ষাট বছর : কবিতা গান আর ছবি
ঝির ঝির বরফের মধ্যে ট্যাক্সি ড্রাইভার যখন মন্ট্রিয়লের সেন্ট ক্যাথারিন স্ট্রিটের এক হোটেলের সামনে নামিয়ে দিলো, তখন স্বপ্নেও মনে হয়নি এদেশে দীর্ঘ ষাট বছর পার করে দেবো! ভেবেছিলাম পড়াশোনা শেষ হলে বছর দুই থেকে কিছু টাকা হলে কলকাতা ফিরে যাবো। সেই দু-বছর আজও শেষ হলো না!
সেই ষাটের দশকে দু-একটি শিখ সম্প্রদায়ের লোক বাদে কানাডায় ভারতীয় প্রায় দেখাই যেত না। বাঙালি, টিম টিম করে দু-একজন। তবে ১৯৬৫-১৯৭০ নাগাদ কিছু বাঙালি পরিবার Lachine আর NDG-তে বসবাস করতে থাকেন। এই বাঙালি পরিবারগুলো একটি বাঙালি ক্লাব চালু করেন। ১৯৭০-এ ভারতী স্নাতকোত্তর পরীক্ষা দিয়ে মন্ট্রিয়লে আসেন। আমি আমার ইউনিভার্সিটি আর চাকরি সামলাচ্ছি। ১৯৬৮ গ্রীষ্মে রুশীকুমার পানডিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ। সে আলি আকবরের প্রথম সারির শাগরেদ, সেতার বাজায়। প্রায় দশ বছর কানাডা, USA জুড়ে রুশীর সঙ্গে তবলা সঙ্গত করেছি। তবলা জানার সুবাদে সুচিত্রা মিত্র, চিন্ময় চট্টোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, নির্মলেন্দু চৌধুরী, ধীরেন বসু, ঋতু গুহ, সন্তোষ সেনগুপ্ত, কৃষ্ণা চট্টোপাধ্যায় এবং আরো অনেকের সঙ্গে বাজানোর সুযোগ পেয়েছি।
ভারতী সুচিত্রাদির ছাত্রী ছিলেন, সেই সূত্রে সুচিত্রাদি আমাদের বাড়িতে বেশ কিছুদিন ছিলেন। সারারাত আড্ডা আর স্কচ খাওয়ার পর সুচিত্রাদি ভোর ছ’টার সময় এক্কেবারে তৈরি বাইরে বেরোনোর জন্য! এক অসাধারণ মানুষ এই শিল্পী। এমন গুণী মানুষটি, শেষজীবনে খুব কষ্ট পেয়ে মারা গেছেন।
কৃষ্ণা চট্টোপাধ্যায় ছাড়া সকলেই আমাদের বাড়িতে থেকেছেন। চিন্ময় দা ছিলেন প্রকৃত সজ্জন মানুষ, আমৃত্যু যোগাযোগ ছিল আমাদের সঙ্গে। নির্মলেন্দু চৌধুরীর সময় ভারতীর মা-বাবা আমাদের সঙ্গে ছিলেন। রুই মাছের মাথা দিয়ে মুগের ডাল খেয়ে নির্মলেন্দুর সে কী আনন্দ! মাসিমা, আপনি কী করে জানলেন, মাছের মাথা দিয়ে মুগডাল আমার সব থেকে প্রিয়? আনন্দে মাছের মাথা দিয়ে মুগডালের ওপর একটি গান গেয়ে দিলেন। এসব গুণী মানুষদের সাথে আড্ডা দিতে দিতে গান গাওয়ার রেকর্ডিং আছে আমাদের সংগ্রহে।
রবিশঙ্কর, বিলায়েত আর আলী আকবর খানের কিছু প্রথম শ্রেণির শিষ্যদের সঙ্গে বাজানোর সুযোগ হয়েছে। এদের মধ্যে আছেন শম্ভু দাস (রবিশঙ্কর), শর্মিষ্ঠা সেন (বিলায়েত), রাহুল সারিপুত্ত, নাদির খান, আফগানিস্তানের বিতাড়িত নবাবপুত্র (বিলায়েত) শম্ভু দাসের সঙ্গে নিউ ইয়র্কে কয়েকবার বাজাতে গিয়েছি। বিদেশে সবথেকে বেশি শুনেছি আলী আকবর খান আর স্বপন চৌধুরীর বাজনা। মন্ট্রিয়ল, টরন্টো আর সেন্ট রাফায়েল ক্যালিফোর্নিয়ায়। খান সাহেব বহুবার ‘ভাল মোরিন’-এ স্বামী বিষ্ণু দেবানন্দের আশ্রমে বাজিয়ে গেছেন। আল্লারাখা সাহেবের কাছে কিছুদিন তালিম নেওয়ার সুযোগ হয় ওই সময়। এই গানের পর্বটির সবটুকুই ঘটেছে ১৯৬৮ থেকে ১৯৮০-র মধ্যে। তবে তবলাকে কোনোদিন পেশা হিসেবে দেখিনি।
