আমার কানাডাবাসের অপ্রচল অভিজ্ঞতা
জয়ন্তী রায়
অটোয়া শহরে থাকি। দীর্ঘ ছাপান্ন বছর কানাডার মাটিতে বাস আমার। আমি এবং আমার স্বামী ড. অরুণ শংকর রায় উচ্চশিক্ষার জন্য কানাডার অন্টারিও প্রদেশের লন্ডন শহরে অবস্থিত ‘ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অন্টারিও’তে ছাত্র হিসেবে এসেছিলাম। আমি কলকাতার মেয়ে আর আমার স্বামী বড়ো হয়েছেন দিল্লিতে। দিল্লি, কিন্তু তিনি অবাঙালি নন। রীতিমতো বাংলা কবিতা ও গান লেখা বাঙালি বাবু। বিদেশে এসে কাঙ্ক্ষিত ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফিরে যাওয়ার অভীপ্সা ছিল আমাদের। কিন্তু সেটা আর বাস্তবায়িত হয়নি। আমরা থিতু হয়েছি এই দেশেই। আমাদের দুই পুত্রের জন্ম কানাডার রাজধানী অটোয়াতে। এখন আমাদের পরিবার আরও বড়ো- দুই পুত্রবধূ এবং একজন নাতিও আছে।
ছবির মতো সুন্দর শহর আর অপূর্ব স্থাপত্যশিল্পের নিদর্শনের কারণে ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অন্টারিও আমার মন কেড়ে নিয়েছিল। আমার স্বামী ইকনোমিক্সে পিএইচ.ডি প্রোগ্রামে এবং আমি ইনফরমেশান অ্যান্ড লাইব্রেরি সায়েন্সে মাস্টার্স প্রোগ্রামে যোগদান করি। পরবর্তীকালে কৃতিত্বের সঙ্গে মাস্টার্স ও পিএইচ.ডি ডিগ্রি অর্জন করি। আমার প্রোগ্রামের শিক্ষা পদ্ধতি ছিল সেমিনারভিত্তিক। সেইজন্য প্রতিদিন প্রতিটি ক্লাসে পূর্ব নির্ধারিত বিষয়ের ওপর লিখিত অ্যাসাইনমেন্টের আলোচনায় অংশগ্রহণের ওপর ভিত্তি করে মার্কস দেওয়া হতো। ফাইনাল পরীক্ষা দিতে হতো না। সেইজন্য প্রতিদিন প্রত্যেকটা ক্লাসে আমাকে পরীক্ষার মতো তৈরি হয়ে যেতে হতো। সেটাই আমার সর্বপ্রথম ‘অপ্রচল’ অভিজ্ঞতা, যেখানে আমি কী বলছি, সেটা বিচার না করে আমাকে আমার মত প্রকাশের স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল। কারণ, সেমিনারে নিজের বক্তব্যটি যথাযথভাবে প্রমাণ করতে পারাকেই দক্ষতার প্রকাশ বলে গণ্য হতো। এটি আজ পর্যন্ত সর্বসমক্ষে নির্ভয়ে আমার মত প্রকাশে সাহায্য করে। এটি কানাডার স্বাধীন শিক্ষাব্যবস্থার নিদর্শন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও ১৯২৯ সালে এই শিক্ষায় স্বাধীনতার সন্ধানে কানাডায় এসেছিলেন। সে-কথা আরেকদিন হবে। ছাত্র থাকাকালীন অবস্থায় আমি জীবনে প্রথম দেখলাম যে, প্রফেসর ক্লাসে ঢুকলে ওঠে দাঁড়ানোর কোনো প্রথা নেই। স্যার কিংবা ম্যাডাম বলে সম্বোধন করার কোনো দরকার নেই। কোনো কোনো ছাত্র মাস্টারমশাইদের নাম ধরেই সম্বোধন করত। আমি সেটা অনুসরণ করতে পারিনি সম্বোধনে প্রফেসরের পরে তাঁর পদবি জুড়ে দিতাম। প্রয়োজন হলে তাঁদের সঙ্গে নির্ভয়ে কথা বলা যেতো।
