স্বদেশের মাটি যেদিন আমি ছেড়ে আসি
আবদুল হাসিব
আমি স্বদেশ ছেড়ে বিদেশে চলে যাবো। বাংলাদেশের আরো অনেকের মতো আমারও প্রবল মোহ ছিল বিদেশের প্রতি। এই মোহ আমাকে ভাবতেও দেয়নি, দেশ ছাড়ার সাথে সাথে আমি যে ছেড়ে আসবো- আমার চিরচেনা গ্রাম, গ্রামের বুকচিরে বয়ে চলা সর্পিল নদী, ফসলের মাঠ, পথ-প্রান্তর, বৃষ্টির বন্দনায় ছন্দ তোলা শৈশবের স্মৃতি বিজড়িত উঠোন, কৈশোরের গোল্লাছুটের ক্লান্তিহীন মাঠ! আমি ছেড়ে যাবো পুষ্পপুঞ্জিত, কোকিলের কুহুতানে মুখরিত অপরূপা প্রকৃতি-কানন; ষড়ঋতুর শতরূপা শাড়ি পরা সোনার স্বদেশ! ফেলে যাবো- আম-জাম লিচু-কাঁঠালের ছায়াময় মায়ামাখা বন! আমি স্বদেশে রেখে যাবো- কদম, জারুল, হিজল, তমাল, তাল, শিমুল, শিরীষ, কৃষ্ণচূড়া, দেবদারু, সেগুন, মেহগিনি, কড়ই, সুন্দরী আর শাল-পিয়ালেন বন! ছেড়ে চলে আসবো- উত্তাল যৌবনের স্মৃতি বিজড়িত কলেজের আঙিনা, মিছিল-মিটিং-পথসভা, বিজয় উৎসব, মহান একুশের মৌনমিছিল! আমি ফেলে যাবো- প্রিয় প্রেমিকার ঠোঁটের কোণে ঝুলে থাকা স্নিগ্ধ হাসির রেখা! আমি নির্মমভাবে ছেড়ে চলে যাবো আমার রূপশ্রী বাংলার অপরূপা ফুটন্ত সকল সৌন্দর্যকে এবং মাটি ও মানুষকে!
হাতে একটা ব্রিফকেস আর নগদ মাত্র দুইশত ইউএস ডলার পকেটে নিয়ে ১৯৮৭ সালের ৬ অক্টোবর, মঙ্গলবার, সিলেট জেলার বিয়ানীবাজার পৌর এলাকাস্থ কসবা গ্রাম থেকে আমি চলে আসি ঢাকায়। ঢাকা থেকে জিয়া আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর (বর্তমান হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর) দিয়ে সকাল ১১টায় বাংলাদেশ বিমান-এর ফ্লাইট নম্বর ৬৯১ যোগে কলকাতার হয়ে কানাডার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করি। ২৪ বছর বয়সী যুবক আমি এই প্রথম স্বদেশের সীমানা অতিক্রম করে বাইরে যাচ্ছি।
বিমান যখন আকাশে উড়ছে, ভিতর থেকে জানালা দিয়ে সকরুণ দৃষ্টিতে দেখতে থাকি, আমার চিরচেনা সোনালি ধানের দেশ ছেড়ে অতি দ্রুত উড়ে চলে যাচ্ছি কোনো এক অজানা অচেনার উদ্দেশ্যে। হঠাৎ করে জন্মমাটির সাথে নাড়ি ছিঁড়ে যাওয়ার মতোন কঠিন একটা কষ্ট বুকের ভিতর অনুভব করি। অস্ফুট সুরে বার কয়েক নিজেকে জিজ্ঞাসা করতে থাকি- “হাসিব, তুমি কি তবে সত্যি সত্যি তোমার মাতৃভূমি আর প্রিয়-পরিজনদের ছেড়ে পরবাসে চলেই যাচ্ছো?” সেদিন নিজেকে বিশ্বাস করাতে পারি নাই যে, এই আমি কীভাবে পাষাণে বুক বেঁধে বিদেশের মোহে স্বার্থপরের মতোন আমার অসুস্থ বাবাকেও ছেড়ে চলে আসছি? সেদিন বিদায়ের প্রাক্কালে বার বার মনে হয়েছে, হয়তো বাবা’র বুকে আমার এই বুকখানা আর কোনো দিনই লাগবে না। ওটাই হয়তো আমার জন্য বাবার বুকের শেষ উত্তাপ। ভাবতে ভাবতে নিমেষে এক ঘণ্টা বিশ মিনিট কেটে যায় আকাশের ওপর। অর্থাৎ ১২:২০ মিনিট-এর সময় বাংলাদেশ বিমান গিয়ে কলকাতার দমদম এয়ারপোর্টে অবতরণ করে।