ম্যাকগিল-এর অধ্যাপনা ছেড়ে মুম্বাই ফিরে গেলো রুশী, অন্নপূর্ণা দেবীর কাছে তালিম নিতে, পাকাপাকিভাবে। পরে অন্নপূর্ণাদেবীকে বিয়ে করে রুশী, রবিশঙ্করের সঙ্গে অন্নপূর্ণাদেবীর বিচ্ছেদ হওয়ার পর। রুশী ২০১২ সালের শেষের দিকে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে হঠাৎ মারা যায়। আমৃত্যু যোগাযোগ আর ভালোবাসা ছিল আমাদের। আমার পুত্র, কন্যা ও জামাতা বহুবার মুম্বাইতে ওর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে। আমি আর ভারতী ওই ২০১২-র জানুয়ারিতে মুম্বাই যাই রুশীর আমন্ত্রণে। রুশী আমার অজন্তা-ইলোরা পরিদর্শনের সমস্ত ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। সেই শেষ দেখা। ওই একবারই অন্নপূর্ণা দেবীকে দেখেছি। শরীর আদৌ ভালো ছিল না। মধ্য আশি থেকে মধ্য নব্বই পর্যন্ত মূলত আমাদের পুত্রকন্যাদের নিয়ে ব্যস্ত সময় কেটেছে।
১৯৮২ সালে চিত্র পরিচালক বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের সঙ্গে আলাপ হয়েছে। উনি মন্ট্রিয়ল এসেছিলেন ‘গৃহযুদ্ধ’ নিয়ে। সেই আলাপ, এবং আমাদের দীর্ঘকালের বন্ধুত্ব। উনি আমার কিছু কবিতা নিয়ে গিয়ে প্রণবেন্দু দাশগুপ্তের ‘অলিন্দ’ পত্রিকায় প্রকাশ করে দেন। ‘কৃত্তিবাস’ টরন্টোগোষ্ঠীর বর্ষপূর্তিতে উনি দুবার সভামুখ্য ছিলেন। কবিতা পাঠ করেছেন। ভারি ভালো বন্ধু ছিলেন। ভারতীকে বলতেন সুশি বানাতে। তাঁর আত্মসম্মান ছিল অতীব প্রখর।

১৯৮৬ সালে কলকাতায় গণেশ পাইন, শুভাপ্রসন্নর পেইন্টিংস আর চিন্তামণি করের ‘তিন নর্তকী’ ভাস্কর্য সংগ্রহ করি। শুভার রাজনৈতিক মতবাদ আমার ভালো না লাগলেও এখনও যোগাযোগ আছে ব্যক্তিগত স্তরে। গণেশ পাইনের সঙ্গে শেষ সাক্ষাৎ ২০০৬ সালে। ১৯৮৭ সালে চিন্তামণি করের সঙ্গে নিউ জার্সির বাংলা সম্মেলনে অনেকটা সময় কেটেছিল। এই সময়েই শক্তি চট্টোপাধ্যায়, অমিতাভ দাশগুপ্ত, কানাই কুন্ডু- এদের সঙ্গে আলাপ হয় আমার, কবি বন্ধু আনন্দ ঘোষ হাজরার সৌজন্যে। শুভা এবং এঁরা সকলেই, আমার পুত্র মেঘমল্লার-এর নবম জন্মদিনে আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন। মনে পড়ছে শক্তিদা’র কবিতা পাঠ আর সেই গমগমে গলায় ‘ওগো কাঙাল আমারে কাঙাল করেছো’ এবং অন্যান্য গান।
