ছুঁয়ে যাবে আকাশসীমা
২০১৭ সাল। আমার ছোটো ছেলে মুহতাসিন আহমেদ, যাকে আমি আদর করে তাসিন ডাকি; সে তখন ক্লাস ওয়ানে পড়ে। একদিন স্কুল থেকে ফিরে একটা ছোটো কাগজের ব্যাগ আমার হাতে দিয়ে বললো, “I need four things to describe myself.” আমি তো চিন্তায় পড়ে গেলাম এত ছোটো ব্যাগ! এর মধ্যে কী দেবো, যা দেখিয়ে আমার ছেলেটা তার সম্পর্কে অন্যদেরকে ধারণা দিতে পারে? আমি বললাম, “তুমি ফ্যামেলি পিকচার নিতে পারো, কিন্তু এটা তো তোমার এই ছোট্ট ব্যাগে ধরবে না। আমি কি একটা বড়ো ব্যাগে এটা দিতে পারি?” তাসিন বললো, “না, টিচার এই ব্যাগেই নিতে বলেছে। “কোনো উপায় না দেখে ওকে জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি কী নিতে চাও?” সে বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললো, “You can print it.” দেখলাম ওর কথাই ঠিক। এতে সহজে সমস্যার সমাধান হয়। তারপর আর কী নিতে চাও? ও বললো, “I want to take my Jack and Meddle. I can draw a picture?” জ্যাক হচ্ছে একটা ছেলে পুতুল। তাসিন অনেক সময় ওকে নিয়ে খেলে, কথা বলে বন্ধুর মতো। মাঝে মাঝে তাসিনের কথা বলার ধরন দেখে মনে হয়, ও সত্যি বুঝি ওর কোনো বন্ধুর সাথে কথা বলছে। আর মেডেলটা সে পেয়েছে আলমপিয়া মিউজিক ইন্সটিটিউশন থেকে বাংলা গান গেয়ে। আমি বললাম, তুমি ছবি দেখিয়ে কী বলবে? সে উত্তর করলো, আমি আমার ফ্যামেলি মেম্বারদের পরিচয় করিয়ে দেবো। তারপর সে আঁকতে বসলো তার প্রিয় খেলা Minecraft. সেখানে সে আঁকলো তার খেলার বিভিন্ন ধাপ, আর ক্যাপশনে লিখলো, কীভাবে খেলতে হয় গেমটি।
এখানে স্কুলগুলোতে ছোটোবেলা থেকেই বাচ্চাদেরকে বড়োদের মতো Presentation করতে হয়। তাসিন হয়তো ওর প্রিয় চারটা জিনিস দেখিয়ে ক্লাসে বলবে ওর নিজের সম্পর্কে, ওর ভালো লাগা বা মন্দ লাগার ওপর। ওর বলা শেষ হলে ওর বন্ধুদেরকে সুযোগ দেবে ওকে প্রশ্ন করার জন্য। ও চেষ্টা করবে তাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে। ওকে প্রশ্ন করার সময় ওর বন্ধুদের হাত তুলতে হবে। ও যাকে প্রশ্ন করার সুযোগ দেবে সে প্রশ্ন করবে। বাচ্চারা খুব Excited থাকে Presentation থাকলে। মজার ব্যাপার হলো, ওরা যাই বলুক না কেন, কোনো উত্তরকে ভুল বলা হয় না। কেউ কোনো ভুল উত্তর করলে টিচার বলে “Nice try. May be you can say this way.” এজন্য বাচ্চারা তাদের মনে যা আসে সহজে প্রকাশ করতে পারে। ক্লাসকে ওরা দেখে ফান হিসেবে। ওদের মধ্যে স্কুল ভীতি কম কাজ করে। সেদিন সে তার ‘ফোর থিংস’ ব্যাগে ঢুকিয়ে সকাল সকাল স্কুলে গেছে। সকালে স্কুলে যাওয়ার সময় কোনো ঝামেলা করেনি। নিজের গরজেই সব কাজ করেছে। আমি যখন ওকে স্কুলে দিয়ে আসছিলাম, সে আমাকে তাড়া দিচ্ছিল, তার ক্লাসে দেরি হয়ে যাবে সেই ভয়ে। আমি স্কুলের গেটে গিয়েই দেখি ওর দুই বন্ধু দাঁড়িয়ে আছে। তাসিন ওদেরকে দেখেই আমার হাত ছেড়ে ‘বাই আম্মু’ বলে এগিয়ে যায় ওদের দিকে।
