স্বপ্নের দেশ কানাডায় এসে অনেক আশা নিয়ে থিতু হই শেষে
আশীষ রায়
কানাডা- বর্তমান বিশ্বে অতি আকাঙ্ক্ষিত একটি দেশের নাম। বিশ্বব্যাপী কোনো মোড়লগিরির জন্য নয়; তৈল সম্পদ থাকলেও অনেক দেশের তুলনায় কম; শিল্পোন্নত দেশ, তবে অস্ত্র বানানোর শিল্পে অনেক দেশের চেয়ে পিছনে পড়ে আছে; চোখ ধাঁধানো জৌলুস প্রদর্শনে অনেক পিছনের সারিতে; চাকরি প্রাপ্তির সুযোগের দিক থেকেও খুব উল্লেখযোগ্য নয়- তবুও সারাবিশ্বের অসংখ্য মানুষ কানাডায় আসার জন্য মুখিয়ে থাকে।
কিন্তু কেন? চলুন দেখে নেওয়া যাক- আমার গল্প থেকে এর কোনো সদুত্তর পাওয়া যায় কি না।
২.
মনে পড়ে, প্রথম কানাডার নাম আমি জানতে পারি উচ্চ মাধ্যমিক পড়ার সময় পাঠ্যবই “বাণিজ্যিক ভূগোল” থেকে। কানাডার প্রেইরি অঞ্চলে উৎপাদিত গম এবং নোভাস্কোশিয়ার জেলেদের মৎস্য সম্পদ আহরণ ইত্যাদি পড়তে গিয়েই “কানাডা” তথা উত্তর আমেরিকার এই দেশটির সাথে আমার প্রথম পরিচয়। অনেকেই এই ভেবে হয়তো হাসছেন, এই আধুনিক যুগেও কানাডার নাম জানতে আমার এত সময় লেগেছিল কেন? আমি তাহলে কোথায় জন্মেছিলাম বা বড়ো হয়েছিলাম ?
বর্তমান বাংলাদেশ বা তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের রাজধানীর কাছাকাছি একটি অতিপরিচিত মহাকুমা শহরে আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। প্রায় পাঁচশত পরিবার নিয়ে গঠিত একটি মহল্লায় সর্বসাকুল্যে সাতটি টেলিভিশন সেট, যার মধ্যে ছয়টিরই মালিক ছিলেন অবাঙালিরা, বাড়িতে টেলিফোনের অবস্থাও ছিল অনুল্লেখ্য। দৈনিক সংবাদপত্র মাত্র চার আনায় পাওয়া গেলেও সেটা নিয়মিত কেনার ক্ষমতা অনেকেরই ছিল না। অগত্যা কোনো পাঠাগারের সভ্য হয়ে নিয়মিত সংবাদপত্র পড়া কিংবা পাঠ্যপুস্তকের বাইরে অন্য কোনো বই নিয়ে পড়া ছাড়া দেশ-বিদেশকে জানাজানির বিশেষ কোনো উপায় ছিল না তখন। দেশীয় অথবা আন্তর্দেশীয় যোগাযোগ ব্যবস্থা বলতে- চিঠিপত্র, টেলিফোন, টেলিগ্রাম কিংবা টেলেক্স। সেলফোন, ই-মেইল এগুলো ছিল কল্পনার বাইরে। কম্পিউটারের আবির্ভাব ঘটেছিল, তবে অতিকায় এবং বিরল। তখন অনেকেই কম্পিউটারের নামও জানতেন না, দেখা তো দূরের কথা। ক্লাস রুমে ভূগোলক সামনে রেখে ছাত্রদের ভূগোল শেখানোটাও ছিল শিক্ষকদের চিন্তার বাইরে, তাই কানাডার নাম জানতে, আমাদের সময়ে, অনেকেরই দীর্ঘদিন লেগেছিল। এক সময় ব্রিটিশ শাসিত হওয়ায় ব্রিটেনের নাম আমরা সহজেই জেনেছি, আমেরিকার নাম জানতেও খুব বেশি সময় লাগেনি।
৩.
