কানাডা : আমার প্রকৃত শিক্ষাভূমি
“হাউ মাচ ইজ দিস?” ক্যাশ কাউন্টারের ওপর একটা এক লিটারের দুধের কার্টুন রেখে আমি জিজ্ঞাসা করলাম। আমার হাতে গোঁজা কুড়ি ডলারের নোট দেখতে পেয়ে, নাকি আমার মুখ চোখে ফুটে ওঠা দ্বিধা ও সংশয় (বা হয়তো বোকাবোকা ভাব) দেখে জানি না, ক্যাশের ভদ্রলোক এক গাল হেসে বললেন, ‘টয়েন্টি ডলার।’ উনি ক্যাশ বাক্স খুলে কী কাজ করতে শুরু করেছেন, আর আমি নিমেষে হাতের নোটটা কাউন্টারে রেখে কার্টুনটা তুলে নিয়ে ধন্যবাদ জানিয়ে দরজার দিকে হাঁটা লাগিয়েছি। দেখতে পেয়ে ভদ্রলোক খানিকটা অবাক হয়ে খানিকটা ঘাবড়ে গিয়ে আমায় ডাকতে শুরু করলেন। “হে, ওয়েট ওয়েট কাম ব্যাক! ডিড ইয়ু রিয়ালি থিঙ্ক ইটস টোয়েন্টি ডলারস? ও নো…”
অত্যন্ত দুর্বল-বাস্তবজ্ঞানসম্পন্ন, সামাজিক আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে কিছুটা জড়তা-সম্পন্ন সদ্য তেইশে পা রাখা নবাগত আন্তর্জাতিক বিদ্যার্থী ছিলাম আমি তখন। তার আগে অবধি আমার বিশ্বের পরিধি ছিল আমার শহর কলকাতা, আমার স্কুল ও পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বর, আমার পড়াশোনা ও পরিবার-বন্ধুবান্ধব। রান্নাবান্না থেকে শুরু করে বাজার দোকান- দুনিয়াদারির বিশেষ কোনো অভিজ্ঞতাই ছিল না; সেখান থেকে এক লাফে সোজা পৃথিবীর অন্য প্রান্তে, সব্বাইকে ছেড়ে, সম্পূর্ণ একা জীবন-যাপন করতে আসলে অবশ্য অমন ভীত, দ্বিধাগ্রস্ত অনুভব করাটাই স্বাভাবিক।
২.
কানাডা আক্ষরিক এবং প্রকৃত অর্থেই আমার প্রধান ‘শিক্ষাভূমি’। নিজের দেশে নিজের পরিবারের স্নেহে যত্নে চিন্তামুক্ত দায়িত্বমুক্ত হয়ে বড়ো হয়ে ওঠার সময় শিক্ষা গ্রহণ ছিল মূলত প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যা। এখানে প্রথম হাতেখড়ি হয় জীবনশিক্ষার- অন্যের সঙ্গে মানিয়ে চলার, নিজের কাজ নিজে করার, সম্পূর্ণ অন্যরকম সামাজিক ও শিক্ষাব্যবস্থায় অভ্যস্ত হয়ে নিজের লক্ষ্যে স্থির থেকে এগিয়ে যাওয়ার, বিভিন্ন মানসিক দোটানা, অবসাদ, বিষণ্ণতা সামলিয়ে চলতে থাকার। আমি এখানে প্রথম আসি ইউনিভার্সিটি অব উইন্ডসরে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর পড়াশোনা করতে। প্রথম কয়েকটি মাস ছিল বেশ মানসিক সংগ্রামে পূর্ণ টালমাটাল অবস্থা। এক দিকে নতুন ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থার শক- মাস্টার্সের ক্লাসে দেখি প্রশ্নপত্রভিত্তিক পরীক্ষা নেই, ৯ জন মাত্র শিক্ষার্থী, আর শিক্ষকের আলাদা ডেস্ক নেই। দেখি শিক্ষক ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে একই গোলটেবিল ঘিরে পড়ে থাকা একটা চেয়ারে বসে পাশের জনের সাথে হেসে হেসে আড্ডা দিচ্ছে। বলে না দিলে দেখে বোঝার উপায় নেই কোন জন শিক্ষক। দেখি, ক্লাসে ‘লেকচার’-এর তুলনায় ‘আলোচনা’ অনেক বেশি। আমি তো দেশীয় শিক্ষা পদ্ধতিতে অভ্যস্ত- অধ্যাপক নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর কথা বলে যাবেন, আমি নোটস লিখতে লিখতে ক্রমে নিজের চিন্তার জগতে চলে যাবো আর নোটসের বদলে ফুল আঁকবো, ঘণ্টা বেজে