টরন্টোতে আমার জানা কথা

আসমা অন্বেষা

প্রায় চার বছর অপেক্ষা করার পর কানাডার ইমিগ্রেশনের ভিসা হাতে পেলাম। অজানা ভবিষ্যৎকে সামনে রেখে স্বপ্নের দেশ কানাডার উদ্দেশ্যে রওনা হতে হবে! এমনই কত রকমের দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্যে যখন ভুগছি, ঠিক তখনই আমার চাচাতো বোন এবং তার হাসব্যান্ডের সাথে দেখা হলো বাংলাদেশে। ওরা কানাডাতে থাকেন, তখন তারা দেশে বেড়াতে গিয়েছিলেন। ওরা দুজনেই আমাকে আশ্বাস দিলেন, কানাডাতে পৌঁছানোর পর ওরা দুজনে সব ধরনের সহযোগিতা করবেন আমাকে। আমার বোনের হাসব্যান্ড একটি কথা বলেছিলেন যা আমার আজীবন মনে থাকবে। আপা, “টরন্টোতে আপনাদের পুনর্বাসন সংক্রান্ত সব কাজ আমি করে দেবো। কেবল চাকরিটা আপনাকে খুঁজে নিতে হবে।” ওরা করেছিলেনও তাই। সব রকম সহযোগিতা ওরা করেছেন। ওদের বাসায় মাসখানেক থাকতে হয়েছে আমাদেরকে। খুঁটিনাটি প্রয়োজনীয় সব জিনিসপত্র জোগাড় করা থেকে শুরু করে অনেক কাজ ওরা করে দিয়েছেন। একটি এপার্টমেন্ট খুঁজে আমাকে সেখানে পৌঁছে দিয়েছেন, ফার্নিচার কিনে দিয়েছেন, টিভি, কম্পিউটার, ইন্টারনেট, টেলিফোন ইত্যাদির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। ছোটো বড়ো সব দরকারি জিনিসপত্র কিনে দিয়েছেন, ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করা, ব্যাঙ্ক একাউন্ট খোলা, হেলথ কার্ড, সিন কার্ড, ডলার এক্সচেঞ্জ, চাকরির এজেন্সির সাথে যোগাযোগ করে দেওয়া ইত্যাদি অনেক কাজ। আজও ওদের সাহায্য সহযোগিতার কথা ভুলতে পারি না। অনেক আন্তরিকতার সাথে পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন ওরা। কানাডাতে যারা নতুন এসেছেন বা আসবেন তাদের জন্য এমন দু-একজন সতীর্থ পাশে পেলে জীবন অনেক সহজ হতে পারে।

২.

তখনো জানতাম না যে, চাকরি পাওয়াটাই সবচেয়ে বড়ো ক্রাইসিস কানাডাতে। বুঝতে পারলাম, আমার সাবজেক্টের মধ্যে কোনো চাকরি পেতে হলে আমাকে টরন্টো ছাড়তে হবে। আমি পিএইচ.ডি করেছিলাম ইংল্যান্ড থেকে, এগ্রিকালচার বায়োটেকনোলজিতে। এই বিষয়ের মধ্যে কোনো চাকরি পেতে হলে আমাকে ম্যানিটোবা, এলবার্টা বা সাচকাচুয়ান প্রভিন্সে জব খুঁজতে হবে। আমার এক বাঙালি সহকর্মী আমাকে বলেছিলেন, ম্যানিটোবা থেকে এগ্রিকালচারের ওপরে এক বছরের একটি কোর্স করে নিতে। ট্রেনিং শেষে অনটারিওর বাইরের প্রভিন্সগুলোতে পোস্টিং হয় এদের। আমি তখন তার কথা শুনিনি, কিন্তু আমার সেই সহকর্মী এখন ভ্যাঙ্কুভারে একটি কৃষিভিত্তিক কোম্পানিতে ভালো কাজ করছেন। বুঝে গেলাম, টরন্টোতে থাকতে হলে আমার প্রফেশনের বাইরে জব খুঁজতে হবে। অন্টারিও ছেড়ে অন্য কোনো প্রভিন্সে যাওয়ার সাহস হলো না। অনেক বেশি শীত ওখানে এবং পরিচিত কেউ নেই বলে দ্বিধান্বিত ছিলাম। সেই সময় আমার একজন বান্ধবী বলেছিলেন, ‘দেশ ছাড়তে পেরেছো, টরন্টো ছাড়তে পারবে না?’ সেদিন সাহস করা উচিত ছিল আমার। আসলে তারুণ্যে যে সাহস থাকে, তারুণ্য পেরিয়ে গেলে সেই সাহস আর থাকে না। আমারও আর সাহস হলো না। আমি টরন্টোতেই রয়ে গেলাম।

