কানাডার বয়োজ্যেষ্ঠ স্কুলে দু’মাস

স্বপন বিশ্বাস

কানাডার নতুন অভিবাসীদের সামনে হাজির হয় দু’টি মূর্তিমান বিপদ। একটি আবহাওয়া, অন্যটি চাকরির বাজার। শীতবস্ত্র থাকলে প্রথমটি সামলে নেওয়া যায়। কিন্তু দ্বিতীয়টির জন্য অনেকের অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। আজ থেকে তেরো বছর আগে আমি কানাডার ভূমি স্পর্শ করি। এর আগেও দু’বার এসেছি, তবে অভিবাসী হয়ে নয়। তখন গ্রীষ্মকাল। সহনীয় গরম, চারদিকে সবুজের সমারোহ। শীতের প্রকোপ উপলব্ধি করার সুযোগ নেই তখন। সিঙ্গাপুরে নাগরিক হিসেবে কুড়ি বছর থাকার পর আমার এই কানাডায় আগমন। সেই অর্থে আমাকে ডবল অভিবাসী বললেও ভুল হবে না। সব ধরনের অভিজ্ঞতার ঝুলি কাঁধে নিয়েই এই মাটিতে আমার পা পড়েছে। কানাডার কেউ কেউ আমাকে বললেন, আপনার আগের শিক্ষা-দীক্ষা, ডিগ্রি, চাকরি ভুলে যান। এখানে শুরু করতে হবে নতুন করে। হাতে কোনো বিকল্প ছিল না। তাই ভাবলাম, তথাস্তু!

মিশিসগায় একটি বয়োজ্যেষ্ঠ স্কুলের সন্ধান পেলাম। এটি প্রশিক্ষণ স্কুল। এই স্কুলের পড়া শেষ করলে কর্তৃপক্ষ চাকরি ধরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে সহায়তা করবে। আগস্ট মাসে ক্লাস শুরু, অক্টোবরে শেষ। এ আর এমন কী! নয়টা থেকে তিনটা, মাঝে এক ঘণ্টা মধ্যাহ্ন ভোজের বিরতি। স্কুল, কলেজ আর দু’টো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার পর এবার ভর্তি হলাম কানাডার বয়োজ্যেষ্ঠ স্কুলে। একেই বলে ‘পুনর্মুষিক ভব’। একপ্রকার জড়তা ও কৌতূহল নিয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ স্কুলে আমার ‘যাত্রা হলো শুরু।

প্রথম দিন ক্লাসে ঢুকে ‘কোথায় বসি, কোথায় বসি’ করছি, তখন বিনয়ী কণ্ঠে স্বাগত জানালো পারমিন্দর ধীমান। শ্বেতশুভ্র পোশাকে অমায়িক পাঞ্জাবি মেয়ে। অল্প সময়ের মধ্যেই এসে হাজির হলো আরো অনেক ‘বয়োজ্যেষ্ঠ’ ছাত্রছাত্রী’। ঘড়ির কাঁটা মেনে আবির্ভূত হলেন মিস জো-এন. আমাদের প্রশিক্ষক। জো-এন. বয়স ত্রিশের কাছাকাছি, খাটো ও গোলাকার মুখায়ব, গর্বিত কানাডিয়ান। অনেক আলাপচারিতার পরে আমরা জিজ্ঞেস করলাম, বিয়ে থা হয়েছে কি না? ব্যাপারটা জো-এন রেখে দিলেন রহস্য করে। তার পূর্বপুরুষরা এসেছে ক্যারিবিয়ান অঞ্চল থেকে। প্রথম ক্লাসে দীর্ঘ একটা পরিচয় পর্ব হয়ে গেল। আমরা বুঝতে পারলাম, বেঁচে থাকার জন্য নেটওয়ার্ক কতটা জরুরি। ক্লাসের ডেমোগ্রাফি সম্পর্কে কিছু ধারণা ধরে রেখেছি। পঁচিশ জন ছাত্রছাত্রীর অধিকাংশ ভারতীয়, বাকিরা চীন, নেপাল, বাংলাদেশ, নাইজেরিয়া ও ফিলিপাইনের। সবাই সুশিক্ষিত, চাকরিক্ষেত্রে সবারই কম-বেশি পেশাগত অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনজনের পিএই.ডি ডিগ্রি। কারো ব্যাকগ্রাউন্ড শিক্ষকতা, কারো গবেষণা। কেউ ইঞ্জিনিয়ার, মাইক্রোবায়োলজিস্ট, ফিনানশিয়াল এনালিস্ট, ফুড কেমিস্ট, হেল্থ এ্যান্ড সেইফটি, ব্যাংকার বিচিত্র সব পেশার লোক জড়ো হয়েছে এখানে। বয়স পঁচিশ থেকে পঞ্চান্ন। সবার লক্ষ্য একটা- চাকরির জন্য লাইন-ঘাট খুঁজে পাওয়া।