যাবে, পরের অধ্যাপক আসবেন, একই ব্যাপার আবার হবে, আর শেষ অবধি আমি পরীক্ষার আগে নিজের মতো করে পড়ে নিয়ে পরীক্ষা দেবো। কিন্তু এখানে দেখলাম লেকচার শুনতে শুনতে দিবাস্বপ্নে লীন হওয়ার উপায় নেই। এখানে পরিকল্পিত পাঠ্য বাড়িতে পড়ে এসে ক্লাসে বিভিন্ন আঙ্গিকের পরিপ্রেক্ষিতে নিজের মতামত জানাতে হবে, অন্যদের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। অর্থাৎ, আমায় কথা বলতে হবে। কী মুশকিল! সে যতই নয় জন মানুষ হোক না কেন, প্রতি ক্লাসেই সবার সামনে আমার বক্তব্য পেশ করতে হবে জেনে আমার তো হাত পা ঠান্ডা হয়ে যেতো। আলোচনা করব কী, দু-লাইনে নিজের মত প্রকাশ করতেও গলার স্বর বের হতো না প্রথম প্রথম। দেশে ক্রিটিকদের মতামত পড়ে সেগুলো পরীক্ষায় লিখতাম, নিজের মতামত তৈরি বা প্রকাশ করার অভ্যাসই ছিল না।
অন্যদিকে, প্রতিদিন ঘুম থেকে ওঠে প্রথমেই মনে হতো- এ আমি কোথায় চলে এসেছি! বাড়ি থেকে কত দূরে! চাইলেও ফেরার উপায় নেই। ব্যাস, সাথে সাথে দু-চোখ থেকে জল পড়তে শুরু করতো আর মনে হতো, আমি নির্বাসনে। বেশ পনেরো-কুড়ি মিনিট কান্নাকাটি করে ঠান্ডা দুধ সিরিয়াল কলা খেয়ে দুরু-দুরু বুকে বেরিয়ে পড়তাম ক্যাম্পাসের দিকে। ক্লাস থাকুক বা না থাকুক, সারাদিন কাটাতাম লাইব্রেরিতে বসে, কারণ, যেখানে থাকতাম সেখানে আবার ছিল অন্য রকমের চাপ। সেই প্রথম অন্যদের সাথে একই বাড়িতে থাকার অভিজ্ঞতা হচ্ছে, আর আমার সমস্যা বাড়ির কাজ ভাগ করে করার ব্যাপারে নয়, আমার সমস্যা ছিল এক বাড়িতে থাকার পরিপ্রেক্ষিতে নিজের অপছন্দ বা অনিচ্ছা বা অসুবিধার কথা জানাতে না পারা। যেমন, খুব জোরে গান চলার কারণে আমি মন দিয়ে পড়তে পারছি না বা হাউজমেটের বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতে আমার ভালো লাগছে না কিন্তু আমি আপত্তি জানাতে বা নিজের ইচ্ছে বা পছন্দ জানাতে ভয় পেতাম। রান্না করতে ভয় পেতাম এই ভেবে যে, আমার অনভ্যস্ত হাতের অপরিপক্ব রান্না খেয়ে কী মনে করবে আমার হাউজমেট! ওর খাওয়া নষ্ট করার থেকে রান্নার চেষ্টা না করাই আমার বেশি স্বস্তির মনে হতো। এদিকে তখনও কিছু কিনতে গেলে আগেই মনে মনে ডলারকে টাকায় রূপান্তর করার অভ্যেস ছিল সুতরাং সারাদিন কফি মাফিন আর হার্ভিজ-এর “ভ্যালু বার্গার” (যত দূর মনে পড়ছে এক ডলার কয়েক সেন্ট দাম ছিল) খেয়ে দিন কাটাতাম। এখন ফিরে তাকালে বুঝতে পারি, দোষ আমারই- কারণ, আমি সোজা সহজভাবে আমার সুবিধে-অসুবিধে পারা-না-পারার কথা জানালেই সমস্যার সমাধান হয়ে যেতে পারতো বা অন্ততপক্ষে একটা মানিয়ে নেওয়ার মতো অবস্থায় আসা যেতো। কিন্তু আমি তা না করে অপছন্দের পরিস্থিতি এড়ানোর জন্য লাইব্রেরিতে বা এম্বাসাডর ব্রিজের তলা দিয়ে বয়ে যাওয়া ডেট্রয়েট নদীর ধারে গিয়ে বসে থাকতাম আর কেনা খাবার খেয়ে দিন কাটাতাম। অর্থাৎ, নিজের মত বা ইচ্ছে বা প্রয়োজন প্রকাশ করতে অদ্ভুত অযৌক্তিক এক কুণ্ঠাবোধ করতাম। আমার নিজের মত, নিজের চিন্তা ভাবনা ধারণা এগুলো জরুরি নয় বা ব্যক্ত করার মতো যথেষ্ট অর্থবহ নয়, এমনটা ভাবতেই অভ্যস্ত ছিলাম।
৩.