কানাডাতে আসবার পর কোনো একটি নির্দিষ্ট স্থানে নিজেকে ফিক্স করে ফেলা ঠিক নয়। যেখানে অপরচুনিটি পাওয়া যাবে সেখানেই যেতে হবে– এমন একটি মানসিকতা থাকা উচিত; থাকলে ভালো হয়।  কানাডাতে আসার পর অন্য কোনো একটি স্থানে নিজেকে নতুন করে সেটেল করাটা বড়ো কোনো সমস্যা নয়। আসল সমস্যা হলো, ভালো চাকরি পাওয়া। এটাও যেমন ঠিক, তেমনি আরও একটি অপশন হলো, এদেশে আসবার পর কোনো একটি কোর্স নিয়ে পড়াশোনা করে ফেলা। এতে চাকরি পেতে সুবিধা হয়। বিশেষ করে আপনার সাবজেক্টে যদি এদেশে জব না পাওয়া যায়। এদেশে চুল কাটা থেকে শুরু করে বৌ সাজানোর জন্যও কোর্স করে নিতে হয়। ব্যতিক্রমও আছে। আমার এক আত্মীয়া ইংল্যান্ড থেকে মাইক্রোবায়োলজিতে মাস্টার্স করেছিল। সে এখানে এসে দু’মাসের মধ্যেই ভালো জব পেয়ে যায় রিসার্চ সায়েন্টিটিস্ট হিসেবে। তারপর আরও বেটার জব পাওয়ার জন্য সে এখানে অন লাইনে কয়েকটি কোর্স করে নেয়। পরে আরও ভালো চাকরি পেয়েছে সে। এদেশে এমপ্লয়াররা আপনার রেজুমি বা বায়োডাটা নিয়ে তেমন মাথা ঘামান না। এরা দেখে, আপনি কতটা ভালোভাবে কাজ করতে পারেন বা সার্ভিস দিতে পারবেন। আপনি যদি আপনার রেজুমি অনুযায়ী কাজ করতে না পারেন তাহলেই সমস্যা শুরু হবে।

চাকরি নিয়ে হতাশা যখন কেবল শুরু হয়েছে তখনই তিন মাসের মাথায় আমার এক বান্ধবীর সহযোগিতা পেলাম। তার এক কানাডিয়ান অফিস কলিগের সুপারিশে, মিসিসাগাতে একটি মর্টগেজ কোম্পানিতে চাকরি হলো আমার। মোটামুটি ভালো জব। ফান্ডিং অফিসার হিসেবে কাজ করতে হবে। তিন মাস পরে চাকরি পারমানেন্ট হয়ে গেল। মোটামুটি সম্মানজনক কাজ ছিল। সারাক্ষণই কম্পিউটার নিয়ে কাজ। খারাপ লাগছিল না। টরন্টো থেকে ভোর ৬টায় রওনা হয়ে ৯টার আগে পৌঁছে যেতাম ওখানে। যেতে ২ ঘণ্টা লাগতো আর ফিরে আসতে আড়াই ঘণ্টা লেগে যেত। তবুও কোনো কমপ্লেইন ছিল না আমার। বাস আর ট্রেইন মিলিয়ে চার বার  ট্রান্সপোর্ট চেঞ্জ করতে হতো আসা যাওয়ার পথে। যতটা ক্লান্ত হবো ভেবেছিলাম অতটা ক্লান্তও মনে হতো না নিজেকে। জীবনে একধরনের নিশ্চয়তা চলে এসেছিল। ভাবছিলাম বাসা বদলে মিসিসাগাতে সেটেল করবো। এরই মধ্যে অর্থাৎ এক বছর পরে কোম্পানিতে একটি বিপর্যয় আসলো। কোম্পানিতে ফান্ড-এর ঘাটতি দেখা গেল। ফলে ছাঁটাই শুরু হলো। ছাঁটাই শুরু করলো নতুনদেরকে দিয়ে। আমি নতুন হওয়াতে আমার জবটা চলে গেল। আমি ভেবেছিলাম, আমার কাজ ওরা এতটা পছন্দ করছে, পারমানেন্ট হয়ে গেছি, আমার চাকরি নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না। আমাদের দেশের মতোই এদেশে প্রাইভেট কোম্পানির জব যখন তখন চলে যায়। ব্যাপারটি এমন হতে পারে যে, আপনি বেশ ভালো মুড নিয়ে কাজে গেছেন এবং মন দিয়ে কাজ করছেন। হঠাৎ করে আপনার ডাক পড়লো বসের রুমে। খুব মিষ্টি ভাষায় আপনাকে বলে দেওয়া হলো, “তোমার কাজ আমরা খুব পছন্দ করি। আমরা খুবই চাই তুমি আমাদের সাথে থাকো, কিন্তু আমাদের ফান্ডের অভাবে আর আমরা তোমাকে রাখতে পারছি না। কাল থেকে আর জব থাকছে না। ভবিষ্যতে খোঁজ রাখতে পারো, আমাদের ফান্ডের ব্যবস্থা হলে আমরা তোমাকে পুনরায় বহাল করতে পারবো।” আবার অনিশ্চিত হয়ে গেল জীবন।