১৯৯২ সালে আমরা মন্ট্রিয়লে ‘কলকাতা ৩০০’ অনুষ্ঠান করি। কলকাতার ইতিহাস, কলকাতার কবি ও কবিতা, আর শিল্প-সংস্কৃতি জগতের উজ্জ্বল ব্যক্তিত্বদের নিয়ে একটি ব্যাপক প্রদর্শনী। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র সমালোচক অধ্যাপক সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় সেই সময় মন্ট্রিয়লে ছিলেন। ওর লেখা কিছু গ্রন্থ উপহার পেলাম। খুব মুষ্টিমেয় মানুষ বাংলা সাহিত্য থেকে বিশ্বসাহিত্যে, ছবি থেকে নাটক কিংবা কবিতায় এত অনায়াসে বিচরণ করতে পারেন। সঞ্জয়ের গদ্য অনেক সময় কবিতাধর্মী। ঋদ্ধ হওয়ার মতো। কলকাতায় দেখা হয়েছে আর দারুণ ভালো সময় কেটেছে।
এর কিছুকাল পরেই সত্যজিৎ রায়ের ওপর একটি প্রদর্শনী করি Concordia University-র স্পনসরশিপ নিয়ে। সত্যজিৎ-এর গুণমুগ্ধ মন্ট্রিয়লের জেসুইট ফাদার কলকাতাবাসী গাঁস্ত রোবের্জকে পেয়েছিলাম সেই সময়। আমার বন্ধু ম্যাকগিলের লাইব্রেরিয়ান প্রয়াত তাপস মজুমদার সত্যজিতের ওপর দেশে-বিদেশে প্রকাশিত গ্রন্থ, আর্টিকেল এবং আরও বিবিধ লেখার এক বিপুল সম্ভার তুলে ধরেন। আমি সত্যজিৎ-এর ছবি, বুক কভার, লেখা, ছড়া, জীবনী আর অন্যান্য সৃষ্টি নিয়ে একটি প্রদর্শনী করি। তখনকার ‘মন্ট্রিয়ল দৈনিকে’ ভালো রিভিউ হয়েছিল। এর কয়েক বছর পরে ম্যাসিভ হার্ট ফেলিওরে মারা যায় তাপস। সারা শহরে একটিমাত্র মানুষ যার সঙ্গে আমি সাম্প্রতিক কবিতা নিয়ে কথা বলতে পারতাম। সেও চলে গেলো!
২০০০ সালে মন্ট্রিয়লের পাঠ চুকিয়ে টরন্টো চলে আসি। তার মূল কারণ হলো কেবেক সেপারেটিস্ট আন্দোলন। সেই বছর কলকাতা গেলে কবিবন্ধুদের উৎসাহে আমার ‘এই নির্বাসন’ প্রকাশিত হলো কফি হাউসের পুরো হল বন্ধ করে। চারু খান প্রচ্ছদ এবং প্রত্যেক পাতায় ইলাস্ট্রেশন করে দিয়েছিলেন। প্রায় তিরিশজন কবি আর কবিবন্ধু ছিলেন সেই আসরে। এখানেই আলাপ এবং দীর্ঘ বন্ধুত্ব হয় হাঙ্গরিয়ালিস্ট-এর কবি দেবী রায়ের সঙ্গে। তার কোনো গ্রন্থ প্রকাশিত হলে আমাকে একখণ্ড পাঠিয়ে দিত আমার মতামত জানার জন্য। ‘জিজ্ঞাসা’ পত্রিকার দপ্তর ছিল ওই কফি হাউসের বাড়ির মধ্যে। অতএব অবারিত আড্ডা। এখানেই শিবনারায়ণ রায়ের সঙ্গে আলাপ হয়েছে অনেকবার।
এই সময়েই সুযোগ আসে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমার আলাপের। তাঁর কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন বিশ্বজ্ঞানের কবিতার কাণ্ডারি দেবকুমার বসু, আমাদের সকলের ভালোবাসার দেবুদা। সেদিন সুনীলপত্নী স্বাতীদি আমাদের পুলিপিঠে খাইয়েছিলেন। সেই ছড়া আমার ‘বোকা ছাগলের জাতীয় সঙ্গীত’-এ আছে, ‘কলকাতার কবিতা’ প্রদর্শনীতে প্রায় কুড়িটি কবিতা ছিল বাংলা এবং তার ইংরেজি অনুবাদসহ। সেখানে মূল থিম ছিল সুনীল গাঙ্গুলির ‘আমি ও কলকাতা’ কবিতা; সঙ্গে ড. লাল-এর ইংরেজি অনুবাদ। অনুবাদটি আমার ভালো লাগেনি জানাতেই তাপস আমাকে একটি চমৎকার অনুবাদ করে দিয়েছিল। শর্ত একটাই, কোথাও প্রকাশ করা চলবে না। ছড়াটি পাঠানোর সময় আমার মনে হলো- প্রয়াত তাপসের এই অনুবাদটিও সুনীলদাকে পাঠানো উচিত।
