আমার কানাডায় আসা

সুপর্ণা মজুমদার

১৯৮৩ সালের জানুয়ারি মাসে আমার বর মহাশয় চাকরি বাকরি ছেড়ে আবার পড়াশোনা করবার অভিপ্রায়ে চলে এলেন সাস্কাচেওয়ান প্রদেশের সাস্কাটুন শহরে ইউনিভার্সিটি অব সাস্কাচেওয়ানে মাস্টারস করতে। তার আট মাস বাদে আমিও ভিসিটার ভিসা নিয়ে আমার এক বছর চার মাস বয়সের ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে, অগাস্ট মাসের শেষের দিকে কলকাতা থেকে সাস্কাটুনের উদ্দেশে রওনা দিলাম। যাত্রা পথটা এই রকম- কলকাতা থেকে দিল্লি, দিল্লি থেকে ‘কে.এল.এম’-র বিমানে অ্যামস্টার্ডাম, সেখান থেকে ক্যালগেরি, তারপর ক্যালগেরি থেকে সাস্কাটুন। অর্থাৎ তিনবার প্লেন চেঞ্জ করা। অতি নির্বোধরা যেমন কিছু না জেনেই বিপদের মাঝে ঝাঁপিয়ে পড়ে আমার অবস্থাও অনেকটা তেমনই বলা যায়।

আত্মীয়-স্বজন যাদের আগে প্লেনে চড়ার অভিজ্ঞতা ছিল, তারা নানা উপদেশ দিলেন। বললেন, চিন্তার কোনো কারণ নেই; এয়ার হস্টেসরা ছোটো বাচ্চাদের খুব যত্ন করে। ওপর দিক থেকে বাচ্চাদের জন্য একটা ছোটো বিছানা নেমে আসে সেখানে তুমি মেয়েকে শুইয়ে দেবে। যতবার বাচ্চার দুধ চাইবে এয়ার হস্টেসরা বোতলে করে দুধ দিয়ে যাবে। ইত্যাদি ইত্যাদি।

নির্দিষ্ট দিনে দিল্লি যাওয়ার জন্য কলকাতা এয়ারপোর্টে এসে হাজির হলাম। পরনে শাড়ি, সিঁথিতে সিঁদুর। সঙ্গে দুটো স্যুটকেস আর আমার মেয়ে। কাঁধে অরেঞ্জ রঙের বিশাল একটা কিটস্ ব্যাগ, যার নাম ‘হোয়াট নট’- অর্থাৎ তাতে আবোল তাবোল সব কিছুই ভরা যায়। সেই ব্যাগের মধ্যে যে যা পেরেছে ভালোবেসে ভরে দিয়েছে।

আমার শাশুড়ি আবার একটা টিনের কৌটো ভরে মুড়ি দিয়ে দিলেন। মেয়ের যখন খুব ক্ষিধে পেয়ে যেতো, দুধ তৈরি করতে যেটুকু সময় লাগে সে সময়টা ওকে ভুলিয়ে রাখার জন্য সামনে উনি কিছু মুড়ি ছড়িয়ে দিতেন। আর সে কান্না ভুলে একটা একটা করে মুড়ি তুলে তুলে খেতো। তাই মুড়ি তো অপরিহার্য, ও দেশে কী আর মুড়ি পাওয়া যায়?

এয়ারপোর্টে দেখা করতে এসে একজন এক বিরাট বাক্স করে অনেক কড়াপাকের সন্দেশ আমার সেই ‘হোয়াট নট’ ব্যাগে ভরে দিলেন। সবাইকে টা টা বাই বাই বলে রওনা দিলাম। টারম্যাকে বেশ কিছুটা হেঁটে গিয়ে প্লেনে ওঠতে হবে। গোলাপি ফ্রক পরে আমার মেয়ে হাত দুলিয়ে দুলিয়ে গটগট করে হেঁটে আমার সঙ্গে চললো। মহাখুশি, ভাবছে মায়ের সঙ্গে বেড়াতে যাচ্ছে!

