স্বপ্নের কানাডা

জাকারিয়া মুহাম্মদ মঈন উদ্দিন

পৃথিবীর অনেক অনেক দেশের চেয়ে কানাডা বসবাসের জন্য শান্তিপূর্ণ এক দেশ। এদেশের হেলথ সেক্টর, এডুকেশন সেক্টর অনেক অনেক দেশের চেয়ে বেশ সুসংগঠিত ও উন্নত। আমি ইমিগ্রান্ট হয়ে এই দেশে এসে শুরুতে অথৈ সমুদ্রে পড়ে গেলেও যেভাবে নানাবিধ চ্যালেঞ্জ উৎরে ওঠতে পেরেছি, তা সত্যিই আনন্দের। আমার সেই অভিজ্ঞতার কথা আজ শেয়ার করবো, যা হয়তো নতুন অভিবাসীদের জন্য রিসোর্স হিসেবে কাজে লাগতে পারে। বিশেষ করে আমি আমার লেখায় যে বিষয়গুলো তুলে নিয়ে আসার চেষ্টা করবো সেসব হচ্ছে: তথ্যের যাচাই-বাছাই; প্রফেশনাল চাকরি ও ভাষা; ক্যারিয়ার গঠনে সিদ্ধান্তহীনতা, সোশ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স বেনিফিট এবং সরকারি লোন নিয়ে লেখাপড়া নিয়ে বিভ্রান্তি; হাউজিং ইস্যু এবং কালচারাল শকড। আসুন, বিস্তারিতভাবে এসব আলোচনা করি।

প্রথমেই, তথ্যের ব্যাপারে বলছি। জাতি হিসেবে আমরা বেশ পরোপকারী জাতি। আমার অভিজ্ঞতায় যা দেখেছি কানাডায় আমাদের বাংলাদেশি কমিউনিটির লোকজন সবাই মোটামুটি হেল্পফুল; এনারা নতুন কোনো অভিবাসী এলে নিজের সাধ্যের মধ্যে উপকার করার চেষ্টা করেন। সমস্যা হচ্ছে এই জায়গায়। যেসব মানুষজনের কাছ থেকে তথ্য চাওয়া হচ্ছে, তারা সবাই তথ্য দিচ্ছেন নিজ অভিজ্ঞতার আলোকে, নিজের সীমাবদ্ধতাকে আমলে না এনে। উপদেশ দেওয়ার সময় একবারও ভাবছেন না, নিজের ক্ষেত্রে যা হয়েছে অন্যের ক্ষেত্রে তা নাও হতে পারে। আমার ক্ষেত্রে এরকম ঘটেছিল, যা এখন বলছি। পার্মানেন্ট রেসিডেন্ট হিসেবে সপরিবারে ২০০৩ সালে স্বপ্নের কানাডায় এলাম। একজন খুব কাছের মানুষ যিনি আমার আগের থেকে এখানে বসবাস করছেন, তিনি সাফ জানিয়ে দিলেন “পড়াশোনা করে কোনো লাভ নেই, এসব দেশে প্রফেশনাল চাকরি পাওয়া যায় না। এসব দেশ হচ্ছে সাদা চামড়ার দেশ। সব প্রফেশনাল চাকরি দখল করে আছে এরাই।” পরে অবশ্য এসব ভুল বুঝতে পেরেছি। সে-জন্যই আমি মনে করি একজন নতুন অভিবাসীর ক্ষেত্রে যেকোনো তথ্য শুধুমাত্র আশেপাশের দুই একজনের কাছ থেকে না শুনে অবশ্যই কোনো কমিউনিটিভিত্তিক অর্গানাইজেশন-এর স্টাফ থেকে যাচাই-বাছাই করে নেওয়া উচিত। এতে করে কিছুটা সময় লাগলেও তা ভুল পথে পা বাড়ানোর চেয়েও ভালো।