কিছুদিন বাদে সুনীলদার চিঠি পেলাম। তাপসের অনুবাদ ভালো লেগেছে, তিনি আর স্বাতীদি ছড়াটি পরে বেশ মজা পেয়েছেন। সেই সঙ্গে সুনীলদা জানিয়েছেন আমার কবিতাচর্চা চালিয়ে যাওয়া উচিত। তিনি আমার কবিতা দেখতে চাইবেন। ‘এই নির্বাসন’ গ্রন্থ বাদে প্রাক-মুদ্রণপর্বে আমার অনেক কাব্যের প্রথম পাঠক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। আমার একাধিক গ্রন্থ তাঁর ভূমিকাসমৃদ্ধ। ইতোমধ্যেই দেশ পত্রিকায় আমার কবিতা প্রকাশিত হয়েছে।

২০০২ সালে টরন্টো ইউনিভার্সিটি, Concordia আর McGill ইউনিভার্সিটিতে সুনীলদার কিছু অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করি। সেই সঙ্গে প্রবাসী বাঙালি সংঘ আর টরন্টো ইউনিভার্সিটির জন্য fund raising করা হয়। এছাড়া ছিল বাংলাদেশের অনুষ্ঠান এবং অন্যান্য ঘরোয়া আয়োজন।
টরন্টো, অটোয়া, মন্ট্রিয়ল, নিউ জার্সি, নিউ ইয়র্ক, কলকাতা, শান্তিনিকেতন সব মিলিয়ে প্রায় ছয় সপ্তাহ সুনীলদার সঙ্গে ২৪/৭ কাটানোর সুযোগ হয়েছে। তিনি আমাকে তাঁর সঙ্গে কথাবার্তা রেকর্ড করার ঢালাও অনুমতি দিয়েছেন। সেইসব আলাপের থেকে একটি পূর্ণ পাণ্ডুলিপি কলকাতার এক কবি-সম্পাদককে দিই। তারপর থেকে সেই কবি আমার সঙ্গে আর কোনো সম্পর্ক রাখেননি।
নিউ জার্সিতে এলে সুনীলদা আমাদের বলতেন- চলে এসো এখানে। ২০০৩ সালে পুজোর সময় আমরা নিউ জার্সিতে, আমার পাণ্ডুলিপি পড়ে বললেন, অশোক এই বইটার নাম রাখো ‘গদ্যজীবন, পদ্যজীবন’, আমি ভূমিকা লিখে দেবো। এই সময় তিনি আমাকে টরন্টোতে ‘কৃত্তিবাস’-এর একটা পাঠচক্র/সংগঠন তৈরি করবার প্রস্তাব দেন। আট বছর এই ‘কৃত্তিবাস’ গোষ্ঠীর আলোচনাচক্র চালিয়েছি। সুনীলদা নিজে দুবার সভামুখ্য হয়ে এসেছেন টরন্টোতে। তার একটি ছিল নর্থ আমেরিকা বঙ্গ সম্মেলন ২০০৮ সাল। সেখানে আমরা কবিতার জগতে পরিচয়, কবিতা পত্রিকা আর কৃত্তিবাসের অবদান নিয়ে আলোচনা করেছি।
আমার ক্ষেত্রে তিনি অগ্রজ কবির দায়িত্ব পালন করেছেন এটি অতিশয়োক্তি নয়, ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকার দুটি সংখ্যা বাদ দিয়ে এগারো বছরে দু’হাতে লিখেছি অজস্র কবিতা। এক, একাধিক, গুচ্ছ এবং দীর্ঘ কবিতা। সেদিক থেকে দেখলে, আমি ‘কৃত্তিবাসে’র কবি। দেশে বিদেশে প্রায় ৮০টি পত্র-পত্রিকায় আমার কবিতা, প্রবন্ধ, গল্প ও ইংরেজি কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। কবিতা, গল্প, ছড়া, নাটক মিলিয়ে কুড়িটির মতো গ্রন্থ প্রকাশ পেয়েছে। বইমেলা উৎসব পুরস্কার পাওয়া গেছে আমার নিজের অজান্তেই। কবিতা অনুবাদ হয়েছে চার পাঁচটি ভাষায়। সুনীলদার রবিবারের আড্ডা আর বুধসন্ধ্যার কল্যাণে কলকাতার তরুণ কবিদের সঙ্গে দ্রুত আলাপ হয়ে গিয়েছিল।
