লেখক ও গবেষক সুব্রত কুমার দাস- জাপানিদের সুব্রত সান, আমার বন্ধু

প্রবীর বিকাশ সরকার

প্রথমেই বলে রাখতে চাই, জাপান নিয়ে আমার গবেষণা এবং লেখালেখির বয়স দুই দশকের। সব মিলিয়ে এই বিষয়ে গোটা পনেরো বই ইতোমধ্যে লিখে ফেলেছি। ছাপা হয়েছে টোকিও, ঢাকা, দিল্লি  ও কলকাতা থেকে। কিন্তু বলতে দ্বিধা নেই যে, এই কাজে যিনি আমাকে বিখ্যাত করেছেন তিনি হলেন  স্বনামধন্য লেখক, গবেষক, উপস্থাপক এবং একসময়ের শিক্ষক সুব্রত কুমার দাস। আমার অত্যন্ত প্রিয়জন বর্তমানে কানাডার টরন্টো শহরে অভিবাসী বাংলাদেশের এই মানুষটির কাছে আমি চিরঋণী, চিরকৃতজ্ঞ।

আমরা সবাই জানি, বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ব্যাখার অতীত এক অদ্ভুত জায়গা! এখানে আকস্মিক অপরিচিত কার সঙ্গে কখন কার সাক্ষাৎ এবং সুসম্পর্ক হয়ে যায় নিশ্চিত করে বলা অসম্ভব। সুব্রতবাবু এবং আমার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। সেটা ঘটেছিল, ২০০৮ সালে ঢাকার মোহাম্মদপুরে জাপান প্রবাসী আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু রফিকুল আলমের বাসায় গ্রীষ্মের এক রোদেলা সকালে।

আমার সঙ্গে সাক্ষাতের আগে, বলা ভালো জাপান-গবেষক আমাকে আবিষ্কারের আগে, হটাৎ একদিন তিনি ফোন করেন। তখন আমি যেমন তাঁকে চিনতাম না, তেমনি তিনিও আমাকে চিনতেন না। ফোনে নিজের পরিচয় দিয়ে তিনি জানান তিনি ইংরেজি ভাষার শিক্ষক এবং লেখালেখি করেন। আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান। তাঁর আগ্রহের কারণ চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত ‘বিশদবাংলা’ নামের একটি পত্রিকায় আমার লিখিত একটি প্রবন্ধ পাঠ। ‘জাপানে গেইশা সংস্কৃতি’ শিরোনামের সেই প্রবন্ধটি তিনি পাঠ করেছেন। পত্রিকাটি তাঁর নজরে পড়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ভাষাবিজ্ঞানী বর্তমানে প্রয়াত ড. মনিরুজ্জামানের ঢাকার বাসায়। জাপান নিয়ে সুব্রতবাবুর প্রবল আগ্রহ। তখন কাজও করছিলেন জাপান-বাংলা সম্পর্ক নিয়ে। যদিও তখনও আমি কিছুই জানতাম না তাঁর উক্ত কাজ সম্পর্কে। পরে ধীরে ধীরে জেনেছি।

প্রবন্ধটি পাঠ করে তিনি এতোই অভিভূত হন যে আমার সাথে সাক্ষাতে আগ্রহী হন। ফোনে জানান আমাদের সাক্ষাতের সময়। তাঁর আগ্রহের অন্যতম বিষয়টি হলো, তিনি মনে করেন, বিশিষ্ট কবি ও সাহিত্যিক প্রিয়ম্বদা বন্দ্যোপাধ্যায় জাপানি গেইশা নিয়ে একটি যে গ্রন্থ লিখেছেন ‘রেণুকা’ নামে তারপর আর দ্বিতীয় কেউ যদি বাংলায় বই লিখে থাকেন সেটা নাকি আমি। ‘রেণুকা’র কথা আমি সেদিনই প্রথম তাঁর কাছ থেকে জানতে পারি।  

সেদিনের সকালে অনুষ্ঠিত সাক্ষাতে জাপান নিয়ে তাঁর আগ্রহের কথা জেনে আমিও আনন্দিত হলাম। সেইসময় জাপান নিয়ে কজন আর লেখালেখি বা গবেষণা করছেন! খুবই সামান্য। জাপান নিয়ে ততোদিনে যদিও অনেক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে, কিন্তু সেগুলোর অধিকাংশই পর্যটক বা ভ্রমণকারীদের অগভীর বিবরণমাত্র। এমনকি, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর বিখ্যাত ‘জাপান যাত্রী’ গ্রন্থটিতেও অসম্পূর্ণ বিবরণ দিয়েছেন জাপান সম্পর্কে। ১৯১৬ সালে প্রায় তিন মাস জাপানে থেকেও তিনি চাক্ষুষ যা যা দেখেছেন বা জেনেছেন তার একভাগও লেখেননি! জাপানশীর্ষ রবীন্দ্রগবেষক দেশিকোত্তম কাজুও আজুমা বাংলায় জাপান-রবীন্দ্রনাথ সম্পর্ক নিয়ে লিখেছেন, সেখানেও জাপান সম্পর্কে তথ্য নিতান্তই কম।

