থাকা না থাকা’র দোলাচল
জীবন খাতায় আমরা সবাই গল্প লিখি। কারো কারো গল্প শাখা বিস্তার করে হয়ে ওঠে সত্যিকারের উপন্যাস আবার কারো কারো গল্প শুধুই আঁকিবুকি; কিছু স্মৃতি আর কিছু কথা। ইংরেজিতে বলে ‘গ্রাস ইজ অলওয়েজ গ্রিনার অন দ্যা আদার সাইড’ অর্থাৎ জীবনে সবসময়ই ‘হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোনোখানে’ ভেবেই আমরা ছুটে চলি। আর আমদের তাড়া করে কোনো একটা অপ্রাপ্তি, কোনো একটা অসম্পূর্ণতা, কোনো একটা অতৃপ্তি। সংসার বিবাগীরা মনে করেন- এই অতৃপ্তিই সব সর্বনাশের মূল, আবার সম্ভবত: এই অতৃপ্তিই মানব জীবনকে এনে দেয় সাফল্য, জীবন হয় আরো সুন্দর। অতৃপ্তি না থাকলে মানুষের ছুটে চলা থেমে যেতো, আর থেমে যেতো সব আবিষ্কার। কখনো কখনো আমাদের জীবনে প্রত্যাশার চেয়ে প্রাপ্তি বেশি হয়; আবার কখনো কম; আবার কখনো আমরা যা ভাবি, ঠিক তেমনটাই ঘটে। আমাদের প্রত্যাশা, চেষ্টা আর প্রাপ্তির নিয়ন্ত্রণও অদৃশ্য এক শক্তির ইশারায় আবর্তন করে, সেখানে আমরা বড়ো নিরুপায়। প্রতিটি মানুষ কখনো না কখনো তার জীবনে প্রাপ্তি ও প্রত্যাশার টানাপোড়েন অনুভব করে।
কানাডার পিআর পাওয়ার পর অন্য সবার মতো আমিও কানাডায় আসবো কি আসবো না, এই দোটানায় পড়ে গেলাম। সেই সময় আমার বয়স প্রায় চল্লিশ। সেই বয়সে নতুন একটি দেশে নতুন করে বসতি করা কতটা সহজ হবে, সেটাও ছিল দোটানার আরেকটি কারণ। তাই ঠিক করলাম প্রথমবার টরন্টোতে এসে আমরা ছয় সপ্তাহ থাকবো। এই সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় সব অফিসিয়াল কাজ শেষ করবো, বেড়াবো, থাকলে কতোটা সুবিধা হবে সেটা যাচাই করে আবার দেশে ফিরে যাবো এবং পরে ভালো মন্দ ভেবে সিদ্ধান্ত নেবো। কাজেই কানাডার সেই ছয় সপ্তাহ সময় আমরা টুরিস্টের মতো অনেক দর্শনীয় স্থান ভ্রমণ করার চেষ্টা করেছি। আমরা একেক দিন একেক জায়গায় বেড়াতে যেতাম। যেহেতু আত্মীয় বন্ধু কেউ ছিল না, তাই গুগলের সাহায্য নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতাম। আমরা প্ল্যান করে একেক দিন একেকটা লোকেশনে বেড়াতে গিয়েছি।
টরন্টো ডাউন টাউনে কী কী দেখা যেতে পারে, সার্চ দেওয়ার পর সেন্টার আইল্যান্ড, সিএন টাওয়ার, ইটন সেন্টার, রিপ্লেইস একুরিয়াম, টরন্টোর পাথ সিস্টেম-সহ আরো কিছু গুগুলে পেলাম। ডাউন টাউনে আমরা তিন থেকে চারবার বেড়াতে এসেছি। ডাউন টাউনে বেড়ানোর প্রথম দিনে আমাদের প্রথম এজেন্ডা ছিল এগস্মার্ট রেস্টুরেন্টে ব্রেকফাস্ট খাওয়া এবং তারপর ট্যুর বাসে টরন্টো ডাউন টাউন এবং অন্টারিও লেইকে ভ্রমণ। যদিও এগস্মার্ট রেস্টুরেন্টে ডিম, রুটি আর আলু দিয়ে তৈরি খাবার পরিবেশন করা হয়, তবু বাংলাদেশ থেকে টরন্টো