কানাডিয়ান এক্সপেরিয়েন্স বনাম নিষ্কাম কর্ম

অসীম ভৌমিক

সাল ২০০০। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি PR-এর কাগজপত্র হাতে পেয়েছিলাম। এদিকে দিন যত যাচ্ছিলো আমার ভিসার মেয়াদও শেষ হয়ে আসছিল। যদি আমি কানাডায় আসতে চাই তাহলে আমাকে ৩১ মে, ২০০১-এর মধ্যেই কানাডায় ইন করতে হতো। ২২ মে ২০০১ তারিখে এক্সটারনাল অডিট শেষ করলাম, ২৩ তারিখে লাস্ট অফিস করলাম আর ২৪ তারিখে দিনের বেলায় সব জিনিসপত্র গোছালাম এবং সেই দিন রাতে দুই বছরের মেয়ে আর স্ত্রীকে নিয়ে সোহাগ পরিবহণে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের ঢাকা রেস্ট হাউজের উদ্দ্যেশ্যে চট্রগ্রাম ছাড়লাম। পরদিন পঁচিশ তারিখ রাতে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজে চেপে বসলাম সম্পূর্ণ অজানা অচেনা বন্ধুবান্ধব আত্মীয়-স্বজনহীন এক গন্তব্যে যার নাম- টরন্টো।

মনে হয়, তখনো একটি ঘোরের মধ্যে দিয়েই প্রথমে হিথরো তারপর পিয়ার্সন এয়ারপোর্টে এসে পৌঁছলাম। সাথে ছিল এক সপ্তাহের চাল, ডাল, তেল, লবণ, হলুদ, মরিচ, মসলা-সহ কিছু বাসন-কোসন, কিছু বেবি ফুড, একটি শিমুল তুলার তোশক, বালিশ, দু-খানা গায়ের চাদর, রবি ঠাকুরের ‘সঞ্চয়িতা’-সহ কয়েকটা বই, একটি হারমোনিয়াম, আমাদের বিয়েতে চট্টগ্রাম উদীচী থেকে উপহার হিসেবে পাওয়া চট্টগ্রাম আর্ট কলেজের তৎকালীন প্রিন্সিপাল সৌমেনদা’র হাতে আঁকা স্কেচ-সহ শুভেচ্ছা বাণী, সব মিলিয়ে তিনটে বড়ো লাগেজ আর দুটো হাত ব্যাগ। যা-হোক, এয়াপোর্টের ভিতর থেকে একজন পোর্টার নিয়ে যখন বাইরে বের হোলাম তখনো ভাবিনি কোথায় যাচ্ছি আর কী অপেক্ষা করছে? শুধু এটুকু জানি, অতীতে যা-কিছু হয়েছে সাময়িক সমস্যা হলেও আখেরে ভালো হয়েছে আর ভবিষ্যতেও যা হবে ভালোই হবে- এই ধ্রুব সত্যটি আমার জীবনে বার বার প্রমাণিত হয়েছে তাই সবসময়ই শুধু কর্মই করে গেছি।

যেহেতু সম্পূর্ণ অপরিচিত দেশে আসছিলাম তাই সাথে সপ্তাহ দুয়েকের খাবার-দাবার এবং বিছানাপত্র নিয়ে এসেছিলাম। তবে ঈশ্বর বড়ো সহায় ছিলেন বলে মনে হয়। তাই আমি আসার মাস দেড়েক আগে আমার স্ত্রীর পরিচিত একজনের ভাইয়ের বউ মন্ট্রিয়ল থেকে দেশে এসেছিলেন তার মাধ্যমে সেই পরিচিতের পরিচিত যিনি টরন্টোতে এপ্রিলে নতুন সেমি ডিটাস হাউজ নিয়েছিলেন এবং ১ মে থেকে বেসমেন্ট ভাড়া দেবেন। তবে রেন্ট পেমেন্ট বাংলাদেশে টাকায় পরিশোধ করতে হবে। আমি তখনো জানতাম না বেসমেন্ট কী বা কেমন হয়, তবে যেহেতু একজন বাঙালির ঘর, তাই সাত-পাঁচ না ভেবেই বলেছিলাম- ঠিক আছে ।

