শব্দেরা যেভাবে পথ খুঁজে নেয়
সাহিত্য এমন এক শিল্পমাধ্যম, যেখানে মানুষের অন্তর্জগত, অনুভূতি, অভিমান, স্বপ্ন, প্রতিবাদ এবং ভালোবাসা এক অদ্ভুত মায়ায় শব্দ হয়ে জন্ম নেয়। একজন লেখক যখন লেখেন, তখন তিনি কেবল গল্প, কবিতা বা প্রবন্ধ লেখেন না; তিনি নিজের জীবনের ভেতরের জীবন, অভিজ্ঞতা, বিশ্বাস, কষ্ট, ভালোবাসা, সময় এবং অনুভূতিকে ভাষা দেওয়ার চেষ্টা করেন। তাই একজন লেখকের কাছে স্বীকৃতি মানে শুধু একটি পুরস্কার নয়; বরং তাঁর দীর্ঘদিনের নিভৃত সাধনা, একাগ্রতা এবং আত্মিক যাত্রার প্রতি এক ধরনের স্বীকৃতি। ‘বাংলামেইল–কবি ইকবাল হাসান সাহিত্য পুরস্কার ২০২৫’ প্রাপ্তির অনুভূতিটা আমার কাছে ঠিক তেমনই – আনন্দ, কৃতজ্ঞতা, বিস্ময় এবং দায়িত্ববোধের এক অদ্ভূত মিশ্র অনুভূতি।
আমি আপন মনে কাজ করে যাওয়া, নিজের মতো লিখে যাওয়া একজন মানুষ। নিজেকে খুব বেশি জাহির করার প্রবণতা আমার ধাতে নেই। আমি বরাবরই বিশ্বাস করেছি, একজন লেখকের সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর লেখা। শব্দ যদি সত্যিকারের শক্তি ধারণ করে, তবে তা একদিন না একদিন পাঠকের কাছে পৌঁছবেই। তাই নিজের লেখাকে সামনে আনার চেয়ে বরং লেখার ভেতরের সততাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছি সবসময়। হয়তো সে কারণেই ‘বাংলামেইল–কবি ইকবাল হাসান সাহিত্য পুরস্কার ২০২৫’-এর জন্য যখন আমাকে নির্বাচিত করা হয়, তখন আমি যেমন আনন্দিত হয়েছিলাম, তেমনি ভীষণ বিস্মিতও হয়েছিলাম। তারপরই মনে হয়েছিল, “নীরবে লিখে যাওয়া শব্দগুলোরও হয়তো কোথাও না কোথাও গিয়ে প্রতিধ্বনি তৈরি হয়।“
২০০৪ সালে পশ্চিমবঙ্গ থেকে ‘যতীন্দ্রমোহন বাগচী সাহিত্য পুরস্কার’ প্রাপ্তির সময়ও আমি একইভাবে বিস্মিত হয়েছিলাম। তখন আমি মনপ্রাণ দিয়ে লিখতাম, ‘ছান্দস’ নামে একটি অনিয়মিত ছোটকাগজ সম্পাদনা করতাম। আমার কবিতা পশ্চিমবঙ্গের অনেক ছোটকাগজে প্রকাশিত হতো। এরইমধ্যে দুটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল— ধ্রুপদ সন্ন্যাসে (১৯৯৮) এবং কাচের কোকিল (২০০০)। আমি থাকতাম বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা থেকে এবং রাজধানীর ঢাকার লেখক সমাজ থেকে দূরে। তবে সাহিত্যাঙ্গনে নাকি কথা হতো আমার লেখালেখি নিয়ে। কিন্তু তারপরেও কোনোভাবে কোথাও নিজের পরিচিতি পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করিনি। পশ্চিমবঙ্গ থেকে ‘যতীন্দ্রমোহন বাগচী সাহিত্য পুরস্কার’ গ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হল। বিস্মিত আমি তখন জানতে পারি, কোনো এক পাঠকের মাধ্যমে আমার কাব্যগ্রন্থ তাঁদের হাতে পৌঁছেছিল! ব্যাপারটা আজও আমাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। একজন অচেনা পাঠক, যিনি হয়তো নিভৃতে আমার লেখা পড়েছেন, তিনিই হয়তো কোথাও আমার শব্দকে পৌঁছে দিয়েছেন – এই অনুভূতি কি অভূতপূর্ব নয়? একজন লেখকের জন্য এর চেয়ে বড় বিস্ময়, এর চেয়ে বড় আনন্দ আর কী হতে পারে! তখনও মনে হয়েছিল, শব্দেরা সত্যিই নিজের পথ খুঁজে নিতে জানে।