এসে এগস্মার্ট রেস্টুরেন্টের ব্রেকফাস্ট বিরাট লাক্সারি মনে হয়েছিল। এগস্মার্ট রেস্টুরেন্টের ব্রেকফাস্ট বিকেল ৩টা পর্যন্ত থাকে। এখানে সকালের নাস্তা আর দুপুরের খাবারকে একত্রে খাওয়াকে বলে ব্রাঞ্চ। বাচ্চাদের নিয়ে মিসিসাগা থেকে ডাউন টাউনে পৌঁছাতে আমাদের প্রায় সাড়ে বারোটার মতো বেজে গিয়েছিল। তাই আমাদেরও ব্রাঞ্চ খেতে হলো। আমাদের ট্যুর বাসের প্ল্যান থাকায় আমরা বেশ তাড়াহুড়া করেই ব্রেকফাস্ট মেনু নিয়ে বসলাম। মেনুতে খাবারের নাম এবং দামের পাশাপাশি, কী কী উপাদানে খাবারটি বানানো হয়েছে এবং কী পদ্ধতিতে বানানো হয়েছে, সেটাও লেখা ছিল। বিদেশে এসে এধরনের মেনু খুব দরকার, কারণ ভিনদেশি খাবারের নাম শুনে আমরা বুঝতে পারি না, এটা কী দিয়ে বানানো। টরন্টো পৃথিবীর সবচেয়ে মাল্টি কালচারাল শহর। এখানে পৃথিবীর প্রায় দুইশত দেশের মানুষ বাস করে, সেইসাথে এই দুইশত সংস্কৃতির খাবারও পাওয়া যায়। ইচ্ছা হলেই এরাবিয়ান, ক্যারিবিয়ান, জাপানিজ, ভিয়েতনামিজ, ইথিওপিয়ান বা অন্য যেকোনো দেশের রেস্টুরেন্টে খেয়ে আসা যায়।
ব্রেকফাস্টের পর আমরা ডাউন টাউনের একটা সিটি ট্যুর বাসে শহর ঘুরে দেখার প্ল্যান করেছিলাম। বাসের নাম ‘হিপো ট্যুর’। ‘হিপো’ জলহস্তীর আদুরে নাম অর্থাৎ ‘হিপোপটেমাস’ শব্দটিকে ছোটো করে নেওয়া হয়েছে। এখনকার বাচ্চারা জলহস্তী খুব পছন্দ করে বলেই এই বাস সার্ভিসের নাম ‘হিপো’ রাখা হয়েছে। এই বাস রাস্তায় যেমন চলে, পানিতেও চলে। সব মিলিয়ে দুই ঘণ্টার ট্যুর। প্রথম একঘণ্টা শহরের দর্শনীয় জায়গাগুলো দেখাবে তারপর লেইক অন্টারিওতে বাসে করেই ভ্রমণ। লেইকে ভ্রমণের সময় বাসটি সরাসরি লেইকে নেমে যাবে এবং একটা ছোটো স্পিড বোটের মতো চলতে শুরু করবে। বিষয়টি খুব অদ্ভুত এবং এ-ধরনের অভিজ্ঞতা আমার কখনো হয়নি। আস্ত বাসটি লেইকের পানিতে নেমে যাবে, বিষয়টি খুব রোমাঞ্চকর লেগেছিল বলেই আমরা এই সিটি বাস ট্যুর বেছে নিয়েছিলাম। ব্রাঞ্চ শেষে আমরা বাসের টিকেট কাউন্টারে এসে শুনলাম পরের বাস দুই ঘণ্টা পরে আসবে। টিকেট কাউন্টারটি ছিল ইউনিয়ন স্টেশনের কাছে। এই দুই ঘণ্টা কীভাবে কাটানো যায়, সেটা নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে ঠিক হলো বাসের টিকিট কেটে নিয়ে আমরা সিএন টাওয়ারটি দেখে আসবো, আবারো কফি খাবো এবং সময়মতো বাস কাউন্টারে চলে আসবো।
