আমি প্রবাসী বা অভিবাসী

ঋতুশ্রী ঘোষ

একটা অপরিচিত মানুষের সাথে বিয়ের প্রথম মুহূর্তে যেমন দোদুল্যমান বা টালমাটাল অনুভূতি সৃষ্টি করে, ঠিক তেমনিই স্বদেশ থেকে সাত সমুদ্র তের নদীর পাড়ে, ১২০০০ কিলোমিটারেরও বেশি পথ পাড়ি দিয়ে সম্পূর্ণ অপরিচিত একটি দেশে স্থায়িভাবে বসবাসের লক্ষ্যে আসার প্রথম মুহূর্তের অনুভূতি আমার কাছে অনেকটা একইরকম। ভয় নয় তবে আশঙ্কা, আবার অন্যদিকে দীর্ঘ অপেক্ষার পর লক্ষ্যে পৌঁছানোর প্রশান্তি। মাতৃভূমি ছেড়ে, মাতৃভাষা ছেড়ে, বাবা-মা-ভাই-বোন-আত্মীয়-স্বজন ছেড়ে আসার বেদনা।

আমাদের এক বন্ধু সাজেশন দিয়েছিলেন সামারে আসতে। তার বক্তব্য অনুযায়ী- শীতকালে যদি আসি চারিপাশ বরফে ঢেকে থাকা প্রকৃতি কয়েক দিনেই বিষণ্ণতা এনে দেবে। প্রথম প্রথম এসেই স্বাভাবিকভাবে বাইরে বের হতে না পারার প্রতিবন্ধকতা নতুন প্রবাস জীবনকে কারা জীবনের শৃঙ্খলের আস্বাদন দেবে। কিন্তু সামারে এলে অনুভূতি বরং সম্পূর্ণ ভিন্ন হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। আমরাও তার কথা মেনে নিয়েছিলাম, সামারে এলাম।
ছোটোবেলা থেকে বইয়ে পড়েছি- সবুজে শ্যামলে ছায়া ঘেরা বাংলাদেশ। কিন্তু কানাডায় এসেই তার প্রকৃতি দেখে মনে হলো- বাংলাদেশের সবুজ কানাডার সবুজের কাছে যেন মøান, ধুলো ঢাকা, বিষণ্ণ। এখানে চারিপাশ চকচকে সবুজ, ফুলে ফুলে সাজানো, ঠিক যেন স্বর্গের মতো। স্বর্গ দেখিনি, কিন্তু আমার কল্পনায় স্বর্গের যে রূপ এ-যেন প্রায় তার কাছাকাছি।

২.

আমি বাংলাদেশের মেয়ে হলেও আমার গ্রাজুয়েশন করেছি ভারত থেকে স্টুডেন্ট ভিসায়। দেশে সংখ্যালঘুদের যে অবস্থা, তার থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্যই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল আমার বাড়ি থেকে। সেই প্রথম বাবা-মাকে ছেড়ে থাকা। সেই থেকে শুরু একাকিত্বের, নিজের সাথে নিজের যুদ্ধের। তবে তা আমার জীবনের অনেক উপকার করেছে, বিশেষ করে কানাডায় এসে আবার নতুন জীবন শুরু করায়।

জীবনে কোনো কিছুই অনুকূল নয়, প্রতিকূলতার সাথে বুঝে বুঝে চলাই জীবন। আবার সামান্য কিছু প্রাপ্তিতেই আনন্দ পাওয়ার মানসিকতাও প্রয়োজন। আমার চেয়ে যারা আরো খারাপ আছে তাদের সাথে নিজের তুলনা করে ঈশ্বর বা প্রকৃতির বা ভাগ্যের ওপর কৃতজ্ঞ থাকা একটা ইতিবাচক গুণ।

যে করে আমার আশ,
আমি করি তার সর্বনাশ।
তবু না ছাড়ে আমার পাশ,
আমি হই তার দাসের দাস।

পরীক্ষার পর পরীক্ষা দিয়েই যেন আমার জীবন। বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা/বিপদে আমি না যেন করি ভয়,/দুঃখ তাপে ব্যথিত চিত্তে নাইবা দিলে সান্তনা/দুঃখ যেন করিতে পারি জয়’। এই সান্তনা নিয়েই থাকি যে, যন্ত্রণা এলেও তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করার ক্ষমতা আমার আছে। পরাজয় হতেই পারে কিন্তু পিছিয়ে আসা মানুষ আমি নই।