৩.

এদেশে এসেই কানাডার আইনগুলো শিখে ফেলতে হবে। কানাডায় এসে প্রথম দিকে একটা ব্যাপার খুব অবাক হয়ে লক্ষ্য করতাম। কোনো একটি রাস্তার ক্রসিং-এর সামনে দাঁড়িয়ে আছি। রেড লাইট জ্বলছে। আশেপাশে বিশেষ কেউ নেই কিন্তু অনিয়ম করে রাস্তা পার হচ্ছেন না কেউ। না গাড়ি, না পথচারী। আমাদের দেশ হলে এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতো হয়তো অনেকেই। পরে জেনেছি, প্রতিটি রাস্তায় ক্রসিং-এ ক্যামেরা বসানো আছে। নিয়ম ভেঙে রাস্তা পার হলে ধরা পড়ার সমূহ সম্ভাবনা। গাড়ির সামনের সিটে বসে তো সিট বেল্ট বাঁধতেই হবে, পিছনের সিটে বসেও সিট বেল্ট বাঁধতে হবে। অবাক হয়েছিলাম যেদিন জেনেছিলাম নিজের বাড়ির বড়ো কোনো গাছ সরকারি অনুমতি ছাড়া কাটা যায় না। নিজে নিজে মাতব্বরি করে নিজের বাড়ির গাছ কাটলে ২০০০ ডলার পর্যন্ত ফাইন হতে পারে। নিজের বাড়ির সামনে ঘাস রেখে দিলে বা বড়ো হতে দিলে ফাইন হবার আশঙ্কা। নিজের বাড়ির সামনের বরফ না কাটলেও সমস্যা হতে পারে। সেই বরফে যদি কেউ পড়ে যেয়ে ব্যথা পায় তাহলে আপনি সমস্যায় পড়বেন নিশ্চিত। বাসে, ট্রেনে টিকিট ফাঁকি দিলে ফাইন অবধারিত। পুকুরে মাছ ধরতে গিয়ে লাইসেন্স না থাকলে সমস্যা। উল্টো পালটা মাছ ধরলেও সমস্যা। রিসাইকেল ব্যাগে গারবেজ দিলে বা গারবেজ ব্যাগে রিসাইকেল আইটেম দিলেও সমস্যা হতে পারে। প্রথম দিকে মনে হতো এত নিয়ম কি মুখস্থ করতে পারবো? সময়ের সাথে সাথে অভ্যাস হয়ে গেছে সব। এখন নিয়মের বাইরে যেতেই অস্বস্তি হয়।