কলকাতা থেকে দিল্লি অভিমুখে এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইট হবে বিকাল ৫:৫০ মিনিটের সময়। স্বদেশ ছাড়ার ব্যাকুল ব্যঞ্জনায় আসার সময় ভালো করে আহার পর্যন্ত গলাধঃকরণ হয় নাই, ফলে কলকাতা এয়ারপোর্টে নেমেই আমি প্রচণ্ড খিদে অনুভব করি। লাউঞ্জ হলের একপাশে একটি রেস্টুরেন্টে সাহস করে ঢুকে রিসিপশ্যানে দাঁড়িয়ে থাকি। কিন্তু অবস্থা দেখে মনে হয়েছে- ওয়েটাররা কেউই আমার কাছে আসতে চাচ্ছে না; কাস্টমার হিসেবে তেমন মূল্যায়ন করছে না। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর কী মনে করে একজন তরুণ ওয়েটার এগিয়ে এসে ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করে ‘হাউ কেন আই হেল্প ইউ?’ আমি তখন রীতিমতো মুশকিলে পড়ে যাই। কেননা, কানাডা আসার জন্যে বিগত কয়েক সপ্তাহে ইমিগ্রেশন অফিসারের জন্য যে কয়েকগুচ্ছ নির্বাচিত ইংরেজি শব্দমালা শিখেছি তা থেকে ওয়েটারের প্রশ্নের উত্তর হিসেবে কোনো বাক্য খুঁজে পাচ্ছিলাম না; এমতাবস্থায় বাংলা ইংরেজিতে ভালো রকমের একটা খিঁচুড়ি করে শেষ পর্যন্ত ওয়েটারকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছি যে, আমার খিদে পেয়েছে, আমি কিছু একটা আহার করতে চাই। ওয়েটারের বুঝে নিতে বিলম্ব হলো না যে, ঐ মানুষটি তার নিজ দেশ থেকে এই প্রথম বের হয়েছে। এয়ারপোর্ট রেস্টুরেন্টের ওয়েটাররা মনে হয় এ ধরনের প্যাসেনজারদের নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে তারা অভ্যস্ত আছে, যার ফলে পেটের খিদে নিবারণে আমার জন্য একটা বিহিত হয়ে যায়। নাস্তা সেরে বিল চুকিয়ে বের হয়ে আসতে তিন রুপি টিপ্স টেবিলে রেখে আসতে ভুল করি নাই। কিন্তু ঝামেলা বাঁধলো যখন বিকাল ৫টার সময় দিল্লির উদ্দেশে ফ্লাইটে ওঠার জন্য এয়ার ইন্ডিয়ার চেকপোস্ট-এ এসে উপস্থিত হই। ওখানে আসার পর আমার পাসপোর্টখানা হাতে নিয়ে ইমিগ্রেশন অফিসার জিজ্ঞাসা করে বসেন, “আপনি কোথায় ছিলেন এতোক্ষণ?” আমার সাদামাটা উত্তর, “ঐ রেস্টুরেন্টে খাবার খেয়েছি, তারপর ঐ লাউঞ্জের বিভিন্ন চেয়ারগুলোতে বসেছি, ওখানেই পায়চারী করে সময় কাটিয়েছি, আমি কি কোনো ভুল করেছি?” “হ্যাঁ অবশ্যই ভুল করেছেন। আপনার তো ইন্ডিয়ার ভিসা নেই, আপনি এই সীমানার বাইরে যেতে পারেন না। এখন তো আপনাকে ইমিগ্রেশন আইনের আওতায় আটকানো হবে।”
