এক বাংলাদেশি নারীর চোখে কানাডার অভিবাসন জীবন

পূর্বাশা চৌধুরী

আজ থেকে প্রায় এগারো-বারো বছর আগের কথা। জীবনের এক নতুন অধ্যায় শুরু করতে আমরা- আমি ও আমার বর। অনেক স্বপ্ন নিয়ে আমরা একসাথে পা রেখেছিলাম কানাডার সাস্কাচুয়ান প্রদেশের সাস্কাচুয়ান শহরে। অচেনা পরিবেশ, অজানা সংস্কৃতি, আর অপরিচিত ভাষাভাষি মানুষের মাঝে নিজেকে স্থাপন করার সাহসটা কোথা থেকে পেয়েছিলাম, আজ ভেবে আশ্চর্য হই। তবে একথা নিশ্চিত- স্বপ্ন ছিল, আর সেই স্বপ্ন বাস্তব করতে নিজের দেশ, পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, পরিচিত মুখ, আর চেনা গলিপথ ছেড়ে পাড়ি জমিয়েছিলাম কানাডার পথে।

সাস্কাচুয়ানে প্রথম কয়েকটি বছর ছিল শেখার, টিকে থাকার ও নিজেকে গড়ে তোলার সময়। হাড়কাঁপানো ঠান্ডা, নিঃসঙ্গতা, ভাষাগত দ্বিধা, আর সামাজিক বিচ্ছিন্নতা- এসব কিছু নিয়েই নতুন দেশে অভিবাসী হিসেবে নিজের জন্য একটি জায়গা তৈরি করার লড়াই ছিল প্রতিনিয়ত। তবে সেই লড়াইকে পিছনে ফেলে আমি যখন অন্টারিওতে পাড়ি জমালাম, তখন জীবনে নতুন মোড় এলো। আর কোভিড মহামারীর মধ্যদিয়ে জীবনের যে চ্যালেঞ্জটা শুরু হলো, তা আমাকে শেষমেশ নিয়ে এলো আলবার্টা প্রদেশের ক্যালগেরি শহরে।

এই পুরো অভিজ্ঞতাটুকু আমার জীবনকে শুধু বদলেই দেয়নি, বরং আমাকে আরও বেশি আত্মবিশ্বাসী, বাস্তববাদী ও মানবিক করে তুলেছে। আজ এই লেখার মধ্যদিয়ে আমি আমার সেই অভিজ্ঞতা, কানাডার সমাজ ও সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি, আর একজন বাংলাদেশি নারীর জীবনযাত্রার সংগ্রাম ও সম্ভাবনার গল্প তুলে ধরতে চাই।

সাস্কাচুয়ান : নতুন জীবনের প্রথম পদক্ষেপ
সাস্কাচুয়ানে প্রথম দিনগুলো ছিল আবেগ ও জিজ্ঞাসায় ভরা। চারদিকে বরফ, নীরব রাস্তা, অপরিচিত মুখ- সবকিছু মিলিয়ে এক ধরনের সাংস্কৃতিক শূন্যতা অনুভব করতাম। আমার পাশের মানুষগুলো হয়তো সহানুভূতিশীল ছিল, কিন্তু আমি যেন নিজের ভাষা ও অভিব্যক্তির ভেতরে আটকে ছিলাম।

বাংলাদেশে বেড়ে ওঠা একটি মেয়ের জন্য পরিবার, প্রতিবেশী, সমাজ, আত্মীয়দের উপস্থিতি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। অথচ এখানে কেউ জানেও না তুমি কে, কোথা থেকে এসেছো, বা তোমার জীবনে কী ঘটছে। তবে এটিই ধীরে ধীরে আমাকে আত্মনির্ভর হতে শিখিয়েছে।