৩.
যেদিন কানাডায় এলাম, সেদিন রাত থেকেই মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলো। সাবওয়ে ট্রেন স্টেশনগুলো বন্ধ হয়ে গেল জলমগ্নতার কারণে। প্রথমে এসেই একটি বেস্টমেন্টে ওঠেছিলাম। মুষলধারে অবিরাম তিনদিনের বৃষ্টিতে ঘরের মেঝে ঘামতে শুরু করলো। অর্থাৎ ঘরে ড্যাম তৈরি হওয়া শুরু হলো।

পতি দেবতার গায়ে লাল লাল গোটা ওঠে গেল। যা প্রচণ্ড চুলকানি সৃষ্টি করল। সাড়ে চার বছরের ছেলেটার যদি গায়ে এগুলো ওঠে তবে কীভাবে সহ্য করবে, সেই ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে গেলাম।

তখনো মেডিকেল কার্ড পাইনি। ডাক্তার দেখানো বিশাল খরচের। বাংলাদেশের একজন ডাক্তারের সাথে এখানে পরিচয় হলো, তাকে ঘটনাটি বললাম। তিনি আমার স্বামীর গায়ের দাগগুলো দেখলেন, বললেন এলার্জি। নিজের কাছে থাকা অভার দা কাউন্টারের কয়েকটা এলার্জির ওষুধ দিয়েও দিলেন। তবুও আর রিস্ক নিতে চাইলাম না। বাড়িওয়ালার সাথে কথা বলে কুড়ি দিনের মাথায় বাসা পাল্টালাম।

এই গেল প্রবাস জীবনে যুদ্ধের সূচনাপর্ব। ভয় পেলাম না, জানি এটাই স্বাভাবিক। আরো খারাপ কিছু যে হয়নি তার জন্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানালাম।

কয়েকদিনের মধ্যেই এক চমৎকার অভিজ্ঞতা হলো। রাস্তার ফুটপাতের ওপর কিংবা কারো বাড়ির সামনে বিভিন্ন জিনিস মানুষ রেখে দেয়। টিভি, ফ্রিজ, ফার্নিচার, বই, জামাকাপড়, খেলনা- কী নেই তার মধ্যে! কিন্তু কেন? অবাক হলাম! পরে জানতে পারলাম যার ঘরে যা লাগে না, তারা তাদের বাড়ির সামনে সেটা রেখে দেয়। অন্যদের যদি লাগে তারা সেটা বিনামূল্যে নিয়ে যেতে পারে। সব জিনিসই যে ভাঙাচোরা বা ব্যবহারের অযোগ্য, তা কিন্তু একেবারেই নয়। বরং অধিকাংশ জিনিসই প্রায় নতুনের মতো। এটি বোধহয় উন্নত দেশ আর অনুন্নত বা স্বল্পোন্নত দেশের তফাৎ। আমাদের দেশে একটি অবস্থাপন্ন আত্মীয়-স্বজন যদি তাদের ব্যবহৃত জিনিস তারই কম আর্থিক অবস্থা সম্পন্ন আত্মীয়কে দিতে চায় তবে কি কুরুক্ষেত্রই না তৈরি হবে, তা আমার দেশের মানুষরাই জানে।

রাস্তায় অনেক সময় ছেলেটাকে নিয়ে দুজনে হাঁটতে বের হতাম। কখনো কখনো কেউ কেউ নিজেরাই ডেকে কথা বলতেন। কথার মধ্যে যখন জানতে পারতেন যে আমরা নতুন কানাডাতে এসেছি- এক গাল হাসি নিয়ে বলতেন ‘ওয়েলকাম টু কানাডা’। খুব ভালো লাগতো। মনে হতো, এই দেশ যেন অপেক্ষা করেছিল আমাদেরকে স্বাগতম জানানোর জন্য। নতুন একটা দেশকে, দেশের মানুষকে আপন ভাবার এটিও বোধহয় একটা বড়ো অধ্যায়। ধাক্কা খাওয়ারও কমতি ছিল না এখানে। দেশে যখন ছিলাম তখন বইয়ে পড়ে জেনেছি, সিনেমা নাটকে দেখেছি বিদেশের বিভিন্ন দৃশ্য। নিজের মধ্যে একটা ধারণা তৈরি হয়েছিল যে, কানাডার মতো উন্নত দেশে রাস্তা ঘাট তেলের মতো, বাসে ট্রেনে ওঠলে বোঝাই যাবে না, আমি যে রাস্তায় চলছি। মসৃণ, নিঃশব্দ।