১৯৯৪ সালের শেষ দিকে, মধ্যপ্রাচ্যে থাকাকালীন আমার এক বন্ধু টেলিফোনে জানতে চান, আমাদের অফিসে দুবাই থেকে প্রকাশিত ‘Khaleej Times’-র ঐদিনের কোনো কপি আছে কি না? নেই বলেই ওর কাছ থেকে কারণটা জানতে চাইলাম। উত্তরে বললো, ইমিগ্রেশনে কীভাবে আবেদন করে কানাডায় যাওয়া যায় সে সম্পর্কে বিস্তারিত ‘Khaleej Times’-এর সেদিনের সংখ্যার সাথে একটি ছোটো পুস্তিকায় দেওয়া আছে। একই পুস্তিকায় কানাডার আবহাওয়া, যোগাযোগব্যবস্থা অভিবাসন সম্পর্কে অনেক প্রয়োজনীয় তথ্য, ইমিগ্রেশনের জন্য আবেদনের ন্যূনতম যোগ্যতা ইত্যাদির উল্লেখ ছিল। মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশেই চাকরির সুবাদে দীর্ঘদিন থাকা গেলেও স্থায়ী অভিবাসনের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় আবেদন করার সিদ্ধান্ত নিই।
কানাডায় বৈধভাবে স্থায়ী বসবাসের জন্য আবেদন করার প্রক্রিয়াটি সম্ভবত, ১৯৯৪ সালে শুরু হয়। বিষয়টি খুব কম লোকই জানতেন, কারণ তখন তো বর্তমান সময়ের মতো ইন্টারনেটের মাধ্যমে জানার সুযোগ ছিল না। তাই বিজ্ঞাপন দেখে একজন বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হই। প্রাথমিকভাবে তিনি আমার শিক্ষাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, বয়স ইত্যাদি বিবেচনা করে আমার পক্ষে আবেদন করতে রাজি হন। প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে স্বাক্ষর করার পর আমার আবেদন দাখিল করা হয় এবং সাত মাসের মধ্যেই ভিসা পেয়ে যাই। এর আগে অবশ্য কানাডার কোন প্রদেশে এবং কোন শহরে যাবো, সেটা ঠিক করে আবেদন পত্রে উল্লেখ করি। পূর্বোল্লিখিত একটি বুকলেটের মাধ্যমেই জানতে পারি, কানাডার সবচেয়ে বড়ো বাণিজ্যিক শহর টরন্টোর নাম। চাকরি করেই জীবিকা নির্বাহ করতে হবে এই ধারণা থেকেই টরন্টোতে আসা স্থির করি। সৌভাগ্যক্রমে এক বন্ধুর মাধ্যমে টরন্টোতে বসবাসরত এক আত্মীয়ের সন্ধান পেয়ে যাই। ওঁদের টেলিফোন নম্বরটাও আমাকে সেই বন্ধুই দেয়। সম্পূর্ণ অপরিচিত দেশে এক আত্মীয়ের খোঁজ পাওয়া নিতান্তই ভাগ্যের ব্যাপার। আগে কখনো না দেখা (অবশ্য সেই ভদ্রলোকের স্ত্রী আমাদের আত্মীয়া এবং আমাদের বিয়েতে উপস্থিত ছিলেন) সেই ভদ্রলোককে একটা বাসা খুঁজে রাখার অনুরোধ জানালে তিনি এবং তাঁর স্ত্রী আন্তরিকভাবেই প্রথমে ওঁদের বাসায় ওঠার আমন্ত্রণ জানান, সেটা পরবর্তীকালে এদেশে থিতু হতে আমাদের অনেক সাহায্য করেছিল।
