শীতের ব্যানফ : এক বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা

সেলিনা শেলী

এডমন্টন এসে প্রতিদিনই বেরোচ্ছি, এখানকার গ্রোসারি, অদ্ভুত সুন্দর এলআরটি ট্রেন, চার্চিল স্কোয়ার, ফানিকুলার (নদীর পাড়ে পাহাড়ের ওপর থেকে ওঠানামা করা লিফট) নানান মল, মিউজিয়াম এভাবে ঘুরতেই লাগলাম।

ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহের এক সকাল বেলা আমরা ক্যালগেরি থেকে আরও অনেক দূরে- বেনফের উদ্দেশ্যে হাল্কা কফি বিস্কিট খেয়ে তৈরি হয়ে নিলাম। আমরা মানে, আমি আর আমার দুই সন্তান- তূর্য ও নীলিমা। এটি আমার প্রথমবার যাওয়া। আমাদের ড্রাইভার উমায়ের- একজন পাকিস্তানি। ৪০-৪৫ বছর বয়স। এই পথে তিনি দক্ষ চালক। আগেই বলে দিলেন- একদিনের ট্রিপ হলে অন্তত সাড়ে আটটার মধ্যে এডমন্টন শহরের মধ্যিখানে আমাদের এপার্টমেন্ট থেকে যাত্রা করতে হবে। ৪০০ কিলোমিটারের বেশি পথ ক্যালগেরি, সেখান থেকে আরও দেড়ঘণ্টায় ব্যানফ। গাড়ি ছাড়তে ছাড়তে আমরা ন’টা বাজিয়ে দিলাম। সিদ্ধান্ত হলো- পথে কোথাও খেয়ে নেবো। সেদিন ২০২৩-র ডিসেম্বরের ৪ তারিখে সূর্য ডুববে ৪.৩৩ মিনিটে। আমাদের জন্যে দিনের সময় খুব সংক্ষিপ্ত হয়ে গেল। অথচ সামারে এখানে রাত দশটায়ও সূর্য ডোবে।

এখানে শীতে হালকা বৃষ্টি হয় মাঝে মধ্যেই। আর ঠান্ডা বাড়লে তো তা তুষার হয়ে ঝরে। নভেম্বরের ২১ তারিখ তূর্যের কনভোকেশনের দিন তো বাসায় ফেরার পথে রীতিমতো ঝড় শুরু হয়েছিল। তখন আমরা এআরবিএনবি-তে ওঠেছিলাম। শহরে মাঝে মাঝে হাল্কা তুষার পড়ছে। মাইনাসে ঢুকে গেছে তাপমাত্রা। কিন্তু রোদ ঝলমলে হলে তুষার গলে যাচ্ছে। বেশ কিছুক্ষণ পরে উঁচু উঁচু দালান, অফিস পাড়া, শহর পিছনে রেখে আমাদের গাড়ি ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে লাগলো ক্যালগেরি ট্রেইল ধরে। দু’পাশে শুধুই বিস্তীর্ণ মাঠ আর মাঠ। সমান্তরাল সড়ক ডানে বায়ে, রেল লাইন- মালবাহী ওয়াগন। এখানে সড়কের একটা দিক বেশ ভালো লেগেছে- যাওয়ার সড়ক আর ফেরার সড়ক একেবারেই আলাদা- অনেক দূরত্বে। সেই ফিরতি পথের গাড়িগুলো দেখতে খেলনার মতো সুন্দর লাগছিল। মাঠে স্নো ফল-এর আগেই কাটা হয়ে গেছে সব ফসল।