কানাডাই প্রথম শিখিয়েছে স্বাধীনভাবে সাহিত্য নিয়ে ভাবতে ও বুঝতে, নিজের মত ও অনুভূতি প্রকাশ করতে, পরীক্ষার জন্য নয়, বরং নিজের ভালো লাগার জন্য কোনো বিষয় নিয়ে চর্চা করতে। কানাডাই প্রথম শিখিয়েছে অন্যদের সাথে সৌজন্য-সম্পন্ন সম্পর্ক বজায় রেখেও নিজের পছন্দ, ইচ্ছে বা প্রয়োজনমতো চলতে পারা। কানাডাই প্রথম শিখিয়েছে নিজের ওপর বিশ্বাস করতে শেখা, নিজের সক্ষমতা সম্পর্কে সচেতন হওয়া, নিজের মতামত বা চিন্তা ভাবনাকে মূল্য দেওয়া। তবে বলাই বাহুল্য, এই শিক্ষা খুব সহজে সংগ্রামহীনভাবে প্রাপ্ত হয়নি।
এক ধাক্কায় আমায় অনেকটা পরিণত করে দিয়েছিল এখানে আমার একা একা জীবন যাপন। মাস পাঁচ-ছয়ের মধ্যে আমি অনেকটা সহজ হতে শিখে গিয়েছিলাম। আস্তে আস্তে নিজের ওপর বিশ্বাস বাড়লো, নতুন বন্ধুত্ব তৈরি হলো, আমার নিজস্ব একটা যাপনের ছন্দ তৈরি হলো। ইংরেজি সাহিত্যর প্রতি আগ্রহ এবং ভালোলাগাও বাড়তে লাগলো। যেই বুঝলাম, পরীক্ষার জুজু নেই, নিজে থেকেই বই ঘেঁটে রাত জেগে পড়ে নোটস নিয়ে ফাইনাল পেপার লেখার প্রতি আগ্রহ বাড়লো, আর অল্প অল্প করে হলেও ক্লাসে সমমনস্ক সহকর্মীদের সঙ্গে সাহিত্যালোচনা করার সাহস তৈরি হলো। তাছাড়া সাহিত্যপ্রেমের থেকেও তখন গ্রেডের দুশ্চিন্তা বেশি ছিল, আর ‘পার্টিসিপেট’ না করলে নম্বর কমে যাবে, তাই লজ্জা সংশয় ভুলে মুখ খুলতে শিখতে হয়েছিল।
অবশ্য কানাডার বদলে নিজের দেশেই বাড়ি থেকে দূরে অন্য কোনো প্রদেশে বা শহরে থেকে পড়াশোনা করলে হয়তো কিছুটা এই রকমই অভিজ্ঞতা হতো। কিন্তু কানাডার যে বৈশিষ্ট্যটি আমার মননে ও নির্মাণে গভীরতম ছাপ ফেলেছে, তা হলো এখানকার জনগোষ্ঠীর বৈচিত্র্য, এবং এই বৈচিত্র্য ভিন্নতার প্রতি সম্মান ও মূল্য দেওয়ার মানসিকতা। এই ব্যাপারে আমার প্রথম উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতা প্রাপ্ত হয় উইন্ডসর উইমেন ওয়ার্কিং উইথ ইমিগ্রান্ট উইমেন নামের উন্ডসরের একটি নবাগত সহায়তা কেন্দ্রে। ততদিনে আমি আমার নবাগত পর্যায়ের সমস্যাসমূহ কাটিয়ে মাস্টার্স প্রোগ্রামের দ্বিতীয় বর্ষে। তখন আত্মবিশ্বাসের বেশ লক্ষণীয় উন্নতি ঘটেছে এবং আমি গ্র্যাড এসিস্ট্যান্ট হিসেবে ইউনিভার্সিটির রাইটিং সেন্টারে টিউটর হিসেবে জাঁকিয়ে বসেছি, সমস্ত কোর্স বেশ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছি। ততদিনে আমার কথা বলার ভয় অনেকটা কমে এসেছে আর আমার নিজস্ব মতামত এবং ভাবনা চিন্তাও যে তাচ্ছিল্য করার মতো নয় তা বুঝতে ও বিশ্বাস করতে শিখেছি।