আমার দ্বিতীয় অভিজ্ঞতাটি একটি কানাডিয়ান পরিবারের আপ্যায়ন আতিথেয়তা ও উদারতার সঙ্গে আমার পরিচয়ের সুযোগ করে দিয়েছিল। কানাডার লোকেরা খ্রিষ্টমাস উৎসব নিজ নিজ পরিবারের সঙ্গে উদযাপন করে। সেই প্রথামতো আমাদের ইউনিভার্সিটির ফরেন স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন, আমাদের খ্রিষ্টমাস যাতে ভালোভাবে উদযাপিত হয় সে-জন্য আমাদের এডুকেশন ডিপার্টমেন্টের একজন প্রফেসরের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিল। খ্রিষ্টমাসের দিন সকাল দশটার সময় প্রফেসর লিন্ডেন গাড়ি নিয়ে এসে আমাদেরকে তাঁদের বাড়িতে নিয়ে গেলেন। স্বামী স্ত্রী ও দুটি সন্তান। মিসেস লিন্ডেন ছিলেন সদা হাস্যময়ী অতিথিবৎসল মানুষ। সেখানে আমন্ত্রিত ছিলেন তাঁর ভাই ও তার পরিবার। সকলের সঙ্গে সকলের অপরিসীম ভালোবাসা। ঠিক আমাদের দুর্গাপূজার মতো অনেক রকমের খাবারের আয়োজন। সেই প্রথম আমার রোস্ট টার্কি খাওয়া ও তাঁদের প্রদত্ত খ্রিষ্টমাসের উপহার পাওয়া। সুন্দরভাবে সাজানো খ্রিষ্টমাস ট্রি আর নিখুঁত পরিপাটি করে সাজানো ডাইনিং টেবিল আমার অপূর্ব লেগেছিল। প্রফেসর লিন্ডেন ছিলেন জুইস ধর্মের আর মিসেস লিন্ডেন খ্রিশ্চিয়ান। আর আমরা ছিলাম হিন্দু। এ যেন রামকৃষ্ণদেবের সর্ব ধর্ম সমন্বয়ের প্রত্যক্ষ নিদর্শন। এই অভিজ্ঞতা আমার ভবিষ্যতের পথ প্রদর্শন করেছিল। পর পর দু’বছর তাঁদের সঙ্গে খ্রিষ্টমাস কাটিয়ে আমি বুঝেছিলাম যে কানাডিয়ান সাহেবদের মধ্যেও গভীর পারস্পরিক ভালোবাসার অভাব নেই। খুব বেশি লোকেরা হয়তো এরকম অভিজ্ঞতার সুযোগ পান না। পরবর্তীকালে যখন আমাদের দুই পুত্র যথাক্রমে White Canadian ও White British কন্যা বিয়ে করে তখন তাদের বর্ণ, ধর্ম বিচার না করে অতি সহজেই কাছে টেনে নিতে পেরেছি ও তাদের কাছ থেকে নিজ কন্যার মতোই অপরিসীম ভালোবাসা পেয়েছি। তাদের পরিবারের সঙ্গে আমাদের সুন্দর সম্পর্ক গড়ে ওঠেছে। কারণ আমরা আমাদের পুত্রবধূদের হিন্দু করতে চাইনি। তাদের পাশ্চাত্য পরিবারে বড়ো হওয়াকে সম্মান দিয়েছি। তারাও আমাদের জীবনধারা বোঝার চেষ্টা করেছে। আমরা আমাদের কন্যা দুটির ভালো মানুষের চরিত্র দেখেছি। আমরা মধ্যযুগের কবি বড়ু চণ্ডীদাস কথাটিই বিশ্বাস করি ‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।’
২.