সুব্রত তখন ছাত্রদের নিয়ে জাপানের কোবে ফুকিয়াই মিউনিসিপ্যাল হাইস্কুলের সাথে একটি প্রকল্পে কাজ করছিলেন। সেই কাজের সূত্র ধরে তিনি জাপানের সাথে শতবর্ষ পূর্বে বাঙালিদের সংযোগের গভীরে অনুসন্ধান করতে শুরু করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী জাপান সম্পর্কে লেখালেখি বা গবেষণার গভীর দিকসমূহের অনেক আলোক তিনি আমার গ্রন্থেই পেয়েছেন। কী সেই গ্রন্থ? ‘জানা-অজানা জাপান’ – প্রবন্ধ সংকলনের প্রথম খণ্ড। সেটা তখন সদ্য ঢাকায় প্রকাশিত হয়েছে। আমি তাঁকে সেই সাক্ষাতের মাহেন্দ্রক্ষণে গ্রন্থটির একটি কপি উপহার দিলাম। তিনি বইটি দেখে অত্যন্ত আনন্দিত এবং বিস্মিত হয়েছিলেন। মনে হইয়েছিল, জহুরি জহর চেনেন! তারই আলোকসম প্রামাণিক দৃষ্টান্ত হিসেবে আবির্ভূত হল প্রভাবশালী ‘দি ডেইলি স্টার’ পত্রিকায় বইটি নিয়ে একটি দীর্ঘ আলোচনা। সেটা দেখে আমি রীতিমতো বিস্মিত হয়ে যাই!

অবশ্যই এটা লিখেই থেমে থাকলেন না তিনি! আমার আরও একাধিক গ্রন্থ নিয়ে তিনি নিবন্ধ লিখেছেন পর পর কয়েক বছর এবং যাকে বলে একেবারে ‘বিখ্যাত’ করে দিয়েছেন আমাকে। ততদিনে তাঁর সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব দৃঢ় হয়েছে।

ইতোমধ্যে ২০১১ সালে দুটি ঘটনা ঘটল। আমি ‘কিশোরচিত্র’ নামে একটি শিশু সাংবাদপত্রের ইন্টারনেট সংস্করণ প্রকাশের উদ্যোগ নেই আমরা। তখন তিনি এবং তাঁর কন্যা ব্রতীর উৎসাহব্যঞ্জক সহযোগিতা পাই আমি। এ উপলক্ষে ঢাকায় তাঁর বাসায় আতিথ্যগ্রহণ ও আপ্যায়নে সম্মানিত হয়েছি। এরমধ্যে আমার মেয়ে টিনা জাপানের বিখ্যাত ৎসুকুবা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য থিসিস হিসেবে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে বেছে নেয়। বাংলাদেশে তার না গেলেই নয়। আমি তখন কুমিল্লায়। সে একদিন কুমিল্লায় এলো। আমি সুব্রতবাবুকে বললাম, ঢাকার বিখ্যাত দু-একটি বিদ্যালয়ে আমাদেরকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। তিনি এবং ব্রতী আমাদেরকে অসামান্য সাহায্য করলেন। ব্রতী তখন ভিকারুননিসা নুন স্কুলের ছাত্রী। স্কুলে গিয়ে টিনা তো মুগ্ধ হয়ে গেল। আমার মুগ্ধতাও কম ছিল না। গাইড করলেন সুব্রতবাবু ও ব্রতী।

২০১১ সালেই ‘কিশোরচিত্র’ মুদ্রিত আকারে প্রকাশের জন্য আমি কুমিল্লায় গেলাম। এক্ষেত্রেও সুব্রতবাবুর আন্তরিক সহযোগিতার কমতি ছিল না। তেমনি একটি সময়ে সম্ভবত জুন মাসের দিকে বন্ধু রফিকের ফোন পেলাম। বলল, “দ্রুত জাপানে ফিরে আসুন! ইন্ডিয়া সেন্টারের উদ্যোগে তিনদিনব্যাপী ‘ইন্ডিয়া-জাপান গ্লোবাল সামিট-২০১১’ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাপানে। সেখানে রবীন্দ্রনাথকে উপস্থাপনের চিন্তা চলছে।“ সে বছর ছিল কবিগুরুর ১৫০তম জন্মবার্ষিকী। রফিক বললেন, “আপনি ছাড়া আর কেউ নেই কাজটা করার জন্য।“ তিনি আরও জানালেন, “সেন্টারের সেক্রেটারি সাকামোতো তোঅরু সান আপনাকে খুঁজছেন। টিকিট পাঠাবে আপনার মতামত জানার পর। প্লিজ, তাড়াতাড়ি করুন।“