জীবনানন্দের হেমন্তের কথা মনে পড়ে গেল। সারামাঠ জুড়ে গোল গোল বিশাল খড়ের রোল। মেশিনে ঘাস-নাড়া কেটে ভেজিটেবল রোলের মতো সারা মাঠে ইতিউতি ফেলে রেখেছে। হয়তো দ্রুতই গাড়িতে তুলে নিয়ে যাবে। বেশ দূরত্ব পেরুলে দেখা মেলে দুয়েকটা ফার্ম হাউজ। সেখানে মাঠের কাজের সরঞ্জাম, লোকজন থাকার ঘর। গ্রাম বলে তার সুবিধা শহরের চেয়ে কম নয়। চলতে চলতে চোখে পড়ে আলবার্টার ইন্ডাস্ট্রি, তেল গ্যাস উত্তোলন ক্ষেত্র, কোথাও কাঠের ঘেরের ভিতর অসংখ্য গরু অথবা ঘোড়া। এখানকার গরুগুলো বেশ বড়ো। আর গরুর মাংসও আমাদের দেশের চেয়ে সুস্বাদু। অদ্ভুত সুন্দর সুনসান দীর্ঘ এই পথ কোথাও উঁচুতে কোথাও নিচুতে নেমে যাচ্ছে। আসলে পুরো আলবার্টা জুড়ে টিলা পাহাড় পর্বত আর বনানী। কিছুদূর পরপরই পাহাড় ভেদ করে যাচ্ছে সড়ক আর তার ওপরে ব্যস্ত ব্রিজ, সড়ক। কানের পাশ দিয়ে সাঁই করে গাড়ি চলে যাচ্ছে। কেউ হর্ন বাজায় না। এখানে এসে এই হর্ন শোনা প্রায় ভুলতে বসেছি।

গাড়িতে উমায়ের কেবল হিন্দি গান চালাচ্ছেন। জিগ্যেস করলাম- ‘দমাদম মাস্ত কালান্দার…’ গানটা শুনেছেন কি না? হ্যাঁ বলতেই বললাম- উনি রুনা লায়লা, বাংলাদেশি শিল্পী। এই বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। এই গান যে নূরজাহানও গেয়েছেন সেটা বললে হয়তো তিনি চিনতে পারতেন। প্রায় এক ঘণ্টার বেশি সময় পর ১৫৫ কিলোমিটার পেরিয়ে আমরা রেড ডিয়ারে পৌঁছলাম। টিম হর্টনসে নেমে বার্গার আর কফি নিলাম। এখানে কিছুদূর পরপরই পৃথিবী বিখ্যাত এই টিম হর্টনস কফিশপ। ম্যাকডোনাল্ড বা অন্যান্য শপও রয়েছে। পৃথিবী সেরা গরুর মাংস, মুরগি, খাসি বা শূকরের মাংসের নানা রকম বার্গার। এছাড়া দেশি কিংবা বিদেশি হাজারও স্বাদের খাবার তো আছেই। সময় বাঁচাতে স্ন্যাক্সসহ আমরা গাড়িতে ওঠে পড়লাম। আবার চলছি তো চলছি।

গান বাজছে। বাইরে তাপমাত্রা মাইনাস ৭ ডিগ্রি। দু’পাশের পথে পথে তুষার জমে আছে। বিস্তীর্ণ মাঠগুলো সাদা চাদরে ঢাকা। ক্যালগেরি এখনও ১৩৬.৭৮ কিলোমিটারের পথ। আরও দেড় ঘণ্টার পথ পেরিয়ে আমরা ক্যালগেরি পার হলাম। আবার কিছুটা হাল্কা খাবার, গরম কফির প্রয়োজন দেখা দিলো। উমায়েরের সাথে কথা বলতে হয়, তা নয় একটানা পথে তার ঝিমুনি পায়। গান বাজছে, সাথে নানা খুনসুটি। উমায়েরের মাসিক আয় তূর্যের চেয়েও বেশি। মাসে গড়ে ৫টা এরকম ট্রিপ সে পায়ই। সাড়ে তিনশ ক্যাড বা কানাডিয়ান ডলারের বাইরে শহরে প্রতিদিন উবারের যে উপার্জন তাতে তূর্যের মতো একজন ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজারের চেয়ে তার আয় বেশি। ক্যালগেরি ফেলে যতোই সামনে এগোচ্ছি ততোই তুষারাচ্ছাদন বাড়ছে। কিছুদূর যেতে বিখ্যাত রকি পর্বতের সারি নজরে এলো। অপূর্ব, মনোহরা সেই দৃশ্য! পথের দুধারে পর্বত, তার সামনে হাজার হাজার পাইন গাছ। নিচে পাহাড়ের গভীর খাদ। সেখানটায় সড়কগুলো তিন চার ফিট দেয়ালে বাঁধানো। এরপর যতো দূর যাই, রকি আমাদের ছাড়ে না।