আমরা সম্প্রতি আমাদের বড়ো বসতবাটি বিক্রি করে কন্ডোমিনিয়াম কিনেছি। এটি এদেশের একটি প্রচলন। এখানে প্রতিদিনের কাজে সাহায্য করার জন্য মাহিনা করা লোক রাখা যায় না। তাই একটা বয়সের পর সন্তানরা যখন নিজ নিজ জায়গায় চলে যায় তখন এখানকার প্রথামতো আমরাও ছোটো জায়গায় চলে এসেছি। ভারতবর্ষ বা বাংলাদেশে এই প্রথা নেই। তাই আমার মাকে যখন খবরটা দিলাম তখন মা আঁতকে ওঠে বললেন “সে কী রে, অতো সুন্দর বাড়িটা বিক্রি করে দিলি!” তিনি হয়তো ভেবেছিলেন আমাদের আর্থিক সমস্যা হয়েছে তাই বাড়িটা বিক্রি করেছি। যাই হোক, আবার প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সমঝোতার কথায় ফিরে যাই। আমাদের বর্তমান বাসস্থান যে পঁচিশতলা কন্ডো বিল্ডিং সেখানে যোগা ও মেডিটেশনের ক্লাস শুরু করেছি। আমরা শেখাই। সাদা, কালো, মুসলিম, খ্রিষ্টান সবাই আমাদের ছাত্র। ভারতের পুরোনো শাস্ত্র অনুযায়ী শেখাই।
তবে আমরা আমাদের কানাডায় বসবাসের প্রথম যুগ থেকেই এদেশীয়দের দেখে মুগ্ধ হয়ে নিজেদের ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে ভুলে যাইনি। লন্ডনে ছাত্র থাকাকালীন বাঙালি ও অবাঙালি ছাত্র, তাদের পরিবার ও অন্যদের সঙ্গে ছোটো করে দিওয়ালি, রবীন্দ্রজয়ন্তী, বিজয়া সম্মিলনী পালন করতাম। অবশ্য দুজনেই গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্ট হওয়াতে আড্ডা দেওয়ার সময়ের অভাব ছিল।
তারপর ১৯৭১ সালে আমার স্বামী Govt. of Canada-য় চাকরি পেলে অটোয়ায় এলাম। আমার স্বামীর কাজের সঙ্গে সঙ্গে Thesis লিখতেন। আর আমার মাত্র দুটি course বাকি থাকায় প্রতি সপ্তাহে বাসে করে ১২০০ কিলোমিটার ভ্রমণ করে London, Ontario-তে যাতায়াত করে কৃতিত্বের সাথেই আমাদের পড়াশোনা সমাপ্ত করি।
আগে যেমনটা বলেছি, আমরা কখনোই নিজেদের ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে ভুলে যাইনি। অটোয়াতে তখন খুব বেশি বাঙালি ছিল না। India Canada Association ছিল। কিন্তু কোনো বাঙালি সাংস্কৃতিক সংস্থা না থাকলে অন্ততপক্ষে সরস্বতী পূজা ও রবীন্দ্রজয়ন্তী কেমন করে হবে এই কথা ভেবে আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে ১৯৭২ সালে অটোয়ার প্রথম বাঙালি সাংস্কৃতিক সংস্থা ‘দেশান্তরী’ প্রতিষ্ঠা করলাম। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভ করে বাংলাদেশের জন্ম হয়। তাই বাংলা ভাষাভাষী হিসেবে বাংলাদেশিরাও এতে যোগদান করেন। তাঁদের ধর্ম ছিল ভিন্ন। পালা পার্বণে মিল ছিল না। তাই তাঁরা চলে যান। তার অনেক পরে কিছু হিন্দুধর্মীয় লোকজন এসে সদস্য হন। পরবর্তীকালে তাঁদের সংখ্যা বাড়লে তাঁরা নিজেদের ক্লাব করেন। এই অভিজ্ঞতা থেকে শিখলাম যে, ভাষা এক হলেও ধর্মের পৃথকতা সীমারেখা টানে। আবার ভাষা ও ধর্ম এক হলেও সংখ্যালঘুদের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেলে পরিবর্তন আসতে পারে। সেটাই স্বাভাবিক।