যাহোক, পিয়ার্সনের বাইরে এসে এদিক ওদিক করতেই চোখে পড়লো এক বাঙালি ভদ্রলোক আমার নাম লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে আছেন; আমি কাছে গিয়ে পরিচয় দিতে জানতে পারলাম, উনি আমার নতুন বাড়িওয়ালা। যাহোক, উনার গাড়িতে আমার দুটো লাগেজ তুলে দিলাম আর একটা লাগেজ আর আমার স্ত্রী-সন্তান নিয়ে আমি একটি লিমোতে চড়ে বসলাম এবং প্রায় দশ মিনিটের মধ্যেই এসে পৌঁছলাম এবং বাড়িওয়ালা আমার আগে এসে বেসমেন্টের দরজা খুলে দাঁড়িয়ে আছে তাই বুঝতে বেগ পেতে হলো না যে এটাই আমাদের ভাড়া করা সেই বেসমেন্ট। বেসমেন্ট হলেও ওয়াক আউট বেসমেন্ট হওয়ায় আলো-বাতাস ভালোই ছিল। সেদিন সন্ধায় এবং পরদিন বাড়িওয়ালার ঘরেই খেলাম, তৃতীয় দিন থেকে দেশ থেকে আনা সেই চাল-ডাল দিয়েই আমাদের নতুন কর্মভূমি তথা এডাপ্টেড মাতৃভূমিতে আমার আগামী বংশধরদের জন্য নতুন দেশের গোড়াপত্তন করলাম।

তৃতীয় দিন বাড়িওয়ালাকে জিজ্ঞেস করলাম এই দেশের কর্মসংস্থানের বিষয়ে। তিনি বল্লেন পরের দিন আমাকে এমপ্লয়মেন্ট এজেন্সিতে নিয়ে যাবেন। কথা অনুযায়ী পরদিন সকাল বেলায় আমাকে একটি বিল্ডিংয়ের সামনে নামিয়ে দিয়ে বল্লেন; এই বিল্ডিংয়ের দোতালায় এমপ্লয়মেন্ট এজেন্সি আছে। যাওয়ার সময় বলে গেলেন এখান থেকে ২৫/৩০ মিনিট হেঁটে আমি বাসায় পৌঁছাতে পারবো, যদি বাসভাড়া সাশ্রয় করতে চাই। এদিকে আমি বিল্ডিংয়ের নিচে গিয়ে এদিক-ওদিক খুঁজতে থাকি কিন্তু কিছুই চোখে পড়ে না, শেষে একজনকে জিজ্ঞাসা করতেই বল্লেন, উনি কোনো এমপ্লয়মেন্ট এজেন্সি সম্পর্কে জানেন না, তবে এই বিল্ডিংয়ের ৩য় তলায় একটি নিউ ইমিগ্রেন্ট ট্রেনিং সেন্টার আছে। ভদ্রলোকের কথা শুনে আমি প্রথমে কিছুটা মনোবল হারিয়ে ফেলি। ভাবলাম বাসায় চলে যাবো, কারণ, বাসায় স্ত্রী-সন্তান একা, তারপর আবার কী মনে করে তিন তলায় ওঠে গেলাম। লিফ্ট থেকে নামতেই রিসেপশন, সেখানে আলাপ করে জানতে পারলাম এটি হিউম্যান রিসোর্স, কোস্টি এবং হাম্বার কলেজের উদ্যোগে পরিচালিত প্রতিষ্ঠান। যেটি মূলত ইমিগ্রেন্টদের এদেশের বিভিন্ন কাজের উপযোগী করে তোলার জন্য নানা রকম ট্রেনিং দিয়ে থাকেন। তবে যারা প্রফেশনাল তাদের জন্য একটি সেপারেট ডিভিশন আছে যেটার নাম Center for Foreign Trade and Professional People Training সংক্ষেপে CFTPT।

সিএফটিপিটি প্রতি মাসে একটি নির্দিষ্টসংখ্যক নবাগত প্রফেশনাল ইমিগ্রেন্ট নিয়ে মাসব্যাপী কোর্স করেন। যেখানে প্রতিদিন ৯টা-৫টা ফুলটাইম ক্লাস করানো হয়, যাতে কীভাবে কানাডার জব মার্কেট উপযোগী করে বিভিন্ন প্রকার রিসুমি লিখতে হয়, কোন কোন খাতে চাকরির সম্ভাবনা বেশি, কীভাবে ইন্টারভিউ ফেস করতে হয়, কীভাবে রেফারেল রেডি রাখতে হয়, মোক ইন্টারভিউ নেওয়া, ইন্টারভিউতে নানা রকম সম্ভাব্য প্রশ্ন, কীভাবে কোল্ড কল করে চাকরির পদ খালি আছে কি-না জেনে চাকরির জন্য আবেদন করতে হয় এইসব বিষয়াদিসহ আরো নানান বিষয়ে ট্রেনিং দেওয়া হয়। সেই সাথে তাদের মাধ্যমে নবাগতদের এ্যাকাদেমিক সনদ এদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের স্ট্যান্ডার্ডে ইক্যুইভ্যালেন্ট সনদের ব্যবস্থা করা এবং কেনেডিয়ান এক্সপেরিয়েন্স গেদার করার নানারকম কৌশল শেখানো হয়।