কানাডায় অনেক ইমিগ্রান্টদের শুরু হয় ‘সেকেন্ড ক্যারিয়ার’

এবার আসি প্রফেশনাল চাকরি ও ভাষা প্রসঙ্গে। প্রফেশনাল চাকরি ছাড়াও এসব দেশে দৈনন্দিন কাজে যেমন বাজারঘাট করা, চলাফেরা করতে, বাইরের কারো সাথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে একেবারে শুদ্ধ করে না হলেও অন্তত বুঝতে পারার জন্যে আমাদের ইংরেজি জানতে হয়। আর প্রফেশনাল চাকরি ক্ষেত্রে তো কথাই নাই। আমি দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে দুটি বিদেশি সংস্থায় কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে এসেও এখানকার লোকদের মতো করে ইংরেজিতে কথা বলা এখন পর্যন্ত পেরে ওঠতে পারিনি। ওঁরা যেভাবে পটেটো, টরন্টো উচ্চারণ করে সেভাবে আমার হয় না। গাড়ির ইঞ্জিন অয়েল চেঞ্জ করতে যেয়ে যেভাবে অয়েল শব্দ বলি ওঁরা ঠিক বুঝতে পারে না। যাহোক, আমি ব্যক্তিগতভাবে যেটি বুঝেছি, সেটি হচ্ছে অভিজ্ঞতা, দক্ষতা প্রভৃতি বিষয়গুলো এমপ্লয়মেন্ট ব্যাপারটির সাথে জড়িয়ে থাকলেও নতুন কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে কমিউনিকেশন স্কিলস একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। এদেশে এসে শুধুমাত্র ভালো করে ইংরেজি বলতে ও লিখতে না পারার কারণে বাংলাদেশ থেকে চাকরির অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা সম্পন্ন অভিবাসীদের অনেক প্রফেশনাল চাকরি পাওয়া থেকে বঞ্চিত হতে হয়। আমার আশেপাশে অনেক বাংলাদেশিকে দেখেছি টিভিতে বাংলা চ্যানেলের পাশাপাশি ইংরেজি চ্যানেলে খবর, টিভি শো দেখে, খবরের কাগজ পড়ে এবং সেই সাথে স্থানীয় কমিউনিটি অর্গানাইজেশনগুলো দ্বারা পরিচালিত ইংরেজি ভাষা শিক্ষার ক্লাসগুলোতে (যেমন: Language Instruction for Newcomers to Canada বা সংক্ষেপে LINC) এটেন্ড করে করে নিজের ইংরেজিকে ঝালাই করেছেন।

