ও কানাডা!

রঞ্জনা ব্যানার্জী

নিউ ইয়র্ক ছেড়ে কানাডায় আসাটা একেবারে হঠাৎ করেই ঘটেছিল আমাদের জীবনে। তার আগের তিন বছর রোড আইল্যান্ডে কাটিয়েছি। সেখানকার ছবির মতো শহর কিংস্টনে থাকতাম আমরা। রোড আইল্যান্ডে থাকার সময় একবার দুর্গা পুজোয় আমরা বেড়াতে এসেছিলাম নিউ ইয়র্কে। কোনো এক বাংলাদেশি পুজো মণ্ডপে গায়ে গা ঠেকানো ভিড়ে বসে গান শুনতে শুনতে মনে হয়েছিল, এই হুল্লোড়ের শহর আমার নয়।

কিন্তু জীবনের প্রয়োজনে কিংস্টন থেকে পাততাড়ি গোটাতে হয়েছিল আমাদের এবং পরবর্তীকালে নিউ ইয়র্কে থাকাকালীন সময়ে প্রতিদিনই এই শহর ছাড়ার প্রত্যয় নিয়েই আমি দিন কাটিয়েছি। চাইলেই সব কি মেলে? মিলেছিল। তবে দুই বছর পার করতে হয়েছিল সেই মাহেন্দ্রক্ষণের দেখা পেতে। প্রিন্স এডওয়ার্ড আইল্যান্ডে আমার বর সুব্রত এসেছিল একটা সেমিনারে। সেখানেই হঠাৎ করেই চাকরির প্রস্তাব পেয়েছিল সে। সুব্রত ফোনে এই খবর জানাতেই আমি পারলে তক্ষুণি ছুট লাগাই। জীবন ধারণের খরচা কেমন, চাকরির ইন্স্যুরেন্স কেমন, এসব কিচ্ছু জানার আগ্রহ ছিল না আমার। আইল্যান্ড শুনেই আমি ফিদা।

আমাদের পিআর কার্ড হয়ে গিয়েছিল বছরখানেক আগে। হ্যামিলটনে ম্যাকমাস্টারে তখন আমার মাসতুতো ভাই বাসব পিএইচ.ডি করছে। ওর শহরে এসে ঘুরে গিয়েছিলাম পিআর কার্ডের ছুতোয়। সেই সময়ে নায়েগ্রা ফলস দেখেও আমার কন্যার মন ওঠেনি। গুয়েলফেও গিয়েছিলাম সুব্রতর ছেলেবেলার বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে। সেখানে কানাডার নাম করা বইয়ের দোকান চ্যাপ্টারে ঢুকেই আমার মেয়ে বারন্স এন্ড নোবেলের বিশাল সংগ্রহের সঙ্গে তুলনা দিয়ে মাথা নেড়ে বলেছিল- বেড়াতে এলে ঠিক আছে, তবে থাকার জন্যে কানাডা? ইম্পসিবল। আমার যে ছেলে নিউ ইয়র্কের প্রি-স্কুলে যেতে চাইতো না একসময় সে-ও গুয়েলফের রাস্তায় ঘুরতে ঘুরতে রায় দিয়েছিল- দিস ইস টু কোয়ায়েট ফর আ সিটি।

সেইদিন বাচ্চারা বাড়ি ফিরলে ওদের বাবা ভিডিও কলে ডাউন টাউনের সাজানো গোছানো ছবি দেখালো। দুজনেই বেশ ওয়াও! সো প্রিটি! বলে বাবাকে তাদের মুগ্ধতা জানিয়েছিল। কিন্তু যেই না বাবা বললো, আমরা এই সুন্দর শহরে থাকব ঠিক করেছি, অমনি দুজনই সমস্বরে তীব্র প্রতিবাদ করে উঠল- নো ওয়ে। বুঝলাম ওদের রাজি করাতে শ্রম দিতে হবে।