সহজে এবং দ্রুত টেলিকম্যুনিকেশন সিগনাল পাঠানোর জন্য ১৯৭৬ সালে ১৮১৫ ফুট উঁচু সিএন টাওয়ারটি নির্মাণ করা হয়। টাওয়ারটি দেখতে গিয়ে জানলাম এলিভেটরে করে টাওয়ারের ওপরে ওঠতে হলে ২৫ ডলারে টিকেট কিনতে হবে। বাসের টিকেটের জন্য প্রায় ১২০ ডলারের বেশি খরচ হয়ে গিয়েছে, তাই মনে হলো কানাডায় যদি কখনো বসবাসের সুযোগ হয়, তখন হয়তো টরন্টোতেই থাকবো, সেসময় না হয় সিএন টাওয়ার দেখা যাবে। কাজেই এযাত্রায় সিএন টাওয়ারের এলিভেটরে নাই-বা ওঠলাম। সিএন টাওয়ারের ওপরে একটা রেস্টুরেন্ট আছে, যার নাম ৩৬০। রেস্টুরেন্টটি ৩৬০ ডিগ্রি গোলাকারে ঘুরতে থাকে, তাই এই নাম। খেতে খেতে অনেক উঁচু থেকে পুরো ডাউন টাউনের চমৎকার দৃশ্য উপভোগ করা যায়। অনেকে বলে এই রেস্টুরেন্ট থেকে রাতের দৃশ্য বেশি সুন্দর, আবার অনেকে দিনের শোভা বেশি পছন্দ করে। এই পৃথিবীতে প্রতিটা মানুষ আলাদা; আলাদা তাদের চরিত্র, আলাদা তাদের পছন্দ। তাই এই রেস্টুরেন্টটিতে দিনে এবং রাতে সমান ভিড় লেগে থাকে।
সিএন টাওয়ার থেকে ফিরে এসে বাস কাউন্টারে ট্যুর বাসে ওঠার লাইনে দাঁড়ালাম। ইতোমধ্যে লাইন বেশ অনেকটা লম্বা হয়ে গেছে। বিভিন্ন দেশের এবং বিভিন্ন বয়সের মানুষ লাইনে অপেক্ষা করছে বাসে ওঠার জন্য। আমাদের সামনে ২৫-৩০ বছর বয়সি একটা মেয়ে আর একটা ছেলে এবং তাদের সাথে ছোটো একটা বাচ্চা স্ট্রলারে ঘুমাচ্ছে। বাচ্চাটার বয়স হয়তোবা ৬ মাস হবে। আমাদের দেশে এত ছোটো বাচ্চা নিয়ে এ ধরনের ট্যুরে আসাটা খুব ঝামেলার কাজ। কিন্তু এদেশের রাস্তায় ছোটো শিশুর স্ট্রলার নিয়ে মায়েরা গ্রোসারি থেকে শুরু করে বাস ট্যুরেও আসে।
মিনিট পনেরো অপেক্ষার পর বাস এলো। বাসটা থিম পার্কের মতো করে রং করা। হালকা হলুদ পটভূমিতে কয়েক শেডের নীল সমুদ্রের ঢেউ আঁকা আর তার মাঝখানে সামনের দুটো দাঁত বের করে হালকা বেগুনি রঙের একটা জলহস্তী অর্ধেক ডুবে আছে। জলহস্তীর এক পাশে লেখা ‘হ্যাপি হিপো’ আরেক পাশে লেখা ‘দ্যা হ্যাপিয়েস্ট ওয়ে টু সি দ্যা সাইটস’। বাসের সামনের অংশটা লঞ্চ বা নৌকার মতো কিছুটা চোখা করে বানানো। বলা যায় বাস আর নৌকার সংমিশ্রণ। লাইনে দাঁড়ানো সবাই বাসের ভিতরে গিয়ে বসলাম। বাসটাতে একজন ট্যুর গাইড নিজেকে এবং ড্রাইভারকে পরিচয় করিয়ে দিলো। ড্রাইভারটি জানালো, গত বিশ বছর ধরে সে ট্যুর বাস চালাচ্ছে। এই অভিজ্ঞতা বলার কারণ হলো যাত্রীদের নিরাপত্তা বিষয়টি নিশ্চিত করা। ইউনিয়ন স্টেশন থেকে আরো কিছু টুরিস্ট যাত্রী নিয়ে আমাদের যাত্রা শুরু হলো। টরন্টো ডাউন টাউনের ইউনিয়ন স্টেশনটি দেখতে ছোটো হলেও আসলে অনেক বড়ো। বাসে ওঠতে ওঠতে আমাদের প্রায় বিকেল পাঁচটা বেজে গিয়েছিল। তাই ইউনিয়ন স্টেশনে ছিল ছুটে চলা কর্মজীবী মানুষের স্রোত। সব মিলিয়ে খুব কর্মব্যস্ত একটি শহরের ছবি। মনে হচ্ছিল এই শহরের প্রতিটি রাস্তায়, প্রতিটি জানালায় হাসিমুখ আর আনন্দধারা, শহরে কোথাও কোনো অসুখ নেই।