এই পর্বতমালা কানাডা আর আমেরিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল অর্থাৎ কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়া এবং আলবার্টা থেকে আইডাহো, মন্টানা, ওয়াইমিং, কলোরাডো হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো পর্যন্ত প্রায় ৩০০০ মাইল প্রসারিত। এই পরিসীমা পৃথিবীর অদ্ভুত সুন্দর চূড়া, খাড়া ঢাল, প্রান্তর, বৈচিত্র্যময় অঞ্চল, বন্যপ্রাণী এবং নানা হ্রদে পরিপূর্ণ। এখানে অসংখ্য বন বনানী, পার্ক, হাইকিং ট্রেইল আর নৈসর্গিক ট্রেইল রিজ রোড, হোটেল মোটেল রয়েছে। প্রতি বছর প্রায় সাড়ে চার লাখ পর্যটক এখানে ভ্রমণ করতে আসে। বিস্ময়কর দানবাকৃতির কালো পাথরের পর্বতমালার বেশিরভাগ সফেদ তুষারে ঢেকে গেছে। কোথাও কোথাও পর্বত থেকে নেমে আসা ঝরনাধারা ভূমিতে লুটিয়ে পড়ার ভঙ্গিতে বরফ হয়ে থেমে আছে পাথরের গায়ে। যেন কোনো জাদুকর তার জাদুর কাঠিতে সব উচ্ছলতা থামিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে তার! আমরা মেঘলা একটি দিনের ভিতর ঢুকে পড়েছি। সূর্য নেই। আকাশের মেঘরাশি পাহাড়ের চূড়োয় লেগে মুহূর্তে বৃষ্টি বা তুষার ঝরাচ্ছে, আবার উজ্জ্বল হয়ে উঠছে দিন। বেশ অনেকদূর পরপর ড্রাইভারদের জিরিয়ে নেওয়ার জন্যে অথবা পর্যটকদের নেমে দেখার জন্যে সড়কের পাশে সুন্দর ভিউ পয়েন্ট রয়েছে। আরও কটি গাড়ির পাশে বিশাল পর্বত থেকে নেমে আসা জলের লেকের কিনারে নামলাম আমরা। চাদ্দিক বাঁধানো। মুহূর্তেই হিম শীতল বাতাস আমাদের জমাট করে তুললো। দুধের সরের মতোন জমে আছে লেক। পাথরের দৈত্যাকার পর্বতগুলো এতটা কাছে লাগছে- যেন হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে। কিন্তু তা নয়, লেকের ওপাড়ের পর্বত তার দাম্ভিক দূরত্বেই রয়েছে। মেঘ-বৃষ্টিরোদ ছুঁয়ে যাওয়া দৃশ্যান্তরের ভিতর আমাদের আবারও যাত্রা শুরু হলো।