বিকেল ৩:৪৫ বাজে। আমি দাঁড়িয়ে আছি ওদের স্কুলের গেটে। ছুটির ঘণ্টা বাজতেই দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসছে বাচ্চারা। সেখানে একজন টিচার দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি হাসিমুখে বাচ্চাদেরকে বিদায় দিচ্ছেন। এভাবে আমার তাসিনও বেরিয়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে একটা Rubik Cube (একটা ছোটো খেলনা) দেখিয়ে বললো, “টিচার আমাকে দিয়েছে। This is my reward..” আমি জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি এটা কেন পেয়েছো? ও বললো, “I got it for my responsibility, respect and nice behaviour to others. “তুমি কি responsibility করেছো? সে বললো, “আমি ফ্রেন্ডদেরকে হেল্প করেছি। রুম ক্লিন আপ করেছি। Are you happy and proud of me? “আমি ওকে আদর করে বললাম “আমি অনেক খুশি আর প্রাউড তোমার জন্য।” তাসিন আমার হাতে ওর ব্যাগ দিয়ে দৌড়ে মাঠে চলে গেল খেলতে। আর আমি বসে রইলাম ওর খেলা শেষ হওয়ার অপেক্ষায়।
২.
এজ্যাক্স থেকে গত বছর, মানে ২০২৪-এ আমরা টরন্টো মুভ করেছি হঠাৎ করেই সিদ্ধান্ত নিয়ে। মনে হয়েছিল টরন্টো এলে সবার জন্য সুবিধা হবে। কিন্তু আমাদের এই সিদ্ধান্তটা আমাদের দুই ছেলে ওয়ালিদ আর তাসিন কেউ মানতে পারছিল না। ওদের এজ্যাক্সের শান্ত নিরিবিলি পরিবেশই বেশি পছন্দের ছিল। আর আমার ছোটো ছেলে তাসিন ছিল একটা গিফটেড স্কুলে। ওর সব বন্ধুদেরকে ছেড়ে আসাটা ওর জন্য ছিল ভীষণ কষ্টের। আমাদের ধারণা ছিল এখানে একটা ভালো স্কুলে গেলে, নতুন বন্ধুদের সাথে মিশে গেলে ওর ভালো লাগবে। কিন্তু আমাদের ধারণা আর বাস্তবতা এক ছিল না। টরন্টোতে ইচ্ছে করলেই একটা ভালো স্কুলে বা নাম করা স্কুলে ভর্তি হওয়া যায় না নিজের বসবাসের এলাকার বাইরে। গ্রেড সেভেনে এসে নতুন স্কুলে ভর্তি হয়ে মানিয়ে নিতে আমার ছোটো তাসিনের খুব সমস্যা হচ্ছিল। স্কুল থেকে ফেরার পর তার কেমন দিন কাটল জানতে চাইলেই বলতো বোরিং। টরন্টোতে এসে বুঝতে পারলাম, গিফটেড স্কুল আর রেগুলার স্কুলের কারিকুলামের পার্থক্য। Gifted স্কুলে পাঠ্যসূচি হয় দ্রুতগতির ও জটিল, যেখানে শিক্ষার্থীদেরকে উচ্চ মানসিক সক্ষমতা অনুযায়ী চ্যালেঞ্জ দেওয়া হয়, অন্যদিকে regular স্কুলে সবাইকে একই ধরনের গতি ও গভীরতায় শিক্ষা দেওয়া হয়। শিক্ষাদান পদ্ধতিতেও পার্থক্য থাকে- Gifted প্রোগ্রামে inquiry-based ও critical Thinking -এর ওপর জোর দেওয়া হয়, আর regular স্কুলে সাধারণত structure-based পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। সহপাঠীর পারিপার্শ্বিকতাও আলাদা- gifted প্রোগ্রামে সবাই মেধাবী ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন হয়, যেখানে regular স্কুলে মিশ্র মেধার শিক্ষার্থীরা থাকে। শিক্ষকদলের মধ্যেও পার্থক্য রয়েছে; gifted স্কুলে অনেক সময় বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক থাকেন, যাঁরা gifted শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন বুঝে ক্লাস পরিচালনা করেন। ভর্তি প্রক্রিয়াও আলাদা- gifted প্রোগ্রামে ভর্তি হতে IQ test, report card ও শিক্ষক পর্যবেক্ষণ দরকার হয়, সেখানে regular স্কুলে সাধারণভাবে এলাকাভিত্তিক ভর্তি হয়। চাপ ও প্রত্যাশার দিক থেকেও gifted স্কুলে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বেশি মানের কাজের প্রত্যাশা থাকে। মানসিক চাপও বেশি হতে পারে। যখন regular স্কুল তুলনামূলকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশে চলে। সাপোর্ট ব্যবস্থাও ভিন্ন- gifted স্কুলে থাকেenrichment activity, mentorship I advanced learning tools, আর regular স্কুলে থাকে সাধারণ ভিত্তিমূলক সহায়তা। তবে এই নীতিমালাগুলো কানাডার প্রতিটি বোর্ড ও প্রদেশে কিছুটা ভিন্ন হতে পারে।

ছোটোবেলা থেকেই তাসিনের জানার আগ্রহ প্রবল। তাই প্রশ্ন করে উত্তর না পেলে ওর ভালো লাগতো না। ওর মুখ দেখে আমার ভীষণ খারাপ লাগতো। আমার নিজের ওপর ভীষণ রাগ লাগতো এমন একটা ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য। তাই চেষ্টা করতাম মাঝে মাঝে এজ্যাক্সে নিয়ে গিয়ে ওর বন্ধুদের সাথে দেখা করিয়ে আনতে বা ওর বন্ধুদের বাসায় ডেকে আনতে। এভাবেই পার হলো তার গ্রেড সেভেন। আমার মনে হলো, তাসিনকে এই অবস্থা থেকে বের করে আনতে ওকে মোটিভেট করার সাথে সাথে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ দেওয়াটা খুব দরকার ।
আমি ওকে বোঝাতে শুরু করলাম “তুমি কোন স্কুলে পড়ছো এটা কোনো বিষয় না। তুমি কীভাবে স্কুলে নিজেকে বিজি রাখবে তার ওপর নির্ভর করবে তোমকে স্কুলে অন্যরা কীভাবে গ্রহণ করছে। তোমার পারফর্মেন্স তার ওপর নির্ভর করবে। উদাহরণ দিয়ে আমি বলি তুমি যদি আগে তোমার ক্লাসের কাজ শেষ করে ফেলো তাহলে তোমার অন্য যে বন্ধুরা কাজটা করতে পারছে না তাদেরকে বুঝিয়ে দিয়ে সাহায্য করতে পারো।” বিষয়টা আমার ছেলের ভালো লাগলো। সে মাথা ঝাঁকিয়ে বললো ‘ঠিক আছে’।
গ্রেড এইটে ক্লাস শুরুর প্রথম দিনেই তাসিন ক্লাস টিচারকে তার আগের ক্লাসে সে যে সকল সমস্যা ফেস করেছে সেসব বিষয়গুলো তুলে ধরে। ক্লাস টিচার মিস্টার ডারডেইন তাকে আশ্বস্ত করেন তিনি তাকে সাহায্য করবেন। তার জন্য এডভান্স কারিকুলাম সেট করবেন।
শুরু হয় তাসিনের নতুন জার্নি। মিস্টার ডারডেইন তাকে ক্লাসে বিজি রাখতে থাকেন বিভিন্ন টাস্ক দিয়ে। সাথে ক্লাসে অন্য বন্ধুদের বুঝিয়ে দেওয়ার দায়িত্বটাও তার ওপর ছেড়ে দেন তিনি। মাঝে মাঝে তিনি তাসিনকে পাঠান অন্য সেকশনে হেল্প করতে। তাসিন খুব আনন্দের সাথে তার কাজগুলো করতে থাকে। বিকেলে কাজ থেকে ফিরে এসে আমি যখন তাসিনকে জিজ্ঞেস করি, স্কুলে কেমন কাটলো সারাদিন? তাসিন হাসি মুখে উত্তর করে, গুড। মাঝে মাঝে বাংলায় বলে মোটামুটি। ওর বলার ধরন দেখে আমি হেসে ফেলি।
৩.