অন্টারিও : সুযোগের দ্বার, কিন্তু কঠিন বাস্তবতা
একসময় জীবন ও কর্মক্ষেত্রের উন্নতির আশায় আমি অন্টারিও প্রদেশে চলে যাই। এখানকার বর্ধিত সুযোগ, শহুরে গতি এবং অভিবাসীদের জন্য প্রশিক্ষণ, চাকরি ও শিক্ষার ক্ষেত্রগুলো আমাকে উৎসাহিত করেছিল। কিন্তু বাস্তবতা অনেক সময় প্রত্যাশার চেয়ে কঠিন হয়। বাড়িভাড়া, ডে কেয়ারের খরচ, যাতায়াত, পড়াশোনা এবং পরিবার সামলানো- সব মিলিয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা তৈরি হয়েছিল। তার ওপর এলো কোভিড-১৯।

কোভিড কাল : বাঁচার লড়াই ও নতুন সিদ্ধান্ত
কোভিডকালীন সময়টি আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়। চাকরি হারানো, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সন্তানকে অনলাইন ক্লাসে সাহায্য করা, মানসিক চাপ- সব মিলে প্রতিদিন একেকটা যুদ্ধ ছিল। এ সময়েই আমি ও আমার বর সিদ্ধান্ত নিই আলবাট্টা প্রদেশে আসার। কিন্তু অনেক গবেষণা, পরামর্শ ও ভাবনার পর ক্যালগেরিকে বেছে নিই। কারণ এখানে জীবনযাত্রার ব্যয় তুলনামূলকভাবে কম, আর অভিবাসীদের জন্য কাজ ও প্রশিক্ষণের সুযোগ বেশি।

ক্যালগেরি : ঘুরে দাঁড়ানোর পথ
ক্যালগেরিতে এসে আবার নতুন করে শুরু করলাম। নিজেকে চিনলাম নতুনভাবে। চাকরি সংক্রান্ত ওয়ার্কশপ, বাচ্চার স্কুল সাপোর্ট সবকিছু মিলিয়ে আমার মতো অভিবাসীদের জন্য এটি অনেক সহায়ক শহর।

এখানে এসে আবার পড়াশোনা শুরু করি, পার্ট টাইম কাজ করি, সন্তানের জন্য সময় দিই- সবকিছুই সমন্বয় করে। ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস ফিরে পাই। নিজের পরিচয় আর অবদান নিয়ে গর্ব অনুভব করি।

ভলান্টিয়ার কাজের মূল্যায়ন : কানাডায় শেখা এক বড়ো শিক্ষা
কানাডায় এসে আমি যে অনেক কিছু শিখেছি, তার মধ্যে একটা বিষয় আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে- তা হলো ভলান্টিয়ার কাজের গুরুত্ব ও সম্মান।

প্রথম দিকে, যখন চারদিকে ব্যস্ততা, অনিশ্চয়তা, আর নতুন সমাজে মানিয়ে নেওয়ার চাপে আছি, তখন ‘ভলান্টিয়ার’ শব্দটা শুনলে ভাবতাম- এটা কেবল সময় দেওয়া, কিন্তু তার প্রকৃত মূল্য হয়তো নেই। বিশেষ করে আমাদের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তো স্বেচ্ছাসেবী কাজ মানেই ‘বিনা পয়সার’ কিছু। কিন্তু এখানে এসে আমি শিখলাম- ভলান্টিয়ার কাজ মানেই কেবল ‘সেবা’ নয়, বরং এটি আত্ম-উন্নয়ন, সামাজিক সংযোগ আর ভবিষ্যতের ভিত্তি।

আমি নিজে যখন প্রথমবারের মতো ভলান্টিয়ার হিসেবে একটি অভিবাসী সহায়তা সংস্থায় কাজ শুরু করি, তখন আমার উদ্দেশ্য ছিল কেবল ব্যস্ত থাকা। কিন্তু সময়ের সাথে বুঝতে পারলাম- এই অভিজ্ঞতা কেবল আমাকে শেখাচ্ছে না, বরং আমাকে তৈরি করছে ভবিষ্যতের জন্য। সেখানে আমি কানাডিয়ান কর্মসংস্কৃতি শিখেছি, নতুন মানুষের সাথে পরিচিত হয়েছি, নিজেকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছি এবং সবচেয়ে বড়ো কথা, সেই সংস্থাই পরে আমাকে চাকরির অফার দেয়। আজ আমি যে প্রতিষ্ঠানে কর্মরত, সেখানেই আমি শুরু করেছিলাম একজন ভলান্টিয়ার হিসেবে। তাদের আস্থা, সহানুভূতি, প্রশিক্ষণ আর আমার শ্রম- সব মিলিয়ে আজ আমি সেখানে একজন পূর্ণসময়ের কর্মী।