ক্যালগেরি থেকে আরও ১২৭.৪ কিলোমিটার দূরে দেড় ঘণ্টার বেশি সময় অতিক্রম করে আমরা যেখানে এসে পৌঁছলাম তা বেনফের শুধু নয়, সারা বিশ্বের এক স্বর্গীয় সৌন্দর্যময় জায়গা। এর নাম লেক লুইস। রকির অববাহিকায় নীল জলের এই লেক যেন পৃথিবীর সব বিস্ময় নিয়ে পর্যটকদের জন্যে অপেক্ষা করে। আমরা গাড়ি থেকে নেমে পাশের ভবনে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। উমায়ের এই ফাঁকে গাড়ির ভিতর ঘুমিয়ে নেবে। আমাদের স্নো-বুট ডুবে যাচ্ছে একহাঁটু নরম বরফ কুচিতে। দল বেঁধে হেঁটে যাচ্ছে মানুষ; শিশু, এমন কী তাদের কুকুর বেড়াল পর্যন্ত। তাদের গায়েও গরম জামা, পায়ে জুতো। কলহাস্যে ভরে ওঠেছে চাদ্দিক। ভেবেছিলাম- এরকম ঠান্ডায় লোকজন কম হবে। বেশ কিছুটা পথ সাবধানে পা ফেলে যেতে হবে লেকের পাড়ে। চার প্রস্থ কাপড়েও কনকনে ঠান্ডা সুঁইয়ের মতো বিঁধতে লাগলো। হঠাৎ পা পিছলে প্রায় পড়েই যাচ্ছিলাম। পেছন থেকে তূর্য হাত ধরে না টান দিলে হয়তো বেড়ানো বন্ধ হয়ে যেত। দূর থেকে সাদা সমতল বিশাল এক মাঠ দেখিয়ে তূর্য বললো- ওই যে দেখো লেক, আমরা ওখানেই যাচ্ছি।

আমি ভাবলাম- এত মানুষ হাঁটাহাঁটি করছে, হয়তো এদের সামনে কোথাও লেক আছে। ওমা! পাড়ে পৌঁছতেই দেখি- এটাই লেক, যার ওপর মানুষজন হাঁটাহাঁটি করছে! পাশে বড়ো একটা বোর্ডে লেকের ছবি আর বর্ণনা দেওয়া। কেবল সেই বোর্ডেই দেখা পেলাম নীল জলের। বাকি সব ধবল শুভ্র। একটু দূরে লেকের ডানে উঁচু কয়েকটি ভবন। তূর্য বললো- এগুলো ফাইভ স্টার হোটেল।

লেক লুইস ইন, ক্যাসেল মাউন্টেন, ফেয়ারমন্ট চ্যাটো লেক লুইস এরকম অসংখ্য হোটেল চাদ্দিকে। ‘ফেয়ারমন্ট চ্যাটো লেক লুইস’ দেখিয়ে তূর্য বললো- বলা হয়ে থাকে ইন্দিরা গান্ধী এই হোটেলের আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন। মহারানি ভিক্টোরিয়ার চতুর্থ কন্যা প্রিন্সেস লুইসের নামেই নামকরণ করা হয়েছে মর্ত্যরে এই স্বর্গহ্রদ লেক লুইসকে। কত প্রেমিক-প্রেমিকার আবেগের গভীরতম স্থানে, কত শিল্পীর রঙ-তুলিতে, কত পরিব্রাজকের ক্যামেরায়, কত মানুষের স্মৃতির পাতায় উজ্জ্বল হয়ে আছে লেক লুইসের সৌন্দর্য !

সমভূমি থেকে ৫,৭৪০ ফুট উচ্চতায় এটি বরফ গলা পানির জলাশয়। রকি পর্বতের হিমবাহ গলা নীল জলের হ্রদটি দৈর্ঘ্যে ২ কিলোমিটার, প্রস্থে আধা কিলোমিটার, সর্বোচ্চ গভীরতা ২৩০ ফুট। হ্রদটি বছরে ছয়মাস বরফাচ্ছাদিত থাকে। জুলাই মাসেও এখানকার তাপমাত্রা ১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হয় না। আর আমরা এসেছি ডিসেম্বরের ৪ তারিখ। ভিক্টোরিয়া হিমবাহের বরফাচ্ছাদিত পাহাড়ের জল তখন স্থির। কী অপরূপ সফেদ এই দৃশ্য, বোঝানো যাবে না। এই সৌন্দর্যের সামনে দাঁড়িয়ে হঠাৎ এক অজানা বিহ্বলতায় মনটা আপ্লূত হয়ে ওঠলো, এই ঘোরগ্রস্ততা কাটছে না কিছুতেই। কিছুক্ষণ অবাক দৃষ্টিতে লেক লুইসের দিকে তাকিয়ে রইলাম। দুইপাশে পাহাড়, পিছনের দিকে ভিক্টোরিয়া হিমবাহ!