সে-কথা শোনামাত্র আমার চেহারা প্রায় বিবর্ণ হয়ে যেতে দেখে অফিসার অভয়বাণী শুনিয়ে বলেন- ‘হতাশ হবেন না, ব্যবস্থা একটা আছে। এক কাজ করেন, ডলার আছে? দেন, বিশ ডলার দিয়া দেন, আর প্লেনে গিয়ে ওঠেন। দেরি করছেন কেন? দেরি করলে ফ্লাইট মিস করবেন যে।’
ফ্লাইট মিস! কথাটি শোনামাত্র বিলম্ব না করে সাথে সাথে মানিব্যাগ থেকে ইউএস ২০ ডলার বের করে ইমিগ্রেশন অফিসারের হাতে তুলে দিতেই পলকে পকেটে ঢুকিয়ে অফিসার আমাকে বিমানে ওঠার প্রবেশ পথে গমন করতে অনুমতি দেয়। আমি তখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে বিমানের ভিতরে গিয়ে আসন নাম্বার খুঁজে নিয়ে নিজ আসনে বসে পড়ি।
কলকাতা থেকে এয়ার ইন্ডিয়া, ফ্লাইট নং-৪০২ যোগে ৫:৪৫ মিনিটের সময় ফ্লাইট করে রাত ৯টায় নতুন দিল্লি ইন্দিরাগান্ধী আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে এসে অবতরণ করে। ওখানে আসার পর কেএলএম (KLM) এয়ার লাইন্স-এর লোকেরা তদের বাসে করে যাত্রীদেরকে দিল্লি শহরের একটি ফাইভ স্টার হোটেলে নিয়ে যায়। হোটেলের ভিতরে ওয়েটিং রুমে আমাদেরকে বসিয়ে রাখা হয়। ঘণ্টা দেড়েক পরে নৈশভোজের জন্য ঐ হোটেলেরই এক প্রান্তে অবস্থিত একটি রেস্টুরেন্টে যাত্রীদেরকে নিয়ে যাওয়া হয়। রেস্টুরেন্টের অপূর্ব সাজসজ্জা, প্রত্যেকটি ক্যাবিন-এর উপরিভাগ ছনের ছাউনি দিয়ে চারচালা। চালের কোণায় কোণায় ঝুলছে পাখিবিহীন বাবুই পাখির বাসা। বাসাগুলোর দিকে থাকালে মনে হয় এই বুঝি বাবুই উড়ে এসে তার বাসায় ঢুকবে কিংবা তো এইমাত্র বাসা ছেড়ে ফুড়ুৎ করে উড়ে যাবে। আহা রে, কী সুন্দর! কত চমৎকারভাবে ফুটে ওঠেছে অতি আধুনিকতার হৃদয়পটে পল্লীজননীর স্নিগ্ধ মুগ্ধ ছবি! রেস্টুরেন্টের ডাইনিং হলের একপাশে ছোট্ট একটি মঞ্চ। মঞ্চে সেতার হাতে একজন তন্বী যুবতী, আর তার পাশে হারমোনিয়াম নিয়ে বসে আছেন সুদর্শন গজল গায়ক, গায়কের পাশেই গম্ভীর চেহারার তবলা বাদক। শুরু হয় প্রাণবন্ত গজলের নিঃসৃত সুরের লহরী। যাত্রীরাও সুরের সুষমামণ্ডিত পরিবেশে গজল শুনতে শুনতে নৈশভোজন গ্রহণ করছে। এমন অনুভূতিশীল প্রাঞ্জল মুহূর্তটির তুলনা তখনকার সেই সময় আর সেই স্থান ছাড়া আর কোনো কিছুর সাথেই দেওয়া যায় না। এই সেই সৌন্দর্য, যা আমি আজও দুচোখ থেকে মুছে ফেলতে পারছি না। বিদেশ গমনের ব্যাপার না হলে সঙ্গীত পিপাসু এই আমি সেই রাতে সেখান থেকে ওঠেই আসতাম না।