নিজের থেকে যেচে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে শ্রমদান করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গিয়েছি। তেমনই একটি প্রতিষ্ঠান ছিল উইন্ডসর উইমেন ওয়ার্কিং উইথ ইমিগ্রেন্ট উইমেন। সেখানে নবাগতদের ইংরেজি শেখানোর ক্লাসে শিক্ষকের সহায়ক হিসেবে আমি সপ্তাহে তিন দিন কাজ করতাম। এই ক্লাসটি আমার খুবই ভিন্নধর্মের মনে হতো; আমার মাস্টার্স ক্লাসের সঙ্গে কোনো মিল নেই। এই নবাগতরা ভিন্ন ভিন্ন বর্ণ ও সম্প্রদায়ের সদস্য ছিলেন। সোমালিয়া, সিরিয়া, রুয়ান্ডা, তুর্কি, পাঞ্জাবি, আফগানি, ভিয়েতনামি- সে এক বৈশ্বিক সম্মেলন মনে হতো। তাদের সবার একই লক্ষ্য- ইংরেজিটা এমনভাবে শিখে নেওয়া, যাতে কাজ পেতে ও কানাডীয় মূলস্রোতের অন্তর্ভুক্ত হতে অসুবিধে না হয়। কিন্তু বাস্তবে এই লক্ষ্য পূরণ করা যে কতটা কঠিন একটি কাজ, তা আমি এই অভিজ্ঞতা না হলে বুঝতে পারতাম না। এদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন কানাডায় শরণার্থী; কয়েকজন ছিলেন স্থায়ী বাসিন্দা। এরা সকলেই প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থী এবং এদের প্রত্যেকেরই নিজস্ব শিক্ষাগ্রহণের পদ্ধতি ছিল ও এনাদের শিক্ষাগ্রহণ করার ক্ষমতা ও তাগিদের স্তরও ছিল বিভিন্ন। সেই প্রথম আমার এই রকম বিশেষ আর্থ-সামাজিক অবস্থার এডাল্ট লার্নার বা প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীর সাথে কাজ করার সুযোগ হয় ও অভিজ্ঞতা তৈরি হয়। ইউনিভার্সিটির রাইটিং সেন্টারেও আমি প্রাপ্তবয়স্কদের নিয়েই কাজ করতাম। কিন্তু তা-ও, তারা শিক্ষার্থী হিসেবে এদের থেকে একেবারেই আলাদা, তাই পড়ানোর পদ্ধতি বা কৌশলও আলাদা। ইউনিভার্সিটিতে যারা রাইটিং সেন্টারে আসতেন তারা বয়সে এডাল্ট হলেও তাদের শিক্ষার্থী জীবনে বিশেষ ছেদ পড়েনি, তারা পড়াশোনার আবহেই রয়েছেন বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে। তাদের শিক্ষাপ্রদান এই নবাগত সীমিত-ইংরেজির শিক্ষার্থীদের থেকে বেশ আলাদাই হওয়ার কথা এবং আমি এই পার্থক্যটি বুঝছিলাম কাজের মাধ্যমে।