আমার বুটজুতো বরফের জন্যে খুবই উপযুক্ত। তবু নিচে নামতে পিছলে যাওয়ার ভয় পাচ্ছি। সিঁড়ি, পাথর উঁচু-নিচু কিচ্ছু বোঝার উপায় নেই। দুয়েকটা নামার পথ পর্যটকের পায়ের ছাপে সুবিধাজনক মনে হলো। বড়ো ছেলে তার ভাই আর আমাকে সামলে যাচ্ছে। চাদ্দিকে লেকের জল বা জমাট বরফের ওপর স্কি খেলছে অনেকে। কেউ সিøপ করে টেনে নিয়ে যাওয়া কতোগুলো বোর্ডে বসে দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে, দাঁড়িয়ে ছবি তুলছে, ভিডিও করছে। আমরাও নামলাম। অবিস্মরণীয় সেই অভিজ্ঞতা। নীল জলের পৃথিবী বিখ্যাত লেক লুইসের ওপর দাঁড়িয়ে আছি! ভিডিও, ছবি তোলার কোনো বিরাম নেই। কিছু তুলোট বরফ সরাতেই বিস্ময়ের সাথে দেখি কাচের মতো স্বচ্ছ বরফ বেরিয়ে এসেছে, আর ভিতরে নিচে নুড়িপাথর দেখা যাচ্ছে! এই ব্ল্যাক আইস পিচ্ছিল, বিপদজনক, পিছলে যাচ্ছে কেউ কেউ। দূরে একটি ঘর দেখা যাচ্ছে। গরমের সময় ওখান থেকে নৌকায় ওঠে পর্যটকরা পুরো লেক ঘুরে বেড়ায়। এখন ওই ঘর থেকে হেঁটে নেমে যাচ্ছে সবাই। সামনে দুই পর্বতের মাঝামাঝি দিয়ে লেক চলে গেছে দূরে যেখানে বিশালাকার হিমবাহ! কোনো কোনো যুগল এখানে পরস্পরকে প্রেম নিবেদন করছে, কেউ আংটি বদল করছে। দূরে লেকের ওপরেই বরফের ভাস্কর্য বানাচ্ছে কয়েকজন শিল্পী। আমি বিমোহিত। এই দুই পর্বত সমেত নীল হ্রদের ছবিই ছোটোবেলায় নানা ক্যালেন্ডারে দেখেছি। তখন এসব রূপকথার স্বপ্ন বলে মনে হতো!

লেক লুইস থেকে গাড়িতে ওঠে আমরা ব্রিটিশ কলম্বিয়ার দিকে যেতে শুরু করলাম। এডমন্টন থেকে ব্যানফ পর্যন্ত অরণ্য বনানী ভেদ করে যাওয়া সড়কের দু-পাশের প্রাণিকুলের দু-দিকের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে কিছুদূর পরপর ওভারব্রিজ তৈরি করা হয়েছে। অরণ্যের মাঝে সড়ক বানিয়ে জীবজন্তুর এলাকা দ্বিধাবিভক্ত করার অমানবিকতা এতে কিছুটা হলেও হ্রাস পায়। সত্যিই মুগ্ধ হলাম। অনেক পর্যটক সড়কপথে যাওয়ার সময় ওভারব্রিজে বন্যপ্রাণীর নির্বিঘ্ন চলাচল দেখেন।