কানাডার উদ্দেশে দেশত্যাগের আগে ২০০০ সালে কক্সবাজারে স্ত্রী গৌরি ভৌমিক ও কন্যার সাথে লেখক অসীম ভৌমিক।

রিসেপশনিস্টকে অনেক অনুনয় বিনয় করে প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটরের সাথে দেখা করতে চাইলে রিসেপশনিস্ট বল্লেন, তিনি ব্যবস্থা করে দেবেন তবে অপেক্ষা করতে হবে। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পরই ডাক এলো প্রোগ্রাম কোর্ডিনেটরের সাথে দেখা করার। দুরু দুরু মন নিয়ে কোর্ডিনেটরের রুমের ভিতরে ঢুকতেই দেখি একজন অত্যন্ত মার্জিত সুন্দরী ভদ্রমহিলা হাত বাড়িয়ে আমাকে সাদর সম্ভাষণ জানালেন এবং বসতে বল্লেন। আমি বসতেই উনি এমনভাবে আলাপ শুরু করলেন যেন অনেকদিনের চেনা। আলাপের ভিতর দিয়েই আমি কী করতাম, এখন কী করতে চাই, শর্টটার্ম অবজেকটিভ এবং লংটার্ম গোল কী, জেনে নিলেন এবং বল্লেন পরদিন ৩১ মে ঠিক দশটায় আমি যেন কাগজপত্র নিয়ে উনার সাথে দেখা করি।

পরদিন নির্দিষ্ট সময়ের আগেই অ্যাঞ্জেলা অর্থাৎ সেই প্রোগ্রাম কোর্ডিনেটরের সাথে দেখা করার জন্য হাজির হলাম। ঘড়িতে ১০টা বাজতেই রিসেপশনিস্ট আমার নাম ধরে ডাকতে লাগলেন। আমি তড়িঘড়ি করে যেতেই সে ইশারায় অ্যাঞ্জেলার রুম দেখিয়ে ভিতরে যেতে বল্লেন। আমার নিজের মনও সকাল থেকে খুব ছটফট করছিল কী হয় কী হয়- এই ভেবে। যাহোক, আর কোনো বাড়তি কথা নয় বরং ঝটপট কাগজপত্র দেখলেন এবং বল্লেন প্রোগ্রাম সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সাথে দেখা করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রসিজিউর সেরে নেওয়ার জন্য, যাতে আগামীকাল থেকে জয়েন করতে পারি। আমি তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে নির্দেশিত কর্মকর্তার সাথে দেখা করলাম। গত পাঁচ দিনে এই প্রথম মনে মনে কিছুটা হলেও রিলাক্স ফিল করলাম।

এদিকে জুনের ১ তারিখ আমাদের বিবাহবার্ষিকী, প্রতি বছর এই দিনটি ছুটিতে থাকি এবং আমাদের নিজেদের মতো করে সময় কাটাই। কিন্তু এ বছর সম্পূর্ণ আলাদা! শুরু হলো মাসব্যাপী সিএফটিপিটি কোর্স প্রতিদিন ৯টা-৫টা ক্লাস, সিসটিমেটিক্যালি চাকরি পাওয়ার জন্য যত রকম প্রস্তুতির প্রয়োজন, সব শিক্ষা দেওয়া হয়। এই কোর্স থেকেই কানাডাতে সার্ভাইভ করার জন্য মোটামুটি সবরকমের তথ্য-উপাত্ত দিয়ে প্রস্তুত করা হয়। বিশেষ করে ফরোয়ার্ডিং লেটার, রিসুমি, থ্যাঙ্কিউ লেটার, চাকরির বিজ্ঞপ্তির সাথে মিল রেখে বিভিন্ন রকম রিসুমি লেখা, কীভাবে ইন্টারভিউতে কথা বলতে হবে, কীভাবে কোল্ড কলিং করতে হয় এইসব, এবং আরো নানা রকমের ইনস্ অ্যান্ড আউট হাতে কলমে শিক্ষা দেওয়া হয় এবং কোর্স শেষে কমপ্লিশন সার্টিফিকেট দেওয়া হয়। যথারীতি ১ মাসের কোর্স কখন শেষ হয়ে গেল টেরই পাইনি। আজ ২৫ বছর পরও সেই কোর্স মেটেরিয়াল এখনো সযত্নে তোলা আছে এবং প্রয়োজনে অনেকবার সেই বাইন্ডারের সাহায্য নিয়েছিলাম।