আমার অবশ্য একটা দুর্ভাবনা ছিল কন্যাকে নিয়ে। ও তখন গ্রেড সিক্সে। আমেরিকায় মিডল স্কুল শুরু হয় গ্রেড সিক্স থেকে অন্যদিকে কানাডায় গ্রেড সেভেনে। বয়ঃসন্ধির নাজুক সময় এটি। তার মধ্যে নতুন দেশে ফের নতুন করে অভিযোজনের সংগ্রাম বাবা-মায়ের জন্যে কতটা দুশ্চিন্তার সেই বয়সী বাচ্চার অভিভাবকমাত্রই তা জানেন।
আমেরিকায় আমরা অ্যাপার্টমেন্টেই থেকেছি সবসময়। আমার চঞ্চল ছেলেকে সাতটার পরে পা মাথায় করে হাঁটার মতো নিঃশব্দে হাঁটতে বাধ্য করেছি। ঘরের ভিতরে বল ছোড়াছুড়ি? নৈব নৈব চ। খানিক ভেবে বাচ্চাদের মন জেতার জন্যে বলেছিলাম, কানাডা গেলে আমরা আর অ্যাপার্টমেন্টে থাকবো না, বাড়িতে থাকবো। ভাড়া বাড়িতে ওঠবো আগে, এরপর নিজেদের বাড়ি কিনবো। ছেলেকে বললাম, বাড়িতেই বাস্কেটবলের নেট লাগাবো, তোমার প্র্যাক্টিসের জন্যে কোর্টে যেতে হবে না। ছেলে খুশিতে আটখানা। কিন্তু মেয়ে অতো সহজে মানলো না। নিয়তি যদি পি ই আই-কে আমাদের গন্তব্য ঠিক করে থাকে তবে সকল মুশকিলের সমাধানও তারই জোগানোর কথা। আমি নিয়তির পরিচারক হয়ে পিইআই-এর দর্শনীয় জায়গাগুলো স্ক্রল করে দেখাতে থাকলাম ওদের। মেয়ে লম্বা মুখ করে বসে থাকে পাশে। আড়চোখে তাকাচ্ছে মাঝে মাঝে, বুঝতে পারলেও বুঝতে দিই না। অ্যাভনলিয়া ভিলেজের পরেই আসে পিনাফোরের নিচে লম্বা গাউন পরা কমলা বিনুনীর কিশোরীর ছবি। নিচে লেখা, ‘অ্যান অব গ্রিন গেবেলস’। সুন্দর ছবি। চারপাশে বেগুনি পিটুনিয়ার ঝোপ, সামনে বিস্তীর্ণ মাঠ নীল আকাশ ছুঁয়ে আছে। তার মাঝে ঘোড়ার ঘের আর সেই ঘেরের কাঠের বেড়ায় হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কিশোরী। মগজে কিছু খেলেনি আমার। মেয়ে হঠাৎ ওঠে আমাকে সরিয়ে ল্যাপটপে জুম করে দেখে সেই ছবি। ‘অ্যান উইথ এনই’- প্রায় চেঁচিয়ে বলে সে! আমিও চোখ বড়ো বড়ো করে দেখি, গ্রিন গেবেলসের সেই অ্যানকে, যার নামের বানানে অতিরিক্ত একটি ‘ই’ তাকে নামের মতোই বিশেষ করেছিল। আমার মেয়ের মুখে হাসি ফোটে অবশেষে। আমরা এখানে প্রতি উইক-এন্ডে চলে যাবো, বলে সে। নিশ্চয়, আমি সায় দিলাম সাত-পাঁচ না ভেবেই।

২.