আমাদের গাইড খুব চমৎকার করে টরন্টো শহরের বর্ণনা দিচ্ছিল এবং তার ইতিহাস জ্ঞানও বেশ পাকা। ইউনিয়ন স্টেশন ছেড়ে ইটন সেন্টার, নেথান ফিলিপ স্কোয়ার, রয়েল অন্টারিও মিউজিয়াম, টরন্টো ইউনিভার্সিটির সামনে দিয়ে এসে আমাদের বাসটি কাসালোমার সামনের রাস্তায় কিছুক্ষণের জন্য থামলো। ১৯১৩ সালে টরন্টোর অন্যতম ধনী ব্যক্তি স্যার হেনরি প্যালেট এই প্রাসাদোপম ভবনটি নিজের বসবাসের জন্য নির্মাণ করেছিলেন। চমৎকার বাগান, চত্বর বা প্যাটিওআর ব্যালকনি ঘেরা এই ভবনটি এখন মিউজিয়াম হিসেবে সংরক্ষিত করা হয়েছে এবং বিকেল পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে। সন্ধ্যায় এই ভবন বিয়ে বা অন্য কোনো অনুষ্ঠানের জন্য ভাড়া নেওয়া যায়। অন্য দর্শনার্থীদের সাথে আমরাও কিছুক্ষণ এই বিরাট ম্যানসনের বাগানে এসে বসলাম। গাইড আমাদের জানালো এই স্পটে আমাদের ৩০ মিনিটের যাত্রা বিরতি। এরপরেই আমরা লেইক অন্টারিওতে নেমে যাবো। বাগানের মাঝামাঝি একটা বড়ো ফোয়ারা ঘুরে ঘুরে পানি ছিটিয়ে দিচ্ছে। কয়েকটি শিশু হাত দিয়ে পানি ছুঁয়ে ছুঁয়ে খেলছে। বাগানে অনেক রকম ফুল, যার বেশিরভাগই আমি চিনি না। আমার মনে হচ্ছিল, শুধু ফুল নয়, কানাডার ঘাসের প্রজাতিটিও বাংলাদেশের চেয়ে আলাদা। যদিও আমি এখন খুব নিশ্চিতভাবে জানি যে এই দেশের মানুষের মতো এই প্রজাতির ঘাসও খুব কষ্টসহিষ্ণু। প্রচণ্ড গরমে বা মাসের পর মাস বরফের নিচে থেকেও এই ঘাস দিব্যি বেঁচে থাকতে পারে। বরফ গলে যাওয়া মাত্রই সবুজ মোটা ঘাস মাথা তুলে উঁকি দেয়। আবার গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমে এই ঘাস বাদামি রং ধারণ করে; তখন মনে হয় ঘাস বুঝি মরে গেছে। কিন্তু অল্প বৃষ্টি বা পানি পেলেই আবার তরতাজা এই ঘাস। বাগানের একপাশে ঝাঁকড়া গোলাপ গাছে ফুটে আছে অসংখ্য গোলাপ। এই গোলাপ আমাদের দেশের গোলাপের মতো দেখতে হলেও এই ফুলে কোনো গন্ধ নেই। রূপের অহংকারেই অহংকারী গোলাপ। এই গোলাপ আধুনিক মানুষের মতো; ভিতরে যা-ই থাকুক, বাইরের রূপটাই বিবেচ্য। আসলে বর্তমান সময়টাই বুঝি ‘আগে দর্শনধারী, পরে গুণ বিচারী’র যুগ। মনে হচ্ছিল এখানে বসে এককাপ চা খেতে পারলে খুব ভালো হতো। কিন্তু দেখলাম সাইনবোর্ড লেখা আছে এই বাগানে খাবার বা পানীয় নিষেধ। আমি বরাবরই গাছ ভালোবাসি। কোথাও গেলে খুব মনোযোগ দিয়ে গাছ লক্ষ্য করি। এই বাগানে এসেও সেটাই করছিলাম। দূরে দেখলাম আমাদের গাইড হাত নেড়ে আমাদের ডাকছে। সিএন টাওয়ারের ওপরে ওঠা হলো না; কাসালোমার ভিতরেও এবার যাওয়া হলো না; শুধু বাইরে থেকেই দেখা হলো। মনে মনে আবারও ভাবলাম, যদি কখনো টরন্টোতে বাস করার সুযোগ পাই, তাহলে কাসালোমার ভিতরটাও ঘুরে দেখবো একসময়।