এই কোর্সের সূত্র ধরেই স্কিল ফর চেঞ্জে যোগাযোগ করলাম এবং সেখানে আবার কোর্সে ভর্তি হয়ে গেলাম এবং সেখান থেকে ক্যানেডিয়ান অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য ব্রাম্পটনে একটি কোম্পানিতে পাঠিয়েছিলেন। গিয়ে জানতে পারলাম, প্রথমে ডোর টু ডোর গিয়ে RESP বিক্রি করতে হবে এবং ইভ্যান্সুয়েলি রিয়েল এস্টেট এজেন্ট লাইসেন্স নিয়ে বাড়ি কেনা-বেচা করতে হবে। ভদ্রলোকের কথা শুনে আমি খুব আশাহত হলাম এবং সেই দিনই ফিরে এসে অফিসে বল্লাম ডোর টু ডোর নক করা আমার দ্বারা হবে না যদি কোথাও একাউন্টিং কাজ থাকে তবেই যেন আমাকে পাঠানো হয়।

এরই মধ্যে জুলাইও প্রায় শেষ হয়ে এলো কিন্তু কোনো দিকে কোনো কাজের হোপ পাচ্ছিলাম না। এখানে সেখানে দু-চারজনের সাথে পরিচয় হতে লাগলো যাদের প্রায় সকলেই হয় সার্ভাইভেল জব করছে বা সোসাল এসিস্ট্যান্সে আছে এবং আমাকেও অনেকেই পরামর্শ দিতে লাগলো অযথা সময় এবং টাকা ব্যয় না করে বরং সার্ভাইভাল জবে জয়েন করি বা সোসালে জয়েন করি। কিন্তু আমার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, আমার কাছে শেষ কপর্দক থাকা পর্যন্ত আমি নিজ প্রফেশনে কাজ পাওয়ার জন্য চেষ্টা করে যাবো যদি না পাই, তবে সবাই যা করে আমিও তাই করবো।

২০০৪ সালে কানাডার নাগরিক হিসেবে শপথ পাঠের অনুষ্ঠানে।

এদিকে আমার স্ত্রীর যেহেতু বিএড, এমএসএস ছিল তাই তার এখানে স্কুলে কাজ পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল কারণ তখন বাংলাদেশের বিএড-কে এখানে কলেজ অব অন্টারিও রিকগনাইজ করতো এমএসএস’কে চার বছর অনার্স ইক্যুইভ্যালেন্ট ধরা হতো। যাহোক, সিদ্ধান্ত হলো আমিই প্রথম নিজ ফিল্ডে কাজের চেষ্টা করবো তদনুযায়ী আমি বিভিন্ন এমপ্লয়মেন্ট এজেন্সিতে একাউন্টিং রিলেটেড জবের জন্য প্রায় প্রতিদিনই এপ্লাই করতে লাগলাম আর খোঁজ করতে লাগলাম কো-অপ এডুকেশনের কোথাও কোনো সুযোগ আছে কি-না। এরই মধ্যে জুলাইয়ের মাঝামাঝি বাংলাদেশ থেকে আসা এক নবাগত কলিগকে সাহায্য করতে গিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল এবং প্রথমদিন ডাক্তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে কিছু ব্যথা নিরোধক ঔষধ দিলেন, একদিন পর আবার আসতে বল্লেন এবং বল্লেন কমপ্লিট বেডরেস্ট নেওয়ার জন্য।

এখানে বলা দরকার যে, যেহেতু আমার হেলথ কার্ড হয়নি প্রতিবার ডাক্তার দেখাতে ১৫০ ডলার ফি দিতে হতো, যা ছিল আমার জন্য মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা। যে ডাক্তার আমাকে দেখছিলেন উনাকে পুরো বিষয়টি বুঝিয়ে বল্লাম এবং অনুরোধ করলাম যদি তিনি আমাকে তার চেম্বারে দেখেন। তিনি তাতে রাজি হলেন না, তবে পরের এপয়েন্টমেন্টে চেষ্টা করবেন কোনো হেল্প করা যায় কি-না। এর মধ্যে আমি বিছানায় শুয়ে শুয়ে ফোনে লোকাল এমপি, এমপিপি, কাউন্সেলর এবং বাঙালি পাড়ার তৎকালীন এমপি মারিয়া মিন্নাহ-সহ অনেককেই ফোন করেছিলাম কিন্তু সবারই এক কথা, হেলথ কার্ড না হওয়াতে আমার চিকিৎসার জন্য উনারা কোনো সাহায্য করতে পারবেন না। এদিকে তৃতীয়বার ডাক্তার দেখাতে আমাকে একটু ড্রপ করার জন্য বাড়িওলাকে অনুরোধ করতেই তিনি অনেকটা অঙ্গভঙ্গি করেই বললেন- দাদা, টাইম ইজ মানি। এই কথা শোনার পর আমার এতটাই খারাপ লেগেছিল যে, আজ পর্যন্ত কথাটি আমার মন খারাপের স্মৃতি হিসেবে গেঁথে আছে। তবে সেদিনের পর থেকে আর কোনোদিন উনার গাড়িতে উঠিনি। অবশ্য উনার বাসায় ছিলাম পরবর্তী এপ্রিল পর্যন্ত এবং মে ২০০২-তে আমি আমার নিজের কন্ডোতেই মুভ করেছিলাম।