হায় ভগবান! বাসে ঝাঁকুনি খেতে খেতে, আমি শুধু বলি- ত্রাহী মধুসূদন। সমস্ত সামার জুড়েই দেখলাম এরা রাস্তায় পট্টি মেরে গেল। যেখানে ভেঙে যায় সেখানে এসে এক টুকরো রাস্তা কেটে নিয়ে চলে যায়, আবার একই মাপের নতুন এক টুকরো রাস্তা এনে ওখানে পট্টি দিয়ে চলে যায়। আমাদের দেশের ভিখারিরাও এত পট্টি দেওয়া কাপড় পড়ে না। তবে হ্যাঁ, শান্তিনিকেতনে বিক্রি হওয়া পট্টি দেওয়া চাদর বা কুর্তি বা পাজামার নতুন যে ফ্যাশন তার সাথে এটা বেশ মানানসই।

অবশ্য এ-কথা সত্যি যে, এখানে হর্ন কেউ বাজায় না। কানের প্রশান্তি এখানে অসাধারণ। প্রথম জানলাম, এখানে কেউ হর্ন বাজানো মানে সে গালাগালি দিলো তার সামনের গাড়িকে ভুল ড্রাইভিং-এর কারণে। খুব মজা লাগলো।

৪.

বাবা-মা হিসেবে জীবনের আরেকটি বড়ো অধ্যায় সামনে এলো- একমাত্র সন্তানের প্রথম স্কুল জীবনের শুরু। এখানকার নিয়ম জানলাম। স্কুল বাছাইয়ে কোনো ভালো-মন্দের কোনো সমস্যা নেই। এলাকা অনুযায়ী স্কুল নির্ধারিত। আমার নতুন বাসার এলাকায় গিয়ে নাম রেজিস্ট্রেশন করিয়ে এলাম। সেপ্টেম্বরের সেশন শুরু। কবে কখন কোনো ক্লাসে ছেলের স্কুল শুরু হবে জানিয়ে দিলো। নির্দিষ্ট দিনে আমরা দুজনেই স্কুলে গেলাম ছেলেকে নিয়ে। সব নতুন মানুষ, স্বাভাবিকভাবেই ছেলে ভয় পেয়ে গেল। কিন্তু সে দেখলাম বেশ শক্তভাবেই মন খারাপ না করে আনন্দের সাথেই স্কুলে ঢুকলো। স্কুলের এলার্ম পড়ে গেল প্যারেন্টসরা বেরিয়ে যাওয়ার। বেরিয়ে এসেই শুরু হলো আসল মজা। ছেলের বাবা কান্না করছে। ছেলে এতক্ষণ কীভাবে স্কুলে থাকবে! ছেলে ইংরেজিতে কথা বলতে পারে না, কী হবে! পরে দেখি, ২-৩ দিন যেতে না যেতেই ছেলেও কান্না শুরু করলো। কারো কথা বুঝতে পারে না, কারো সাথে কথা বলতে পারেনা- যা স্বাভাবিক। কারণ, ওর মাতৃভাষা বাংলা এবং টুকটাক কিছু ইংরেজি শব্দ শিখলেও ইংরেজিতে কথা বলা ওকে আমরা শেখাইনি। যেহেতু ছেলের বাবা নিজেই পেশাগতভাবে ভাষা শিক্ষার মানুষ, সে আমাকে বললো যে, একটা বাচ্চার নতুন একটা ভাষা শিখতে ছয় মাসের মতো সময় লাগে। তবুও আমরা ওর টিচারের সাথে কথা বলতে গেলাম। তিনিও একই কথা বললেন। আমরা শুনলাম, বুঝলাম, তবুও কিছুদিন কষ্টে গেল ছেলেটার নিত্যদিনের মন খারাপ দেখে।