টরন্টোর তরুণ নাট্যগোষ্ঠীর অনুরোধে ‘গুপী গায়েন বাঘা বায়েন’-এর সম্পাদিত নাট্যরূপ দিই বিজয়া রায়ের অনুমতি নিয়ে। পূর্ণ প্রেক্ষাগৃহে সেটি অভিনীত হয়। বিজয়া রায় নাট্যরূপ, অনুষ্ঠানসূচি আর ‘গুগাবাবা’ টি-শার্ট পেয়ে ভারি খুশি হয়েছিলেন। ‘প্রতিভাস’-এর বিজেশ সাহা এটি গ্রন্থ হিসেবে প্রকাশ করে।
আমার উদ্যোগে ২০০৩ সালের নভেম্বরের দিকে জয় গোস্বামীর জন্য একই ধরনের অনেকগুলো অনুষ্ঠান করেছিলাম। জয় গোস্বামীর সঙ্গে ওই দিনদশেক কেটেছে অনেকটা মহার্ঘ্য শ্যাম্পেন পানের মতো। যেদিন জয় চলে যাবে, সেদিন আমাদের বাইরে ডিনার করার কথা। অল্প বৃষ্টি পড়ছে। জয় বললো, অশোকদা, কাবেরী আর ভারতীদি বাড়িতে থাক, আমরা দু’জন একটু গাড়ি করে বৃষ্টির মধ্যে ঘুরে আসি। আমি বললাম, তাই হোক। এখানে সেখানে অনির্দিষ্ট ঘোরার পর জয় বললো, অশোকদা মাথাটা একটু গাড়ির জানালা খুলে ভেজাবো। জয় বরাবর একটু দুর্বল মানুষ। ভয় পেলাম, তবু বললাম একটু খুলেই আবার বন্ধ করে দিতে! একটু পরে জয় বললো, অশোকদা, একটু ট্রাম চড়া যায় না। কাছেই একটা ট্রামের টার্মিনাল ছিল, সেদিকে যাচ্ছি, জয় বলে ওঠলো, আচ্ছা, ট্রাম চালানো যায় না! বিপদ আর কারে কয়! কলকাতার জয় গোস্বামী টরন্টোতে ট্রামচালক হতে চাইছে!
আমিও তেমনি। বললাম, দেখি কী করা যায়। ট্রাম গুমটির মধ্যে এক ট্রামচালক একটু পরেই বেরোবার জন্য তৈরি হচ্ছে। সোজা গিয়ে বললাম হ্যালো, তুমি এই মানুষটিকে চেন না, কিন্তু ইনি একজন বিখ্যাত ব্যক্তি, একটু ট্রাম চালাতে চান। জয়ের শান্ত চেহারা, দাড়ি গোঁফের মাঝখানে অল্প হাসি দেখে তার কী মনে হলো কে জানে! সে বললো, ঠিক আছে, কিন্তু এখন থেকে কুড়ি মিটার পরে আমি ব্রেক দিয়ে রাখবো, ট্রাম থেমে যাবে। জয় তো মহাখুশি। কুড়ি মিটার, তাই সই। ট্রাম গুড় গুড় করে কুড়ি মিটার গিয়ে থেমে গেল। আমরা চালককে ধন্যবাদ দিয়ে নেমে এলাম।
জয় নেমে বললো, অশোকদা ভেবে দেখুন, সুনীলদা, নবনীতাদি টরন্টোতে কেউ ট্রাম চালায়নি। আমি কিন্তু চালিয়েছি। সেই ছবিটি ক্যামেরাবন্দি আমার কাছে আছে। সেই পাগলামির মুহূর্তগুলো এখনও সমান উজ্জ্বল আমার স্মৃতিতে। সেবার কলকাতা গিয়ে জয়ের বাড়ির অন্য একটি ফ্ল্যাটে ছয় সপ্তাহ ছিলাম। সে এক দুর্দান্ত সময় গেছে।
সুনীলদা নবনীতা ছাড়া তেজেন্দ্রনারায়ণ মজুমদার, প্রয়াত শুভঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, অনুজাপ্রতিম বিজয়লক্ষ্মী বর্মণ, পার্থ মুখোপাধ্যায় এবং ছবি ও মার্গ সংগীতের আরো বহু গুণী মানুষকে আমরা আতিথ্য দিতে পেরেছি। বিজয়লক্ষ্মী আমার কবিতা এখানে ওখানে পড়েন। আমার বহু দীর্ঘ কবিতা ওর কণ্ঠস্থ। আমার সব অনুষ্ঠানেই বিজয়লক্ষ্মী সঞ্চালক।