রাতের খাবার শেষ হলে যাত্রীদেরকে আবারও নিয়ে আসা হয় ইন্দিরাগান্ধী ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে। এখানে আসার পর যাত্রীদের এয়ারপোর্ট ট্যাক্স পরিশোধ করা শেষ হলে দিল্লি থেকে কেএলএম বিমানযোগে ৮৭২ নং ফ্লাইটে রাত ১:৪৫ মিনিটের সময় আমস্ট্রার্ডাম অভিমুখে বিমানটি রওয়ানা দেয় এবং পরের দিন সকাল ৭টায় বিমানটি আমস্ট্রার্ডাম এসে পৌঁছে। আমস্ট্রার্ডাম থেকে ফ্লাইট করবার পূর্বমুহূর্তে ইমিগ্রেশন রীতিমতো আমাকে আটকে দেয়। এবং আমার পাসপোর্ট ও টিকেট নিয়ে জনৈক অফিসার অন্যত্র চলে যাওয়ার সময় আমাকে একটা নির্দিষ্ট জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে আদেশ দিয়ে যান। আমিও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কৃত্রিম সাহসিকতা দেখিয়ে চুইনগাম চিবুতে থাকি; যদিও ভিতরে ভিতরে ‘ধরবে না ছাড়বে?’ হরদম মারছে। আমি মনে মনে প্রার্থনা করি, ‘হে বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের মালিক, হে আমার নিয়তি, এমন কী ক্ষতি হয়ে যাবে তোমার, যদি তরিখানি নিয়ে যাও গন্তব্যের তীরে!’ হ্যাঁ, স্রষ্টা সেদিন লৌকিক হোক আর অলৌকিকভাবে হোক সাহায্য করেছিলেন বটে। তা না হলে এই পাসপোর্ট দিয়ে রাস্তা পার হয়ে কানাডা পর্যন্ত আসার কথা ছিল না। কেননা, এই পাসপোর্ট দিয়ে এখনো পর্যন্ত তিনজন আমেরিকার নিউ ইয়র্ক শহরে প্রবেশ করেছেন। যার ফলে এই পাসপোর্ট এতই দুর্বল হয়ে যায়, যা দিয়ে কানাডা পৌঁছার স্বপ্ন দেখা গেলেও বাস্তবে আশা করা যায় না। হ্যাঁ, আমি নিয়তির ওপর ভরসা করেই আমার স্বপ্নবুনন বুকের ভিতর আশায় বাসা বেঁধে বসে ছিলাম সেদিন এবং একটা প্রচণ্ড রকমের আত্মবিশ্বাস নিয়েই সেদিন আমি স্বদেশ ত্যাগ করে বিদেশের পথে পা বাড়িয়েছিলাম।
পনেরো মিনিট পরে ইমিগ্রেশন অফিসার এসে আমার পাসপোর্ট ও টিকেট হাতে দিয়ে প্লেইনে ওঠার নির্দেশ দিলে আমি তখন পরিতৃপ্তির পরমানন্দে আকাশ স্পর্শ করেছি। সকাল ৭টা থেকে দুপুর ১:৪৫ মিনিট পর্যন্ত প্রায় সাত ঘণ্টা আমস্ট্রার্ডাম এয়ারপোর্টে আমি উপোস করেছি। ওয়াশরুমে গিয়ে কয়েকবার জল পান করেছি। কেননা, পাছে ভয়, খাবার আনতে গিয়ে যদি পুলিশ ধরে ফেলে? কারণ ওটা তো নিজের পাসপোর্ট নয়। আমস্ট্রার্ডাম থেকে কেএলএম-এর ৬৯১ নং ফ্লাইটে স্থানীয় সময় ১:৫৫ মিনিটে ফ্লাইটে চড়ে ৯ ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে অবশেষে ৭ অক্টোবর আমি কানাডার টরন্টো পিয়ারসন এয়ারপোর্টে সন্ধ্যা ৬টায় এসে অবতরণ করি। কানাডায় তখন হেমন্ত ঋতু। তাই অবতরণ করার সময় ওপর থেকে ম্যাপল পাতার বাহারি রঙে রাঙানো দেশটিকে দেখে মনে হয়েছে, এই দেশটি যেন ফুলে ফুলে সাজানো বিধাতার বসুধায় এক অনিন্দ্য সুন্দর মহাউদ্যান।
২.