অভিবাসীদের মধ্যে যারা এসব দেশে এসে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে ভাবছেন তাঁদের জন্য বলবো, দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া আমি হলফ করে বলতে পারি, কানাডায় প্রফেশনাল লাইনে চাকরি করে ক্যারিয়ার গঠন করতে হলে পড়ালেখার বিকল্প নেই। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ফার্মাসিস্ট প্রভৃতি পেশার অভিবাসীর কথা আলাদা। ওনাদেরকে এদেশে নিজ পেশায় চাকরি বা প্রাকটিস করতে বেশ কিছু পরীক্ষা দিয়ে, লাইসেন্স নিয়ে কাজ শুরু করতে হয়। আমি কৃষিবিদ ক্যাটাগরিতে কানাডায় এসেছি। এখানে এসে দেখলাম কৃষি সেক্টরে কাজ বলতে বোঝায় ল্যান্ডস্কেপিং অর্থাৎ মানুষের বাড়ি বাড়ি ঘাস কাটা, বাগান করে দেওয়া। নিজস্ব পুঁজি নিয়ে কেউ কেউ এই কাজ করে যাচ্ছে। আবার দেখেছি, সরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন পার্কেও একই ধরনের কাজ অনেক বাংলাদেশি কৃষিবিদ হর্টিকালচারিস্ট-এর চাকরি বহাল তবিয়তে করে যাচ্ছেন। আমি দেশে কৃষিবিদ হিসেবে এনজিও বা অলাভজনক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ ৮/৯ বছর কাজ করেছি। আমি ভাবলাম, এখানেও এনজিওতে কাজ করা যাবে, অসুবিধার কিছু নেই। তবে, অসুবিধা একটি জায়গায়। তা হচ্ছে, এখানকার কৃষকগণ দেশের মতো হতদরিদ্র তো নয়ই, এনারা মস্ত বড়োলোক, একেকজন গ্রামদেশে রাজপ্রাসাদের মতো বাড়ি বানিয়ে দিব্বি হেসে-খেলে কৃষিকর্ম করে বেড়াচ্ছে। এনজিও ওয়ালারা এদের নিয়ে কী কাজ করবে, এরাই বরং এনজিওতে ডোনেশন দেবে। একথা ঠিক, এখানেও দেশের মতো হাজার হাজার এনজিও ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, তবে এদের টার্গেট লোকজন ভিন্ন ধরনের। একেক এনজিও একেক পপুলেশন নিয়ে কাজ করছে। যেমন, বৃদ্ধ/বৃদ্ধা লোকজন, ইয়ুথ, নিউকামার, হোমলেস, মেন্টালহেল্থ ইত্যাদি বিভিন্ন সেক্টরে প্রচুর এনজিও এদেশে কাজ করে যাচ্ছে। এসব দেখে এবং শুনে আমি এখানকার এনজিওতে ক্যারিয়ার গঠনের কথা ঠিক করলাম। একদিন দেশের যেসব জায়গায় কাজ করেছি সেখানকার অভিজ্ঞতার কাগজপত্র ও শিক্ষাগত সব সনদপত্র নিয়ে হাম্বার কলেজের সোশ্যাল সার্ভিস ডিপার্টমেন্টের ডিনের এপয়েন্টমেন্ট নিয়ে আলাপ করলাম। উনি আমাকে এস এস ডব্লিউ (সোশ্যাল সার্ভিস ওয়ার্ক)-এর ওপরে দুই বছরের ডিপ্লোমা করার পরামর্শ দিলেন। আমিও ভাবলাম, এটাই ঠিক। ভর্তি হয়ে গেলাম ডিপ্লোমায়। ডিপ্লোমা শেষ করে গুয়েল্ফ ইউনিভার্সিটি থেকে ফ্যামিলি অ্যান্ড কমিউনিটি সার্ভিস বিষয়ে চার বছরের অনার্স কমপ্লিট করে সেই অবধি সোশ্যাল সার্ভিস সেক্টরে কাজ করে যাচ্ছি।