কানাডা শীত প্রধান দেশ হওয়ায়, দীর্ঘদিন আমাদের প্রচণ্ড গরমের দেশে থাকার অভ্যাস এবং নতুন অভিবাসীর জন্য চাকরি খোঁজার উপযুক্ত সময়ের কথা মাথায় রেখেই মে অথবা জুন মাসে কানাডা যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। আমার পদত্যাগপত্র হাতে নিয়ে কোম্পানির চেয়ারম্যান আমার দিকে সবিস্ময়ে তাকালেন, সেই সাথে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন, আপনি কি জানেন, কানাডায় সহজে চাকরি পাওয়া যায় না? সাথে একথাও যোগ করলেন যে, ওঁর পরিচিত এক ভদ্রলোক কানাডায় এসে কোনো চাকরি না পেয়ে এক বছর পর আবার মধ্যপ্রাচ্যেই ফিরে গেছেন। এক ব্যাংকার বন্ধুর কণ্ঠেও সেই একই কথা প্রতিধ্বনিত হলো। ওঁদের ব্যাংকের এক উচ্চশিক্ষিত কর্মকর্তা কানাডায় এসে ছয় মাস খোঁজাখুজি করে মাত্র একবেলা চাকরি করে আবার সেই ব্যাংকেই ফিরে গেছেন। মনটা খুব উসখুস করলেও দমে যাইনি, কারণ, দীর্ঘদিন মধ্যপ্রাচ্যে বসবাস করলেও সেসব দেশে নাগরিকত্ব পাওয়ার তেমন সুযোগ নেই বলেই আমাকে এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল। যতই দিন ঘনিয়ে আসছিল ওমান ছেড়ে আসার, ততই মনটা ভারাক্রান্ত হচ্ছিল এই ভেবে যে, দীর্ঘদিন সে দেশে থাকাকালীন আমি সংখ্যালঘু একথা একবারও মনে হয়নি। সাধারণ ওমানিরা অত্যন্ত অতিথিপরায়ণ এবং সাম্প্রদায়িকতার বিষ বাষ্প ওঁদের কখনও ছুঁতে পারেনি। ১৯৯২ সালে যখন ভারতে বাবরি মসজিদ ভাঙা হচ্ছিল, তখনও ওঁদের মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখিনি বরং এর প্রতিবাদে আমাদের স্বদেশীয় কিছু মানুষ মিছিল বের করলে, ‘রয়্যাল ওমান পুলিশ’ ওঁদের আটকে দেয় এবং বলে যে এটা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে মোকাবেলা করা হবে। সেদেশে মিছিল নিষিদ্ধ থাকায় এবং সেটা অমান্য করায় নেতৃস্থানীয় কিছু লোককে দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
৪.
নতুন দেশ কেমন হবে, চাকরি-বাকরি যোগাড় করতে পারবো কি না, এত শীত সয়ে কীভাবে সেখানে বেঁচে থাকবো- ইত্যাদি নানা দুশ্চিন্তায় যখন শেষ দিনগুলো কাটছিল, তখনই ওখানে এক বন্ধুর দেখা পাই, যিনি ভিজিট ভিসায় কানাডা এসেছিলেন। ওঁর কাছেই প্রথম কানাডার জীবন-যাত্রার একটা চালচিত্র পাই, যা থেকে চাকরি খোঁজা থেকে শুরু করে সুস্থভাবে শীতকাল কাটানোর সহজ পথ ও পদ্ধতি-সহ বিভিন্ন বিষয়াদির একটা সম্যক ধারণা পেয়ে যাই, ফলে আত্মবিশ্বাসটাও একটু একটু করে বাড়তে থাকে। তারপর সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে মে মাসের শেষ দিকে এক রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে সপরিবারে কানাডার পথে উড়াল দিই।