আবার যাত্রা শুরু। পাশেই সাত পর্বত ছোঁয়া ‘মোরাইন লেকে’ এসে দাঁড়ালাম। এটিও জমে আছে। এখানে আরও ঠান্ডা। এই অঞ্চলটি কানাডার বিখ্যাত ব্যানফ ন্যাশানাল পার্কের ভিতর। ব্যানফ ন্যাশনাল পার্কটি কানাডার সবচেয়ে বড়ো জাতীয় পার্ক।

প্রাকৃতিকভাবে অসংখ্য পর্বত, অরণ্য, জীবজন্তু লেক ঝরনা, মাইলের পর মাইল জুড়ে পাইনের সারি, ভালুক, হরিণ, নানা পাখপাখালিতে ভরা এই পার্কটির সকল বৈচিত্র্য বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণে কানাডা সরকার অত্যন্ত সচেতন। আর এ-কারণেই এটি পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম পার্ক, আর কানাডার সর্ববৃহৎ পার্ক, যাকে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এসবের ভিতর দিয়েই ট্রান্সকানাডা হাইওয়ে চলে গেছে, আর রকি পর্বতমালার ওই পাশটিতেই রয়েছে আমেরিকা।

আবহাওয়া আরও খারাপ হয়ে এলো। আমরা মিনেওয়াঙ্কা হ্রদের (Lake Minnewanka) সামনে এসে দাঁড়ালাম। চাদ্দিকে পাহাড় আর পাহাড়। সেখান থেকে ব্রিটিশ কলম্বিয়ার দিকে যাত্রা শুরু করলাম। পথে তুমুল ঝড়ো হাওয়া আর স্নো-ফল শুরু হলো। এমন ধোঁয়াশা অন্ধকার ঘনিয়ে এলো যে, গাড়ির হেড লাইটেও দু’হাত দূরের কিছু দেখা যাচ্ছে না। মন খারাপ হয়ে গেলো। উমায়ের বললেন, এই পাহাড়ি পথে এভাবে গেলে বিপদ হতে পারে। কী আর করা! গাড়ি ফেরাতে হবে। কিন্তু এত ঝাপসা অন্ধকারে তুষারে গাড়ি ঘোরাবার জায়গাও পাওয়া যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ বেগে দু-দিকে দু-মুখী চলছে। আমরা অনেক দূর গিয়ে কোনো রকমভাবে ফেরার পথে উঠলাম। যতো ব্যানফের দিকে ফিরছি- আবহাওয়া ততো সুন্দর হয়ে ওঠছে। তবে ঠান্ডা বেড়ে চলেছে রাতের সাথে পাল্লা দিয়ে। ঠিক হলো- আমরা ব্যানফ শহরে যাবো, পথে যতো দর্শনীয় জায়গা পাবো- দেখে নেবো। এভাবে সড়কের পাশের ভারমিলিয়ন পার্কে এসে দাঁড়ালাম। এখানে যে নির্দেশিকা আছে- তাতে নানা বন্যপ্রাণী যেমন জাগুয়ার, শেয়াল, শ্বেতভাল্লুক, ঈগল, দাঁড়কাক এরকম অসংখ্য প্রাণী এবং হ্রদের জলে অজস্র মাছের উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু সবকিছু এখন বরফাচ্ছাদিত। পাখি প্রাণী সব কোথায় যে লুকিয়ে পড়েছে। পথে পথে পাইন গাছের পাতার শুভ্র তুষারকে মনে হলো তুষারকুসুম বা তারাবাতি। অপূর্ব সেই সৌন্দর্য। পার্কের পাশের সড়ক আর তার সাথে লাগোয়া বিশাল রকি পর্বতের সারি। গাড়ি যাচ্ছে হুস হুস করে। পাশে পর্যটকদের জন্যে ওয়াসরুম, ছবি তোলার বাঁধানো জায়গা, পার্কিং লট। সূর্য না থাকলেও আকাশের আলো বরফে পাহাড়ে বিম্বিত হয়ে আমাদের বিভাময় করে তুললো। ভীষণ ঠান্ডা বাতাস। এক মুহূর্তে ব্যথায় হাত, আঙুল, নাক অনুভূতিহীন হয়ে পড়ছিল! তূর্যকে বললাম– কষ্টের স্মৃতিগুলো যদি এভাবে অনুভূতিহীন করার কোনো সুযোগ থাকতো! ওর চোখ শাসনে জ্বলে ওঠতেই চুপসে গেলাম! গাড়ি আবার চলতে শুরু করেছে।