আরেকটি ব্যাপার পাঠকদের জন্যে উল্লেখ করতে চাই, এদেশে ইমিগ্রান্টদের প্রফেশনাল জবের ক্ষেত্রে যারা দেশ থেকে পোস্ট সেকেন্ডারি এডুকেশন নিয়ে নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে কাজের ব্যাপক অভিজ্ঞতা নিয়ে অন্টারিও প্রভিন্স-এ ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে বা পার্মানেন্ট রেসিডেন্ট হিসেবে অথবা রেফুইজি স্ট্যাটাস নিয়ে থাকতে এসেছেন ওনাদের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যা আমি পরে জেনেছি, সেটা হচ্ছে রেগুলেটেড অকুপেশন (যেমন : নার্স, ইঞ্জিনিয়ারিং প্রভৃতি) এবং দক্ষ, নন-রেগুলেটেড অকুপেশন (যেমন : তথ্য প্রযুক্তি, ফিনান্সিয়াল সার্ভিসেস প্রভৃতি)-এর ক্ষেত্রে কিছু কিছু ব্রিজিং প্রোগ্রাম আছে যা এদেশে প্রফেশনাল প্রাকটিস করতে লাইসেন্সিং-এর জন্য সাহায্য করে থাকে। তবে এক্ষেত্রে কানাডিয়ান ল্যাংগুয়েজ বেঞ্চমার্ক (সিবিএল) অবশ্যই সাত বা এর ওপরে থাকতে হবে। এছাড়া, দেশে যারা সোশ্যাল ওয়ার্ক-এর ওপর বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি নিয়ে দেশে এই লাইনে কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে কানাডায় এসেছেন এনাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এবার দিচ্ছি যা আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি। এরা টরন্টো মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি (প্রাক্তন নাম : রায়ার্সন ইউনিভার্সিটি) থেকে Internationally Educated Social Work Professionals (IESW) program নামের এক বছর মেয়াদি একটি পার্টটাইম ব্রিজিং প্রোগ্রাম কমপ্লিট করে সোশ্যাল ওয়ার্ক সংশ্লিষ্ট নন-প্রফিট সেক্টরে প্রফেশনাল চাকরি করতে পারবেন। আমার জানা মতে বেশ কিছু বাংলাদেশি এই প্রোগ্রাম করে কেস ওয়ার্কার টাইপের চাকরি করে যাচ্ছেন।

ক্যারিয়ারের নতুন চ্যাপ্টার শুরু করতে যা ভাবতে হবে

অনেক ইমিগ্রান্ট সাহস করে ক্যারিয়ার গঠনের লক্ষ্যে পড়াশোনা করতে চাইলেও সরকারি লোনের ব্যাপারে কমিউনিটির নানান মানুষের কাছ থেকে বিভিন্ন কথা শুনে কনফিউজড হয়ে যান। কারো কারো ধারণা আমাদের মতো বয়স্ক ইমিগ্রান্টদের ওস্যাপ (অন্টারিও স্টুডেন্ট বেনিফিট) নিয়ে পড়ার কোনো মানে হয় না। চাকরি তো পাওয়ায় যাবে না, শুধু শুধু ঋণের বোঝা বাড়ানোর কোনো মানে হতে পারে না। আবার কেউ কেউ মনে করেন, যদি চাকরি কালেভদ্রে পেয়েই যায়, সরকারকে সেই অস্যাপ-এর ধারের টাকা দিয়ে দিলে না খেয়ে থাকতে হবে। আসলে ব্যাপারটা কিন্তু তা না। প্রথমত, অস্যাপ-এর ধারের টাকার পাশাপাশি বেশি কিছু অনুদান দেওয়া হয় তা ফেরৎ নেওয়া হয় না। দ্বিতীয়ত, চাকরি না পেলে বা ভালো বেতনের চাকরি না পেলেও সরকার আপনার কাছে চাপ দিয়ে টাকা আদায় করবে না। আপনার সামর্থ্য অনুযায়ী নিজের আয়-ব্যয়ের সাথে সঙ্গতি রেখে কিছু টাকা দিয়ে বাকি টাকা মাসে মাসে কিস্তিতে সেই ধারের টাকা শোধ দেওয়ার সুযোগ আছে, যা আমি করেছিলাম বলে আপনাদের সাথে শেয়ার করলাম।