এ্যানিওয়ে, তৃতীয় দিন ডাক্তার দেখানো শেষে সেই ডাক্তার আমাকে একজন ভিয়েতনামি ডাক্তারের ঠিকানা দেন যিনি হেলথকার্ড না হওয়া পর্যন্ত আমাকে হেল্প করবেন। পরবর্তী চেকআপ হসপিটালের সেই ডাক্তারের রেফারেন্স নিয়ে ভিয়েতনামি ডাক্তারের কাছে গেলাম এবং আজ অব্দি উনিই আমার ফেমিলি ডাক্তার। বলা দরকার যে, উনি কেবল আমার ডাক্তার হয়েই ক্ষান্ত থাকেননি বিভিন্ন সময় মানসিক হেল্পও করেছেন। যাহোক, সেবার প্রায় দু-মাস আমাকে শক্ত কাঠের বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে থাকতে হয়েছিল।

আজও চোখের ওপর ভাসছে ৯/১১ এর সেই ভয়াল দিন। আমি শুয়ে শুয়ে একপাশ হয়ে টিভি দেখার চেষ্টা করছিলাম যদিও আমার টিভিখানা ১ মিনিট চলে তো ২ মিনিট থাপ্পড় দিয়ে ঠিক করতে হতো। কারণ, টিভিখানা কিনেছিলাম ১০ ডলার দিয়ে গেরেজ সেল থেকে তা-ও আবার বাক্স টিভি। টুইন টাওয়ারের প্রথম টাওয়ার যখন নিচের দিকে মেল্ট হয়ে পড়ছিল তখন মনে হচ্ছিলো হলিউডের কোনো সিনেমা দেখছিলাম কিন্তু সম্বিত ফিরলো তখন যখন CNN-এর সাংবাদিক এরন ব্রাউন ধারাভাষ্য দিচ্ছিলেন এখন আরেকটি প্লেন দ্বিতীয় টাওয়ারটির উদ্দেশে আসছে আসছে…হিট।

সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি আমি আবার হাঁটা-চলা শুরু করি এবং প্রথমেই আগের তথ্যের ভিত্তিতে বারনহামথর্প এডাল্ট লার্নিং সেন্টারে গিয়ে চলতি কোর্স যেটা আগের সপ্তাহে চালু হয়েছিল তাতে ভর্তি হয়ে যাই, শুনেছি সেখান থেকে প্লেসমেন্ট হয় কানাডিয়ান এক্সপেরিন্সের জন্য এবং কখনো কখনো চাকরিও হয়।