কিছুদিন পর দেখি তাসিন ডুওলিঙ্গুয়াল প্রাকটিস করছে ফ্রেন্স ভালোভাবে আয়ত্ত করার জন্য। সে প্রতিদিন সময় ও নিয়ম করে বসে ১০ মিনিটের জন্য। কোনোদিন ভুলে গেলে দেখি রাতে ঘুমের আগে হলেও বসছে প্রাকটিস করতে।
তার কিছুদিন পর প্যারেন্টস মিটিং-এ আমাকে ডাকা হয়। অন্য প্যারেন্টসদের সাথে আমিও যাই তাসিনের সব শিক্ষকদের সাথে কথা বলতে। দেখি তাসিন স্কুলে নতুন হলেও টিচাররা তাকে খুব পছন্দ করেন। মিস্টার ডারডেইন তাঁর ক্লাসটা সাজিয়ে রেখেছেন স্টুডেন্টদের সমাধান করা অংক দিয়ে, আর্ট ওয়ার্ক দিয়ে। তিনি বলেন, কীভাবে তিনি তাসিনকে বিজি রাখেন। দেখা হলো তাসিনের ফ্রেন্স টিচারের সাথে। তিনি বললেন, তাসিন নিজের ক্লাস ওয়ার্ক শেষ করে কীভাবে তাকে অন্য স্টুডেন্টদের খাতা দেখতে সাহায্য করে। আমি তাদেরকে ধন্যবাদ দিয়ে মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি। আমি দেখলাম, এখানকার শিক্ষকরা কীভাবে ছাত্র ছাত্রীদেরকে সাহায্য করেন।

স্কুলের টিচাররা ছাত্রদের একাডেমিকের পাশাপাশি প্র্যাকটিকাল লাইফ স্কিল উন্নত করতে বাস্তব জীবনের সমস্যার সমাধানভিত্তিক অ্যাসাইনমেন্ট দেন (যেমন বাজেট তৈরি, ক্ষুদ্র ব্যবসা পরিকল্পনা)। গ্রুপে কাজ দিয়ে দলগত চিন্তা ও সহযোগিতার মানসিকতা তৈরি করেন। হোমওয়ার্ক ও পরীক্ষার শিডিউল তৈরি করতে সহায়তা করেন। বক্তৃতা, প্রেজেন্টেশন ও বিতর্কের মাধ্যমে প্রকাশের দক্ষতা বাড়ানোর চেষ্টা করেন। ক্লাসরুমে কনফ্লিক্ট হলে শান্তভাবে সমাধানের কৌশল শেখান। ক্লাসের নির্দিষ্ট কাজের দায়িত্ব ছাত্রদের মধ্যে ভাগ করে দেন। ভলান্টিয়ারিং বা কমিউনিটি সার্ভিসে অংশগ্রহণ বাড়ানোর মাধ্যমে সহমর্মিতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা শেখান। রোল প্লে ও নাটকের মাধ্যমে বিভিন্ন সামাজিক পরিস্থিতি অনুকরণ করতে শেখান। ব্যাঙ্ক, হাসপাতাল, বাজার বা অফিস ভিজিট করিয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা দেওয়ার চেষ্টা করেন। ইমেইল লেখা, গুগল ডকস বা স্প্রেডশিট ব্যবহারের মাধ্যমে টেকনোলজি ব্যবহার শেখান। সফল বা ব্যর্থ মানুষের গল্প বলে অনুপ্রাণিত করেন। নিজের কাজ নিজে বিশ্লেষণ করতে শেখান।
শিক্ষকদের উৎসাহে তাসিন স্কুলে যাওয়ার প্রতি আগ্রহী ওঠে। তার ক্লাস শুরু হয় সকাল ৮টা ৫৫ মিনিটে। কিন্তু প্রতিদিন সে স্কুলে যাওয়া শুরু করে সকাল ৮টা ৩০-এর আগে। কেন না সকালের এনাউন্সমেন্ট তাকে করতে হয়। তাই স্ক্রিপ্ট আয়ত্ত করতে একটু আগে ভাগেই তাকে স্কুলে ঢুকতে হয়। ঋতু, মাস, দিন ভেদে স্ক্রিপ্টের লেখা তথ্যের পরিবর্তন পরিমার্জন করে উপস্থাপন করতে হয়। তাই বেচারা তাসিন এ-বছর একদিনও অ্যাবসেন্ট থাকতে পারেনি ক্লাসে।
তাসিনের স্কুল ব্যাগ চেক করে বেশির ভাগ সময়েই ওর লাঞ্চ বক্স দেখি সকালে আমি যেভাবে লাঞ্চ দিই, সেভাবেই ফিরে আসে। মানে, লাঞ্চে সে কোনো কিছুই খায় না। এটা দেখলেই আমার মেজাজ সপ্তমে ওঠে যায়। আমি রাগী গলায় জিজ্ঞেস করি, খাওনি কেন? তাসিন মন খারাপ করে বলে, সময় পাইনি খাওয়ার। আমি বলি এক ঘণ্টা লাঞ্চ ব্রেক থাকার পরও সময় পাও না কীভাবে? কত সময় লাগে তোমার লাঞ্চ খেতে?