যে কোনো পুরস্কার নিঃসন্দেহে মানুষকে আনন্দিত করে, আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়। একজন লেখকের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়। দীর্ঘ সময় ধরে লিখতে লিখতে অনেক সময় ক্লান্তি আসে, নিজের কাজ নিয়েই তৈরি হয় সংশয়। কখনও মনে হয় – “এই লেখাগুলো আদৌ কারও কাছে পৌঁছাচ্ছে কি? কেউ কি অনুভব করছে শব্দগুলোর ভেতরের গভীরতা? কেন লিখছি আমি? আমি না লিখলে পৃথিবীতে কার কী যাবে আসবে?” এমনই দোদুল্যমান সময়ে একটি স্বীকৃতি লেখকের সামনে আলোর মতো জ্বলে ওঠে –“লিখে যাও, কেউ পড়ুক বা না পড়ুক, নিজের ভেতরে জমে ওঠা শব্দকে মুক্ত করে দাও পাখির মতো। এই মুক্তি দিতে পারাটাও কি আনন্দের নয়?” নিঃসন্দেহে আনন্দের। একটা লেখা শেষ না হওয়া পর্যন্ত একজন লেখকের মনে যে অপরিসীম ছটফটানি থাকে, লেখাটা শেষ হওয়ার পরে যে অনুভূতি জন্ম নেয়, তা শুধু লেখকরাই জানেন।
আমি সবসময় মনে করি, সাহিত্য কোনো প্রতিযোগিতার জায়গা নয়। এখানে কেউ কারও প্রতিদ্বন্দ্বী নন। প্রত্যেক লেখকের নিজস্ব ভাষা আছে, নিজস্ব অনুভব আছে, নিজস্ব আকাশ আছে। কেউ নীরবতা লেখেন, কেউ প্রতিবাদ লেখেন, কেউ মানুষের ভাঙা সম্পর্কের গল্প লেখেন, কেউ জীবনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সৌন্দর্যগুলো তুলে আনেন। এই বৈচিত্র্যই সাহিত্যকে জীবন্ত রাখে। তাই পুরস্কার অবশ্যই আনন্দের, কিন্তু সেটিই লেখকের চূড়ান্ত পরিচয় নয়। প্রকৃত পরিচয় তাঁর লেখার ভেতরে।
আরেকটি বিষয় আমি খুব গভীরভাবে অনুভব করি – একজন লেখক আসলে লেখকই। তাঁর চিন্তা, অনুভূতি, সৃজনশীলতা কিংবা সাহিত্যবোধকে নারী বা পুরুষ পরিচয়ে আলাদা করে বিচার করার কথা নয়। একজন লেখকের সত্যিকারের শক্তি তাঁর কাজের ভেতরে। আমি কখনো নিজেকে ‘নারী লেখক’ হিসেবে নয় – একজন লেখক হিসেবেই দেখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। কারণ লেখার জগতে অনুভূতির কোনো লিঙ্গ নেই। ভালোবাসা, বেদনা, অভিমান, প্রতিবাদ কিংবা মানবিকতার অনুভূতি নারী-পুরুষে বিভক্ত নয়। একজন সত্যিকারের লেখক সেই সর্বজনীন অনুভূতিগুলোকে ধারণ করেন। তবে একজন নারী হিসেবে আমার অনুভূতির ভেতরে আরও কিছু বিশেষ জায়গা আছে। আমাদের সমাজে নারীদের অনুভূতি, সংগ্রাম, অভিমান, স্বপ্ন এবং নীরব শক্তির অনেক গল্প এখনও যথেষ্টভাবে উচ্চারিত হয় না। আমি চেষ্টা করি সেই নীরব গল্পগুলোকেও ভাষা দিতে। আমি চাই আমার লেখায় মানুষ নিজেদের খুঁজে পাক – বিশেষ করে সেইসব মানুষ, যারা অনেক কথা বলেও আসলে নিজের ভেতরের কষ্ট কাউকে বলতে পারেন না। সাহিত্য যদি মানুষের না বলা কথাগুলোকে ভাষা দিতে না পারে, তাহলে সেই সাহিত্য অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
লেখালেখি কখনোই আমার কাছে নিছক শখ নয়; এটি এক ধরনের আত্মিক আশ্রয়। জীবনের নানা অভিজ্ঞতা, বিচিত্র মানুষ, সমাজের বৈপরীত্য, আনন্দ, বেদনা, নীরবতা – সবকিছুই আমাকে লিখতে শিখিয়েছে। অনেক সময় এমনও হয়েছে, কিছু অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। সেই জায়গা থেকেই আমার লেখার শুরু। তাই আমি যখন লিখি, তখন চেষ্টা করি যতটা সম্ভব আন্তরিক থাকতে। শব্দকে কখনো সাজিয়ে তোলার জন্য নয়, বরং সত্যিকারের অনুভূতিকে স্পর্শ করার জন্য লিখি।
আমার লেখালেখির পথচলায় আমি সবসময় চেষ্টা করেছি যতটা সম্ভব আন্তরিক থাকতে। আমি খুব জোরে কথা বলতে পারি না, নিজেকে খুব বেশি প্রচার করতেও পারি না। বরং নীরবে কাজ করে যেতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। হয়তো সে কারণেই এই পুরস্কার আমার কাছে আরও বেশি আবেগের। কারণ এটি যেন আমাকে নতুন করে বিশ্বাস করিয়েছে – নিঃশব্দ পরিশ্রমও একদিন মূল্যায়িত হয়। শব্দ যদি সত্যিকারের হয়, তবে তা একসময় মানুষের হৃদয়ে পৌঁছবেই।