সারা কানাডাব্যাপী অসংখ্য বয়োজ্যেষ্ঠ বা প্রাপ্তবয়স্কদের স্কুল আছে। এসব স্কুল স্থানীয় কম্যুনিটি সেন্টার বা ডিস্ট্রিক্ট স্কুল বোর্ডের সঙ্গে যুক্ত। নাগরিকরা যাতে শিক্ষাগত, পেশাগত ও ব্যক্তিগত দক্ষতার উন্নয়ন ঘটাতে পারে, এই লক্ষ্যে সরকার এসব কলেজে অর্থায়ন করে থাকে। স্কুলগুলো বিভিন্ন ক্যাটেগরির। কোনো স্কুল নবাগত অভিবাসীদের প্রাথমিক ইংরেজি শেখায়, কোনোটা স্কুল থেকে খসে পড়া প্রাপ্তবয়স্ক ছাত্রছাত্রীদের ক্রেডিট কোর্স অফার করে। আমাদের স্কুল হলো আন্তর্জাতিক অভিবাসী পেশাজীবী লোকদের প্রশিক্ষণ দেয়। এ-সকল প্রোগ্রামের মাধ্যমে অনুমান করা হয়, এক অন্টারিও প্রদেশেই দুই লক্ষ নাগরিক শিক্ষা ও পেশাগত মান উন্নয়নে উপকৃত হচ্ছে। বয়োজ্যেষ্ঠ স্কুল ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রাপ্তবয়স্করা তাদের নিজ নিজ গতিতে পড়াশোনা করতে পারে, যা অনেকের জন্য সুবিধাজনক, বিশেষ করে যারা পরিবার বা চাকরির দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চায়। অনেক ক্ষেত্রে অনলাইন বা হাইব্রিড ক্লাসের সুবিধাও পাওয়া যায়। আমার নির্বাচিত স্কুলটি ডাফারিন-পিল ক্যাথলিক ডিস্ট্রিক্ট স্কুল বোর্ডের অধীনে ‘সেন্ট গেব্রিয়েল এডাল্ট ট্রেনিং সেন্টার’। একটি স্কুল বোর্ডের অধীনে এক বা একাধিক ট্রেনিং স্কুল থাকতে পারে।