একটু পিছিয়ে গিয়ে, খানিকটা বলি এই অ্যান কাহিনি। রোড আইল্যান্ডে থাকার সময় ওর জন্মদিনে দুটো বই উপহার পেয়েছিল কারও কাছ থেকে। বই দুটির একটি ছিল ‘অ্যান অব গ্রিন গেবেলস’, অন্যটি ‘থ্রি উইমেন’। দুটো বই-ই অসাধারণ কিন্তু লুসি মড মন্টগোমারির লেখা ‘অ্যান অফ গ্রিন গেবেলস’ ওকে টেনেছিল বেশি এবং অ্যান সিরিজের বেশ কটি বই ওর পড়াও হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীকালে ‘হ্যারি পটার’-এর আগমনে অ্যান সিরিজের সঙ্গে আমার মেয়ের বিচ্ছেদ ঘটেছিল। কিন্তু সেই বিকেলে ল্যাপটপে গ্রিন গেবেলসের ছবি দেখে সে এতটাই আপ্লুত হয় যে, সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়- কানাডা গিয়ে অ্যান সিরিজের সব ক’টা বই সে পড়ে ফেলবে। এরপরেই মেঘ না চাইতে জলের মতোই সহজ হয়ে গিয়েছিল বাকি সবকিছু। ঠিক হয় আমরা স্কুল ইয়ার নিউ ইয়র্কে নয়, শেষ করবো কানাডায়। তাতে করে কিছু নতুন বন্ধু হবে ওর ফলে মিডল স্কুলের ট্রান্জিশনও সহজ হবে। আমার মেয়ে আনমনা কিছুটা হয় কিন্তু ওর দিকে তাকিয়ে আমার প্রত্যয় হয়েছিল- সে যেখানেই যাক, ঠিক মানিয়ে নেবে এবং নিজ গুণেই দ্যুতি ছড়াবে।

অতঃপর ২০০৮ সালের মে মাসের শেষ দিকে, গাড়ি চালিয়ে আমরা নিউ ইয়র্ক থেকে কোনো এক শনিবার ভোরে যাত্রা শুরু করি। বর্ডারে এক রাত বিরতি নিয়ে রোববার সন্ধ্যা নামার পরে আট মাইল দীর্ঘ কনফেডারেশন ব্রিজ পার হই এবং পিইআই পৌঁছাই। আমাদের নতুন বাড়ির ড্রাইভ-ওয়েতে গাড়ি ঢুকতেই সকলের মন ভালো হয়ে যায়। এই বাড়ি আমাদের হয়ে ভাড়া করেছিল সুব্রতর অফিসের একজন। আমাকে ভিডিও কলে দেখানো হয়েছিল বাড়ি। সামনে-পিছনে বড়ো উঠোন। বড়ো বড়ো বার্চ গাছ পাহারাদারের মতো দাঁড়িয়ে আছে ইতিউতি আর পিছনে ফুলের বাগান। অবশ্য ফুলের শোভা চাক্ষুষ করতে আমাদের আরও দুই মাস অপেক্ষা করতে হয়েছিল। ঘরে ঢুকে জরিপ করি ঘরবাড়ির হালচাল। রান্নাঘর খানিক অপরিসর কিন্তু জানালার কাছে দাঁড়াতেই অদূরে নর্থ নদীর রুপোলি জল ঝিকমিকিয়ে ওঠে যেন সম্ভাষণ জানায় আমাকে। এটা আমার বাড়তি পাওয়া। আমার একটাই আবদার ছিল, নদীর কাছাকাছি বাড়ি।