মানবিক আচরণে ভিন্নতা : কানাডা বনাম বাংলাদেশ
বাংলাদেশের মানুষের আন্তরিকতা নিঃসন্দেহে অসাধারণ। কিন্তু কখনো কখনো সামাজিক চাপ, আগ বাড়িয়ে মন্তব্য, বা নারীকে কেন্দ্র করে তৈরি কিছু রক্ষণশীল চিন্তা আমাকে ক্লান্ত করত। কানাডায় আসার পর আমি আবিষ্কার করি- মানুষ এখানে শিষ্ট, মানবিক ও পেশাদার। ‘থ্যাঙ্ক ইউ’, ‘সরি’, ‘প্লিজ’, ‘আই অ্যাপ্রিসিয়েট’- এই শব্দগুলো শুধু সৌজন্য নয়, বরং সম্মানের প্রতীক।

এখানে কাউকে দেখলেই হাসিমুখে সম্ভাষণ জানানো হয়, লাইনে দাঁড়ানো হয় ধৈর্য ধরে এবং ভিন্ন মতামতকে শ্রদ্ধা করা হয়। এই ব্যবস্থাপনায় আমি যেন শ্বাস নিতে শিখলাম, নিজের মতো করে বাঁচার স্বাধীনতা খুঁজে পেলাম।

বহুজাতিকতা ও বিশ্বনাগরিক ভাবনা
ক্যালগেরিতে এসে বুঝলাম- জীবনটা কত বিশাল এবং সংস্কৃতির ভিন্নতা কতটা সমৃদ্ধ করতে পারে আমাদের চিন্তাধারা। এখানে প্রতিদিনই দেখা মেলে নানা দেশের অভিবাসীদের- ফিলিপাইন, চীন, ভারত, সোমালিয়া, আফগানিস্তান, লেবানন, সিরিয়া- সবাই একে অপরের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছে, সন্তানদের স্কুলে নিয়ে যাচ্ছে, পার্কে হাঁটছে। বিশেষ করে ভেনিজুয়েলা, ইরিট্রিয়া ও ইরানের অনেক নারী অভিবাসীর সাথে কাজ করার সুযোগ হয়েছে, যারা তাদের নিজ নিজ দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক দমন-পীড়ন কিংবা অর্থনৈতিক সংকটের মুখে কানাডায় আশ্রয় নিয়েছেন। তাদের অভিজ্ঞতা আমাকে বারবার ভাবিয়েছে। তাদের চোখে আমি দেখি সাহস, আত্মত্যাগ ও নিজের অধিকারের জন্য লড়াই করার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। তাদের সঙ্গে কাজ করে আমার নিজের নারীত্ব, পরিচয় ও শক্তির সংজ্ঞাও আরও গভীর হয়েছে। প্রতিদিনই নতুন ভাষা, পোশাক, খাবার, বিশ্বাস ও জীবনধারা দেখে শিখছি। আমার সন্তানও এই পরিবেশে বড়ো হয়ে ওঠছে, যেখানে বৈচিত্র্যই শক্তি। এই বহুজাতিক সমাজ আমাকে শিখিয়েছে- মানুষ হিসেবে আমাদের মূল অনুভব এক, শুধু প্রকাশের ধরন ভিন্ন। ভিন্নতাকে শ্রদ্ধা করা মানে নিজের অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করা। বিশ্বটা অনেক বড়ো এবং প্রতিটি সংস্কৃতির মধ্যেই রয়েছে কিছু শেখার মতো বিষয়। একসময় যে তরুণী শুধুই ‘বাংলাদেশি’ ছিল, আজ সে নিজেকে বিশ্বনাগরিক বলে ভাবতে শিখেছে।