আমাদের বয়োজ্যেষ্ঠদের লেখাপড়ার বিষয়বস্তু ও তা শেখানোর পদ্ধতি বেশ বিচিত্র। ছোটোদেরকে স্কুলে যেভাবে পড়ানো হয়, সেই পদ্ধতির নাম Pedagogy, আর বড়োদের শেখানোর পদ্ধতিকে বলে Andragogy। বড়োদের শেখাতে হয় না, তারা নিজেরাই শেখে। লক্ষ্য নির্বাচন করে ও নিজস্ব প্রেষণায় এগিয়ে যায়। কোর্স শেষ হলে স্কুল সনদপত্র দেয়। এই হলো Andragogy-এর পদ্ধতি। স্কুলে জো-এন দু’মাস ধরে বিচিত্র সব বিষয়বস্তু নিয়ে হাজির হয়েছে। আমাদের অভিজ্ঞতার রাডারে এ-সকল বিষয়বস্তু সহজেই ধরতে পারি। জানা বিদ্যার চর্বিতচর্চায় তিতী-বিরক্ত কিন্তু আমরা ক্লাসে মজা করার বিদ্যা আবিষ্কার করে নিয়েছিলাম। ক্লাসের ফাঁক-ফোকরে বা মধ্যাহ্ন ভোজের বিরতিতে গালগল্প ও আড্ডা মেরে বেশ টাইম পাস করেছি। কোর্সের কারিকুলাম আর আইন-কানুন থেকে শুরু করে চালচলন ও আদব-কায়দা সবকিছু। এ-তো দেখছি বিশুদ্ধ কানাডিয়ান তৈরির পাঠশালা! এমপ্লয়মেন্ট অ্যাক্ট দিয়ে শুরু, চাকরির ইন্টারভিউ দিয়ে শেষ। কানাডার অধিকার আইন, প্রাথমিক সেইফটি আইন, কানাডার সংস্কৃতি, সম্ভাষণ, WHMIS (Workplace Hazardous Material Information System), ইংরেজি ব্যাকরণ, কথোপকথন, ইত্যাকার সবকিছুই সিলেবাসের আওতায়। বয়োজ্যেষ্ঠ স্কুলে শেখানো হয়েছে, কী করে স্মার্ট হয়ে ইন্টারভিউ বোর্ডে হাজির হতে হয়। আমরা নতুন কোট ও টাই কিনেছিলাম। স্কুলের বাইরের থেকে হিউম্যান রিসোর্স বিশেষজ্ঞ আনা হয়েছে। তারা আমাদের ইন্টারভিউ নিয়ে মার্ক দিয়েছেন। মাঝে মাঝে আনা হয়েছে আমন্ত্রিত অতিথি বক্তা। তারা ঘণ্টাখানেক তাদের কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা বলে যেতেন। জো-এন একদিন একজন তরুণ বিশেষ অতিথিকে নিয়ে হাজির হলেন। তিনি লাতিন আমেরিকার কোস্টারিকা থেকে এসে অভিবাসী হয়ে এই আমাদের বয়োজ্যেষ্ঠ স্কুলে পড়ে একটি কনস্ট্রাকশন কোম্পানিতে কাজ পেয়ে থিতু হয়েছেন। স্কুলে এসে ছাত্রদের সাফল্য হচ্ছে চাকরি খুঁজে পাওয়া। আর জো-এনের সাফল্য এসেছে এই ছাত্রদের মধ্য থেকে একজনকে জীবনসঙ্গী হিসেবে নির্বাচন করা। আজকের তরুণ অতিথি বক্তা জো-এনের বয়ফ্রেন্ড। শুরুতে জো-এন যে রহস্য লুকিয়ে রেখেছিল, আজ তা প্রকাশ পেলো। ক্লাসে সকলকে সাক্ষী রেখে জো-এন তার বয়ফ্রেন্ডকে চুমু খেলেন। আমরা নতুন সংস্কৃতি ও অভিজ্ঞতার সাক্ষী হলাম।