দিল্লিতে আমার স্যুটকেস কনভেয়ার বেল্ট থেকে নামিয়ে নিয়ে আবার বুক করতে হবে। বেল্টের সামনে বেজায় ভিড়। আমার কোলে মেয়ে, একজন বিশালদেহী অবাঙালি পুরুষের পিছন থেকে গলা বাড়িয়ে দেখলাম- ওই ওই যে আমার স্যুটকেস চলে যাচ্ছে। কী হবে? তখনও জানি না যে ওটা আবার ঘুরে আসবে। ঘুরতেই থাকবে। একটু ঠেলাঠেলি করে স্যুটকেস নিতে গিয়ে সামনের সেই বিশালদেহী লোকটার গায়ে ধাক্কা লাগলো। সে পেছন ফিরে আমার কোলে আমার মেয়েকে দেখে ভাবলো সেই ধাক্কাটা দিয়েছে। রেগে গিয়ে ইংরেজিতে একটা বিচ্ছিরি গালাগাল দিলো। কী আর করা, আমাকে তো আমার স্যুটকেসটা নিতে হবে!

যাই হোক, এবার অ্যামস্টারডামের প্লেনে ওঠলাম। অগাস্ট মাসের শেষ। প্লেন পুরোপুরি ভর্তি। বোধ হয় স্টুডেন্টরা চলেছে সেপ্টেম্বর মাসে ইউনিভার্সিটিতে যোগ দেবে বলে। ঠিক জানি না, তবে সব ধরনের লোকই ছিল। আমার সিট জানালার ধারে। মেয়ের বয়স দু-বছরের কম, তাই তার টিকেট কাটা হয়েছে এক-দশমাংশ ভাড়া দিয়ে। ওর কোনো আলাদা সিট নেই, পুরো রাস্তাটাই সে আমার কোলে বসে যাবে। ওকে আলাদা কোনো সিটে বসানোর উপায় নেই, কারণ, প্লেন একেবারে ভর্তি, এয়ার হুস্টেসরা ব্যস্ত হয়ে ছুটোছুটি করছে সারাক্ষণ।
আকাশে প্লেন বেশ কিছুক্ষণ ওড়ার পর এক এয়ার হুস্টেসকে কাছে পেয়ে বাচ্চার ব্যাসিনেটের কথা জিগেস করলাম। মনের বাসনা- ওর তো ঘুম পেয়েছে তা-হলে ওকে একটু শুইয়ে দিতাম। তা এয়ার হুস্টেস মেয়েটি বাঁকা চোখে একবার আমার মেয়ের দিকে দৃষ্টিপাত করেই বললেন- দোস্ আর ফর বেবিস- শি ইজ নট আ বেবি, শি ইজ আ চাইল্ড। অতএব সারা রাস্তা মেয়ে আমার কোলে। বয়সের তুলনায় তাকে বড়ো দেখায়, তাতে ওর কী দোষ? তবে বোতল দিলে মাঝে মাঝে তারা দুধ ভরে দিতো, ফ্রিজের ঠান্ডা দুধ, তা খেতে আবার মেয়ের আপত্তি- অত ঠান্ডা দুধ খাওয়ার তার অভ্যেস নেই। প্লেনে খাবার দেয়, আমি খেতে পারি না, কারণ, আমার কোলে আমার মেয়ে।

অ্যামস্টারডাম বিশাল এয়ারপোর্ট। যখন পৌঁছলাম আমি তখনই প্রায় আধমরা। কাঁধের ব্যাগটা জিনিসপত্রে এত ভারি হয়েছে যে, মনে হচ্ছে যেন কাঁধ ছিঁড়ে পড়ে যাবে। এতক্ষণ পর খোলা জায়গা পেয়ে মেয়ে আমার হাত ছাড়িয়ে দৌড়তে শুরু করলো। আমি শাড়ি সামলাতে সামলাতে দৌড়াই তার পিছনে। আমার প্রথম কাজ হলো ব্যাগ হাল্কা করবার জন্য ওই মুড়ির টিনটা গারবেজে ফেলা। আরও খুচখাচ কিছু ফেলে দিয়েছিলাম, এখন আর মনে নেই। একটি অল্পবয়সি মেয়ে আমার দুরবস্থা দেখে দয়াপরবশ হয়ে বললো- আন্টি তোমার ব্যাগটা একটা স্টোরেজে রেখে দাও না- শুধুমাত্র একটা ডাইম দিলেই রাখতে পারবে।

ডাইম কী? তা ছাড়া আমার কাছে খুচরোই-বা কোথায়! কয়েকটা ডলার আছে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ঝলমলে এয়ারপোর্ট, চারদিকে সাজানো গোছানো সুন্দর সুন্দর দোকান। দশ ডলার দিয়ে মেয়ের জন্যে খুব সুন্দর একটা খেলনার সাদা বেড়াল কিনে দিলাম, তার নীল কাচের চোখ।