তাসিন উত্তর দেয় “ঐ সময়ে আমার জুনিয়র আর সিনিয়র কিন্ডারগার্টেনের বাচ্চাদেরকে লাঞ্চে হেল্প করতে হয়। অনেক সময় অফিস সেক্রেটারি না থাকলে আমাকে তাঁর ফোন কল রিসিভ করতে হয়। ফোনে পারেন্টসদের বিভিন্ন ইনফরমেশন দিই। আমি ইনফরমেশন দিতে না পারলে সেক্রেটারিকে ফোনটা পাস করি।”
আমি বলি “বুঝলাম তোমার অফিসে অনেক কাজ থাকে। কিন্তু এর ফাঁকেও তো তুমি তোমার লাঞ্চটা করে নিতে পারো!”
তাসিনের উত্তর যেন রেডি। সে বলে, ঐ সময়ে আমার সামনেও অনেক স্টুডেন্ট থাকে। কারো হয়তো ব্যান্ডেড লাগে। কারো হয়তো ইমারজেন্সি বাসায় কল দিতে হয়। অনেক সময় প্রিন্সিপালকে কম্পিউটার ডাটা এন্ট্রি দিয়ে সাহায্য করি।
আমি অবাক হয়ে যাই আমার ছোটো ছেলেটার এত এত দায়িত্ব পালন করা দেখে। বলা হয়নি, তাসিন ওর স্কুলে একজন কাউন্সিল মেম্বার হিসেবে কাজ করছিল। প্রিন্সিপাল আর শিক্ষকদের সহায়তায় আমার ছোটো তাসিন তার ওপর অর্পিত দায়িত্বগুলো ঠিকঠাক মতো পালন করার চেষ্টা করেছে খুব আত্মবিশ্বাস নিয়ে। সহপাঠীদের সাথে গড়ে ওঠেছে বন্ধুত্ব। দেখতে দেখতে কোথা দিয়ে গ্রেড এইট শেষ করে ফেললো তাসিন, বুঝতেই পারলাম না। এর মধ্যেই সেন্ট মারগারেট স্কুল থেকে পেলাম মুহতাসিন আহমেদের গ্রাজুয়েশন পার্টির আমন্ত্রণপত্র।
গ্রাজুয়েশন পার্টিতে গিয়ে দর্শক সারিতে বসে দেখছিলাম প্রত্যেক স্টুডেন্টের সফলতার গাথা দিনগুলোকে কতটা সম্মানের সাথে মূল্যায়ন করে স্কুল কর্তৃপক্ষ তুলে দিলেন সম্মাননা পদকগুলো। তাসিন পেলো, ‘ম্যাথ এওয়ারড’ আর ‘অন্টারিও প্রিন্সিপাল কাউন্সিল লিডারশিপ এওয়ারড’। আমার আর ওর বাবার চোখে তখন আনন্দাশ্রু। আর প্রত্যেক বাবা মায়ের চোখ মুখ উজ্জ্বল সন্তানের কৃতিত্বে।
আমার চোখে ভাসছে তখন তাসিনের গ্রেড টু-তে পড়ার সময়ের ম্যাথ ফেস্টিভ্যালের কথা। কোনো এক বিকেলে আমি যখন কাজ থেকে বাসায় ফেরার পথে ওকে বেবিসিটারের বাসায় আনতে গেলাম, সে গাড়িতে ওঠতে ওঠতে বললো, “Today is math night. May can I go to school?” আমি বললাম, “ঠিক আছে, চলো যাই তোমার ম্যাথ নাইটে। দেখি তুমি কী করো!” তাসিন খুব খুশি। তার স্কুলে ঢুকে আমিও খুব অবাক হয়েছিলাম আয়োজন দেখে। আমার আগে এমন উৎসবের ধারণা ছিল না। প্রথমে রেজিস্ট্রেশন করার পর অংশগ্রহণকারী ছাত্র-ছাত্রীদেরকে একটা শিট দেওয়া হচ্ছে স্ট্যাম্প কালেকশনের জন্য। সেখানে পুরো