অতি গর্বের সঙ্গে বলি, আজ তিপান্ন বছর পরেও ‘দেশান্তরী’ জোর কদমে এগিয়ে চলেছে। আর আমরা দুজনে ছোটো বড়ো সকলের সঙ্গে মিলেমিশে এই দীর্ঘ সময় ধরে অবিচ্ছিন্নভাবে ‘দেশান্তরী’র সেবায় লিপ্ত আছি। আমরা এটির প্রতি একটা অপত্যস্নেহ অনুভব করি। ‘দেশান্তরী’র বর্তমান ধারক ও বাহকরা Founding Member হিসেবে আমাদের সম্মান করে ও পরামর্শ চায়।
সেই শুরুর দিকেই আমার স্বামী এবং আমার উদ্যোগে Department of Multicuture and Heritage থেকে grant পেয়ে ‘অঙ্কুর’ নাম দিয়ে দ্বিতীয় প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের জন্য বাঙলা স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরবর্তীকালে বোর্ড অব এডুকেশন থেকে Grant পাওয়া যায়। আমাদের দুই ছেলেই নিয়মিতভাবে এই স্কুলে গিয়ে বাংলা লিখতে পড়তে শেখে। তবে আমি এবং আমার স্বামী ওদের বাড়িতে ইংরেজিতে কথা বলতে দিইনি। ওরা খুব ভালো বাংলায় কথা বলে। তবে সেই স্কুলটি বহুদিন চলার পর ছাত্রাভাবে বন্ধ হয়ে যায়।

এছাড়াও আমাদের কয়েকজনের উদ্যোগে বাংলা বইয়ের লাইব্রেরি স্থাপন করা হয়। আমরা দুজন সেবার কলকাতা গিয়েছিলাম। অনেক পাবলিশারের কাছে ঘুরে ঘুরে বই পছন্দ করে জাহাজে করে কানাডায় আনার ব্যবস্থা করে এসেছিলাম। তার কয়েকমাস পরে অনেক বাংলা বই কলকাতা থেকে এসে গেলে আমরা সবাই মিলে বইগুলোর ক্যাটালগ বানিয়ে শেলফে সাজিয়ে ফেললাম। নতুন নতুন বাংলা বই নিয়ে পড়ার যে কী আনন্দ, সেটা বলে বোঝানোর নয়! একটি Community Center-এ প্রতি রবিবার দুপুরে বাংলা স্কুল, বাংলা বইয়ের লাইব্রেরি, ব্যাডমিন্টন ক্লাব আর বাংলাভাষায় আড্ডা চলত। কখনও কখনও ভিডিও ক্যাসেটে সবাই একসঙ্গে বসে বাংলা মুভি দেখতাম। তখন কমিউনিটি সেন্টার ব্যবহার করতে কোনো ভাড়া দিতে হতো না, তাই রক্ষে। হ্যাঁ, আর একটা কথা বলতে ভুলে গেছি। সেটা হলো যে, ফেলে আসা দেশের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগের সুযোগ ছিল খুবই কম। একটা চিঠি আসতে বা যেতে তিন সপ্তাহ লাগতো। টেলিফোন অফিসে লং ডিসটান্স ফোন বুক করে রাখতে হতো। তারা যখন লাইন পেতো তখন আমাদের ফোন করে কানেক্ট করে দিতো।
‘দেশান্তরী’র জন্মের দশ বছর পর বাঙালির সবচেয়ে বড়ো উৎসব দুর্গাপূজা এবং লক্ষ্মীপূজা শুরু হলো। সেই সময়ে আমার প্রথম পরিচয় হলো দুর্গাপূজার উপাচারের সঙ্গে। হঠাৎ করে পূজার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গ থেকে কিছু আনার সময় ছিল না। তাই আমরা তিনজন মহিলা পুরোহিতদর্পণ দেখে কানাডায় লভ্য জিনিস দিয়ে নিজেদের মাথা খাটিয়ে জীবনে প্রথমবার পূজার উপাচার প্রস্তুত করেছিলাম। এরকম অভিজ্ঞতা হয়তো সবার হয় না। আমরা এদেশের অনেক ভালো জিনিস গ্রহণ করলেও নিজেদের সংস্কৃতি, সাহিত্য ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের ঐতিহ্য বজায় রাখতে চেয়েছি। তাই ‘দেশান্তরী’তে ধর্মের গোঁড়ামি কাটিয়ে সকল পূজার পুরোহিতদের বর্ণ, গোত্র বিচার না করে অব্রাহ্মণদের এবং মহিলাদেরকেও পুরোহিতের পদ দেওয়া হয়েছে। আমিও তাদের মধ্যে একজন। প্রথম থেকেই পূজার যোগাড় করা তো ছিলই। গত তিরিশ বছর ধরে আমার ওপর লক্ষ্মীপূজার আয়োজনের পুরো দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। এখন আবার পৌরহিত্যও করছি।