পরদিনই স্কুলে নিয়ে গিয়েছিলাম বাচ্চাদের। ওয়েস্ট কেন্ট এলিমেন্টারি স্কুল। রোড আইল্যান্ডে আমার মেয়ের স্কুলের নাম ছিল ওয়েস্ট কিংস্টন এলিমেন্টারি। নামের মিল কাকতালীয়ই। স্কুলের প্রিন্সিপ্যালের নাম রস ম্যাকডেরমট। কফির কাপ হাতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে বাস কিংবা গাড়ি বা হেঁটে আসা সবক’টা বাচ্চার নাম ধরে ধরে সুপ্রভাত জানাচ্ছিলেন। আমার দুই বাচ্চাকেও পরিষ্কার উচ্চারণে নাম ধরে স্বাগতম জানালেন তিনি। আমরা নিউ ইয়র্ক থেকেই তাঁর সঙ্গে কথা বলে ঠিক করেছিলাম দিন-তারিখ। বাচ্চাদের নামের উচ্চারণ জেনে নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু এতটা উষ্ণ অভ্যর্থনা পাবে ওদের মাথাতেই আসেনি। সেই প্রথম দিনের ক্লাসেই বাচ্চারা ওদের ওয়েলকাম কার্ড দিলো। বাচ্চাদের খুশি মুখ দেখে মনে হলো, এই শহর যেন আমাদের প্রতীক্ষাতেই ছিল।
এই ধারণা ক্রমশ পোক্ত হয়েছিল নানা ঘটনায়।

৩.

বাঙালি অভিবাসীদের খোঁজ শুরু করিনি তখনও। আমাদের পাশের বাড়িতেই থাকতেন সস্ত্রীক ব্যারিস্টার জিম ম্যাকনট। জিম কেবল ওকালতি নয়, পিইআই-এর স্থাপত্য নিয়ে বেশ ক’টি বই লিখেছেন। এইসব অবশ্য জেনেছি আরও পরে। কিন্তু তিনি যে ভালো প্রতিবেশী, সেটি জেনেছিলাম এখানে আসার পরপরই। সেই রাতে ঝড়ের পূর্বাভাস ছিল, বিকেলে জিম বাড়ি এলেন। বাড়িতে শুকনো খাবার, টিনের খাবারের মজুদ আছে কি না খবর নিলেন। মোমবাতি, ফ্ল্যাশ লাইট এবং ফোনে চার্জ দেওয়ার কথা মনে করিয়ে গেলেন। এই ঘটনার তিন চারদিন পরেই জিম আমাদের চায়ের নিমন্ত্রণে ডেকেছিলেন। পাড়ার অনেকে উপস্থিত ছিল সেই পার্টিতে। জেনেছিলাম, প্রতিবেশীদের সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্যেই ছিল এই আয়োজন।

আমরা যে বাড়িভাড়া নিয়েছিলাম সেটি বিক্রি হতে পারে জেনেছিলাম ভাড়া নেওয়ার সময়। বাড়ির মালিক থাকতেন ক্যালগেরিতে- এদিকে আসার সম্ভাবনা নেই। অন্যদিকে এই এলাকা আমাদের জন্যে ভীষণই সুবিধার। অ্যালিমেন্টারি, মিডল, হাই- তিনটি স্কুলই হাঁটার দূরত্বে। এই বাড়ি আমরাই কিনে নেবো জানিয়েছিলাম। প্রায় একবছর এমনই আশ্বাস নিয়ে থাকছিলাম আমরা কিন্তু একদিন জানলাম বাড়ির মালিক সিদ্ধান্ত পাল্টেছেন; আপাতত বাড়ি বিক্রি করবেন না। শুরু হলো আমাদের বাড়ি খোঁজা। ব্রাইটন এলাকায় বাড়ির দাম আমাদের বাজেটের চেয়ে ঢের বেশি। রিয়েলটর ঠারেঠোরে বোঝান, বাজেট বাড়াতে হবে। কিন্তু আমরা অটল রইলাম এবং ব্রাইটনেই বাড়ি পেলাম, বাজেটের ভিতরেই পেলাম। নদীটাও কাছে এলো, কিন্তু জানালা খুললেই এখন আর দেখা যায় না তাকে।

