাদা কলার চাকরি যোগাড় করে ফেলতে পেরেছিলাম পার্শ্ববর্তী নর্থ ইয়র্ক হাসপাতালে- এডমিনিস্ট্রেটিভ কাজ, খুবই চমৎকার পরিবেশ।
সকালে অফিসে যাই আর বিকেলে বৃদ্ধাশ্রমে আমার বন্ধুদের সাথে দেখা করে আসি। গল্প করে আমার একলা জীবনের সময়টাও খুব চমৎকার কাটে। বৃদ্ধাশ্রমে মৃত্যু একটা খুব স্বাভাবিক বিষয়। মৃত্যুকে খুব কাছে থেকে দেখার প্রচুর অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে এই বৃদ্ধাশ্রমে স্বেচ্ছাসেবকের কাজ করে। মৃত্যু হলে এবং মৃত্যুবিষয়ক বিভিন্ন ট্রেইনিংও নিয়মিত দেওয়া হয় এসব বৃদ্ধাশ্রমগুলোতে। তবু যতই প্রফেশনাল থাকার চেষ্টা করি না কেন, আমার খয়েরি মন এবং মানসিকতা মৃত্যু ব্যাপারটাকে কখনও সহজভাবে গ্রহণ করতে পারেনি।
এই বৃদ্ধাশ্রমে ইয়াতা বেসিল নামের নব্বই বছর বয়সী একজন ইটালিয়ান বৃদ্ধার সাথে আমার বিশেষ সখ্য গড়ে ওঠে। ইয়াতা ষাটের দশকে ইটালি থেকে টরন্টো অভিবাসন করেন। অভিবাসীদের সকল সংগ্রামের মধ্যদিয়ে তাকে যেতে হয়েছিল এবং তিনি স্বামী এবং ছেলেপুলে নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন একটি সুন্দর সংসার। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে ইয়াতার স্বামী মারা যান এবং বিধবা অবস্থায় একসাথে দুটো-তিনটে চাকরি করে মানুষ করেন তিন ছেলেমেয়েকে। ছেলেমেয়েদের গল্প করার সময় তার চোখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠতো। নাতি-নাতনিদের ছবি দিয়ে ভরে তুলেছিলেন তার দেয়াল। তবে কাউকে কখনও ইয়াতার সাথে দেখা করতে আসতে দেখিনি।
ইয়াতার বেশিরভাগ গল্প জুড়ে ছিল তার ফেলে রেখে আসা ইটালির গ্রামের গল্প, যেখানে তিনি তার বর্ণময় কিশোরী জীবন কাটিয়েছিলেন। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো ইয়াতার গল্প শুনতাম। ইটালি যাওয়ার একটা শখ তৈরি হয়েছিল ইয়াতার গল্প শুনতে শুনতেই। বেশ কয়েকমাস যাওয়ার পরে চাকরির ক্ষেত্রে আমার ব্যস্ততাও বেড়ে গেল আর বৃদ্ধাশ্রমে আমার যাতায়াত কমতে থাকলো। তবু যখনই যেতাম ইয়াতার সাথে কয়েক ঘণ্টা সময় কোথা থেকে যে কেটে যেতো, বুঝতে পারতাম না। বৃদ্ধাশ্রমের সকলেই আমাদের এই বন্ধুত্বের কথাটা জানতো।