প্রায় বাইশ ঘণ্টার বিমান ভ্রমণে (দুটি ছোট্ট বিরতির সময়-সহ) আমাদের সূর্যাস্ত দেখতে হয়নি, কারণ, আমরা পূর্ব দিক থেকে পশ্চিম দিকে আসছিলাম। টরন্টো বিমানবন্দরে আমার আত্মীয় সস্ত্রীক, ওঁদের দু’জন শুভানুধ্যায়ীসহ আমাদের স্বাগত জানান এবং আধ ঘণ্টার মধ্যেই ওঁদের বাসায় পৌঁছে যাই। সম্পূর্ণ নতুন দেশে আত্মীয়ের বাসায় এসে ওঠার ফলে অনেক সম্ভাব্য ঝামেলা এড়িয়ে যেতে সক্ষম হই। পরদিন পুরোপুরি বিশ্রাম নিয়ে তৃতীয় দিন থেকেই চাকরি খোঁজার যুদ্ধে নেমে যাই। সেদিন থেকেই ‘Employment News’ এবং সাপ্তাহিক বাংলা পত্রিকা ‘দেশে বিদেশে’তে ছাপা বিভিন্ন রকম বিজ্ঞাপন দেখে পরিকল্পনা সাজাতে থাকি। দেশে এবং মধ্যপ্রাচ্যে থাকাকালীন কোনোদিন টাইপ-রাইটিং শেখার প্রয়োজনীয়তা বোধ করিনি। কিন্তু এখানে এসেই বুঝতে পারি, কম্পিউটার ব্যবহার করতে না জানলে এখানে চাকরি মিলবে না, তাই এখানে পৌঁছানোর তৃতীয় দিনেই মণ্ডল কাকুর ‘Bloor Office Services’ এ ভর্তি হয়ে যাই।
আমাদের দুই সন্তান খুবই ছোটো থাকায়, ওদের দেখাশোনার ভার স্ত্রীর হাতে ছেড়ে দিয়ে পুরোদমে চাকরি খোঁজার কাজে নেমে পড়ি। সেই সময় আমাদের স্বদেশীদের সংখ্যা ছিল খুবই নগণ্য, তাছাড়া ই-মেইল বা ইন্টারনেট ছিল না বললেই চলে। কমিউনিটির লোকদের সাথে যোগাযোগের সুযোগও কম ছিল। আর তাই চাকরি খোঁজার জন্য উপযুক্ত দুই প্রধান সংবাদপত্র ‘Toronto Star’ কিংবা ‘Globe And Mail’-এর নাম জানতেও আমার কয়েক সপ্তাহ লেগে গিয়েছিল। চাকরি খুঁজতে সাহায্য করার জন্য এবং কানাডায় দক্ষতার উন্নয়নের মাধ্যমে নিজেকে চাকরির যোগ্য প্রার্থী তৈরি করতে সরকারি সাহায্যকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও ছিল নিতান্তই কম। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, এরকম একটি প্রতিষ্ঠানে আমার নাম নথিভুক্ত করতে প্রায় তিন মাস অপেক্ষা করতে হয়েছে। কারণ, তখন এইসব প্রতিষ্ঠানে দু’মাসেরও বেশি গ্রীষ্মকালীন ছুটি থাকতো, যা এখন আর নেই। এসময় বাসা খুঁজতে গিয়ে পরিচিত হই এক স্বদেশি প্রকৌশলী ভাইয়ের সাথে যিনি চাকরি খোঁজার প্রক্রিয়া সম্পর্কে আমাকে মোটামুটি একটা ধারণা দিয়ে ‘Skills for Change’-এর ঠিকানা দিয়ে যোগাযোগ করতে বললেন। আমাকে আরো একটু সাহায্যের উদ্দেশ্যে নিজের স্ত্রী’র রেজুমি আমাকে দিলেন এবং বললেন এখানে ‘রেজুমি’ লেখার ধরন আলাদা, দেশি স্টাইল এখানে চলবে না। এখানে ইন্টারভিউর স্টাইলও আলাদা বলে আমাকে সেটা রপ্ত করে নেওয়ার উপদেশ দিলেন। সহৃদয় এই ভাইয়ের কথা আজও কৃতজ্ঞচিত্তে মনে করি, যখন অফিসে চাকরি খোঁজার ব্যাপার নিয়ে আমাকে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করার দিনগুলো মনে পড়ে। অফিসে চাকরি খুঁজছি শুনে অনেকে মুখ টিপে হাসতেন, আড়ালে নানারকম মন্তব্য করতেন, যা পরে আমি জানতে পারি আর নীরবে সহ্য করি। মনকে বোঝাই- সময়ই এর জবাব দেবে।
৫.