একদিকে বার্নহামথর্পে ক্লাস অন্যদিকে বিভিন্ন এজেন্সিতে কাজের জন্য রিসুমি ড্রপ করার মধ্যদিয়ে দিন যাচ্ছিলো। এবার কিছুটা নার্ভাস লাগতে শুরু করছিল কারণ জমা টাকা প্রায় শেষের দিকে। অন্যদিকে কানেডিয়ান এক্সপেরিয়েন্সের দোহাই দিয়ে কোথাও কোনো চাকরি হচ্ছিল না। প্রায় ভেঙে পড়ছিলাম। এরই মধ্যে একদিন টরন্টো ডাউন টাউন এ্যাকাউন্টেম্পস /রবার্ট হাফ থেকে কল পেলাম বেতন ১৭ ডলার প্রতি ঘণ্টায় যখন মিনিমাম ওয়েজ সম্ভবত $৫.২৫। আমি তো মহা খুশি ১৭ ডলার করে আওয়ারলি, ওয়াও স্বপ্ন দেখতে লাগলাম কন্ডো নেবো না বাড়ি নেবো, কী গাড়ি…নেবো ইত্যাদি। প্রথম দিন আমার পোস্টিং হলো ডাউন টাউন সিপিপি অফিস যে বিল্ডিং, সেই বিল্ডিংএ, সম্ভবত ২৫ বা ২৬ তলায়। প্রথম কাজ ব্যাংক রিকন্সিলিয়েসন, আমি তো অনেকটা চোখ বন্ধ করে করার মতো দুই দিনেই সব কাজ শুধু শেষই করিনি বরং যাতে আগামীতে তারা নিজেরাই করতে পারে, তার জন্য স্প্রেডশিটে সেল এড্রেসের মাধ্যমে একটি প্রফরমা বানিয়ে দিয়ে এসেছিলাম। আনফর্সুনেটলি সেটাই আমার প্রথম আর সেটাই শেষ কাজ ছিল। কারণ, আমাকে যারা পাঠিয়েছে তারা ১ সপ্তাহের কাজ ২ দিনে শেষ করা এবং আনআক্সড ফর লোটাস স্প্রেডশিটে প্রোগ্রাম করে দেওয়া মোটেই পছন্দ করেনি। কারণ, তাতে তারা ক্লায়েন্ট থেকে প্রত্যাশিত ফি-তো পায়ইনি আবার ভবিষ্যতের পথও বন্ধ হয়ে গেল।

অবশেষে ভগ্ন হৃদয়ে আবার বার্নহামথর্প এডাল্ট লার্নিং সেন্টার-এ ফিরে এলাম বল্লাম গত ২ দিন অসুস্থ ছিলাম। এদিকে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ থেকে প্লেসমেন্ট শুরু হবে সবাই খুব অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে কার কোথায় প্লেসমেন্ট হয়। কোর্ডিনেটর বলছেন, এমপ্লয়ারের যার রিসুমি পছন্দ হয় তাকেই ডাকবেন তদনুযায়ী সপ্তাহ শেষ হওয়ার আগেই আমার ডাক এলো একটি ল’ ফার্ম থেকে। প্রথম দিন গেলাম তেমন কোনো কাজই আমাকে দিলেন না, দ্বিতীয় দিনও অনেকটা, তেমনই তৃতীয় দিন ছিল শুক্রবার সেদিন যিনি লয়ার সেই ভদ্রমহিলার সাক্ষাৎ পেয়ে আমি উনাকে বল্লাম গত ৩ দিন তেমন কোনো কাজ করিনি, আমি কাজ করতে চাই এবং কোনো ফিউসার অপর্সুনিটি আছে কি-না জানতে চাইলাম। উত্তরে তিনি বল্লেন পরে জানানো হবে। আমাকে একটা ডেক্স দেওয়া হলো, সেই সাথে পি.সি ল’ কীভাবে অপারেট করে, সেটা দেখিয়ে দিলেন কিন্তু সারাদিনের যে কাজ আমাকে দিলেন, তা শেষ করতে আমার বড়োজোর দু-ঘণ্টা সময় লাগবে এবং বল্লেন, আমার প্রতিদিন কাজের ভলিউম এমনই হবে।

পরের সপ্তাহ সোমবারও দেখলাম একই রকম, তাই প্রদত্ত কাজ শেষ করে সোজা স্কুলে এসে অফিসে জানালাম যে ল’ফার্মে পর্যাপ্ত কাজ নেই এবং ভবিষ্যতে কর্মী নেওয়ারও কোনো প্লান নেই (পরে শুনেছিলাম নতুন নিয়োগ দিয়েছিল) তাই আমি সিএ ফার্মে প্লেসমেন্ট চাই। অফিস থেকে বলা হলো, তাদের দায়িত্ব একবার প্লেসমেন্ট দেওয়া, এখন আমি যদি সেখানে না যাই লিস্টে পরবর্তী জনকে পাঠানো হবে এবং আমার নিজের প্লেসমেন্ট নিজেকেই যোগাড় করতে হবে। আমি বল্লাম, রাজি। বলে তো দিলাম, এবার করবো কী? বাসায় এসে অনেক চিন্তা করলাম কিন্তু কিছুই মাথায় আসছিল না। বার বার মনে হচ্ছিলো, ভুল করলাম না তো! হঠাৎ মাথায় এলো, আচ্ছা যেহেতু দেশে আমি ১৯৮৬ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সিএ ফার্মে ছিলাম, তাহলে এখানে কেন নয়! সারা দুনিয়াতে প্রায় সব সিএ ফার্মেই তো কাজ মোটামুটি একই রকম হবে। পরদিন সকালে স্কুলে না গিয়ে সোজা ডাউন টাউনে বে অ্যান্ড ব্লোরের অন্টারিও সিএ ইনস্টিটিউট অফিসে গিয়ে সেখান থেকে অন্টারিও সিএ ফার্মের লিস্ট সংগ্রহ করে স্কুলে ফিরে এলাম। এসে সংশ্লিষ্ট কোর্ডিনেটরকে সবটা খুলে বল্লাম এবং এ-ও বল্লাম, পরদিন থেকে কোল্ড কলিং করবো নিশ্চয় কোথাও না কোথাও থেকে পজেটিভ রেসপন্স পাবো। এ ছাড়া সিএফটিপিটি থেকে জেনেছিলাম সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে পরের বছরের জন্য ট্যাক্স ফার্মগুলোতে এপয়েন্টমেন্ট দিয়ে থাকে।