উমায়েরকে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে জিগ্যেস করার পর তিনি জানালেন, খুব সামান্যই জানেন। বাংলাদেশ নিয়ে তেমন কিছু জানার সুযোগ হয়নি তার। জীবনের অনেক সময় নানা দেশে ঘুরেছেন। আমাদের কোনো ইতিহাস, শিল্পী, কবি কিচ্ছু জানা নেই তার।

এর মধ্যে গাড়িতে আমাদের পানি শেষ হয়ে গেছে। আগেই বলেছি ড্রাইভার পাকিস্তানি। আমার প্রচ- পানির পিপাসা লেগেছে। এই কথা কয়েকবার বলেও ফেলেছি। কিন্তু কাছে ধারে কোনো রেস্টুরেন্ট বা কফিশপ নেই। কথায় কথায় তূর্য ওর বাবার প্রসঙ্গ তুললো। সে কি করতো, কবে মারা গেল, এইসবের ফাঁকে কী এক কথায় শাহিদের কবরের কথা ওঠলো। চমকে গিয়ে উমায়ের জিজ্ঞেস করলেন- ‘grave? are you muslim?’ তূর্য বললো ‘হ্যাঁ’, অমনি উমায়ের তার সিটের পাশ থেকে পানিভর্তি একটা বোতল বের করে দিলেন। ওখানে পানিভর্তি আরও দুটো বোতল দেখতে পেলাম, তার মধ্যে একটা অর্ধেক শেষ। মুহূর্তে আমার পানির তৃষ্ণা উবে গেলো। আমি হাত বাড়াতে পারছিলাম না। তূর্য বুঝে ফেলেছে। সে বললো- ‘নাও তো, বাদ দাও।’ আমি নিতে পারছিলাম না, পানি থাকার পরও শুধু অমুসলিম ভেবে ড্রাইভার আমাকে পানি দেননি! ভাবা যায়! কোনো রকমে একটু পানি খেয়ে আমি চুপ করে বসে রইলাম। উমায়ের বললেন, ‘আসলে উবারের কন্ট্রাক্টে তোমার নাম দেখে বুঝতে পারিনি।’ অর্থাৎ তূর্যের নামটি পড়ে মুসলিম বলে মনে হয়নি তার। সেই থেকে উমায়েরের সাম্প্রদায়িক ওই ব্যবহারটি আমি কিছুতেই ভুলতে পারছি না।