কানাডায় দেখেছি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে অনেকেই সরকারি আর্থিক বেনিফিট বা সোশ্যাল এসিট্যান্স নেওয়াকে নেগেটিভভাবে দেখেন। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে সরকারি আর্থিক সুবিধা বা সোশ্যাল এসিট্যান্স নিয়ে সাময়িক আর্থিক সম্যস্যা কাটিয়ে ওঠার সুযোগ যদি থাকে, অন্যান্য কমিউনিটির লোকজন যদি এসব বেনিফিট নিতে পারে তবে আমাদের সমস্যা কোথায়? বিভিন্ন কারণে যারা কাজ করতে অক্ষম, তারা ক্ষণস্থায়ী থেকে স্থায়িভাবেও সরকারি অর্থিক বেনিফিট বা সোশ্যাল এসিট্যান্স নিয়ে খুব বেশি পরিমাণে না হলেও খেয়ে-পরে থেকে যেতে পারেন। তবে, আমার মতামত হচ্ছে, কাজ করার সুযোগ থাকলে এই প্রোগ্রামের থেকে বের হয়ে আসাই ভালো। আমার অভিজ্ঞতায় কিছু প্রফেশনাল বাংলাদেশিদের দেখেছি যেমন ডাক্তার, ফার্মাসিস্ট যারা খরচবহুল লাইসেন্সের পরীক্ষাগুলোর ফিস নিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন, সারভাইভাল চাকরি করে পরীক্ষার পড়ায় মন দিতে পারছেন না। আমি দেখেছি এরকম কিছু প্রফেশনাল ব্যাকগ্রাউন্ডের বাংলাদেশিরা ক্ষণস্থায়িভাবে এই সোশ্যাল এসিট্যান্স নিয়ে ভালো করে পড়াশোনা করে পরীক্ষায় পাস করে লাইসেন্স নিয়ে সোশ্যাল এসিস্ট্যান্স প্রোগ্রাম থেকে বের হয়ে নিজ পেশায় চলে এসেছেন এবং সেটেল্ড হয়ে বসবাস করছেন। সুতরাং সোশ্যাল এসিস্ট্যান্সকে নেগেটিভভাবে দেখার কোনো কারণ নেই।

এবার বলবো হাউজিং-এর ব্যাপারে। অনেকেরই প্রবাসে আয়ের প্রায় অর্ধেকটাই চলে যায় হাউজিং-এর পিছনে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে নতুন অভিবাসীগণ এখানে এসে প্রথমেই সীমিত আয়ের মধ্যে কিছুটা কম ভাড়ার বাসা খুঁজে থাকেন। কেউ সাবলেট নিয়ে অল্প ভাড়ায় শেয়ার করে থাকেন, কেউ কারো বাসার বেজমেন্টে ভাড়া নিয়ে থাকেন, কেউ-বা পরিবারের সদস্যদের সংখ্যা অনুযায়ী হাইরাইজ বিল্ডিং-এর স্টুডিও রুম, এক রুম, দুই রুম বা তিন রুমের এপার্টমেন্ট ভাড়া নিয়ে থাকেন। এসবের বাইরেও অনেকে সরকারি সাবসিডি দেওয়া খুব অল্প ভাড়ার বাসায় থাকেন যদিও এসব বাসা পেতে অনেক বছর অপেক্ষায় থাকতে হয়। আমাদের ক্ষেত্রে অবশ্য এই অপেক্ষায় তেমন একটা প্রভাব পড়েনি। কারণ, বিল্ডিং ম্যানেজমেন্টে চাকরি করে ফ্রি বাসা পেয়েছি, ফ্রি ক্যাবল পেয়েছি। তবুও কী মনে করে আমি দুই রুমের বাসার এপ্লাই করে রেখেছিলাম। পরবর্তীকালে আমি ক্যারিয়ারের কথা চিন্তা করে সেই চাকরি ছেড়ে দিলাম, সেই সাথে ফ্রি বাসাটিও ছেড়ে দিতে হলো। একই বিল্ডিং-এর দুই বেডরুমের এপার্টমেন্ট ভাড়া নিয়ে পরিবার নিয়ে থাকছি আর একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাচেলর পড়ছি। এমন সময়ে শুনলাম আমাদের একটি টাউন হাউজ দেওয়া হয়েছে। যেহেতু আমি ওস্যাপ নিয়ে পড়ছি আমাদের ফ্যামিলি ইনকাম বেশি না হওয়ায় বাসাভাড়া অনেক কম পড়লো। অন্যথায় ইনকামের থার্টি পার্সেন্ট সরকারকে বাসাভাড়া দিতে হতো। যাদের ইনকাম বেশি তাদের জন্যে এসব বাসা সুবিধার না। স্টুডেন্ট অবস্থায় আমি কয়েক মাস ছিলাম। পরে, চাকরি পেয়ে কেনা বাসায় ওঠেছি। যারা এখানে দীর্ঘ সময়ের পরিকল্পনা নিয়ে এদেশে থাকতে এসেছেন শুরুতেই এসব সরকারি বাড়ির জন্য এপ্লাই করে রাখতে পারেন।