এক শুক্রবার সকালে বৃদ্ধাশ্রম থেকে কল করে জানালো ইয়াতার শরীর ভালো না। কথা বলছেন না, তবে ইশারায় আমার কথা জিজ্ঞেস করেছেন বলেই বৃদ্ধাশ্রমের নার্স আমাকে কল করেছেন। আমি দৌড়ে গেলাম। ইয়াতা আমাকে ডেকে একটা পুডিং কাপ ধরিয়ে দিলো। আমি কাষ্ট হেসে বললাম, তুমি তো ভয় ধরিয়ে দিয়েছিলে ইয়াতা। জবাবে ইয়াতা শুধু ফোকলা দাঁতে হেঁসেছিলেন। সেই রাতেই ইয়াতা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আমাকে আবারও খবর জানানো হয়। বৃদ্ধাশ্রমের ডিউটিরত হেড নার্স আমাকে বলেন যেহেতু ইয়াতা তোমার বন্ধু ছিলেন, তার শেষের কাজগুলোও তুমি করো। আমি রাজি হয়ে গেলাম। ইয়াতার বডি ঠিকঠাক করে বডি ব্যাগে ঢুকিয়ে সংলগ্ন ফিউনারেল হোমে রেখে এলাম। এরপরের কাজটা কঠিন। ইয়াতার আত্মীয়-স্বজনদের ফোন করে খবরটা দেওয়া।
প্রথম কল করলাম তার মেয়েকে। তিনি ধরলেন না, ভয়েস মেইল জানালো তিনি কানাডার বাইরে ভ্যাকেশনে গেছেন। বড়ো ছেলেকে ফোন করলাম, পেলাম না। ফোনটি ধরলেন ছোটো ছেলে। খবরটা শোনার পরে বললেন- “আমি একটু ব্যস্ত আছি, আমি একজন রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী এবং আমার ক্লায়েন্ট আমার জন্য অপেক্ষা করছেন। তুমি এক কাজ করো, আমার হয়ে মায়ের কপালে একটা চুমু দিয়ে দিও।” আমার মনের ভিতরের প্রচণ্ড ক্ষোভ নিবারণ করে প্রোফেশনাল থাকার চেষ্টা করতে করতে বললাম, তা না হয় হবে কিন্তু তোমাদের তো ইয়াতার জিনিসপত্রের একটা ব্যবস্থা করতে হবে, তাই না। তিনি আমাকেই বললেন সেগুলোর ব্যবস্থা করতে। তাদের না কি ইয়াতার পুরাতন জিনিসের কোনো প্রয়োজন নেই। ফোনটা রাখার পরে আমি জানি না কেন আমার মনের ভিতরের বাঙালিত্ব জেগে ওঠলো। আমি ইয়াতার ছেলের এই তাচ্ছিল্যের আচরণ একদমই মেনে নিতে পারছিলাম না। ইয়াতার জিনিসগুলো গোছানো শুরু করলাম। কত কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে তার প্রতিটা জিনিসে। কত গল্প, পরিশ্রম অভিজ্ঞতা। মাত্র পাঁচটা বাক্সে ঢুকে গেল ইয়াতার সমস্ত জীবন। ডোনেশনের অফিসে জমা দিয়ে সকল প্রকার কাগজ কলমের কাজ শেষ করে বাইরে এসে দেখি দিনটা কোথায় যেন মিলিয়ে গেছে। শেষ বিকেলের মন খারাপ করা সামান্য আভায় সবকিছু আরও বিষণ্ণ মনে হয়। আমি বের হয়ে কিছুদূর হেঁটে একটা পার্কের চেয়ারে বসে পড়লাম। সমস্ত দিন নিজের অনুভূতি প্রকাশ না করে শুধু কর্তব্য পালন করে গেছি। এবারে আর চোখের জল বাঁধ মানেনি। হু হু করে বুকের ভিতর থেকে কান্না বের হয়ে এলো। মানুষের জীবন এত করুণ কেন হবে?