সেই বয়োজ্যেষ্ঠ ইস্কুল

কানাডার সংস্কৃতি নিয়ে জো-এনের ক্লাস। তিনি বললেন, কানাডা বহু জাতি গোষ্ঠী ও সংস্কৃতির দেশ। জো-এন কানাডার স্বকীয়তা নিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করছিলেন। আমরা বয়োজ্যেষ্ঠরা এশিয়া ও আফ্রিকার হাজার বছরের সংস্কৃতি কাঁধে নিয়ে প্রবেশ করেছি কানাডায়। মনে হলো, জো-এন কানাডার সংস্কৃতি নিয়ে বেশ গর্বিত। তার ভাষায়, কানাডা সংস্কৃতির উচ্চতম শিখরে অবস্থান করছে। তিনি একে একে সব ছাত্রকে জিজ্ঞেস করছেন, কানাডার সংস্কৃতি নিয়ে আমাদের মতামত ও ভাবনা কী। যারা যতটুকু বলেছে, কানাডার ভূয়সী প্রশংসা করেছে। আমার যখন পালা এলো, আমি একটা মোটামুটি ‘গ্যাটিসবার্গ এড্রেস’ দিয়ে দিলাম। বললাম, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সংস্কৃতি নাই। এই দুটি দেশের ইতিহাস এখানকার আদিবাসী নির্যাতনের কালিমায় লিপ্ত। এদের নিজস্ব কোনো খাবার নাই। কানাডাবাসীরা জাপানের সুশি, কোরিয়ার কিমচি, থাইল্যান্ডের তম ইয়াম স্যুপ, ভারতের বিরিয়ানি, ইদলি, দোসা, মধ্যপ্রাচ্যের শোয়ারমা, ফালাফেল, গ্রিক সালাদ, ইতালির পিতজা, মেক্সিকোর টেকো বেল খায়। আমেরিকা ও কানাডার সংস্কৃতি মাত্র চারশ’ বছরের। খাবারের একটা Cuisine আবিষ্কারে সময় লাগতে পারে হাজার বছর। বৈভব ও সংস্কৃতি দুটি আলাদা জিনিস। মেসোপটেমিয়া, ভারত, চীন, আফ্রিকার সংস্কৃতি কয়েক হাজার বছরের। প্রাচীন জ্ঞান, বিজ্ঞান, চারু ও কারু কলায় প্রাচীন সভ্যতাগুলোর যে ঐশ্বর্য, কানাডা আমেরিকা তার ধারে কাছে নাই। আমার কথা শেষ হতে না হতেই শুরু হলো ক্লাসসুদ্ধ করতালি। জো-এন খানিকটা দমে গেছে মনে হলো। Andragogy গুরু-শিষ্য পদ্ধতি নয়। এখানে শুধু প্রশিক্ষক শেখায় না, বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছ থেকে প্রশিক্ষক নিজেও কিছু শেখে।

শিক্ষা-দীক্ষার এই লেনদেনের মধ্যে প্রতিদিন আমরা শিখছি, দেখছি, আলোচনা করছি, আড্ডা মারছি অক্লান্ত। কানাডা সংস্কৃতির কথা বলতে গিয়ে ক্লাসে জো-এন জানালেন, এখানে কর্মক্ষেত্রে দুজনে দেখা হলে, চিঠি বা ই-মেইলের সম্ভাষণে বলা হয়, ‘How are you?’ এর মানে, কেউ তোমাকে ‘তোমার স্বাস্থ্য কেমন আছে’ জানতে চাইছে না। তোমাকে বলতে হবে, ‘I am ok’, তোমার মনের ব্যথা বা ডায়াবেটিস যাই থাকুক না কেন। জানলাম, কানাডার অফিস আদালতে সুগন্ধি ব্যবহার করলে আইনত অপরাধ বলে গণ্য হবে। একজনের সুগন্ধি অন্যজনের এলার্জির কারণ হতে পারে। এই ভেবে অবাক হলাম, ধূমপান আর সুগন্ধি ব্যবহার এক কাতারে আসলো কী করে? নতুন দেশে চাকরির বাজারে কী করে দৈহিকভাবে ও মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে হবে, কোর্স ম্যাটারিয়াল সেভাবেই সাজানো। একজন চাকরিপ্রার্থী বয়োজ্যেষ্ঠ অভিজ্ঞ লোকের কাছে চাকরি খোঁজার তরিকা নিয়ে পুনর্বার জ্ঞান আহরণ সবসময় মধুর হয় না। ভালো Resume লিখে কি কখনো চাকরি মেলে? চাকরির বাজারের ইঁদুর দৌড়ে সবাই সমান দৌড়ায় না। কিন্তু সবারই বেঁচে থাকার অবলম্বন হিসেবে চাকরি বা কাজ প্রয়োজন। কানাডায় সম্ভবত কারো রেফারেন্স চাকরি পাওয়ার প্রধান উপায়। ভালো নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে রেফেরেন্স আদায় করতে পারলে চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।