জীবনে এই প্রথম স্বদেশ ছেড়ে বিদেশে। চেনা নেই, জানা নেই, এত বড়ো দেশ, এত বড়ো শহর। ইমিগ্রেশন শেষ করে সন্ধ্যায় আমি যখন এয়ারপোর্ট প্রাঙ্গণে বেরিয়েছি তখন পাগলপ্রায় হয়ে খুঁজেছি রফিক নামের আত্মীয় মানুষটিকে। উনি সেদিন সন্ধ্যায় এয়ারপোর্ট থাকার কথা ছিল, কিন্তু তাঁর দেখা মেলেনি। তাঁকে না পেয়ে পিয়ারসন এয়ারপোর্টে ব্যাকুল হয়ে কেবল একজন বাঙালির মুখ খুঁজেছি। কিন্তু একজন বাঙালির চেহারাও সেদিন দেখিনি।
রফিক সাহেবকে নিউইয়র্ক থেকে আমার বোন যে বার্তা দিয়েছিলেন সেখানে অসাবধানতাবশত একটি ভুল হয়ে গেছে। আমার বোন ফোন করে বলেছেন, ‘রফিক সাহেব, আমার ভাই হাসিব ৬ অক্টোবর কানাডা আসছে, সুতরাং দয়া করে আপনি তাকে টরন্টো এয়ারপোর্ট থেকে এগিয়ে নিয়ে আসবেন, কেমন!’ অথচ, ৬ অক্টোবর ঢাকা থেকে ফ্লাই করলে আমি যে ৭ অক্টোবর কানাডা এসে পৌঁছাবো, সেটা দুজনের কেউ তরজমা করেননি। ফলে, রফিক সাহেব ৬ অক্টোবর আমাকে নিতে এয়ারপোর্ট এসে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ঘরে ফিরে যান।
পরিপাটি এয়ারপোর্ট আমার চোখ ধাঁধিয়ে দিয়েছে। কিন্তু বিমুগ্ধ রূপের ঝলসানিতে নিমগ্ন হলে চলবে না, আশ্রয় যে খুঁজে নিতে হবে। কিন্তু কোথায় যাই, কার কাছে যাই, কার সাহায্য পাই… এইসব ভাবতে ভাবতে অস্থির হয়ে ওঠি। এমনিতেই অন্যের পাসপোর্ট দিয়ে অবৈধভাবে ঢুকেছি। নানান ভাবনায় আক্রান্ত হয়ে প্রতি মুহূর্তে মনে হয়েছে, এই বুঝি পুলিশ ধরে ফেলবে এবং দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেবে। কলেজ পড়ুয়া বিকম হলে কী হবে, মুখ দিয়ে তখন ইংরেজিতে ভালো করে এককাপ কফি বা কুকিজ চাইবার সাধ্যও ছিল না। ভিতরে তখন কেবলই পুলিশ পুলিশ করছে। তাই যত শীঘ্র স্থান ত্যাগ করা যায় ততই মঙ্গল- এই ভেবে সেখান থেকে রওয়ানা দিতে ট্যাক্সিতে ওঠে ড্রাইভারকে রফিক সাহেব-এর ঠিকানা দেখালে ড্রাইভার ঠিকানা সনাক্ত করতে পারে নাই। কারণ আমেরিকা থেকে টেলিফোনে শুনে লেখা ঠিকানায় বানান ভুল ছিল। (105 west lodge #1105-এর জায়গায় West bodge #1105) অর্থাৎ ভুল ঠিকানা লেখার কারণে তখন আমি অকূল সাগরে ধপাস করে পড়ে যাই। নিরুপায় হয়ে ট্যাক্সি ড্রাইভারকে কোনোমতে বলতে সক্ষম হই যে, আমাকে মেইন টাউনে নিয়ে গিয়ে একটি মিডিল ক্লাস হোটেলের দরজায় পৌঁছে দিতে।
ট্যাক্সি ড্রাইভার আমাকে পৌঁছে দিলেন, The White House Hotel, 76 Church Street, Toronto। আমি ট্যাক্সি ভাড়া বাবদ ১৭.০০ ডলার-এর সাথে আরো ৩.০০ ডলার টিপস যোগ করে মোট ইউএস ২০.০০ ডলার পরিশোধ করি। ট্যাক্সি থেকে নেমে ব্রিফকেইসটি হাতে নিয়ে হোটেলের রিসিপশ্যানে যাই এবং রুম ভাড়া বাবদ পঞ্চাশ ডলার পরিশোধ করি। পঞ্চাশের কাছাকাছি বয়সী হোটেলের ম্যানেজার আমার পাসপোর্ট নাম্বর-সহ অন্যান্য তথ্যাদি হোটেল-এর রেজিস্ট্রি খাতায় লিখে রাখেন। তারপর হাতে রুমের চাবি দিতে দিতে খাঁটি বাংলায় জিজ্ঞাসা করেন, “আপনি তো বাংলাদেশি তাই না?”