২০০৬ থেকে ২০১০ পর্যন্ত আমি International Festival of Poetry of Resistance (IFPOR)-এর ডিরেক্টর; তার মধ্যে দু’বছর প্রেসিডেন্ট ছিলাম। জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, ল্যাটিন আমেরিকা, নিউজিল্যান্ড-এর তে কুপু, কিউবা থেকে ন্যান্সি মোরেহন নেব্রাস্কা ইউনিভার্সিটির সাহিত্যের ডিন এলিসন হেজ কোক, আর তুরস্ক থেকে Ataol Behramoglu সেই আন্তর্জাতিক কবি সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। কৃত্তিবাস গোষ্ঠী সেখানে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছিল। আমাদের কথা তুরস্কের কাগজে আর কিউবার grandma-তে প্রকাশিত হয়েছিল। আমার কবিবন্ধু আশীষ সান্যালের সহযোগিতায় এসব কবিদের কবিতার একটি সংকলনের সম্পাদনা করি।
২০০৬ সুনীলদা কলকাতার মেয়র বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্যের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেন। ‘অশোক জানে কীভাবে কেবেক আবার ফ্রেঞ্চ ভাষাকে ফিরিয়ে এনেছে, তুমি ওর সঙ্গে কথা বলতে পারো।’ বিকাশ বাবু তখন ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর মেয়রের অফিসে বসে বিস্তারিত আলোচনা হলো। আজো সেই বন্ধুত্ব অটুট আছে। আমার সমস্ত গ্রন্থ প্রকাশের আসরে এই ব্যস্ত মানুষটি শত কাজ ফেলে এসেছেন। একজন নিরহঙ্কারী উচ্চ মনের মানুষ। তাঁর অফিসে ঢুকবার মুখে একটা ট্যাবলেটে চিত্তরঞ্জন থেকে সব মেয়রের ইংরেজিতে নাম। বললাম বাংলা নাম নেই কেন? একসপ্তাহ পরে জানালেন, একটি বাংলা নামের মেয়র তালিকা বসানো হয়েছে।
২০০৬ সালে অধ্যাপক, চিত্র সমালোচক প্রশান্তদার সঙ্গে আলাপ গণেশ পাইনের বাড়িতে। ২০১২ সালে নন্দনে হঠাৎ যোগাযোগ আর সামাজিক সম্পর্ক। বিনা অনুরোধে আমার ছবির একটি চমৎকার রিভিউ করে দিয়েছিলেন। সেটি সযত্নে রাখা আছে।
২০০৮ সালে শেক্সপিয়ার-টেগোর সোসাইটির সভাপতি ড. অমিতাভ রায় আর শ্রীলা রায়-এর আতিথ্য নিয়েছিলাম। সকালে ব্রেকফাস্টের সময় কবিতা পাঠ আর ভরতমুনি, এরিস্টটল-এর কাটাছেঁড়া চলত। দুজনেই প্রয়াত। একেবারে নিঃশর্ত ভালোবাসা আর প্রশ্রয় পেয়েছি এদের কাছে। সোসাইটি থেকে কবিতা পাঠ আর সংবর্ধনার আয়োজন করেছিলেন অমিতাভ। বিকাশরঞ্জন, প্রশান্ত আর অমিতাভ- এই তিনজন মানুষকে সবসময় কাছে পেয়েছি। এছাড়া দেবারতি আর স্বপন সোম, বিজয় লক্ষ্মী বর্মণ, শৃণ্বন্তুর মিতা আর রতন ঘোষ- এরা তো আত্মীয়ের মতো হয়ে গেছেন। আমার যে-কোনো অনুষ্ঠানে এদের উপস্থিতি থাকবেই।