এখানে এসে সরকারি বাসেই চলাচল করি। এক অপূর্ব সুন্দর ভদ্রতা দেখে সত্যিই মনে প্রশান্তি এনে দিলো। বাস থেকে নামার সময় বাস ড্রাইভারকে সবাই ধন্যবাদ জানিয়ে যায়। বিশেষ করে ছোটো বাচ্চারা। বাস ড্রাইভাররাও বাচ্চাদের এক অনন্য ভালোবাসার স্পর্শ ঢেলে দেয়। আমিও আমার ছেলেকে শেখালাম। ও খুব আনন্দ পেলো। আর আমি মনে মনে হাসলাম। আমাদের দেশে বাস কন্ডাক্টররা কবে, কত তাড়াতাড়ি যে ড্রাইভার হয়ে যায় তা তারা নিজেরাও বুঝতে পারে না। আর তাদের ব্যবহার- তা শুধু আমরা বাংলাদেশিরাই জানি। যে মানুষটার হাতে জীবন সঁপে দিয়ে রাস্তায় চলাচল করছি, সে যেমন এখানে সাবধানতা ও দায়িত্বশীলতার সাথে আমাকে আমার নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে দিচ্ছে, তেমনি আমিও তাকে কৃতজ্ঞতা জানাতে কখনো কার্পণ্য করি না। এটাই স্বাভাবিক।
এতটা বছর কতটা অস্বাভাবিকতার সাথে জীবন কাটিয়ে আসলাম ভাবতেই অবাক লাগে।

৫.

আমার স্বামী ইংরেজির এসোসিয়েট প্রফেসর হলেও এখানে এসে একাউন্টেন্ট হিসেবে একটি ভালো জব পেলেন। এখানে মানুষ সাতবার তার জব চেঞ্জ করার সুযোগ পায়।

প্রথম থেকেই আমাদের সিদ্ধান্ত ছিলো, ছোটো বাচ্চাকে ডে-কেয়ারে রেখে দুজনে কাজে যাবো না। আমি ঘরে বসেই টুকটাক লেখালিখির কাজ করতাম। আমার বড়ো ছেলের স্কুল জীবন এখানেই শুরু। স্কুলে যাওয়া শুরু হতেই সব বাচ্চাদের ভাই-বোন আছে দেখে তার বায়না শুরু হলো, কান্না শুরু হলো তারও ভাই-বোন লাগবে।
আমরাও সিদ্ধান্ত নিলাম। কিন্তু বড়ো সন্তান জন্ম দেওয়ার ব্যাপারে যত বেশি সুস্থ ছিলাম দ্বিতীয় সন্তানের ক্ষেত্রে তত বেশি অসুস্থ হলাম। রান্না ঘরে ঢুকতেই পারিনি, কিছুই খেতে পারিনি। যেখানে বড়ো বাচ্চার ক্ষেত্রে কোনোরকম ফাস্টফুড খাবার ছুঁয়েও দেখিনি, সেখানে টানা একটি মাস দুধ, জল, জুস কোনো কিছু খেতে না পেরে ডাক্তারের পরামর্শে কোক-স্প্রাইট খেয়ে বেঁচে থাকলাম। এক মাস পর অবস্থার একটু উন্নতি হলেও খাওয়ার ব্যাপারে একই অবস্থা। পতি দেবতা সকালে ওঠে আমার মর্জি মতো রান্না করে রেখে যান, আবার অফিস থেকে ফেরার সময় আমি কী খেতে পারবো, সেই অনুযায়ী বাজার করে এনে রান্না করেন। কিন্তু আমি মহাশয়া খাওয়া তো দূরের কথা, খাবারের কথা মনে পড়লেই, খাবার চোখের সামনে দেখলেই বমি করি।

প্রতিবেশী বা পরিচিতজনের এক নতুন রূপ দেখলাম এখানে। নয়টি পরিবার থেকে আমার জন্য ‘সাধ ভক্ষণ’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলো। বাচ্চার বাবার অফিস থেকেও ‘বেবি শাওয়ার’-এর আয়োজন করা হলো। অনেক খাবার, বাচ্চার জন্য অনেক কাপড়-চোপড়, পুতুল ও গিফট পাঠালো।