‘দেশান্তরী’র প্রথম নাটকে নায়িকার ভূমিকায় আমি আমার জীবনের প্রথম অভিনয় শুরু করি। এরপরে বহু নাটকে অভিনয় করি এবং অনেক নাটক পরিচালনা করি। দুর্গাপূজার সময় ছোটোদের ও বড়োদের নাটক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান প্রবাসে পূজার একটি বিশেষ অঙ্গ। আমার অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছি যে, ছোটোরা এই অনুষ্ঠানগুলোতে অংশগ্রহণ করলে, পূজার অঞ্জলি দিলে, প্রসাদ খেলে নিজেদের ঐতিহ্য সম্বন্ধে কিছুটা ওয়াকিবহাল তো নিশ্চয়ই হয়।

ক্রমে ক্রমে পূজার তিনদিন সকলের দুবেলা খাওয়ার জন্য পূজা প্যান্ডেলে রান্নার দলে যোগ দিলাম। সেই প্রথম বছর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত প্রতিদিন দুবেলা আমাদের প্যান্ডেলে চর্ব্য, চোষ্য, লেহ্য, পেয় খাবার বানানো হয়। সে-এক অপূর্ব আনন্দ! তবে এইসময় মনে পড়ে সেইসব লোকেদের কথা, যাঁরা ‘দেশান্তরী’র জন্য অদম্য পরিশ্রম করেছিলেন, কিন্তু আজ আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। সেই যে ক’বে এদেশে এসেছিলাম, আর কখন যে বন্ধুরা আত্মীয় হয়ে ওঠেছিলেন, তা মনে পড়ে না।
বাঙালি সংস্থা ‘দেশান্তরী’ ছাড়াও আমরা অন্যান্য কয়েকটি অবাঙালি সংস্থার সদস্য। India Canada Community Center নামক একটি সংস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। এছাড়া Speakers Forum নামক আরেকটি সংস্থাতে নানা বিষয়ে আলোচনা করি। নিজেদের লেখা অন্যদের পাঠ করে শোনাই।
কানাডায় এসে দেখেছিলাম, একটা দেশ কত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হতে পারে। অনেকে বলবেন যে, এখানে অনেক দেশের পরিধির তুলনায় জনসংখ্যা কম। সেটা খানিকটা সত্য হলেও আমরা দেখেছিলাম, কানাডার জনগণের নিজের পরিবেশ পরিষ্কার রাখার ইচ্ছা ও এ-সম্পর্কে বেঁধে দেওয়া নিয়ম মানার সদিচ্ছা। আর আমরা তাদের দেখে সেটা শিখলাম। এই প্রসঙ্গে একটা ঘটনার কথা বলতে ইচ্ছে করছে। আমাদের বড়ো ছেলের তখন মাত্র তিন বছর বয়স। আমরা দিল্লিতে আমাদের বাড়িতে বেড়াতে গেছি। ওর দাদু ওকে একটা লজেন্স খেতে দিয়েছিলেন। লজেন্সটা খেয়ে ও wrapperটা হাতে নিয়ে বসে আছে দেখে কেউ ওকে বললো ওটা ফেলে দাও। ওর উত্তর ছিল এখানে তো garbage can নাই। কোথায় ফেলবো? আমরা নতুন দেশে ভারতের অভ্যাস ও নিয়ম-কানুনের বোঝা এনে সেটা এখানে চালাতে চাইনি। ভালো জিনিস কেন শিখবো না? এখন আর সেদিন নাই। আমি যে সময়ের কথা বলছি, তখন ভারতীয় তথা বাংলার শাক, সবজি, মাছের কথা ছেড়ে দিন, কোনো দোকানে আদা, কাঁচা লংকা অর্থাৎ কাঁচা মরিচ পাওয়া গেলে আমরা সবাইকে ফোন করতাম। শহরের কোণায় কোণায় ভারতীয় বা বাংলাদেশি দোকান থাকতো না।
৩.