আমার এক জুনিয়র সহকর্মী (বাংলাদেশের সহকর্মী) তড়িঘড়ি করে গাড়ি চালিয়ে চাকরির ইন্টারভিউ দিতে যাচ্ছেন। নতুন এসেছেন। রাস্তা ফাঁকা। ট্রাফিক লাইটে হলুদ আলো জ্বলে ওঠেছে। অপেক্ষা না করে চালিয়ে দিয়েছেন। ভাবছেন কেউ তো দেখেনি। ভাবতে পারেননি ক্যামেরা থাকতে পারে রাস্তার ক্রসিংয়ে। দুদিন পরে চিঠি এসে গেল ফাইনসহ। বিস্তারিত লেখা আছে চিঠিতে, কোথায় এবং কখন ট্রাফিক আইন ভেঙে গাড়ি চালানো হয়েছে। ফাইন না দিয়ে পার পাওয়া যাবে না। এদেশের পুলিশকে কেনা যায় না। কোর্টে হাজিরা দিয়ে ফাইন দিতেই হলো। ফাইন দিতে যেয়ে অন্যায় স্বীকার করে নিলে কম ঝামেলাতে কাজ শেষ করা যাবে। তর্ক করলে মহা ঝামেলায় পড়বেন। ভুল জায়গাতে গাড়ি পার্ক করার জন্য অহরহ টিকিট খাচ্ছেন ইমিগ্রান্টরা এবং কানাডিয়ানরা। এসব টিকিটের ফাইন না দিয়ে পার পাবেন না কেউ। একদিন টরন্টোর মেইন স্টেশনে আমি এবং আমার এক বাঙালি সহকর্মী আমার সাথে হাঁটতে হাঁটতে স্টেশনের বর্ডার লাইন ছেড়ে কয়েক ফুট বাইরে বেরিয়ে এসেছেন। কথা বলতে বলতে ওনাকে নিয়ে কখন এগিয়ে গিয়েছি খেয়াল করিনি। খেয়াল হতেই কয়েক পা পিছিয়ে আবার স্টেশনে ঢুকে পড়লাম। সাথে সাথে কোথা থেকে এক পুলিশ এসে হাজির। এসেই আমাদের টিকিট চেয়ে ফেললো। আমার কাছে মেট্রো পাস ছিল। তখন মাসিক পাস রাখার নিয়ম ছিল। তাই পার পেয়ে গেলাম। সমস্যাতে পড়লেন আমার সহকর্মী। উনি টিকিট কিনে বাসে ওঠেছিলেন। আমরা অনেক করে বোঝাবার চেষ্টা করলাম পুলিশকে যে, উনি নতুন এসেছেন। অনেক নিয়ম-কানুন জানেন না, তাই ভুল করেছেন। কিছুতেই মানলেন না পুলিশ। আমার সহকর্মী ভদ্রলোক ভালো সমস্যায় পড়লেন। কোর্টে হাজিরা দিয়ে ফাইন দিতে হলো। আমাদের দেশে পুলিশ গাড়িকে ধরে, আবার টাকা পেলে ছেড়েও দেয়। এরা জোরালো কারণ না থাকলে কাউকে ধরবে না এবং যখন ধরবে তখন কোনো ভাবেই সেটা থেকে রেহাই পাওয়া যাবে না।

৪.