কয়েক ঘণ্টা পর আবার একটা প্লেন, এবার ক্যালগেরি। সেখানে ইমিগ্রেশন হবে। বেশ ফাঁকা এয়ারপোর্ট। কাচের ঘরে বসা এক অফিসার আমাকে হাজারো প্রশ্ন করতে লাগলেন। কড়া পাকের সন্দেশ নিয়ে ধরা পড়লাম। এটা কী? খাবার জিনিস ওরা অ্যালাও করে না, গারবেজে ফেলে দেয়। কড়া পাকের সন্দেশ গারবেজে ফেলবে? সে যে বড়ো আফসোসের কথা! কী বুদ্ধি মাথায় এলো, বললাম মিল্ক প্রডাক্ট, আমার বাচ্চার খাবার। তা শুনে ছেড়ে দিলো। মেয়ের মুখ-চোখ দেখে বুঝতে পারছি তাকে নিয়ে এবার বাথরুমে যেতে হবে। যাই হোক, জিজ্ঞাসাবাদ শেষ হতে মেয়েকে নিয়ে বাথরুমের উদ্দেশে রওনা হলাম। দু-পা যেতে না যেতেই একটা পাওয়া গেল, কিন্তু এর দরজায় যে হুইল চেয়ার চিহ্ন আঁকা! আবার হাঁটা, বেশ কিছুটা গিয়ে আর একটা বাথরুম। ওমা, এখানেও যে হুইল চেয়ার চিহ্ন আঁকা! যা থাকে কপালে বলে মেয়েকে নিয়ে ঢুকে পড়লাম। পরে হুইল চেয়ার চিহ্নের রহস্য বুঝেছিলাম।

মেয়েকে নিয়ে সাস্কাটুনে আসার পর।

এবার ক্যালগেরি থেকে সাস্কাটুনের প্লেন। বরকে একটা ফোন করলাম। আমার মৃতবৎ অবস্থা বুঝে সে বললেন, আমি কি তোমাকে নিতে আসবো? রেগে গিয়ে বললাম, এত দূর যদি নিজে নিজে আসতে পারি, এটুকুও পারবো। অবশেষে সাস্কাটুন পৌঁছলাম।

২.

বর ছোট্ট একটা ওয়ান বেডরুম ফারনিশড অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া করেছে। খাট, ড্রেসিং টেবল্, পুরোনো একটা সোফা আছে। ড্রেসিং টেবলের প্রতিটা ড্রয়ারে আমার জন্যে খুচখাচ ছোটো ছোটো উপহার রেখে দিয়েছে। একটা ড্রয়ারে, মনে আছে গোলাপী রঙের ফেসিয়াল টিস্যু বক্স ছিল। মনে আছে, কারণ ওটা আমার খুব পছন্দ হয়েছিল। রাতে খেতে দিলো চিকেন রোস্ট। আমি তো হেভি ইমপ্রেস্ড! সে এত কিছু শিখে গেছে? পরে জেনেছিলাম ওরকম রোস্ট চিকেন কিনতে পাওয়া যায়। রান্নার জন্যে সে পাঁচটা ছোটো থেকে বড়ো স্টিলের গামলার একটা সেট কিনে রেখেছিল- বউ এসে রান্না করবে। সে জানে না যে, ওগুলোতে রান্না করা যায় না।

মেয়ে এই আট মাসে তার বাবাকে ভুলে গেছে, বাবা বলতে মামা বলে। যাই হোক। আমাকে সংসার বুঝিয়ে দিয়ে বর তো পরদিন থেকেই ডিপার্টমেন্টে চলে গেল। ছোটো মেয়ে, কিছু বোঝে না। সে হঠাৎ দেখে যে, তার সব প্রিয়জনেরা যারা তাকে সব সময় ঘিরে থাকতো, আদর করতো- সবাই অদৃশ্য! কেউ নেই, শুধু মা আছে। সে আমাকে এমনভাবে আঁকড়ে ধরলো যে, বলার কথা নয়। বাথরুমে স্নান করতে গেলেও দরজা খুলে রাখতে হতো, সে চুপ করে খোলা দরজার সামনে বসে থাকতো।