যাই হোক, নয় মাস পর এলো সেই প্রতীক্ষিত সময়। এখানে হসপিটালে বাচ্চাকে নিয়ে যাওয়া যায় না। বড়ো ছেলের বয়স ৬ বছর। নিজের প্রেগনেন্সি নিয়ে যে ভয় তার চেয়ে অনেক বেশি ভয় ওকে কার কাছে রেখে যাবো তা নিয়ে। শেষ পর্যন্ত ওর ক্লাসমেটের মা বললেন তার কাছে রেখে যেতে পারি। দ্বিতীয় কোনো অপশন নেই। সেই দিদির কাছে রেখেই আমরা দুজনে গেলাম হসপিটালে। আমাদের দ্বিতীয় সন্তান এলো পৃথিবীতে। পরদিন বড়ো ছেলে ছোটো ভাইকে দেখতে এলো। যখন ভাইকে দেখে আবার ফিরে গেল তখন সে কাঁদলো না ঠিকই কিন্তু তার চোখ মুখের অবস্থা দেখে যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকলাম। নিজের সাথে যুদ্ধ করে যেখানে হসপিটালে চার দিন থাকার কথা দুই দিনে বাড়ি ফিরে এলাম।

৬.

কানাডায় আসার তিন মাস পরেই ছিল দুর্গাপূজা। পূজার সময় বেশ ঠান্ডা পড়ে যায় এখানে। একটি নাতিশীতোষ্ণ দেশ থেকে এসে প্রথম বছরের শীত, যা হাড় কাঁপানো নয় বরং বরফে জমে যাওয়া শীতের মতোই মনে হলো। এখানে আসার আগেই লেখালিখির সূত্র ধরেই পরিচয় এক দাদার সাথে। তিনি পুজোর প্রতিটি দিন আমাদেরকে মন্দিরে নিয়ে যেতেন, আবার পুজো দেখা শেষ হলে বাসায় পৌঁছে দিয়ে যেতেন। তিনি বলতেন- আপনি ছোটো বাচ্চাকে নিয়ে এসেছেন, ও পুজো দেখবে না বা এই ঠান্ডার মধ্যে কষ্ট করে যাবেন এটা কী হয়? শুধু সেই বারের পুজোয় নয়, কতদিন কতবার কত মানুষ যে লিফট দিয়ে সাহায্য করেছেন তা হিসাব করে বলতে পারবো না। যারা এখানে আগে এসেছেন তারা নব্যদেরকে বিভিন্নভাবে কত যে সাহায্য করেন তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। দেশ, পরিবার ও প্রিয়জনকে ছেড়ে থাকার যন্ত্রণা আছে ঠিকই কিন্তু তার সাথে সম্পূর্ণ অপরিচিত নতুন মানুষেরা যখন আত্মীয়ের মতো কাছে টেনে নেন তখন যে কী বড়ো প্রশান্তি হৃদয়কে ছুঁয়ে যায়, তা শুধু প্রবাসীরাই জানেন। আমরাও এখন আমাদের মতো করে চেষ্টা করি নতুনদের পাশে দাঁড়ানোর, তাদেরকে সাহায্য করার।

কানাডায় তিন ধরনের নির্বাচন- আর এক নতুন অভিজ্ঞতা এনে দিলো। ফেডারেল, প্রভিন্সিয়াল ও লোকাল। জন্ম থেকে দেখে এসেছি নির্বাচন মানেই নির্বাচনের আগে থেকেই সাজো সাজো রব। পোস্টার, মাইকিং, মিটিং, মিছিল- এক কথায় টাকার শ্রাদ্ধ। অথচ এখানে কয়েকটা পোস্টার এবং প্ল্যাকার্ড ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না। আর কিছু ছেলে/মেয়ে এবং জনসাধারণ হাতে হাতে কিছু ফ্লায়ার ঘরে ঘরে বিলি করে যায়। তবে সবচেয়ে মজার জিনিস হলো, এদের অধিকাংশই যে দলের ফ্লায়ার বিলি করছে সেই দলের সমর্থক নয়। এটা স্টুডেন্টদের অসাধারণ মানুষের ভলেন্টিয়ার ডিউটি, টাকার খেলা নয়। রাজনীতি শিখতে গেলে এদের কাছ থেকেই শিখতে হয়।

৭.