আমার এমন দুঃসময়ে লোকটির মুখে শুদ্ধ বাংলা শুনে আমি আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাই; দিকহারা নাবিক যেন তীরের সন্ধান পেয়ে বসি। স্বস্তির নিঃশ্বাস নিয়ে উত্তর দিলাম, “হ্যাঁ! আমি বাংলাদেশি। আপনি কী করে বাংলা জানেন! আপনি কি বাঙালি?”
উত্তরে হোটেল ম্যানেজার বলেন, “হ্যাঁ, আমিও বাংলাদেশি। আজ থেকে চল্লিশ বছর আগে সেই শৈশবে বাবার সাথে এসেছিলাম।”
ভদ্রলোক আরও বললেন, “আপনি নিশ্চয় আগা খাঁ গোল্ডকাপ-এর কথা শুনেছেন?”
-“হ্যাঁ, অবশ্যই শুনেছি’ বললে, হোটেল ম্যানেজার বলেন, ‘আমরা উনাদেরই বংশধর। এই হোটেলটি আমাদের বহু পুরানো ব্যবসা।”
অল্পক্ষণ আলাপ আলোচনায় আমার সেই অসহায়ত্ব ভাবটা অনেকখানি কেটে যায়। ঐদিন আকস্মিকভাবে এমন একজন বাঙালিকে এভাবে পেয়ে যাওয়ার বিষয়টি আমার জন্য একটা অলৌকিক ব্যাপার ছাড়া আর কী হতে পারে! ঐ রাতে এই ভদ্রলোকটিকে না পেলে কীভাবে, কার সাথে যে যোগাযোগই-বা করতাম, বিষয়টি আজও আমার কল্পনায় কেবল ঘুরপাক খায়।
আজ থেকে আটত্রিশ বছর আগের কথা। কানাডা পৌঁছানোর সংবাদ বাড়িতে দিয়েছিলাম সিলেট শহরের এক আত্মীয়ের বাসায় টেলিফোন করে এবং তারা বিয়ানীবাজার টেলিফোন এক্সচেঞ্জ-এ ফোন করে জানালে ওরা আমার বাড়িতে লোক পাঠিয়ে সংবাদটি দেয়। তখন চিঠি লিখতাম .৭২ সেন্টের ডাক টিকিট লাগিয়ে। চিঠি বাড়ি পৌঁছাতে প্রায় একমাস সময় লেগে যেত। উত্তর পেতেও সমান সময়। প্রতিদিন স্বজনদের পত্রের আশায় লেটার বক্স খোলা একটা অনুভূতিশীল ব্যাপার ছিল। পত্র পেলে মহা খুশি, না পেলে মনটা বড়োই ভারি। সেই সময়ের সাথে তুলনা করলে অবাক না হয়ে পারা যায়! প্রযুক্তি আমাদেরকে আজ কোথায় পৌঁছে দিয়েছে!
৩.
১৯৮৭ সালে টরন্টো শহরে তখন হাতেগোনা বাঙালি। ছড়িয়ে ছিটিয়ে বড়ো জোর ১,২০০ থেকে ১,৫০০ লোকের বসবাস ছিল। আমি পরিচিত তিনজনকে খুঁজে পেয়েছিলাম। আর আজ বৃহত্তর টরন্টো শহর এবং তার আশপাশের ছোটো ছোটো শহর মিলে প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ হাজার বাংলাদেশির বসবাস। তখনকার সময় সারাদিন রাস্তায় হাঁটলেও দৈবক্রমে ছাড়া একজন বাঙালিও চোখে পড়তো না।
হাতে ব্রিফকেস, পকেটে ইউএস দুইশত ডলার নিয়ে আসা এই আমি বিগত আটত্রিশ বছর ধরে খুব ভালো আছি এখানে। জীবনের জন্য নিত্য প্রয়োজনীয় সকলই আজ, পরিমিত হলেও আমার কাছে আছে।
লেখক পরিচিতি
সিলেট জেলার বিয়ানীবাজার উপজেলাস্থ কসবা গ্রামে কবি আবদুল হাসিবের জন্ম। ছড়া, কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ ও উপন্যাস মিলে ষোলটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ২০১৫ সালে যুক্তরাজ্যের ‘সংহতি সাহিত্য পরিষদ’-এর পক্ষ থেকে ‘সম্মাননা পদক’ লাভ করেন। দ্বিতীয় পদকটি ‘জয়বাংলা সাংস্কৃতিক ঐক্যজোট’ কানাডা শাখার পক্ষ থেকে লাভ করেন।