অন্ধকার নেমে এসেছে। ব্যানফ শহরে যখন পৌঁছলাম, তখন সন্ধ্যা উৎরে গেছে। কিন্তু সারা শহর তার সব রং রূপ আর আকাক্সক্ষা নিয়ে ঝলমল করছে। এ-এক উজ্জ্বল দিনের চেয়েও ঝলমলে শহর। ছোট্ট ব্যানফ শহরটি সারারাত ঘুমায় না। পর্যটকদের জন্যে পসরা সাজিয়ে উন্মুখ হয়ে বসে থাকে। আমরা যখন পৌঁছালাম তখন এখানকার হোয়াট মিউজিয়াম বন্ধ হয়ে গেছে। মিউজিয়ামের চাদ্দিকে উঁচু বরফ জমে আছে। গাছের পাতা ভর্তি বরফ আর তার সাথে সামনের ক্রিসমাসের জন্যে অজস্র বাতির আলোকসজ্জা চাদ্দিকে। পাশেই সিটি হল। অসংখ্য রেস্তোরাঁ, কফিশপ, মল পর্যটকে গম গম করছে। কানাডার নৃগোষ্ঠী, পশু, পাখি সংস্কৃতির পরিচয়বাহী কত জিনিসপত্র! আমরা বেশ কিছু কেনাকাটা করলাম, হাল্কা খেয়ে নিলাম। মূল্যও কম নয়। BANFF লেখা চত্বরটি উঁচু বরফে ঢেকে গেছে। সেখানে ছবি তুললাম। সেলফি তোলার সময় এই আঙুল জমে যাওয়া ঠান্ডায়ও কোনো কোনো পর্যটক এগিয়ে এসে তূর্যকে বললেন- তুমি গিয়ে ফ্যামিলির সাথে দাঁড়াও, আমি ছবি তুলে দিচ্ছি।
ভয়ংকর ঠান্ডায় আর থাকতে পারছিলাম না। মাইনাস কতো ডিগ্রিতে তাপমাত্রা- জানি না। শুধু অবশ বিবশ হয়ে যাচ্ছিলো শরীর।

আবার গাড়িতে চড়লাম। ক্যালগেরি যখন পৌঁছালাম তখন রাত ১০টা প্রায়। আমরা যেখানে গাড়ি পার্ক করলাম, তার পাশেই বাংলাদেশ সেন্টার, ইন্ডিয়ান সিটিজেন সোসাইটি, একপাশে একটি মসজিদ, অন্যপাশে চার্চ। একটা দোকানের নাম শাপলা। বাংলায় নামগুলো দেখে বড়ো ভালো লাগছিল। এখানে বাংলাদেশিরা ইংরেজির পাশাপাশি বাংলায় নাম লিখতে ভালোবাসেন। রাঙ্গুনিয়া বাড়ি এক দোকানের মালিক, স্বামী-স্ত্রী দুজনে মিলে দোকান চালান। সেখান থেকে পরিষ্কার করে কাটা ইলিশ, কৈ, পাবদা আর বাটা মাছ কিনলাম। এডমন্টনেও পাওয়া যায়। কিন্তু মাছের প্যাকেটের গায়ে চট্টগ্রামে আমার বাসার পাশের অলংকার মোড়ের ঠিকানা দেখে আবেগ আপ্লুত হয়ে গেলাম। মিরাজ রেস্টুরেন্টে আগেই ডিনারের জন্য কাচ্চি বিরানি অর্ডার দেওয়া ছিল। সেগুলো তুলে আবার এডমন্টনের পথে যাত্রা শুরু হলো। দীর্ঘ যাত্রায় তূর্য নীলিম ঝিমিয়ে পড়েছে। এদিকে অন্ধকার রাতে ড্রাইভার উমায়েরকে জাগিয়ে রাখতে হবে। উমায়েরের সাথে আর কথা বলতে ভালো লাগছিল না। কিন্তু তবুও বক বক করে তাকে জাগিয়ে রাখার জন্য প্রাণান্ত চেষ্টা চালালাম। রাত বারোটার আগে হোয়াইট এভের বাসায় এসে পৌঁছলাম।

লেখক পরিচিতি
কবিতায় সেলিনা শেলীর স্বর একেবারেই নিজস্ব। এই দ্বিধাসময়ের কালমঞ্চে তিনি কেবল চাক্ষিকই নন, রূপকারও বটে। পাশাপাশি প্রতিরোধ প্রতিবাদে শানিত উজ্জ্বল তার পঙক্তিমালা। আশির দশক থেকে কবিতার পাশাপাশি প্রবন্ধ, মুক্ত গদ্য এবং গল্পেও তিনি সমান পারদর্শী। কবি ও অধ্যক্ষ সেলিনা শেলীর জন্ম ১৭ জুলাই, ১৯৬৭ সাল। বর্তমান নিবাস কানাডা।