টরন্টোতে বাস করার অরো অনেক অনেক স্বপ্ন নিয়ে বাসে এসে বসলাম। মানুষ এক জীবনে যত স্বপ্ন দেখে, তার সব কি পূরণ হয়? সবার স্বপ্ন পূর্ণ হয় না, তারপরও মানুষের স্বপ্ন থেমে থাকে না। মানুষ সারাজীবন স্বপ্নের পিছনে ছোটে আর স্বপ্ন নিয়েই বাঁচে। আর সে-জন্যই হয়তোবা বলে- মানুষ তার স্বপ্নের মতো বড়ো। আমিও একদিন কানাডার সিটিজেন হবো। আমার বাচ্চারা কানাডার নামি দামি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে- এসব সাত-পাঁচ স্বপ্ন দেখতে লাগলাম। এরমাঝেই বাসটি এসে লেইকের পাশে দাঁড়ালো। নীল পানির বিশাল লেইকে দৃষ্টিসীমা দিগন্তে মিলিয়ে যায়। সাগরের মতো বিশাল লেইকের অপর পার দেখতে পাওয়া যায় না; কিন্তু সাগরের মতো বিশাল ঢেউ নেই- অনেকটাই শান্ত। দেখলাম একটা রাস্তা লেইকের পানিতে ঢালু হয়ে নেমে গিয়েছে। আমাদের বাসটি সেই ঢালু রাস্তা দিয়ে পানির দিকে এগিয়ে যেতে লাগলো। বাস যখন পানি ছুঁই ছুঁই, তখন সবযাত্রী ‘গো হিপো গো’ বলে চিৎকার করে ওঠলাম। আমাদের বাস সবুজ রাজহাঁসের মতো লেইকের স্বচ্ছ পানিতে ভেসে ভেসে এগিয়ে যেতে লাগলো। বাসটিকে এখন মনে হচ্ছে বড়ো একটা নৌকা। জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে লেইকের পানিতে হাত রাখলাম। যদিও টরন্টোতে এখন আগস্ট মাসের গরম, তারপরও লেইকের পানি অনেক ঠান্ডা। বলা হয়, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ নাকি পানির জন্য হবে; সত্যিই যদি হয়, তাহলে টরন্টোবাসীর কোনো চিন্তা নেই। লেইক অন্টারিও-সহ আরো চারটি লেইক কত লক্ষ বছর ধরে সুপেয় মিষ্টি পানি সংরক্ষণ করে রেখেছে।
লক্ষ্য করলাম, আমাদের আশেপাশে আরো অনেক ছোটো বড়ো স্পিডবোট, লঞ্চ, জাহাজ ভেসে বেড়াচ্ছে। ট্যুর গাইড জানালো এগুলো প্রায় সবই টুরিস্টদের বোট। লেইক অন্টারিওতে বিভিন্ন ধরনের বোট ক্রুজ আছে। এপ্রিল মাসের শেষ থেকে অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রচুর পর্যটক এই নৌকাগুলোতে ভেসে বেড়ায়। লেকের পারে রেডপাথ নামে চিনির কারখানা, লেইকের মাঝখানে এয়ারপোর্ট, একপাশে সেন্টার আইল্যান্ড দেখিয়ে আমাদের গাইড বলে যাচ্ছে এসব জায়গার ইতিহাস। একপর্যায়ে জানালো রেডপাথ চিনির কারখানা কিছুতেই যেন লেইকের পানিতে কারখানার বর্জ্য ফেলতে না পারে, সেজন্য তাদের রয়েছে বিশেষ পানি পরিশোধনাগার, যেটা খুব নজরদারির মধ্যে রাখা হয়। স্কুলে আমরা পড়তাম ‘নদীমাতৃক বাংলাদেশ’; এটা পড়ে বুঝতাম আমাদের দেশে অনেক নদী। সেই ছেলে বেলায় আমাদের এতগুলো নদী আছে ভেবে বেশ অহংকার হতো। কিন্তু বয়স বাড়লে দেখছিলাম সেই নদীগুলোর পানি কারখানার বর্জ্যে কেমন কালো হয়ে যাচ্ছিল; নদীর চারপাশ আরো কারখানা নির্মাণের জন্য দখল হয়ে যাচ্ছিল, আর আমার সেই অহংকারের ওপর জমে যাচ্ছিল ধুলো।