আমার নিজ পেশায় চাকরি পাওয়ার আগ পর্যন্ত বিভিন্ন রকম খণ্ডকালীন চাকরি করেছি এমনকি বিভিন্ন মলে দাঁড়িয়ে ক্রেডিট কার্ড বিক্রি করেছি। তখনই একদিন ভিন্ন রকম অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হই। এক অহংকারী যুবক কথার ফাঁকে আমাকে তাচ্ছিল্যের সুরে জিজ্ঞেস করে, ঘণ্টায় কত ডলার পাও? সহ্য করতে না পেরে প্রত্যুত্তরে বলি, জীবিকার প্রয়োজনে এখানে দাঁড়িয়েছি বলে তুমি আমাকে একথা বলতে পারলে, যোগ্যতার বিচার করতে গেলে আমি তোমার চেয়ে কোনো অংশেই কম হবো বলে মনে হয় না, যদিও ওঁর যোগ্যতা সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা ছিল না। ধরে নিয়েছিলাম সত্যিকারের শিক্ষিত লোক এমন কথা বলতেই পারেন না। প্রমাণটাও পেলাম কয়েকদিন পর। এক ভদ্রলোক আমার কাছে একটা ফরম চাইলেন অত্যন্ত বিনীতভাবে। ফরমটা পূরণ করে আমার হাতে দেওয়ার পর লক্ষ্য করলাম উনি টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক। আমার তখনকার অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে ভদ্রলোকের আন্তরিক এবং মার্জিত ব্যবহার ওঁর প্রতি আমাকে শ্রদ্ধাবনত হতে বাধ্য করল, স্মরণ করিয়ে দিলো, বাংলা প্রবচনের একটা লাইন ‘খালি কলস বাজে বেশি’। কানাডার একটা নামী প্রতিষ্ঠানের কোর্স সম্পন্ন করে পরীক্ষা দিয়ে পাস করার পর ওখানেই আমার ইন্টারভিউয়ের জন্য ডাক পড়ে। ইন্টারভিউ বোর্ডের এক সদস্য প্রথমেই আমাকে প্রশ্ন করে বসলেন, “আপনার কোনো কানাডিয়ান কোম্পানিতে চাকরি করার অভিজ্ঞতাই নেই, তাহলে আমরা কীভাবে আপনাকে নেবো?” প্রত্যুত্তরে আমি বলি, একথার ভিত্তিতে কেউ যদি আমাকে নিয়োগ না দেয়, তাহলে কানাডিয়ান অভিজ্ঞতাটা আমি কী করে অর্জন করবো? ভদ্রলোকের সহাস্য উত্তর, তাহলে সুযোগটা আমাদের দিতে বলছেন? যাই হোক, পরবর্তী কালে এখানেই কয়েক মাসের সুযোগের চাকরিটা আমি পেয়েছি, পরের বছরও নির্দিষ্ট কোর্স করে কয়েক মাসের জন্য ওখানে আবারও চাকরি করেছি অবশ্য।
এর পরের বছর আমার পেশার সাথে সম্পর্কিত চাকরি পেয়ে যাওয়ায় ওখানে আমাকে আর যেতে হয়নি। একই কোম্পানিতে চাকরি করার সময়ে আমাকে আরও একটা অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয়। ট্যাক্স রিটার্ন তৈরি করার পর এক সহৃদয় গ্রাহক আমাকে কফি খাওয়ার জন্য টিপ্স দিতে চাইলে সবিনয়ে তা প্রত্যাখ্যান করি এই ভেবে যে জীবনে সব সময় টিপ্স দিয়ে এসেছি, কখনও নিইনি। ভদ্রলোক আমার এই প্রত্যাখ্যানটি কীভাবে নিয়েছেন আজও জানি না, তবে সুপারভাইজারকে কথাটা বলতেই উনি টিপ্স নেওয়ার পক্ষেই যুক্তি দিলেন। বললেন, এখানে ডলারের অংকটা বড়ো নয়, এখানে গ্রাহকের সন্তুষ্টিটাই বড়ো। সেদিন নতুন কিছু শেখা হলো, তবে পরবর্তীতে আর কোনো দিন এই রকম অবস্থার মোকাবেলা করতে হয়নি।
৬.