মধ্যাহ্ন ভোজের বিরতি মানে আমাদের মহামিলনের সুযোগ। আমাদের গুজরাটি বন্ধু ও গৃহিণীরা প্রায়শ বাড়ি থেকে খাবার নিয়ে এসে ভাগ-বাটোয়ারা করে খেতেন। তাদের আতিথেয়তা মনে রেখেছি। ক্যান্টিনে বসে খেতে খেতে রাজ্যির গল্প করে এক ঘণ্টা পার করেছি। কখনো কখনো নেইবারহুডের ফুড কোর্টে গিয়েও ভোজন সেরেছি। ভারতীয় বন্ধুদের মধ্যে ক্রিকেট আর ফিল্মি দুনিয়ার আলাপ বেশি। পাঞ্জাবি মেয়ে ও গৃহিণীদের দেখলাম, তারা অমায়িক, উদ্যোগী, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও বন্ধুবৎসল। চীনের ফ্যান গুয়ান চীন থেকে ফাইনান্স বিষয়ে ডক্টরেট করে এসেছে। তার ইচ্ছা, সে কানাডায় লং ট্রাক চালাবে। সে ইতোমধ্যে হিসেব কষে দেখেছে, কানাডা থেকে মালামালসুদ্ধ একটি লং ট্রাক নিয়ে আমেরিকা গিয়ে কানাডা ফিরে আসলে এক মাসের কম সময়ের মধ্যে ঘণ্টায় পঁচিশ ডলার হারে সে হাতে পাবে পাঁচ হাজার ডলার। পিএইচ.ডি-র এমন অগতি আমি আরো অনেক দেখেছি। আমি আর উন্মেষ টরন্টো থেকে মিসিসাগায় যেতে ফ্যান গুয়ানের গাড়ির রাইড নিয়েছি। শুরুতে ভেবেছি, ফ্যান গুয়ান আমাদের বন্ধু হিসেবে সহায়তা করছে। পরে জানলাম, ওকে গ্যাসের টাকাটা দিতে হবে। এতে গ্যাসের দাম চুকিয়ে সে প্রতিদিন বরং কিছু লাভ করেছে। পরবর্তীকালে জেনেছি, কানাডার অফিস আদালতে Car Ride প্রথা বেশ চালু আছে।

বয়োজ্যেষ্ঠ স্কুলের ‘সিনাই সিনাই’ লেখাপড়ার শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেলাম আমরা। পঁচিশ জন আদম সন্তানের এখন চাকরির দরজায় হানা দেওয়ার পালা। কর্তৃপক্ষ আমাদের বিভিন্ন কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগের সূত্র ধরিয়ে দিতে লাগলেন। কোনটা শুরুতে ভলানটারি, কোনটা স্বল্প বেতনে চাকরি। হেল্থ ও সেইফটি বিষয়ে আমার অভিজ্ঞতা। আমি একটি স্কুল বোর্ডের কেন্দ্রীয় অফিসে আট মাসের কনট্রাক্ট পেলাম। অনিশ্চয়তা ও হতাশার মাঝে এই চাকরি ছিল ‘বরিষ ধরা-মাঝে শান্তির বারি। ‘আমাদের বন্ধু-বান্ধবীরা বিভিন্ন জায়গায় যুক্ত হতে থাকলেন। বয়োজ্যেষ্ঠ স্কুলের বিদায় সমাগত। ক্লাসের বন্ধুরা মিলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, আমরা জো-এনকে নিয়ে বিদায় অনুষ্ঠান করবো। আমি পেলাম সমন্বয়কারীর দায়িত্ব। প্রত্যেকেই মোটা অঙ্কের চাঁদা দিয়েছে, জো-এনের জন্য গিফট কেনা হবে। নির্ধারিত দিনে অনুষ্ঠান। সবাই বেশ সেজেগুজে হাজির হয়েছে। আজ জো-এন কোনো ক্লাস নেবে না। লাঞ্চের জন্য অর্ডার দেওয়া হয়েছে পিৎজা। অনুষ্ঠানে হালকা চালে কিছু কথাবার্তার আদান-প্রদান হয়েছে মাত্র। জো-এনের হাতে তুলে দিই সুদৃশ্য মোড়কে একটি প্যাকেট। তিনি সবার সামনে প্যাকেটটি খুললেন। বললেন, এত দামি গিফট! একটি হীরের আংটি। তার চোখে অশ্রুর বন্যা বয়ে গেল। আমরা বিদায় অনুষ্ঠানের ও বন্ধু-বান্ধবদের ছবি তুলে যে যার মতো কানাডার পথে ছড়িয়ে পড়লাম।