পূর্ব ভাবনানুযায়ী পরদিন লিস্ট হাতে নিয়ে একে একে বেশ কিছু ফার্মকে ফোন করলাম কোথাও বলা হলো, আপাতত কোনো এমপ্লয়মেন্ট সুযোগ নেই, আবার কোথাও বলা হলো, রিজুমি ড্রপ করতে। এভাবে দুদিন চলে গেল, তৃতীয় দিনেও যথারীতি ফোন করছিলাম একপর্যায়ে একটি ফার্ম থেকে বলা হলো, যদি ইন্টারেস্টেড হই তবে ফার্মে এসে কথা বলতে। ওদিকে আগের দিনের কলগুলো থেকেও একটা রেসপন্স পেলাম। তারা আমার সাথে কথা বলতে চায়। যাহোক, আমি প্রথম রেসপন্সকেই সিলেক্ট করলাম এবং এপয়েন্টমেন্ট নিয়ে পরদিন যথাসময়ে পৌঁছে গেলাম, ফার্মে ঢুকতেই প্রথমে রিসেপশন এরিয়া সেখানে তখন কেউ ছিল না, কিছুক্ষণ পরে ভিতর থেকে একজন ভদ্রমহিলা বেরিয়ে এলে তাকে বিস্তারিত জানালাম। তিনি আমাকে বসতে বলে প্রিন্সিপালের রুমে ঢুকলেন এবং দরজা বন্ধ করে কিছু একটা বল্লেন, যেটা আমি বাইরের থেকে কাচের দেয়াল দিয়ে দেখতে পাচ্ছিলাম। খানিক বাদে উনি বেরিয়ে এসে আমাকে ভিতরে যেতে বল্লেন, আমি যথারীতি ভিতরে ঢুকতেই দেখি বেশ লম্বা একহারা গড়নের এক সাদা চামড়ার ভদ্রলোক কিছুটা রুক্ষ চেহারা নিয়ে ফোনে আলাপ করছে এবং আমাকে ইশারায় বসতে বল্লেন। আমি সিটে বসতেই উনি ফোন রেখে আমার নাম-ধাম অভিজ্ঞতা এইসব জেনে নিয়ে ক্যানসেল চেক-সহ কতকগুলো ব্যাংক স্টেটমেন্টস আমার দিকে এগিয়ে দিলেন এবং বল্লেন, এগুলো থেকে কোনটি কেপিটেল এক্সপেন্স আর কোনটি রেভিনিউ এক্সপেন্স তা আইডেন্টিফাই করতে বল্লেন। আমি মনে মনে খুব খুশি হলাম এই ভেবে যে, এগুলো আবার কোনো কাজ হলো! তো কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি আইডেন্টিফাই করে দিলাম। উনি চোখ বুলিয়ে আমাকে বাইরে অপেক্ষা করতে বল্লেন এবং দশ মিনিট পর উনি নিজে বেরিয়ে এসে আমাকে আগামী কাল থেকে কাজে জয়েন করতে বল্লেন।

এভাবেই আমার বিনে বেতনের খণ্ডকালীন জব শুরু হলো। আমি স্কুলকে ফোন করে জানিয়ে দিলাম যে আমার কোঅপ প্লেসমেন্ট আগামীকাল থেকে শুরু হবে। পরদিন অফিসে আমাকে একটি কিউবিকে বসতে দিয়ে গতকালের সেই ভদ্রমহিলাটিই একটি ফাইল আর গতকালের সেই ব্যাংক স্টেটমেন্ট-সহ আরো এক ফোল্ডার কাগজপত্র দিয়ে বলা হলো, এখান থেকে ফিন্যান্সিয়াল স্টেটমেন্ট তৈরি করতে এবং কোনো সমস্যা হলে প্রথম গত বছরের ফাইল কনসাল্ট করতে। তারপরও না বুঝলে সিনিয়র থেকে জেনে নেওয়ার জন্য বল্লেন। আমি তো মনে মনে খুব খুশি, কারণ, দেশে এইরকম ইনকমপ্লিট রেকর্ড থেকে কত কাজ করেছি! যাহোক, আমি একসপ্তা’র কাজ তিনদিনেই করে দিলাম। তাতে ফার্ম প্রিন্সিপাল খুব খুশি বুঝতে পারলাম এবং প্রতিদিন বিনে পয়সায় ৫ ঘণ্টা কাজ করার কথা থাকলেও আমি কখনো কখনো ৮/৯ ঘণ্টা কাজ করতে লাগলাম। আর এভাবেই কোঅফ টাইম একমাস শেষ হয়ে কখন ৩১ অক্টোবর এসে গেল টেরই পাইনি।