সেপ্টেম্বর মাস থেকেই ঠান্ডা পড়ে গেল। তখন মাস্টারস্ স্টুডেন্টদের স্কলারশিপ খুবই কম ছিল। টিএ করে কিছু আলাদা টাকা পাওয়া গেলেও তিনজনের সংসার খুব টেনেটুনে চলতো। আমরা আসার আগে বর যেটুকু টাকা জমিয়েছিল তা আমাদের কোট, প্যান্ট, জুতো, জ্যাকেট কিনতেই ফুরিয়ে গেল। ঠান্ডায় মেয়েকে নিয়ে কোথাও বেরোতেও পারি না। সারাক্ষণ ছোটো অ্যাপার্টমেন্টের ভিতরে প্রাণ হাঁপিয়ে ওঠে।

একদিন সাহস করে মেয়ের হাত ধরে হেঁটে হেঁটে এক ম্যাকডোনালডে গিয়ে হাজির হলাম। খাবারের অর্ডার দিতে মেয়েটি কী যেন বললো, বুঝতে পারলাম না। জিগ্যেস করতে আবার কী একটা বললো, আমি শুনলাম- ফ্রট্রেগো। আমি হাঁ করে তাকিয়ে আছি। সে আমার মুখ দেখে যখন বুঝলো যে আমি তা-ও কিছু বুঝিনি, তখন রেগে গিয়ে খুব কেটে কেটে বললো- ফর হিয়ার অর টু গো? বললাম- ফর হিয়ার। আশ্চর্য প্রশ্ন! মনে মনে বললাম, খেতেই তো এসেছি আবার ‘গো’ কেন? পরে অবশ্য এই ভ্রান্তি দূর হয়েছিল।

পরের বছর অগাস্ট মাসে বর জানালেন যে মাস্টারস শেষ হয়েছে এবার তিনি পিএইচ.ডি করবেন। পিএইচ.ডি না থাকলে রিসার্চ করবার ভালো সুযোগ নাকি পাওয়া যায় না। পিএইচ.ডি? সে তো অনেক দিনের ব্যাপার! ছোটো পরিসরে দিনের পর দিন আটকে থাকা। ততদিনে আমার আর মেয়ের দুজনেরই সহ্যের সীমা ছাড়িয়েছে। আমি ঠিক করলাম আমিও ইউনিভার্সিটিতে যুক্ত হবো। ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর মাস্টার্স প্রোগ্রাম। এর আগে তো প্ল্যান ছিল না। কোনো পরীক্ষাই দিইনি। যাই হোক, অনেক ইন্টারভিউ নিয়ে কথাবার্তা বলে কোনো রকমে আমার অ্যাডমিশন হলো। মেয়ে দু-বছর চার মাস বয়স থেকে রইলো ‘ডে কেয়ারে’। এখানে ক্লাসে ছেলেমেয়েরা পড়া শুনতে শুনতে খাবার খায়, প্রফেসর এলে কেউ ওঠে দাঁড়ায় না। প্রফেসর বিলিংটন, প্রব্যাবিলিটি থিওরিতে বিশ্বজোড়া নাম। তাঁর ক্লাসে একদিন এক মক্কেলকে দেখলাম টেবিলের ওপর পা তুলে দিয়ে আপেল খেতে খেতে পড়া শুনছে। সেই দিনগুলোর কথা লিখতে গেলে হয়ে যাবে আর এক মহাভারত।

কানাডায় আমার – ইউনিভারসিটি অফ সাসকাচেওয়ান।

যাই হোক, ইউনিভার্সিটি জীবনের ছোট্ট একটা ঘটনার কথা লিখি। আমাদের ডিপার্টমেন্টে খুব সুন্দর একটা গ্র্যাজুয়েট লাউঞ্জ ছিল। বোধহয় জুন-জুলাই মাস, বেশ সুন্দর একটা দিন। জানালা দিয়ে বাইরে দেখছি বেশ কিছু ছাত্র-ছাত্রী স্বল্পবেশে ঘাসের ওপর শুয়ে রোদ পোয়াচ্ছে, কেউ কেউ বই পড়ছে। এখানে মেয়েরা স্বাধীনভাবে যার যেমন খুশি খোলামেলা পোশাক পরে ঘুরে বেড়ায়, কেউ ফিরেও তাকায় না- মন্তব্য করা তো দূরের কথা। হঠাৎ নজরে এলো তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ব্রায়ান মালরুনি অল্প কয়েকজন মানুষ নিয়ে ওখান দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। যারা শুয়ে ছিল তাদের মধ্যে তেমন কোনো হেলদোল দেখা গেল না। উনিই নিচু হয়ে ওদের সঙ্গে কথা বললেন। তখন শুধু একজন ওঠে দাঁড়িয়ে ওঁর সঙ্গে হ্যান্ডশেক করলো। এই ঘটনা আমার মনে বিশেষ দাগ কেটেছিল।

৩.