এখানে নতুন অভিবাসীদের চাকরি পাওয়ার জন্য যোগ্যতা ছাড়াও আরও অনেক কিছুর সাথে খাপ খাইয়ে নিতে হতে পারে- যেটার সম্মুখীন আমাকে হতে হয়েছিল; চাকরি পাওয়ার জন্য অনেকটা মরিয়া হয়ে ওঠা। ক্রেডিট কার্ড বিক্রি করে এমন একটি কোম্পানির চাকরির জন্য আমি আমার ‘জীবন-বৃত্তান্ত’ নিয়ে ওঁদের অফিসে যাই। এ ব্যাপারে খোঁজ নিতে গেলে আমাকে বলা হয় “টরন্টোতে এমন কোনো পদ খালি নেই”। প্রত্যুত্তরে আমি বলি, “আমাকে যেখানেই পাঠাবেন, আমি সেখানে যেতেই রাজি।” কর্মকর্তা তখন বলেন, ঠিক আছে, তাহলে রেজুমিটা রেখে যান। দেখছি কী করা যায়। পরদিনই সেই কর্মকর্তার টেলিফোন পেলাম, প্রাথমিক কিছু আলোচনার পর আমাকে পরদিনই যোগদানের নির্দেশ দিলেন এবং সেটা টরন্টোতেই ছিল। আসলে টরন্টোতে তখন পদ খালিই ছিল, তবে নিয়োগকর্তার প্রতিনিধি আমাকে পরীক্ষা করে দেখেছিলেন, সত্যিই আমি সে পদে চাকরি করতে উদগ্রীব ছিলাম কি না। এই চাকরিটা আমাকে পরবর্তী ধাপে পৌঁছাতে অনেক সাহায্য করেছিল। কেননা, এখানে কাজের সময়ের বিভিন্নতা ছিল, যা থেকে আমি একটা বেছে নিয়ে বাকি সময়টুকু পড়াশোনা অথবা কাঙ্ক্ষিত চাকরি খোঁজায় সময় দিতে পেরেছিলাম।
কানাডায় কাজের অভিজ্ঞতা ছাড়া কোনো নিয়োগকর্তা কাউকে নিয়োগ দিতে চান না, অথচ কেউ নিয়োগ দিতে না চাইলে, কানাডিয়ান অভিজ্ঞতা কোথায় পাবো? এ যেন ‘ডিম আগে না মুরগি আগে’র অবস্থা। সমাধানটা এলো কানাডীয় সরকারের কিছু সাহায্যপুষ্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে একটাতে ওদেরই পরিচালিত CO-OP Program-এ ভর্তি হলাম, সেখানে প্রায় পাঁচ মাসের কোর্সে প্রথম পাঁচ বা ছয় সপ্তাহ সঠিকভাবে রেজুমি লেখার কলা-কৌশল এবং কীভাবে “ইন্টারভিউ” সফলভাবে মোকাবেলা করতে হয়, তা হাতে-কলমে শেখানো হয়। পরবর্তী তেরো সপ্তাহ কানাডায় কাজ করার বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং নিয়োগসংক্রান্ত অন্য গুণাবলির উন্নয়নের জন্য একটি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেওয়া হয়, তবে সেটা বিনা বেতনে অর্থাৎ স্বেচ্ছাশ্রমে। অবশ্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নিয়োগকর্তা কর্মস্থলে যাতায়াতের ভাড়াটা বহন করেছে। প্রথম CO-OP Program-এ আমি ভর্তি হই “Skills for Change”-এ। প্রথম ধাপের পঞ্চম সপ্তাহের শেষ দিকে হঠাৎ একদিন দেখি ক্লাসের অর্ধেকের বেশি ছাত্র-ছাত্রী উধাও। পরদিন সকালে জানতে পারি, ওঁরা “Placement”-এর জন্য বিভিন্ন অফিসে গিয়েছিল, অথচ কেউ আমাদের জানানোরও প্রয়োজন বোধ করেনি, একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারি এই আশঙ্কায়। জেনে কষ্ট পেলাম, তবে অবাক হইনি। সত্যিই তো প্রতিদ্বন্দ্বীর সংখ্যা যত বাড়বে, ‘Program’-এ সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনাও তত কমবে। এরপর আরও এক জায়গায় আমাকে ‘Placement’ দেওয়া হয়নি এই যুক্তিতে যে আমার যোগ্যতা ও দক্ষতা চাকরি পাওয়ার অনুকূলে ছিল; সুতরাং স্বেচ্ছাশ্রমের পরিবর্তে আমাকে চাকরি খোঁজার উপদেশ দেওয়া হলো, ভদ্র মহিলা ভুলে গেলেন যে তখন পর্যন্ত আমার পেশা সম্পর্কিত কানাডিয়ান অভিজ্ঞতা নেই। আরও একটা সুযোগ হারালাম, তবে দমে যাইনি। আবার চাকরি খোঁজা শুরু হলো।