৩১ অক্টোবর ২০০১ সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা হবে হয়তো, সবাই অফিস থেকে চলে গেছে একমাত্র গ্যারি অর্থাৎ প্রিন্সিপাল ছাড়া; আমি তখনো ফাইল ক্লোজ করে অসমাপ্ত কাজের লিস্ট করে ফাইলের ওপর রেখে কিছুটা বিমর্ষ (লাস্ট ডে অব কোঅপ) হয়ে চলে যাওয়ার জন্য ওঠে দাঁড়িয়েছি ঠিক তখনই গ্যারি তার রুম থেকে বেরিয়ে এসে বল্ল, অসীম ইউ আর হায়ার্ড ফ্রম টুমোরো এস স্টাফ এ্যাকাউন্টেন্ট উইথ সো অ্যান্ড সো ইয়ারলি সেলারি অ্যান্ড পারমানেন্ট ফুলটাইম। আমি তো পড়িমরি করে কী বলবো বুঝে ওঠার আগেই তিনি তার রুমে ঢুকে দরজা টেনে দিলেন। সেই দিন থেকে শুরু হলো আমার কানাডার কর্মজীবন তারপর এক নাগাড়ে ২০ বছর অর্থাৎ ২০২০ সালের ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত একই ফার্মে কাটিয়ে দিয়েছি। যদিও এর মধ্যে বিভিন্ন দিক থেকে অনেক অফার এসেছিল কিন্তু আর কোথাও যাইনি বা যাওয়ার প্রয়োজনও হয়নি। কারণ, পরবর্তী ৯/১০ বছর প্রায় প্রতি বছরই লাফিয়ে লাফিয়ে বেতন বাড়ছিল গড়ে ১০ হাজার ডলার করে সাথে প্রমোশন স্টাফ এ্যাকাউন্টেন্ট থেকে সিনিয়র একাউন্টেন্ট তারপর ম্যানেজার, ম্যানেজার থেকে সিনিয়র ম্যানেজার এবং এক পর্যায়ে ওয়ার্কিং পার্টনার। অন্যদিকে নানারকম মনিটরি ও নন-মনিটরি সুযোগ-সুবিধা তো ছিলই। ইয়র্কে ভর্তি হওয়া, ফুলটাইম কাজ করে সোজা ২৪/৭ লাইব্রেরিতে গিয়ে রাতের পর রাত জেগে এসাইনমেন্ট রেডি করা, সিজিএ কমপ্লিট করা, ২০০২ সালে মে অর্থাৎ এই দেশে আসার ১ বছরের মাথায় কন্ডো নেওয়া, ২০০৩-এ গাড়ি নেওয়া, ২০০৮ সালে প্র্যাকটিস লাইসেন্স নেওয়া, নিজ নামে আলাদা কোম্পানি খোলা প্রায় সবকিছুতেই ফার্মের পজিটিভ ভূমিকা ছিল। আর এভাবেই আমার গল্পটি ফুরালো নটে গাছটি মুড়োলো।

লেখক পরিচিতি
জন্ম চট্টগ্রামে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হিসাববিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর। কর্মজীবন শুরু করেন ১৯৮৬ সালে চার্টার্ড এ্যাকাউন্টেন্সির আর্টিকেল স্টুডেন্ট হিসাবে। ২০০১ সালে কানাডায় স্থায়িভাবে বসবাস শুরু। ২০০৭ সালে সিজিএ ডিগ্রি অর্জন। ২০০১ সাল থেকে অদ্যাবধি ট্যাক্স এবং এ্যাকাউন্টিং-এ প্রফেশনাল সার্ভিস প্রদান। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ম্যাগাজিনে নিয়মিত ছোটগল্প, ভ্রমণ-কাহিনি এবং সমাজ সচেতনামূলক প্রবন্ধ লিখে সুধীমহলে সমাদৃত হয়েছেন।