মজার ব্যাপার কী, ব্যারিস্টার ম্যাকনটও বাড়ি বিক্রি করে চলে এসেছিলেন আমাদের নতুন পাড়ায়। এ-পাড়ায় আমি যেদিন ঢুকলাম সেদিনই ছিল স্কুলের শেষ দিন। সকাল থেকেই আমি ব্যস্ত। এবাড়ি-ওবাড়ি করছি। আমার ছেলের স্কুল এখন একদম কাছে। আনতে না গেলেও চলে। একাই আসতে পারবে। কিন্তু সেদিন এ-পাড়ায় প্রথম দিন। আমি ওকে এনে ব্যস্ত হয়ে পড়েছি কাজে। ও বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে মুভারদের যাওয়া আসা দেখছে। একটু পরে এসে জানালো, কোণের বাড়িতে ওর স্কুলের একজন থাকে, ও খেলতে যেতে চায়। আমি ওকে পরে দেখা যাবে বলে থামালাম। খানিক পরে দেখি আমার উদোম বাড়ির দরজায় এক সোনালি চুলের সুন্দরী। বললো- আমি তোমার প্রতিবেশি। আমাদের বাচ্চারা একই স্কুলে পড়ে। তুমি তো আজ ব্যস্ত। তোমার ছেলেকে নিয়ে যাচ্ছি আমি। আমার বাচ্চাদের সঙ্গে ঘণ্টাখানিক খেলুক। তোমার সাহায্য হবে। নিউ ইয়র্ক, এমনকি রোড আইল্যান্ডেও এমন স্বতঃস্ফূর্ত সাহায্যের হাত বাড়ায়নি কেউ। সুন্দরীর নাম জানলাম, ক্যালি ল্যান্জ। সেই ক্যালির স্বামী রব ল্যান্জ বর্তমানে আমাদের মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে আছেন। এবং এদের সকলে কীভাবে আমার পরম আত্মীয় বনে গেল, সেই গল্প দিয়েই শেষ করবো আমার কানাডা-স্তুতি।

৪.

২০১০-এ আমার মায়ের ক্যান্সার ফিরে এসেছিল। সেই সময় মা-বাবার আমার কাছে আসার প্রস্তুতি চলছিল। আমার মায়ের জন্মদিন তেইশে সেপ্টেম্বর। সেইবারই প্রথম আমি অনলাইনে মাকে ফুলের বুকে পাঠাই। সেই বুকে মা হাতে ধরতে পারেননি, জন্মদিনের আগের রাতেই তাঁর কিডনি ফেইলিউর হয়। তারপরেও দশ মাস বেঁচে ছিলেন মা, ডাক্তারদের গিনিপিগ হয়ে। যাই হোক, এই গল্প আমার মায়ের অসুখের নয় বরং আমার মায়ের কাছে একমাস থাকার সময়টিতে আমার প্রতিবেশীদের অনন্য সহযোগিতার গল্প।

বাচ্চাদের তখন সামারের ছুটি। এর মধ্যে সুব্রত চাকরি পাল্টেছে। ওর নতুন অফিস অন্য শহরে। প্রায় নব্বই মিনিট লাগে যাওয়া-আসায়। আমার তখন শাখের করাত অবস্থা। একদিকে বাচ্চাদের জন্য দুশ্চিন্তা অন্য দিকে আমার মায়ের কাছে থাকার দুর্দমনীয় আকাক্সক্ষা। রব-ক্যালি, বেথ এবং বেথের প্রাক্তন স্বামী শেইন রস আমার সেই দুঃসময়ে যেন স্বর্গের দূত বনে গিয়েছিল। এবং সেই বিভীষিকাময় গ্রীষ্ম আমাকে চিনিয়েছিল কেবল রক্তের সম্পর্ক নয় বরং আত্মার টানেই হয় আত্মীয়তা। সুব্রত বাড়ি ফেরার আগ পর্যন্ত আমার বাচ্চারা যেন নিরাপদে থাকে তার খেয়াল রেখেছিল আমার এই প্রতিবেশীরা।

এক মাস পর ফিরেছিলাম আমি। এয়ারপোর্ট থেকে বাড়ি ফিরে ঘরে ঢুকতে যাবো, দেখি, দরজার সামনে ফুলের তোড়া আর কার্ড। বেথের দুই ছেলে কচি হাতে আমার পোর্ট্রেট এঁকেছে, নিচে লেখা- ওয়েলকাম ব্যাক রঞ্জনা! ওদের আঁকা ‘রঞ্জনা’ আমার চেয়ে ঢের সুন্দর দেখতে।