একবিংশ শতাব্দীর ইতিহাসে ‘কোভিড-১৯’-এর নাম লেখা থাকবে ভয়ঙ্কর ট্রাজেডি হিসেবে। কোভিড শুরু হওয়ার ঠিক আগেই পারিবারিক প্রয়োজনে আমার স্বামীকে চলে যেতে হলো বাংলাদেশে। তার বাবা-মা অসুস্থ বলে সে আটকে গেল সেখানে। আমি আমার ১০ এবং ৪ বছর বয়সের দুটি সন্তানকে নিয়ে একা এই বিদেশ বিভুঁইয়ে। লকডাউন শুরু। চাকরি থেকে ছাঁটাই। বাইরে বের হওয়া ভয়ঙ্কর ব্যাপার। অথচ খেয়ে বেঁচে থাকার জন্য বাজারতো করতে হবে। দুটি প্রতিবেশী পরিবার ও একজন পারিবারিক অভিভাবক স্থানীয় মানুষ প্রায় আড়াই বছর আমাকে বাজার করে দিলেন। বাজার করে নিয়ে আসার পর শুধু টাকাটুকু দিয়ে দিতাম, আর কোনো দায়িত্ব নেই। দরজার সামনে বাজার পৌঁছে দিয়ে যেতেন তারা। আমার অস্বস্তি বোধ বুঝতে পেরে তারা বোঝাতেন, বাচ্চাকে নিয়ে বাইরে যাওয়া কতটা বিপজ্জনক। জানি না, রক্তের সম্পর্কের মানুষেরা এতটা উপকার কখনো করত কি না! এজন্যই হয়তো বলে-

আপন চেয়ে পর ভালো,
পরের চেয়ে জঙ্গল ভালো।

কয়েকটা শব্দ বা কয়েকটা লাইনে অনুভূতিটা লিখে এই অনুভূতির প্রকাশ অসম্ভব।

প্রবাস জীবন, যুদ্ধের জীবন। হয়তো উত্তর প্রজন্মের জন্য সুখকর, কিন্তু তাদের জন্য পূর্ববর্তী প্রজন্মকে যে ত্যাগ করতে হয় তা ইতিহাস তৈরি করে। শত ব্যস্ততার মাঝেও প্রতিদিন নিয়ম করে বাবা-মা’র সাথে কথা বলি। খোঁজ খবর নেই। ছেলেদেরকেও চেষ্টা করি সবার সাথেই যোগাযোগ রাখার অভ্যাস করার।

ভাষা বা সামাজিকতা বা দায়িত্ব কিংবা আবেগ যেটাই হোক না কেন, শুরু থেকেই সন্তানকে অভ্যস্ত করে তুললে সেই শিক্ষাটা দেওয়া সহজ হয় বলে বিশ্বাস করি। সময়ের সাথে সাথে পরিস্থিতি হয়তো পাল্টায় কিন্তু শেকড় বা মূল মানুষ একেবারে ছেড়ে ফেলতে পারে না।

তবে এ-কথা সত্যি যে, কানাডা আমাকে বড়ো মিথ্যাবাদী বানিয়েছে। কত ঝড়-ঝঞ্ঝার সমস্যা আছড়ে পড়েছে আমার ওপরে, আমাদের ওপরে। কিন্তু বাবা-মা শ্বশুর-শাশুড়িকে কখনো বলি না। তাদেরকে সবসময় জানিয়েছি- আমরা খুব ভালো আছি। তারা আসলে আমাদের খারাপ থাকাটুকু জানালে মন খারাপ করা ছাড়া আর কিছুই করতে পারবে না। তাই ‘আমরা ভালো আছি’, এটা জেনে তারা ভালো থাক- তাই-ই ভালো।

লেখক পরিচিতি
জন্ম ৮ মে ১৯৮৪। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসহ স্নাতক। বাংলাদেশে পত্রিকায় লেখালেখি শুরু। অধ্যয়নকালে কলকাতার স্মরণিকা ও সাময়িকীতে লেখালেখি ও সাংবাদিকতার জীবন। টরন্টোর প্রবাস জীবনে মূলধারার পত্রিকায় লেখালেখি। কাব্যগ্রন্থ ‘জীবন্ত আতশ কাচ’, ‘আকালিক উপাখ্যান’, ‘একনিষ্ঠ মৃত্যু’। ছড়া, গল্প, প্রবন্ধ এবং শিশুদের নাটিকা লেখা ও প্রযোজনা নিয়ে কাজ।