আমার পেশাগত কর্মজীবন শুরু হয় কানাডা সরকারের চাকরি দিয়ে। নানা ডিপার্টমেন্টে কাজ করেছি। তার মধ্যে যেটি করে আমি আনন্দিত ও গর্বিত বোধ করেছি, সেটি ছিল আমার নিজ হাতে গড়া কানাডা সরকারের একমাত্র National Search and Rescue Resource Center. ১৯৮২ সালে প্রবল প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে নিউফাউন্ডল্যান্ডে Ocean Ranger Oil Rig সমুদ্রের জল প্রবেশের ফলে ভেসে যায় এবং ঐখানে কর্মরত ৮৪ জন মানুষের মৃত্যু হয়। কিন্তু সেসময় কানাডায় কোনো একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ সংগঠন ছিল না, তাই ঠিক সময়ে সেখানে সাহায্য পৌঁছায় না। কানাডা সরকার কঠিন সমালোচনার সম্মুখীন হয় এবং Department of National Defence এই সমস্যার সমাধান করার জন্য National Search and Rescue Secretariat তৈরি করে। আমাকে Information Scientist হিসেবে সেখানে উপরোক্ত Resource Center গঠনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। আমি একেবারে শূন্য থেকে শুরু করে একটা কাঠামো তৈরি করে সেই অনুযায়ী অনেক সরকারি নথিপত্র ঘেঁটে এবং যেসব Department search and rescue-তে নিযুক্ত তাদের সঙ্গে এবং স্বেচ্ছাসেবীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে অনেক লিখিত ও মৌখিক উপাদান যোগাড় করে একটি Search and Rescue Center তৈরি করলাম। সমস্ত কানাডার স্বেচ্ছাসেবী ও পেশাগত search and rescue কর্মীদের জন্য Reference Center হলো এটি। পৃথিবীর বহু দেশ থেকে অনুরোধ আসতে লাগলো। আমি ছিলাম এটির কর্ণধার।
আর একটি কথা ফেলে আসা দেশের মধুর স্মৃতি কোনোদিনই সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলা যাবে না। তবে যে দেশে আমরা বসবাস করি, সেই কানাডাকেও ভালোবাসতে আমরা যেন দ্বিধাবোধ না করি। এ প্রসঙ্গটি নিয়ে আমি যে কবিতাটি লিখেছি সেটি আমার লেখার শেষ পর্বে যুক্ত করে আমার আলোচনার ইতিরেখা টানব।
স্বদেশ ও বিদেশ
দেশ তুমি কারে বলো, শুধাই সবায়,
উত্তর মেলে তবু দ্বন্দ্ব না যায়।
যেখানে জন্ম যার সেটা তার দেশ,
এইখানে প্রশ্নে হলো না তো শেষ।
জন্মভূমি, তুমি আমার ভালোবাসার ধন,
তোমার তরে সদাই কাঁদে আমার দুখী মন।
তোমায় ছেড়ে চলে এলাম সাতসমুদ্র পার,
অবশেষে ঘরে ফেরা হলো না যে আর।
সারাজীবন কাটিয়ে দিলাম পরবাসে থেকে,
স্মৃতি খালি মনের পটে তোমার কথা লেখে।
অবসরে দৌড়ে যে যাই ফেলে আসা দেশে,
চিনতে নারি তারে আমি নব্যযুগের বেশে।
কয়েক দশক কাটিয়ে দিয়ে হিসাব করি আমি,
স্বদেশ আমার এখন হলো কানাডার এই ভূমি।
ভালোবাসি তারেও আমি সন্দেহ নাই কোনো,
তারি বুকে সুখে আছি এই কথাটি জেনো।
তবে কেন আজও কাঁদি ভারতভূমির জন্যে,
ভেবে ভেবে সেই কথাটি হলাম আমি হন্যে।
এই কথাটির জবাব আমি পেলাম নাকো কোথা,
মনের দুয়ার খুলে দেখি লুকিয়ে আছে সেথা।
লেখক পরিচিতি
কবিতা, রম্যরচনা, ছোটোগল্প, প্রবন্ধ ও সমালোচনা লিখে থাকেন। আশির দশকে তাঁর লেখা প্রথম প্রকাশিত হয় ‘আমরা’ পত্রিকায়। রবীন্দ্রনাথের ওপর বেশ কয়েকটি প্রবন্ধ লিখেছেন যেগুলো ইলেকট্রনিক ম্যাগাজিন সহেলিতে প্রকাশিত হয়েছে। পরলোকগত আদিত্য চক্রবর্তীর সাথে তিনি ‘লিপিকা’ পত্রিকা শুরু করেন। অবাঙালিদের জন্য বাঙলার সাহিত্য সংস্কৃতির সম্বন্ধে ইংরেজিতে লিখে থাকেন।