হল রুম জুড়ে টেবিলগুলো সাজানো রয়েছে বিভিন্ন রকম অংক করার উপকরণ দিয়ে। যেমন- একটা টেবিলকে সাজানো হয়েছে স্টোর হিসেবে। সেখানে টেবিলের ওপর সাজানো জিনিসগুলোর সাথে মূল্যও লেখা আছে। একটা টেবিল সাজানো হয়েছে লুডুর গুটি দিয়ে। এরকম প্রতিটা টেবিল থেকে সঠিকভাবে অংক করতে পারলে টিচার একটা করে স্টিকার দেবেন শিটে। সব টেবিলের অংক শেষ হলে অংশগ্রহণকারীরা স্টিকারসহ শিটটি জমা দেবে টেবিলে। আর সেটা দেখে টিচার তাকে দেবেন পুরস্কার। তাসিনের তো আগ্রহের কমতি নেই। সে বিভিন্ন টেবিলের যোগ-বিয়োগ-গুন-ভাগ-ভগ্নাংশ শেষ করে লাইনে দাঁড়ালো শেষ টেবিলে। সেখানে দুইজন প্রতিযোগী একসঙ্গে খেলবে। টিচার মুখে মুখে অংক বলবেন টেবিলে সাজানো উত্তর থেকে প্রতিযোগীদের যে প্রথম সঠিক উত্তরটি ধরবে সে নম্বর পাবে। তাসিন তখন কেবল গ্রেড টুতে পড়ে। আর ওর প্রতিদ্বন্দ্বী মেয়েটি পড়ে গ্রেড ফাইভে। টিচার দুজনকে পাঁচ পাঁচটি দশটি অংক দিলেন। আমি খুব অবাক হয়ে দেখলাম আমার ছোট্ট তাসিন সঠিক উত্তরগুলোই ধরছে। দেখলাম দুই প্রতিযোগীর পয়েন্ট সমান সমান। তাসিনের জন্য দেওয়া শেষ অংকটার উত্তর একটু দূরে থাকায় ওর চেষ্টা থাকা সত্ত্বেও মেয়েটি আগে ধরে। তাসিন একটু মন খারাপ করে বলে “Next Time”
কয়েকদিন পর তাসিন স্কুল থেকে এসে আমাকে বলে, “Maa can you close your eyes?” আমি চোখ বন্ধ করার পর সে স্কুলের ব্যাগ থেকে কিছু একটা বের করে বললো, “Open your eyes.” আমি চোখ খুলে তাকিয়ে দেখি আমার ছোট্ট তাসিন একটা গল্প লিখেছে। নাম দিয়েছে, “MR. Math”. আর উৎসর্গে লিখেছে- “This book is dedicated to my Mom. There are no words that can how I feel. I love it when you bring stuff for me. You are wonderful because you are you. I love you Mom. You are appreciated. Love Muhtaseen. ”
লেখক পরিচিতি
ছেলেবেলা থেকেই লেখালেখির সাথে জড়িত। গল্প দিয়ে তাঁর লেখার হাতেখড়ি হলেও কবিতার মাঝে আপন ভাবনার অন্তরালে ভালো লাগার মিশেলে কলম ধরেন সময়ের হাত ধরে। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘এলোমেলো ভাবনা’ (২০২০), ‘বুকপকেটে চাবি’ (২০২৪), ‘উল্টো হাওয়া’ (২০২৫)। গল্পগ্রন্থ ‘গল্পগুলো মনের-তাকে ছিল’ প্রকাশিত হয় ২০২৩ সালে। যাপিত জীবনে কাব্যকলার সৌন্দর্যে নিজেকে পরিশীলিত রাখতেই তিনি ভালোবাসেন।