নারী হিসেবে আমার উপলব্ধি
বাংলাদেশে বেড়ে ঠলেও সবসময় স্বাধীনচেতা ছিলাম। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন- পরিবার, সমাজ, কখনো কখনো ধর্মীয় গোঁড়ামি- আমার পছন্দ, চাওয়া, মতামতকে পিছনে ঠেলে দিয়েছে। কানাডায় এসে আমি প্রথমবারের মতো বুঝতে পারি- নারী হিসেবে আমার কণ্ঠস্বর কতটা মূল্যবান। এখানে আমি দেখি- নারীরা বাস চালায়, পুলিশ হয়, স্কুল পরিচালনা করে, রাজনীতি করে, ব্যবসা চালায়। একজন নারী হিসেবে আমি এখন যে কাজটাই করি না কেন, সমাজ আমাকে সম্মান করে, মূল্যায়ন করে। এই সম্মান আমাকে আরও সাহসী করে তোলে। আমি চাই আমার মেয়ে যেন ভবিষ্যতে আরও আত্মবিশ্বাসী, স্বাধীনচেতা ও মানবিক হয়।

আমি কে?
একজন অভিবাসী নারী হিসেবে এই প্রশ্নটা বারবার আমাকে ভাবায়- আমি কে? আমি কি শুধুই একজন মা? একজন অভিবাসী? একজন কর্মজীবী নারী? একজন বাংলাদেশি, না কি কানাডিয়ান?

আসলে আমি এইসব পরিচয়ের মিশ্রণ। আমার শেকড় বাংলাদেশে, কিন্তু ডালপালা ছড়িয়েছে কানাডার মাটিতে। আমি আমার ভাষা, সংস্কৃতি, রান্না, আচার-ব্যবহার সব নিয়ে গর্ব করি, আবার কানাডার মানবিকতা, শৃঙ্খলা, এবং সমতার সংস্কৃতিও ভালোবাসি। এই দ্বৈত পরিচয়ই আমাকে পূর্ণ করে তোলে। আমি আজ যা, তার পিছনে রয়েছে এই দুই সংস্কৃতির সম্মিলন।

আমার পথচলা এখনো চলছে
আজ এত বছরের অভিজ্ঞতার পর আমি বলতে পারি- অভিবাসন কোনো সরল পথ নয়। এটি ধৈর্যের, শেখার, ভুল করার, আবার ঘুরে দাঁড়ানোর এক দীর্ঘ যাত্রা। কানাডা আমাকে শুধু নিরাপদ আশ্রয় দেয়নি, দিয়েছে নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলার সুযোগ। একজন নারী হিসেবে আমি এখানে সাহস খুঁজে পেয়েছি, লড়াই করার শক্তি পেয়েছি, নিজের কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব দিতে শিখেছি। আমি আজ গর্বের সঙ্গে বলতে পারি- আমি একজন বাংলাদেশি অভিবাসী নারী, যে কানাডায় এসে নিজের স্বপ্নকে আবার নতুনভাবে রাঙিয়েছে।

লেখক পরিচিতি
বাংলাদেশি-কানাডীয় নবীন লেখক। পেশায় একজন ইএসএল ইন্সট্রাক্টর। পড়াশোনা ইংরেজি সাহিত্যে। সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠায় ছোটোবেলা থেকেই লেখালেখির প্রতি অনুরাগ। বিভিন্ন সময়ে নানা পত্র-পত্রিকা ও ম্যাগাজিনে অনিয়মিতভাবে প্রবন্ধ ও কবিতা প্রকাশিত হয়। সম্প্রতি তার একটি লেখা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে ‘কানাডা: বিবিধ প্রসঙ্গ’ গ্রন্থে।