মিতা আর রতনের কথা একটু বলে নিই। ২০১৪ সালে ওরা আমার লেখা একটি শ্রুতি নাটক ‘তেঙ্গেরি’, সেনেগাল থেকে দাস ব্যবসায়ের ওপর লেখা, বাংলা একাডেমিতে মঞ্চস্থ করে প্রচুর যত্নসহকারে। সেখানে ওপরে উল্লিখিত সকলেই ছিলেন। আর ছিলেন ঋষি কবি শঙ্খ ঘোষ। আমার একটি গ্রন্থ প্রকাশ হলো শঙ্খদার পৌরোহিত্যে। পুরো তিন ঘণ্টা সমস্ত নাটক ও কবিতা পাঠ শুনলেন।
২০০৪ থেকে শঙ্খদার সঙ্গে আলাপ। প্রতি বছর দেখা হতো তাঁর সঙ্গে। আমার ২০১২ সালের চিত্রকুটে সোলো প্রদর্শনীতে উনি উপস্থিত ছিলেন। আমার ‘কালো কবিতা’র দুটি খণ্ড দেবেশ আর শঙ্খ ঘোষের উৎসাহ ছাড়া আলোর মুখ দেখতো না। প্রথম খণ্ড, ১২ জন কৃষ্ণাঙ্গ নারীর কবিতা দেবেশ নিজের উদ্যোগে দিল্লির স্পার্ক থেকে প্রকাশ করার ব্যবস্থা করেন। দ্বিতীয় খণ্ড, হারলেম রেনেসাঁস, অনুজপ্রতিম পার্থ রায় (ভিরাসাত) সযত্নে প্রকাশ করেছে।
আমার দেখা মানুষদের মধ্যে শঙ্খ ঘোষের স্থান সবার ওপরে। দেবেশের সঙ্গে আলাপের পর থেকে আমরা দুপুরের দিকে আলাদা করে শঙ্খদার ওখানে যেতাম। তিনি একজন ঋষিকল্প কবি মনীষী। কবি পত্নী প্রতিমাদিও ছিলেন অত্যন্ত উন্নত মনের মানুষ। এই দুজনকে এখনও অনুভবে পাই।
দেবেশ রায়ের সঙ্গে আলাপ টরন্টো ইউনিভর্সিটির একটি সেমিনারে, সম্ভবত ২০০৫ সালে। সেদিন রাত্রে একটি ভোজসভাতে আবার দেখা। উনি বারবার বলছেন আমাকে কেউ একটু রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনাতে পারেন। ওই বাড়িতে রবীন্দ্রসংগীতের কোনো স্থান ছিল না। আমি বললাম, আমার গাড়িতে আসুন, শোনাবো। বাইরে গাড়িতে বসে হাতে এলো ভারতীর সদ্য করা ঈউ ‘হে নিখিলভার ধারণ’। জিজ্ঞেস করলেন ইনি কে? মন দিয়ে শুনলেন। বললেন, ইনি ধ্রুপদ শিখেছেন মনে হয়। এর গান তো শুনতে হবে। একটি নাটক দেখে তারপর আপনার বাড়ি যাবো রাত করে। আমি বাড়ি ফেরার খানিকটা পরে বেল বাজলো। বললেন নাটকটি ভালো লাগলো না, চলে এলাম। সন্ধ্যেটা গান বাজনায় কাটলো হৈ হৈ করে। যাওয়ার সময় বলে গেলেন তাঁর বাগুইহাটির ফ্ল্যাটে যেন নিশ্চয় দেখা করি। সেই শুরু। কখন যে আপনি থেকে তুমি হয়ে গেছে জানি না। কলকাতা ছাড়ার দিন বলতেন তোমার প্লেন তো সেই শেষ রাতে। আমার এখানে ক্যান্ডল লাইট ডিনার করে প্লেন চাপবে। আমরা গাড়ি বোঝাই মালপত্র রেখে কাকলি আর দেবেশের ওখানে ডিনার সেরে প্লেনে ওঠতাম। কতো রকমের যে মাছের পদ! কাকলির সঙ্গে গানের সূত্রে ভারতীর দারুণ বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল। কাকলি একসময় বিশ্বভারতীতে রবীন্দ্রসঙ্গীত শেখাতেন। দেবেশের সঙ্গে শেষ দেখা ২০২০, ফেব্রুয়ারি।
বন্ধু পঙ্কজ সাহার সৌজন্যে দূরদর্শনে আসর করেছি অনেকবার। প্রচুর কবিতা পাঠের আসর, আলোচনাসভা। চারুকৃতি আর কবি সম্মেলনের আসর দুটি বেশ মনে আছে, বহু কবি আমার কবিতা পাঠ করলেন!