স্ক্যাম এর ঝামেলাতে পড়েছি অনেকবার। তখন নতুন এসেছি। খুব একটা নতুন অবশ্য নয় তখন। আসার বছর তিনেক পরের কথা। সিটিজেনশিপ-এর জন্য আবেদন করেছি তখন। একদিন একটি ফোন কল এলো। নম্বরটা চেনা নয়। একটি গম্ভীর পুরুষ কণ্ঠ জানালো কানাডা ইমিগ্রেশন থেকে ইমিগ্রেশন অফিসার বলছি। নিজের নাম, আইডি নম্বর বললেন ভদ্রলোক। ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে কর্মব্যস্ত অফিসের বিভিন্ন ধরনের শব্দ শোনা যাচ্ছে। কথা শোনা যাচ্ছে। পুরোপুরি একটি অফিসের পরিবেশ। জানালো, ‘তোমার ইমিগ্রেশন ফাইলে কিছু আপত্তিকর ত্রুটি পাওয়া গেছে, যার কারণে তোমাকে এরেস্ট করতে ইমিগ্রেশন পুলিশ তোমার বাড়িতে যাচ্ছে।‘ আমি জানালাম, আমি তো তেমন কোনো নিয়ম বহির্ভূত কাজ করিনি।‘ জানালো, “তুমি জেনে করনি হয়তো, তোমার অজান্তেই ভুলটা করেছো সম্ভবত।” আমি হতাশ হয়ে বললাম, আমি কী করবো এখন আমার জানা নেই। কুড ইউ প্লিজ হেল্প মি? অচেনা কণ্ঠটি জানালো, “আমাদের ইমিগ্রেশন ল’ইয়ার তোমাকে এই বিপদ থেকে বাঁচার জন্য হেল্প করতে পারে, তোমাকে তার জন্য টাকা খরচ করতে হবে।” জানতে চাইলাম কত টাকা খরচ করতে হবে। জানতে পারলাম ৩০০০ ডলার ওদেরকে দিলে ওরা আমার ফাইল ঠিক করে দেবে। টাকাটা ক্যাশে নেবে ওরা আমার বাসায় এসে। ওরা তিরিশ মিনিটের মধ্যে আসবে টাকা নিতে। আমাকে জানানো হলো, আমি এর মধ্যে কারও সাথে আলাপ করতে পারবো না এ-ব্যাপারে। আমার কাছে পুরো টাকা ছিল না তাই বললাম টাকাটা আমাকে আমার কাজিনের কাছ থেকে নিতে হবে যিনি কাছেই থাকেন। ওরা জানালো, আমি কাজিনকে কিছুই জানাতে পারবো না আগে থেকে। ওরা আমাকে তাদের গাড়িতে করে কাজিনের বাসায় নিয়ে যাবে এবং আমাকে সেখান থেকে টাকাটা নিতে হবে। আমার মেয়ে পাশের রুম থেকে আমাদের কথা কিছুটা শুনেছে এবং আমার ঘরে এসে বাংলায় বলতে লাগলো মা, এরা স্ক্যাম করছে। এদের কথা বিশ্বাস কোরো না। ওরা বুঝতে পারলো আমি অন্য কারও সাথে কথা বলছি। ওরা আমার মেয়ের সাথে কথা বলতে নিষেধ করলো আমাকে। ততক্ষণে আমিও ওদের কথা অবিশ্বাস করতে শুরু করেছি। আমি বললাম, ‘আমার মেয়ের সাথে কথা না বলে আমি কিছুই করবো না।‘ ওরা আমাকে বললো, ‘তাহলে তুমি জেলেই যাও বলে রেগে ফোন রেখে দিলো। আমি সেদিন খুব ভয় পেয়েছিলাম। ওরা ফোন রেখে দেওয়ার পরেও আমার ভয় হচ্ছিলো যে, ওরা আমার ফাইলের ক্ষতি করবে।

এরপরও বহুবার স্ক্যাম হতে হতে বেঁচে গিয়েছি। কখনো সি আর এ সেজে, কখনো ব্যাঙ্কের একাউন্ট হ্যাক করা, ক্রেডিট কার্ড থেকে টাকা তুলে নেওয়ার সময় ভুল তথ্য দিয়ে ব্যাঙ্কের একাউন্ট হ্যাক করা ইত্যাদি। প্রতিবারেই আমার মেয়ে আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। তারপরেও কিন্তু সে নিজেই একবার ৪০০ ডলার দিয়েছে স্ক্যামারদের। ইন্সট্রাগ্রামের স্ক্যামের মাধ্যমে। এখন আর অজানা নম্বর থেকে কোনো ফোন এলে ফোন ধরি না। বাংলাদেশে এই ধরনের স্ক্যামের সাথে পরিচিত ছিলাম না আমরা। উন্নত প্রযুক্তির দেশ। স্ক্যামিংও হয় উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে, যার জন্য মানুষ বেশি প্রস্তুত থাকে না।

৫.