নতুন অভিবাসীদের ক্ষেত্রে কালচারাল শকড আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার যা কিছুটা আমাদের বেলাতেও হয়েছে। এখানে মানুষদের আঁটোসাঁটো পোশাক-পরিচ্ছেদ, কথাবার্তায় বিশেষ অশ্লীল শব্দের ব্যবহার, হ্যালোয়িনের দিনে বীভৎস মুখোশ পরে বাচ্চাদের বাড়িতে বাড়িতে যেয়ে চকলেট সংগ্রহ ইত্যাদি কর্ম দেখে শুরুতে কিছুটা থমকে গিয়েছিলাম। এছাড়াও, দেশে থাকতে আমরা বাড়িতে ও স্কুলে যে শাস্তি প্রক্রিয়ার মধ্যে বেড়ে ওঠেছি, বিদ্যার পাঠ নিয়েছি, একই প্রক্রিয়া এদেশে প্রাকটিস করতে যেয়ে দেখেছি অনেক বাংলাদেশিরা মারাত্মক বিপদে পড়েছেন। অনেক বাবা-মাকে বাচ্চাদের গায়ে হাত তোলার জন্যে চিলড্রেন এইড সোসাইটির স্টাফের হাতে নাজেহাল হতে হয়েছে। কাউকে কাউকে আবার জেল পর্যন্ত খাটতে হয়েছে। ধীরে ধীরে অবশ্য এই কালচারাল শকড ব্যাপারটি আমাদের কেটে গিয়েছে ।