জো-এনের হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে হীরের আংটি

অজানা অচেনা দেশে পদার্পণ করার পর একটি প্রাথমিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বয়োজ্যেষ্ঠ স্কুল আমাদের সহায়তা করেছে। নতুন সমাজ ও বহু সংস্কৃতির মেলবন্ধনে নিজেদের কিছুটা খাপ খাইয়ে নিতে এই স্কুলের অর্জনকে আমরা মূল্যবান মনে করি। এক সঙ্গে দুই ডজন বন্ধু পাওয়াও কম সৌভাগ্যের কথা নয়। আজ অনেক বছর পরে কে কোথায় আছে জানি না, মাঝে-মধ্যে ফেসবুকে তাদের কাউকে খুঁজে পাই। নিজের পরিবারের বাইরে তাদেরকে বৃহত্তর পরিবারের অংশ মনে হয়। সবাই নিশ্চয়ই নিজ নিজ পেশায় বা পেশা পরিবর্তন করে পরিবার পরিজন নিয়ে এদেশে থিতু হয়েছে। নতুন জীবনযাপনে আমরা ব্যস্ত হয়ে পড়েছি, আমাদের জীবনে ও পরিবারে যুক্ত হয়েছে অনেক নতুন মুখ ও বন্ধু, আর পুরনোরা স্মৃতির আড়ালে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। অন্যভাবে বললে বলা যায়, আমরা পুরনো হওয়ার রেলগাড়িতে চড়ে বসে আছি।

আমরা বিশাল ভারতীয় সভ্যতার অংশ, পার হয়ে এসেছি হরপ্পা, মহেঞ্জদারো। আমরা গঙ্গা-যমুনা-মেঘনা অববাহিকার লোক; ছয় ঋতুর মধ্যে বড়ো হয়েছি। ইতিহাস ও ঐতিহ্য আমাদের মনের গভীরে প্রোথিত। আমাদের নিজস্ব গল্প আছে, আছে সঙ্গীত, নৃত্য, পোশাক, খাবার, দর্শন ও মহাকাব্য। পরিণত বয়সে অভিবাসী হয়েছি আমরা। বয়োজ্যেষ্ঠ স্কুল আমাদের বদলাতে পারেনি কিন্তু সমৃদ্ধ করেছে। পরিযায়ী পাখিরা তাদের ‘খাদ্য ও আবহাওয়া’ বসন্ত কাটিয়ে আবার নিজ বাসভূমে ফিরে আসে। আশঙ্কার দোলাচলে ভাসতে ভাসতে মনে হয়, পলি-বিধৌত মাটিতে আমরা বোধ হয় আর কখনো ফিরে যাবো না!

লেখক পরিচিতি
জন্ম নেত্রকোনায়। বুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগ ও সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে যথাক্রমে ব্যাচেলর ও মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেছেন। জনপ্রিয় বিজ্ঞান ও ভ্রমণ বিষয়ের লেখক। বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী-সহ কয়েকটি সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ: ‘সাদাকো ও হাজার সারস’ (অনূদিত) এবং ‘কুড়াই পথের নুড়ি’ (ভ্রমণ গল্প)।