প্রতি বছর সেপ্টেম্বর মাসে সেশন শুরু হতে ভোরবেলায় কুয়াশার মধ্যে ‘লেডি গোডাইভা’ বের হতো। আমি নিজের চোখে কখনও দেখিনি। শুনেছি। ঘোড়ায় চেপে নগ্ন গাত্র চুল দিয়ে ঢেকে একটি মেয়ে ক্যাম্পাসের মধ্যদিয়ে ঘুরে যেতো। ওই ঠান্ডায় জামা-কাপড় না পরে ঘোরা- সে বড়ো সাহসের ব্যাপার! জানি না, সেই ট্র্যাডিশন আজও আছে কি-না।

আমার মেয়ে নিজেই নিজের টিফিন খাওয়া, জামা-কাপড় কোট পরা, স্কেটিং, সাঁতার- সব শিখলো ডে-কেয়ারে। ঠান্ডার মধ্যেও প্রতিদিন বাচ্চাদের ফ্রেশ এয়ারের জন্য টিচাররা বাইরে হাঁটতে নিয়ে যায়। তার প্রথম বুলি ফুটলো ডে কেয়ারে। সে যা শোনে বাড়ি এসে তাই মুখস্থ বলে। আমি মনে ভাবলাম এ তো মহা মুশকিল! মেয়ে কি বাংলা বলবে না? বাড়ি এসে সে যখন কোনো জিনিস খেতে চাইতো, তখন আমি এমন একটা ভাব করতাম যেন ওর ইংরেজি কথা আমি মোটেই বুঝতে পারছি না। বেচারা প্রাণের দায়ে আমাকে বোঝাতে গিয়ে বেশ বাংলা বলা শিখে গেল।

১৯৮৩ সালের অগাস্ট থেকে ১৯৮৮ সালের অগাস্ট অব্দি আমরা সাস্কাটুনে ছিলাম। সে কী ঠান্ডা! শীতকালে মাইনাস ৩০-৪০ ডিগ্রি হয়ে যেত। আর তেমনি লম্বা শীত। আমাদের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে ইউনিভার্সিটি হাঁটা পথে প্রায় কুড়ি মিনিট লাগতো। মাথায় হুড দেওয়া মোটা কোট, হাতে দস্তানা, গলায় ও নাকে উলের স্কার্ফ জড়িয়ে হাঁটা দিতাম। নাক মুখ থেকে যে বাষ্প বের হতো তা চোখের পাতায় বরফ হয়ে জমে যেত। সন্ধ্যেবেলা সাদা বরফের ওপর আলো পড়ে হীরের কুচির মতো ঝিকমিক করতো। তাও বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে খাওয়া দাওয়া, আড্ডা দেওয়া, জন্মদিন, বিয়ের দিনে কোনো কম দামি রেস্তোরাঁয় গিয়ে সেলিব্রেট করা- আনন্দও ছিল বৈকি! বয়স কম ছিল বলেই বোধ হয় অনেক রকম কষ্টকর পরিস্থিতি সহ্য করতে পেরেছিলাম। আজ সেই সব দিনের কথা ভাবলে মনে হয়, কী করে পেরেছিলাম!

লেখক পরিচিতি
পেশায় ইঞ্জিনিয়ার হলেও বাংলা সাহিত্যের বিশেষ অনুরাগী। ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের কবিতার দুটি বই এবং কবীরের ৫০০টি দোহা বাংলায় অনুবাদ করেছেন। নিজেও ছোটোগল্প এবং কবিতা লেখেন। ছবি আঁকার শখও আছে। এছাড়া বাঙালি মেয়েদের লেখায় উৎসাহ দেওয়ার জন্য ২০২০ সাল থেকে ‘সহেলি’ নামে একটি পত্রিকার সম্পাদনা করে চলেছেন।