অনেকে প্রশ্ন করেন এতদিন বিদেশবাসের পর লেখালিখি করা যায় কি না। কঠিন এবং বিস্তর অসুবিধে, সন্দেহ নেই। বহুকাল বিদেশবাস করেও ধনগোপাল মুখোপাধ্যায় সৃষ্টিশীল ছিলেন। আবার অমিয় চক্রবর্তী ফুরিয়ে গেলেন। যেসব উজ্জ্বল লেখকরা মস্কো চলে যান সুভাষ মুখোপাধ্যায় বাদে আর কেউ তেমন লিখতে পারেননি। তবে আজকের এই দ্রুত যোগাযোগ আর ভার্চুয়াল রিয়ালিটির যুগে বিদেশবাস আর সেরকম দূরত্ব আনে না। তবুও অভিবাসী লেখকের পক্ষে micro level-এ শিল্প সংস্কৃতির তাৎক্ষণিক বিবর্তন স্পর্শ করা একটু কঠিন হয়ে পড়ে। আমার মনে হয় অভিবাসী লেখকদের একটা দায়িত্ব থেকে যায় এদেশের সাহিত্য সংস্কৃতির খবর বাংলায় পৌঁছে দেওয়ার।
২০০৩ সালে শুরু করে চার বছরের দুটি ছবি আঁকার ডিপ্লোমা শেষ করি। সেটি সম্ভব হয়েছে ভারতীর অবিরাম উৎসাহে। তিন মহাদেশে গোটা বাইশ সোলো এক্সিবিশন হয়ে গেছে। টরন্টোতে কোনো এক্সিবিশন হলে Badai Ho কালচারাল টিভি থেকে স্নেহভাজন গীতিকা সিংহ সেটি তুলে ধরতেন। সে চ্যানেল আজ নেই, কিন্তু গীতিকার সঙ্গে ভালোবাসা (এখন আর্নল্ড) রয়ে গেছে। ওই চ্যানেলে প্রায় আমার ডাক পড়তো ছবি ও সাহিত্য নিয়ে কিছু বলবার জন্য। রবীন্দ্রনাথের ১৫০তম জন্মবার্ষিকীতে একটি স্পেশাল প্রোগ্রাম করেছিলাম আধ ঘণ্টার। টরন্টো ইউনিভার্সিটির নিউ কলেজ এর উৎসাহে ওখানেও ১৫০তম জন্মবার্ষিকীর অনুষ্ঠান করি। সেখানে ড. ক্র্যানফিল্ড প্যারিসে রবীন্দ্রনাথের চিত্র প্রদর্শনীর ওপর ৪৫ মিনিটের একটি তথ্যসমৃদ্ধ ডকুমেন্টারি দেখান।
আমি ইচ্ছে করেই কানাডার রাজনীতি, সামাজিক ব্যবস্থা, বর্ণ বিদ্বেষ, অর্থনৈতিক বৈষম্য এইসব আলোচনায় যাইনি। ভ্রাতৃপ্রতিম সুব্রত কুমার দাস আমাকে অবিরাম অনুযোগ করেছেন আমি যাদের দেখেছি একটা টাইম লাইন দিয়ে তাদের ওপর কিছু আলোকপাত করার জন্য। এই সুযোগে একটা মোটামুটি টাইম লাইন দিয়েছি সামান্য আলোকপাতসহ।
কোনো কিছুই অনেকদিন ধরে করার মতো মানসিকতা আমার নেই, তবু সবকিছু মিলিয়ে নিজেকে ভাগ্যবান মনে হয়। প্রাচ্য আর পাশ্চাত্যের সাহিত্য সঙ্গীত আর চিত্রকলার মধ্যে নিরন্তর অবগাহনের সুযোগ ঘটেছে। সারা পৃথিবীর ৭০-৭২টি দেশ দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। ইউরোপ-আমেরিকার নামকরা আর্ট গ্যালারি বারবার দেখার সুযোগ ঘটেছে। সব থেকে বড়ো কথা, ঠিক নিজের মতো বাঁচতে পেরেছি। দু’হাত দিয়ে বিশ্বকে ছুঁতে পেরেছি, শিশুর মতো হেসে।
লেখক পরিচিতি
জন্ম ১৯৩৯। কবি, গল্পকার, গদ্যকার, নাট্যকার ও চিত্রী। পেশায় প্রযুক্তিবিদ। কানাডাতে আছেন প্রায় ছয় দশক। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সঙ্গীতের তিনি একজন বোদ্ধা সাধকও। ২০২০ সালে টরন্টো আন্তর্জাতিক লেখক সম্মেলন (টিফা)-তে অংশগ্রহণ। তাঁর কবিতা স্প্যানিশ, ফরাসি, জার্মান, তার্কিশ এবং অন্যান্য ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তাঁর আঁকা ছবি নিয়ে ১৯টির বেশি একক চিত্র-প্রদর্শনী হয়েছে পৃথিবীর তিন মহাদেশে। ২০১৯ সালে তার অনুবাদে আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গ কবিদের কবিতা প্রকাশিত হয়েছে ‘কালো কবিতা’ নামে। ষাটের বেশি দেশ ভ্রমণ করেছেন।