এর কয়েকদিন বাদেই আরেক প্রতিবেশী দম্পতি ভ্যালেরি-ব্রুস, তাদের সমুদ্র পাড়ের বাণিজ্যিক কটেজে সেই আগস্টের শেষ উইক-এন্ড যেন বাচ্চাদের নিয়ে একান্তে কাটাই তার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল আর সেখানেই ঘটেছিল অদ্ভুত ঘটনাটি। রবি, সোম দু-রাত কাটিয়ে মঙ্গলবার ফেরার কথা ছিল আমাদের। রোববার সকালেই পৌঁছে গিয়েছিলাম কটেজে। সামনেই সমুদ্র। বাচ্চারা খুব খুশি। সারা বিকেল সমুদ্রে দাপাদাপি করেছে বাবা, ছেলে, মেয়ে তিনজন। কটেজে ফিরে সুব্রত বাচ্চাদের নিয়ে বারবিকিউ করলো কটেজের খোলা প্যাটিওতে। বাংলাদেশে তখন সকাল। মায়ের সঙ্গে কথা বললাম। খুব ক্ষীণ গলার স্বর মায়ের। ক্লান্ত। তারপরেও আমার পড়শির এই সুচিন্তিত উপহারের জন্য আশিস জানালেন তাদের। খাওয়া দাওয়া শেষ হতেই সেই রাতে কটেজের কাচের জানালাতে রাখা হাই রেজ্যুলিউশন দূরবিন দিয়ে পালা করে রাতের আকাশ দেখছিলাম আমরা দুজনে। কাঁসার থালার মতো চাঁদ ঢেউয়ের বুকে চকমকি ঠুকে আলো ছড়াচ্ছে যেন। হঠাৎ করে আমার চোখে পড়ে অপূর্ব দৃশ্যটি! সঙ্গে সঙ্গে সুব্রতকে দেখাই। সমুদ্রের জলে গোল চাঁদের প্রতিবিম্ব ঘিরে ঘুরছে সিল মাছের দল। অপার্থিব দৃশ্য! দেখতে দেখতে হঠাৎ কী যে হলো আমার। মনে হলো- কোথায়, কী যেন হারিয়ে ফেলছি। চাঁদের আলোর মতো গলে বেরিয়ে যাচ্ছে আমার জীবন থেকে কিছু একটা। আমি বুক ভেঙে কেঁদেছিলাম সারারাত এবং সুব্রতকে বাধ্য করেছিলাম পরদিন ঘুম ভাঙতেই জলখাবার না খেয়েই বাড়ির পথে যাত্রা করতে। বাড়িতে পা দিতেই দেশ থেকে কল এসেছিল সুব্রতর ফোনে। আমি নির্বিকারে শুকনো চোখে শুনছিলাম সেই দুঃসংবাদ: খানিক আগেই আমার মা পাড়ি দিয়েছেন তাঁর অন্তিম ঠিকানায়।

লেখক পরিচিতি
জন্ম এবং বেড়ে ওঠা চট্টগ্রামে। তিনটি মৌলিক গল্পসংকলন, একটি অনূদিত উপন্যাস ছাড়াও তাঁর সম্পাদনায় বুকার পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখকদের গল্পসংকলন প্রকাশিত হয়েছে। দুই বাংলার গল্পসংকলন, অনুবাদ সংকলন, পূজাবার্ষিকী এবং ঈদ ম্যাগাজিনেও রঞ্জনার মৌলিক ও অনূদিত গল্প ছাপা হয়েছে। প্রিন্স এডওয়ার্ড আইল্যান্ডের বাসিন্দা রঞ্জনা একটি বায়ো-ট্যাক ফার্মের সঙ্গে কর্মসূত্রে যুক্ত আছেন।