এই পুরস্কার আমাকে আনন্দ দিয়েছে, তবে একই সঙ্গে আরও বেশি দায়িত্বশীলও করেছে। কারণ পুরস্কারপ্রাপ্তি নিঃসন্দেহে ভালো লেখার আগ্রহ বাড়িয়ে তোলে, দায়িত্বও বাড়িয়ে দেয়। একজন লেখকের কাজ শুধু সুন্দর শব্দ সাজানো নয়; বরং সময়কে ধারণ করা, মানুষের না বলা কথাগুলোকে ভাষা দেওয়া এবং মানবিক সত্যকে সাহসের সঙ্গে প্রকাশ করা।
আজকের পৃথিবীতে মানুষ ভীষণ ব্যস্ত, কিন্তু ভেতরে ভেতরে খুব একা। প্রযুক্তি আমাদের অনেক কাছে এনেছে, আবার অনেক দূরেও সরিয়ে দিয়েছে। মানুষের অনুভূতিগুলো ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। এই সময়ে সাহিত্য খুব জরুরি। একটি সত্যিকারের লেখা মানুষকে থামতে শেখায়, ভাবতে শেখায়, অন্যের কষ্ট অনুভব করতে শেখায়।
এই প্রাপ্তিতে আমি গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করতে চাই আমার পাঠকদের। কারণ পাঠক ছাড়া কোনো লেখকের অস্তিত্ব পূর্ণতা পায় না। একজন পাঠক যখন সময় নিয়ে একটি লেখা পড়েন, তখন তিনি কেবল শব্দ পড়েন না; তিনি লেখকের অনুভূতির ভেতরে প্রবেশ করেন। সেই সংযোগই একজন লেখককে বাঁচিয়ে রাখে। আমি কৃতজ্ঞ সেইসব মানুষের প্রতি, যারা আমার লেখা পড়েছেন, আমাকে উৎসাহ দিয়েছেন, কখনো নীরবে পাশে থেকেছেন, আবার কখনো গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে আমাকে আরও ভালো লিখতে সাহায্য করেছেন।
আমি আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই ‘বাংলামেইল’ পরিবার এবং সম্মানিত বিচারকমণ্ডলীকে, যারা আমাকে এই সম্মানের জন্য নির্বাচিত করেছেন। এই স্বীকৃতি আমার কাছে অত্যন্ত মূল্যবান। কারণ এটি শুধু একটি পুরস্কার নয়; এটি আমার দীর্ঘদিনের নীরব সাহিত্যচর্চার প্রতি একটি সম্মান, একটি বিশ্বাস। একজন লেখক হিসেবে এই প্রাপ্তি আমাকে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছে – আমি কেন লিখি, কী লিখি এবং কাদের জন্য লিখি।
এই পুরস্কার আমাকে আরও একটি বিষয় নতুন করে উপলব্ধি করিয়েছে – সাহিত্যচর্চা আসলে এক দীর্ঘ দায়বদ্ধতার পথ। এখানে থেমে যাওয়ার সুযোগ নেই। প্রতিনিয়ত নিজেকে নতুন করে তৈরি করতে হয়, পড়তে হয়, শিখতে হয়, অনুভব করতে হয়। একজন লেখক যদি নিজেকে সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন না করেন, তাহলে তাঁর লেখাও স্থির হয়ে যায়। তাই আমি চাই আরও বেশি পড়তে, আরও গভীরভাবে মানুষকে বুঝতে এবং আরও সততার সঙ্গে লিখতে।
আমি বিশ্বাস করি, সাহিত্য মানুষের আত্মাকে সুন্দর করে। পৃথিবীতে যত বিভাজন, হিংসা, অমানবিকতা আছে – তার বিপরীতে সাহিত্য মানুষের ভেতরে সহমর্মিতা তৈরি করে। একটি ভালো লেখা মানুষকে অন্যের কষ্ট বুঝতে শেখায়, ভালোবাসতে শেখায়, ভাবতে শেখায়। তাই সাহিত্য কখনোই শুধু বিনোদনের বিষয় নয়; এটি মানবিকতারও চর্চা।
সবশেষে শুধু এটুকুই বলতে চাই – পুরস্কার আনন্দ দেয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত একজন লেখককে বাঁচিয়ে রাখে তাঁর লেখাই। আমি সেই লেখার কাছেই দায়বদ্ধ থাকতে চাই। লিখে যেতে চাই আরও আন্তরিকভাবে, আরও গভীরভাবে। যদি কোনো একদিন আমার কোনো লেখা একজন মানুষের মন ভালো করে দেয়, কাউকে সাহস জোগায়, কাউকে নিজের ভেতরে ফিরে তাকাতে শেখায় কিংবা কোনো নিঃসঙ্গ মানুষকে অনুভব করায় যে সে একা নয় – তাহলেই মনে হবে, আমার শব্দেরা তাদের পথ খুঁজে পেয়েছে।