এমন সম্মানজনক সুযোগ কি হাতছাড়া করা যায়! দ্রুত টোকিওতে ফিরে এলাম। একাধিক কাজ সম্পাদন করার দায়িত্ব পড়ল আমার ওপর। এর মধ্যে একটি ছিল স্মারকগ্রন্থ। কিন্তু বেশি সময় ছিল না হাতে। সদ্য প্রকাশিত আমার ‘রবীন্দ্রনাথ এবং জাপান: শতবর্ষের সম্পর্ক’ গ্রন্থটিকে ইংরেজি অনুবাদ করাতে বললেন সাকামোতো সান। তড়িঘড়ি করে সুব্রতবাবুকে অনুরোধ করলাম। বাংলা গ্রন্থটিসহ ওয়ার্ড ফাইল ডেটা ইমেইল করে দিলাম। যথাসময় তিনি বাংলা থেকে ইংরেজিতে অসাধারণ ট্রান্সক্রিয়েট করে দিলেন ‘Rabindranath Tagore: India-Japan Cooperation Perspective’ নাম দিয়ে। যথাসময়ে সেই বই প্রকাশিত হলো।

বলা বাহুল্য, এই দুটো নিয়েও তিনি প্রবন্ধ লিখেছেন। দৈনিক সংবাদ, ডেইলি সান, বইয়ের জগৎ প্রভৃতি কাগজে। আলোচনা করেছেন ‘জানা-অজানা জাপান’ দ্বিতীয় খণ্ড নিয়েও। তাঁর বদান্যতায় জাপানের নানাদিক উন্মোচিত হয়েছে বৃহত্তর পাঠকের সামনে। এ যেন আমার শতজনমের প্রাপ্তি। কঠোর চেষ্টা ও সদিচ্ছা যে বৃথা যায় না এর চেয়ে অনবদ্য উদাহরণ আর কী আছে!

উল্লেখ করে রাখতে চাই, ২০১২ সালের বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছিল সুব্রতর কঠিন পরিশ্রমের অনেক গবেষণালব্ধ বই ‘সেকালের বাংলা সাময়িকপত্রে জাপান’। আমার সৌভাগ্য যে, সেই গ্রন্থ তিনি আমাকেই উৎসর্গ করেন। ঢাকার নবযুগ থেকে প্রকাশিত সেই গ্রন্থের উৎসর্গপত্রে তিনি লেখেন, ‘প্রবীর বিকাশ সরকার / বাংলা এবং জাপানি উভয়ই যার ভাষা / বাংলাদেশ এবং জাপান উভয়ই যার কর্মস্থল’। আমারও সৌভাগ্য হয় ২০১৬ সালে প্রকাশিত আমার লেখা ‘জাপানে রবীন্দ্রনাথ’ বইটি তাঁকে উৎসর্গ করার।

সুব্রত কুমার দাসের বর্তমান আবাস টরন্টোতে। সেই শহরে থাকে আমার ছোটবোন প্রতিমা সরকার। সুব্রত ও তাঁর স্ত্রী নীলিমা দত্ত, আমাদের প্রিয় নীলিমা বৌদি, আপনস্নেহে প্রতিমার সাথে চলেন। সহোদর ভাইয়ের চেয়ে সেই স্নেহ কোন অংশেই কম নয়। ফেসবুকে ওই দুই পরিবারের আন্তরিক মেলামেশা আমার মনে সত্যিকারের বন্ধুত্বের প্রতি নতুন করে আস্থা জাগায়। 

জাপানের সাথে বাংলার সম্পর্ক নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে আমাদের যাত্রা মোটামুটি একই সময়ে। আমি দুই-তিন বছর আগে লিখতে শুরু করি, তিনি সামান্য পরে। কিন্তু আনন্দের যে, গত দুই দশক ধরে দুজনেই এগিয়ে চলেছি এই পথে। এই চলার পথে দুই পরিবারও যেন মিলেমিশে আছি আপন জ্ঞানে। আর তাই বলতে ইচ্ছে করে, “এমন বন্ধু আর কে আছে!”

জাপানিদের সুব্রত সান, আমার সুব্রত কুমার দাস, বন্ধুবর, আবারও ধন্যবাদ, প্রণাম।

প্রবীর বিকাশ সরকার, জাপান প্রবাসী রবীন্দ্রগবেষক