সমস্ত রাতে আর ঘুমাতে পারিনি। আমি নিজেকে ইয়াতার ফিউনেরালেও নিয়ে যেতে পারিনি। কেমন যেন একটা ভীষণ অপরাধবোধ কাজ করছিল। এর পরের কয়েক সপ্তাহ আমি গভীর বিষণ্ণতায় পড়ে যাই। আমার কাছের মানুষ যারা ঘটনাটা জানতেন, তারা সবাই বলছিলেন ইয়াতা আমার আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে কেউ ছিলেন না। তিনি আমার বহুদিনের পুরাতন কোনো বন্ধুও ছিল না। আর এমন না যে, এর আগে আমি মৃত্যুর সামনে পড়িনি। আমি যথেষ্ট যুক্তিবাদী মানুষ এবং মৃত্যুকে বরাবরই জীবনের একটি অধ্যয় হিসেবেই নিয়েছিলাম। ইয়াতার মৃত্যু আমাকে অতখানি নাড়া দেয়নি- দিয়েছিল তার ছেলের ঐ কথাগুলো- “মাকে আমার হয়ে চুমু দিয়ে দিও।”
এখানে মৃত মানুষ কবর দেওয়া খুব খরচসাধ্য ব্যাপার। সাধারণত পরিবার থেকেই এই কবরের ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু যাদের পরিবার এই ব্যাপারে নাক গলাতে না চান, এই দেশের সরকার তাদের মৃতদেহ সৎকারের ব্যবস্থা করেন। কিন্তু এত খরচ সরকার বহন করতে পারেন না। তাই এইসব মৃতদেহগুলো নামমাত্র খরচে পুড়িয়ে ফেলা হয়। ধর্মপ্রাণ খ্রিষ্টান ইয়াতার ভাগ্যেও এই পুড়ে যাওয়াই রয়েছে। আমি এই সকল অভিজ্ঞতার মধ্যদিয়ে যাওয়ার পরে ঐ বৃদ্ধাশ্রমে আর কখনও ফেরত যেতে পারিনি।
তবে বৃদ্ধাশ্রমের এই কাজটি আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। আমি সম্পূর্ণ অন্যভাবে জীবনকে দেখতে শিখেছি। আমি শিখেছি টাকা-পয়সা, শিক্ষা, সন্তান- এগুলো সব কিছুই খুব সামান্য কয়েকদিনের সাথী। শেষ পর্যন্ত কিছুই থাকে না। এই পৃথিবীর সবকিছুই নশ্বর। ইয়াতা আমার আত্মাকে ছুঁয়ে দিতে পেরেছিলেন। তার মৃত্যু আমাকে জীবনের দিকে অন্যভাবে তাকাতে শিখিয়েছে। যে শিক্ষা নিয়ে এখনও চলছি। আশা করি ভবিষ্যতেও চলবো।
কানাডা জীবনের এই দুটি অধ্যায়ের গুরুত্ব আমার জীবনে অপরিসীম। আমি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার চেয়েও জীবনের চলার পথের এই শিক্ষাগুলোকে খুব মূল্যায়ন করি। আমার এই অভিজ্ঞতার আলোকে আমি আমার জীবনকে সাজিয়ে তুলছি। এই শিক্ষা আমাকে শান্তি এবং শান্তির জীবন খুঁজে পেতে সাহায্য করেছে। আমি আমার নিজের ফেলে আসা দেশ ও সংস্কৃতির প্রতিও শ্রদ্ধা অনুভব করছি। আমি আমার সুন্দর জীবনের জন্য দুটো দেশের কাছেই কৃতজ্ঞ।
লেখক পরিচিতি
জন্ম ঢাকায়। ২০০৭ সালে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষে কানাডায় অভিবাসী। টরন্টো মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতক। পরবর্তীকালে সেন্টেনিয়াল কলেজ থেকে পোস্টগ্রাজুয়েট ডিপ্লোমা অর্জন করেন। স্টারফিশ মেডিকেলের কর্পোরেট হেড অফিসে কর্মরত। ৩০টিরও বেশি দেশ ভ্রমণ করেছেন। ‘আমি একখণ্ড বাংলাদেশ’- কবি মৌ মধুবন্তীর বাংলা কবিতার ইংরেজি অনুবাদ। ‘চড়ুই’- এ.এফ মরিৎজের ইংরেজি কবিতার বাংলা অনুবাদ। ‘প্রলাপ’- নিজস্ব যাপনগ্রন্থ।