পাশাপাশি নতুন কোনো জায়গায় ‘CO-OP Program’-এর চেষ্টাও চলতে থাকলো। কয়েকমাস পর সেটা পেয়েও গেলাম, ‘Yorkdale Adult Learning Centre’-এ, আবার সেই রেজুমি লেখা থেকে শুরু করে, ইন্টারভিউ মোকাবেলা করার দক্ষতা বৃদ্ধি ইত্যাদি শেষে আমাকে Placement-এর জন্য একটা অফিসে পাঠানো হলো। জীবনে প্রথম একটা বসত বাড়িতে অফিস দেখে আমার তো আক্কেলগুড়ুম। ক্লাসে ফিরে এসে শিক্ষককে আমার আপত্তির কারণটা জানালাম। ব্রাজিল থেকে অভিবাসী হয়ে আসা দূরদর্শী সেই শিক্ষক আমাকে বোঝালেন, “ভালো চাকরি পেতে হলে তোমার অন্তত দুই বছরের কানাডীয় অভিজ্ঞতা থাকতে হবে, তোমার সম্পর্কে ভালো জানেন এমন একজনের সুপারিশও লাগবে। সুতরাং অফিস বাড়িতে, নাকি অন্য কোথাও, সেটা নিয়ে তোমার কোনো মাথাব্যথা থাকা উচিত নয়।” সৌভাগ্যবশত, সেদিন সেই শিক্ষকের উপদেশে ছোট্ট একাউন্টিং ফার্মটায় যোগ দিই। ক’দিনের মধ্যেই পুরস্কারও মেলে। মাত্র পাঁচ সপ্তাহ পরে আমাদের কয়েকজনকে Vaughan-এ নতুন অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়, যেটা মালিক আগেই ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন, কিন্তু আমাদের জানাননি। যাই হোক, এর আট সপ্তাহ পরে আমাদের CO-OP Program শেষ হয়ে গেল এবং মালিকের প্রস্তাবিত বেতনে সেখানেই চাকরি শুরু করি। বেতন নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য করার সুযোগ ছিল না, কারণ সেক্ষেত্রে চাকরিটাই না-ও পেতে পারতাম। কমপক্ষে দুই বছর কানাডীয় অভিজ্ঞতা অর্জনের লক্ষ্যে বেশ আন্তরিকভাবেই কাজ করতে লাগলাম। এভাবে চাকরির মেয়াদ দুই বছর পূর্ণ হওয়ার কয়েক মাস আগে থেকেই নতুন চাকরি খোঁজা শুরু করলাম এবং মাস কয়েকের মধ্যেই একটা IT কোম্পানিতে আমার কাঙ্ক্ষিত চাকরি পেয়ে গেলাম।
‘Start up’ কোম্পানিতে প্রথম দিকে তেমন সুযোগ-সুবিধা না থাকলেও পরবর্তীকালে কোম্পানির উন্নতির সাথে সাথে আমার আর্থিক এবং পদগত উন্নতিও হলো। প্রায় ষোলো বছর এই কোম্পানিতে ছিলাম, যেটা আমার জীবনের সবচেয়ে ভালো এবং দীর্ঘতম সময়ের চাকরি ছিল। সবিস্তারে এত কিছু লিখলাম যাতে কানাডায় নতুন অভিবাসী হয়ে আসা আমার ছোটো ভাই-বোনেরা প্রথমেই হতোদ্যম না হয়ে পড়েন। লক্ষ্য স্থির রেখে নিরন্তর চেষ্টা করে গেলে সাফল্য এক সময় আসবেই। আমার সমসাময়িক যাঁরা অভিবাসী হয়ে এদেশে এসেছেন, তাদের বেশির ভাগই সাফল্য পেয়েছেন। হাতে গোনা দু’চারজন হয়তো পাননি, তবে সেটা তাঁদের চেষ্টার ত্রুটি নয় বরং ভাগ্যের পরিহাস। নিন্দুক বা ঈর্ষাপরায়ণ মানুষেরা সব সময়ই ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। তাই বলে দমে গেলে চলবে না। সময়ই তাঁদের দম্ভ, নিন্দা কিংবা ব্যাঙ্গোক্তির জবাব দিয়ে দেবে।
৭.