গাইডের ধারাভাষ্য শুনছিলাম আর ভাবছিলাম আমার আগামী জীবনটা কেমন হবে। সত্যিই কি আমি দেশ ছেড়ে কানাডা চলে আসবো? যদি না আসি, এই লেইকের স্বচ্ছ পানিতে সাঁতার কাটা হবে না; হয়তো ওই সিএন টাওয়ারের ওপর ৩৬০ রেস্টুরেন্টে খেতে খেতে টরন্টো ডাউন টাউনের দিগন্ত রেখা দেখা হবে না; হয়তো কাসালোমার ভিতরে ঢুকে দেখা হবে না উনিশ শতকের প্রথমদিকে টরন্টোর অভিজাত শ্রেণির জীবনাচরণ কেমন ছিল তা।
শুনেছি অক্টোবরে টরন্টোর গাছের পাতায় অপার্থিব রঙের খেলা শুরু হয়; শুনেছি টরন্টোর পূর্বে কোবার্গ কনজারভেটরির লেইকের পাশে বুনো রাজহাঁস তার পাতার বাসায় ছানাদের নিয়ে সংসার পাতে; শুনেছি কানাডার উত্তরে রাতের অন্ধকারে ফুটে ওঠে ‘অরোরা’ নামের সবুজ-গোলাপি আলো। যদি দেশে থেকে যাই; মায়ের কোলে, ভাইয়ের আদরে জীবন কাটিয়ে দিই; এই বিশাল পৃথিবীর হাতছানি কি আমাকে তাড়িয়ে বেড়াবে? কিন্তু দেশের প্রিয় চাকরি, নিশ্চিত জীবন ছেড়ে এই অজানায় আসতে বুকের ভিতরে কোথাও তার ছিঁড়ে যাওয়ার বেদনাটিও তো সত্যি। শেক্সপিয়ার লিখেছিলেন, “টু বি অর নট টু বি, দ্যাট ইজ দ্যা কোয়েশ্চেন” অর্থাৎ একটা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারা জীবনের অনেক বড়ো একটা বিষয়। এরই মাঝে আমাদের ট্যুরের নির্ধারিত সময় শেষ হয়ে আসছিল। অনিন্দ সুন্দরী, অপার সম্ভাবনাময় টরন্টো শহরের জন্য মুগ্ধ ভালোবাসা নিয়ে আমরা ফিরে চললাম পারের দিকে। বিকেল গড়িয়ে তখন সন্ধ্যা নামছে; সূর্যের কমলা আলো লেইকের পানিতে সোনালি ঢেউ তৈরি করছে; সেন্টার আইল্যান্ডের মেপল আর পাইন গাছের কোলে ছায়া নেমে আসছে; লেইকের পারের বিরাট ভবনগুলোতে জ্বলে ওঠছে আলো। সেই ভবনের কোনো এক জানালায় গোধূলি বেলায় হাসিমুখে আমার দাঁড়িয়ে থাকার অস্পষ্ট একটা ছবি মগজের নিউরনে ছড়িয়ে পড়ছিল। সেই অপূর্ব সন্ধ্যায় লেইকের ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে আমি কোনো এক সকাল দেখার চেষ্টা করছিলাম, যে সকালে সূর্যের কমলা আলো এমনি করে লেইকের পানিতে সোনা ঢেলে দিয়ে ক্লান্তিহীন, দীর্ঘ আনন্দময় দিন উপহার দেয়।
লেখক পরিচিতি
সামিনা চৌধুরী জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে এম.এ. সম্পন্ন করার পর ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। তাঁর নয়টি গবেষণাপত্র জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশে তিনি দ্য ডেইলি স্টারের ঊহমষরংয রহ ঝপযড়ড়ষ প্রকল্প এবং বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বই অনুবাদ প্রকল্পে যুক্ত ছিলেন। তিনি ত্রিশটিরও বেশি বইয়ের পর্যালোচনা করেছেন। তিনি টরন্টোতে বসবাস করেন এবং কানাডিয়ান পোস্টাল সার্ভিসে কর্মরত।