এখানে কিছু সরকারি প্রতিষ্ঠান আছে যারা বিভিন্নভাবে নবাগতদের সহযোগিতা করে থাকে। ডিক্সন হল নামে একটি প্রতিষ্ঠান আমাকে শুরুতে অনেক রকম সহায়তা করেছেন। এদের মাধ্যমে কিছুদিন ভলান্টিয়ার-এর কাজ করেছিলাম। বাঙালিদের এবং চাইনিজদের ইংরেজি শেখাতাম। না, এখানে আমার কোনো চাকরি হয়নি। কিন্তু আমি অনেক রকম লিঙ্ক পেয়েছি অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ করবার জন্য যা পরবর্তীতে অনেক কাজে এসেছে আমার। এরা শুধু ইংরেজি শেখান না, এরা নবাগতদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতাও করেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে কমিউনিকেশন করতে শেখান। এদের মাধ্যমে আপনি হয়তো অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের যোগসূত্র পেয়ে যাবেন যারা আপনার উপকারে আসতে পারে। আমার বেলায় হয়েছিল। আমি অনেক বন্ধুও পেয়েছি এদের মাধ্যমে। এখনো এদের সাহায্য নিয়ে চলেছি। এখানকার কিছু বাঙালি প্রতিষ্ঠানও আছে যারা বিভিন্ন ধরনের সাহায্য করে থাকে।

এদেশে সবাই, সব দেশীয় মানুষ গ্রুপ করে একসাথে থাকে। নিজস্ব একটি কমিউনিটি বানিয়ে থাকে। বাঙালিরা সাদা কানাডিয়ানদের সাথে সহজে মিশতে চায় না। আমি যখন ইংল্যান্ডে ছিলাম উচ্চ শিক্ষার জন্য, তখন ইংরেজরাসহ বিভিন্ন দেশের মানুষের সাথে মিশবার সুযোগ হয়েছে। ইংরেজরা যথেষ্ট ভালো হয়ে থাকে। তেমনি, এদেশেও দেখেছি, জড়তা কাটিয়ে সাদা কানাডিয়ানদের সাথে মিশতে চাইলে কিন্তু মেশা যায়। ওদেরকে আমরা রেসিস্ট বলি। আমরা বাঙালিরাও কম রেসিস্ট নই। সিনিয়র সিটিজেনদের ওপরে একটি সার্ভে করেছিলাম টরন্টোতে। ঐ সময়ে বিভিন্ন ন্যাশনালিটির মানুষের সাথে মিশবার সুযোগ হয়েছে। এদের বেশির ভাগই ছিলেন সাদা কানাডিয়ান। বিভিন্ন লেভেলের সাদা জনগোষ্ঠীর সাথে মিশবার সুযোগ হয়েছিল। যেখানেই কাজ করেছি সাদা কানাডিয়ানদের সহযোগিতা সবচেয়ে ভালো পেয়েছি। অন্য দেশীয়রা সমস্যা করেছে। আমার মনে হয়েছে সাদারা সহনশীল জাতি। এদের ভালোগুলো দেখতে হবে। ওরা আপনার দরজায় নক করবে না, সেই সম্ভাবনা কম। আপনাকেই এগিয়ে আসতে হবে। নক করতে হবে ওদের দরজায়। আপনি বন্ধুত্বের উদ্দেশ্য নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সাহস করে এগোতে পারলে ওরাও মিশতে চেষ্টা করে। ওরা যখন বন্ধু হয়, তখন খুব ভালো বন্ধু হয়। বিভিন্ন প্রফিট এবং নন-প্রফিট প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছি। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজের অভিজ্ঞতা নানান রকমের। বিশেষ খারাপ মানুষ পাইনি তেমন কোথাও। নিজে মানিয়ে নিতে পারলে, তাল মিলিয়ে চলতে পারলে ভালোভাবে কাজ করা যায়। সহযোগিতা পাওয়া যায়। বন্ধুও পাওয়া যায়।

জন্ম ১৯৫৩, পাবনাতে। ১৯৭৮ সনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি লাভের পর ইংল্যান্ডের নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৩ সালে বায়োটেকনোলোজি বিষয়ে পিএইচ.ডি করেন। বিভিন্ন দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক জার্নাল, পুস্তক, সম্মেলন ও রিপোর্টে তার গবেষণার ফলসহ প্রচুর প্রবন্ধ প্রকাশ করেছেন। টরন্টোর বিশেষ বাংলা পত্রিকা ‘বাংলা মেইল’-এ বিভিন্ন বিষয়ে নিয়মিত লিখছেন তিনি।