ইতোমধ্যে যাঁরা নতুন অভিবাসী হয়ে কানাডায় এসেছেন কিংবা ভবিষ্যতে আসার পরিকল্পনা করছেন, তাঁদের জন্য আমার এই বার্তা যে, এখানে এসেই পারিপার্শ্বিক অনেক কিছু দেখে হতোদ্যম হয়ে পড়া চলবে না। অন্য অনেকেই পারেনি বলে আপনিও পারবেন না- কথাটি মাথা থেকে বিদায় দিতে হবে। এখানে আসার পাঁচ মাস পর আমি নিজেই একবার ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। পরে অবশ্য এক গুরুজনের উপদেশে মনোবল ফিরে পাই এবং নতুন উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়ি। এখানে এসেই আপনার কী কাজ করার দক্ষতা সবচেয়ে বেশি সেটার ওপর গুরুত্ব দিয়ে এটাকে আরও উন্নত করা যায় কি না, করা গেলে কীভাবে এগোতে হবে- সেটা আপনাকেই ঠিক করতে হবে। এখানে শিক্ষাগত যোগ্যতার চেয়ে কাজ করার দক্ষতাকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
এখানে প্রায় পঁচিশ বছরের চাকরি জীবনে কোনো নিয়োগকর্তাই আমার শিক্ষাগত যোগ্যতার সার্টিফিকেট দেখতে চাননি। কারণ, ওঁরা জানতেন যে কাজটা আমি করতে না পারলে নিজেই চাকরি ছেড়ে পালাবো অথবা ওঁদের হাতে, আমার দাবি করা দক্ষতার ঘাটতি ধরা পড়ে গেলে সেদিনই পত্রপাঠ বিদায় নিতে হবে। যেকোনো পেশায়, সম্পর্কিত কোনো ছোটো-খাটো কোর্স কিংবা জ্ঞান ও দক্ষতার হাল-নাগাদ করে নেওয়া জরুরি যা শুধু চাকরির উন্নতির জন্যই নয় বরং চাকরি টিকিয়ে রাখার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া অনেকেই চাকরি না খুঁজে নিজের পেশার সাথে সম্পর্কিত ছোটো-খাটো কোনো ব্যবসা বা স্বনিয়োগের (Self Employment) দিকে ঝুঁকে ভালোই করছেন বলা যায়।
দীর্ঘ দিন এদেশে থাকার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি যে, আসার কয়েকমাস পরেই আমার ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্তটা হতো আত্মঘাতী। নাগরিক সুযোগ-সুবিধা, আইনের শাসন, সামাজিক নিরাপত্তা, স্থানীয়দের আমাদের প্রতি আচরণ ইত্যাদি মিলিয়ে কানাডা সত্যিই সুন্দরভাবে বসবাসযোগ্য একটি দেশ। সরকার চাকরি প্রার্থীদের হয়তো সরাসরি চাকরি দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারে না, কিন্তু চাকরি পাওয়ার জন্য যতরকম সাহায্য দরকার, সবকিছুরই ব্যবস্থা করে রেখেছেন। তাছাড়া নিজস্ব সংস্কৃতি, কৃষ্টি, সামাজিক মূল্যবোধ এগুলো, যেন নতুন অভিবাসীরা হারিয়ে না ফেলেন সে ব্যাপারেও সরকার সজাগ এবং স্বেচ্ছাশ্রম-সহ নানা রকম কমিউনিটি প্রোগ্রামের জন্যও ওঁরা উদারহস্ত।
লেখক পরিচিতি
হিসাববিজ্ঞানের ছাত্র এই লেখকের সাহিত্যের প্রতিও দুর্বলতা ছিল সেই কিশোর বয়স থেকেই, কিন্তু কিছুটা সদিচ্ছার অভাব এবং কিছুটা সুযোগের অভাবে সাহিত্য চর্চা তেমন হয়ে ওঠেনি। তবে কানাডায় আসার বেশ কিছুদিন পর কিছু গুণী সাহিত্যিকের সান্নিধ্যে এসে ম্যাগাজিনে সমালোচনাপূর্ণ অথচ কৌতুক মেশানো নিবন্ধ লিখা শুরু হয় যা আজও চলছে।