একবার এদেশে জন্ম নেওয়া আমার ছোট্ট মেয়ে অধরার কোনো এক হেলথ ইস্যুতে টরন্টো শহরের ডাউন টাউনে অধরা আর স্ত্রী মিতাকে নিয়ে এসেছি। অধরার তখন সম্ভবত বছর তিনেক বয়স। অনেক ক্ষেত্রে এসব দেশে বাচ্চাদের ক্লিনিকে খেলাধুলার নানান সরঞ্জামাদি থাকে। মিতা অধরাকে নিয়ে সেখানেই ডাক্তারের ডাকের অপেক্ষায় সময় কাটাচ্ছে। এক সময়ে সেখানে একটি দৃশ্য দেখে আমাকে কিছুক্ষণের জন্য কিছুটা অন্যমনস্ক করে তুললো। আমি দেখলাম খেলায় মত্ত অধরার পিছে পিছে মিতা খাবারের বাটি হাতে ঘুরে ঘুরে খাবার খাওয়াচ্ছে। ঠিক অধরার বয়সী একটি শ্বেতাঙ্গ বাচ্চাকে তাঁর মা ছোট্ট একটি চেয়ারে বসিয়ে রেখেছে। সেই চেয়ারের সামনে হাতলে কিছু খেলনা দিয়ে বাচ্চা খেলছে আর চেয়ারে বসে বসে নিজ হাতে চামুচে করে একটি প্লেটে রাখা খাবার খাচ্ছে। পাশাপাশি এই দুটি চিত্র যে বার্তা দিয়ে গেল, তা হচ্ছে বাচ্চাদের আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে ওদেরকে স্বাবলম্বী হতে ছোটো থেকেই আমাদের অর্থাৎ বাবা-মায়েদের অনেক বেশি সচেতন হওয়া উচিত। এই উচিত, অনুচিত বিষয়ে এই প্রসঙ্গে আরেকটি উদাহরণ পাঠকদের সাথে শেয়ার করছি। অধরা তখন আরও ছোটো। আমরা যে বিল্ডিং-এ থাকতাম সেই বিল্ডিংয়েই একজন ট্রেইন্ড শ্বেতাঙ্গ বেবি-সিটার থাকতেন। আমরা সেই বিল্ডিংয়ের ম্যানেজমেন্টে চাকরি করি। অধরাকে ওনার ওখানে রেখে আমি আর মিতা কাজ করছি। ছোট্ট অধরাকে বেবি সিটারের কাছে রেখে মিতা ছটফট করছে। কী মনে করে আমি আর মিতা সেই এপার্টমেন্টের সামনে যেতেই অধরার তীব্র কান্নার শব্দ শুনতে পেলাম। মিতা উদভ্রান্তের মতো দরজা কড়া নাড়তেই বেবি-সিটার ভদ্র মহিলা দরজা খুললেন। আমরা দুজনেই ভিতরের দিকে তাকাতেই দেখতে পেলাম একটি স্ট্রলার কাপড় দিয়ে ঢাকা এবং অধরার কান্নার শব্দ সেখান থেকে আসছে। মিতা এবং আমি দুজনেই সেই মহিলাকে খানিকটা ধমকের সুরে বললাম, এ কী অবস্থা? তুমি এভাবে কাপড় দিয়ে স্ট্রলার ঢেকে রেখেছো, আমার বাচ্চাটি কাঁদছে, এটা তোমার কেমন আক্কেল? তিনি আমাদের শান্ত হতে বলে বললেন, “দেখো, একটু আগেই আমি ওকে ডায়পার চেঞ্জ করে খাইয়ে এখানে বসিয়ে রেখেছি। হালকা কাপড় দিয়ে ঢেকে কৃত্রিমভাবে অন্ধকার তৈরি করে ঘুমানের পরিবেশ তৈরি করেছি।” মিতা, ওসব কথায় কর্ণপাত না করে ছোঁ মেরে অধরাকে কোলে তুলে নিয়ে আমাদের এপার্টমেন্টে চলে গেল।

উপসংহারে বলবো, উন্নত দেশগুলোর মধ্যে কানাডা বসবাস করার জন্যে ভালোই একটি দেশ। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখেছি নতুন অভিবাসীর ক্ষেত্রে ভাষা, হাউজিং, কালচারাল প্রতিবন্ধকতা ইত্যাদি চ্যালেঞ্জিং বিষয়াবলিকে ঠিকভাবে মোকাবিলা করে ওঠতে পারলে এখানে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করা সম্ভব। তবে এ-কথাও ঠিক, মাতৃভূমির কোনো বিকল্প হয় না। আমরা পৃথিবীর আনাচে কানাচে যেখানেই বসবাস করি না কেন, আমাদের শেকড় কিন্তু ঐ সোনার বাংলাদেশ; আমরা ভালোবাসি প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশকে, আমরা ভালোবাসি আমাদের এই স্বপ্নের কানাডাকে।

লেখক পরিচিতি
জন্ম : ১৯৬৬। কথাসাহিত্যিক, কৃষিবিদ এবং সমাজকর্মী। ২০০৩ সাল থেকে সপরিবার কানাডায় স্থায়িভাবে বসবাস। প্রকাশিত বই : ‘হোমলেস’ (২০২৩), ‘স্বপ্নের ইমিগ্রেশন’ (২০২৩), ‘জোসনা ম্যানসন’ (২০২৩), ‘হাউজ হাজব্যান্ড’ (২০২৪) এবং ‘বসন্তের বাতাস’ (২০২৫)। টরন্টো থেকে প্রকাশিত জনপ্রিয় সাপ্তাহিক বাংলা মেইলের নিয়মিত লেখক।