এই নবাগত প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিরা সকলেই নিজের নিজের দেশে উপার্জন করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নিজের নিজের ভাষার মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষালাভও করেছেন। তারা এখন ইংরেজি ভাষি দেশে এসেছেন বলেই তো আর তাদের ‘এ ফর অ্যাপল’ ‘বি ফর বল’ এভাবে ভাষা শেখানো যায় না! এদেরকে একেবারে প্রাথমিক ভাষাশিক্ষা প্রদান করাও বেশ পরিকল্পনা-সাপেক্ষ ব্যাপার ছিল। অথচ, শুধু পরিকল্পনার মধ্যে থাকলেই হতো না, থাকতে হতো সহজাত বোঝার ক্ষমতা। বাস্তবধর্মী পাঠ-পরিকল্পনা যেমন বানাতে শিখেছিলাম, তেমনি শিখেছিলাম তাদের মন বুঝতে, কী করলে তাদের অনুপ্রাণিত করা যাবে, কী করলে তারা অসম্মানিত বা হেয় বোধ করতে পারেন, কীভাবে শিক্ষা গ্রহণের পথে ওদের বাস্তবিক বাধা দূর করা যায়, এসবও শিখিয়েছে আমার সেই ভল্যুন্টারিং-এর অভিজ্ঞতা। কয়েক মাসের ছোটো শিশু বাড়িতে আছে, কম খরচে বিশ্বস্ত কোথাও শিশুকে দেখাশোনার কেউ নেই। ফ্যাক্টরিতে শিফট ক’দিন সকালবেলায় তো ক’দিন রাতের বেলায়, কোনো নির্ধারিত সময় নেই। বাড়িয়ে শয্যাশায়ী বয়স্ক সদস্য আছেন সারাদিন যার দেখাশোনা করতে হয়। এমন অবস্থায় নিয়ম করে বা আগ্রহ ও তাগিদের মাত্রা সমান রেখে কি শিক্ষাগ্রহণ সম্ভব? সম্ভব নয়। সুতরাং প্রাপ্তবয়স্ক বা বলা ভালো মধ্যবয়সী বা প্রৌঢ় শিক্ষার্থীদের সাথে সঠিক আচরণ করা ও তাদের বুঝতে শেখার অভিজ্ঞতাও আমায় প্রথম দেয় কানাডা।
৪.
পরবর্তীকালে আমি প্রাপ্তবয়স্কদের বিদেশি ভাষা হিসেবে ইংরেজি শেখানোর প্রশিক্ষণ (টিইএস/এফএল অর্থাৎ টিচিং ইংলিশ অ্যাজ আ সেকেন্ড/ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজ) নিয়ে তাইওয়ানে যাই ইংরেজি পড়াতে। তাইওয়ানে গিয়ে প্রথম বুঝি, কানাডার মাল্টিকালচারিজম বা বহুসংস্কৃতিবাদের মাহাত্ম্য। কালচার শকের যন্ত্রণা যদি আমার কোথাও হয়ে থাকে, তা হয়েছিল তাইওয়ানে- কানাডায় নয়। সেখানে আমি ছিলাম কার্যত ও দৃশ্যত ‘বিদেশি’। যা আমায় কানাডায় ভোগ করতে হয়নি, তা করতে হয়েছে তাইওয়ানে। সেখানে তাদের ধারণা ছিল যে, শুধু মাত্র শ্বেতাঙ্গরা ইংরেজি পড়াতে পারে দ্বিধাহীনভাবে। তাদের ধারণা, খুব ভালোভাবে প্রশিক্ষিত হলেও বা যথেষ্ট অভিজ্ঞতা থাকলেও গায়ের রং বাদামি হলে ছাত্রদের কাছে ও তাদের অভিভাবকদের কাছে ইংরেজির শিক্ষক হিসেবে বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যায়। এদিকে তা-ও আমাকে তারা নিয়োগ কিন্তু করেছেন। সুতরাং আমায় বলা হলো, কোনো অভিভাবক যদি জিজ্ঞাসা করে আমি কোন দেশ থেকে, আমি যেন বলি কানাডা। ভারত নয়। তাইওয়ানে ‘বিদেশি শিক্ষক’-এর কাছে ইংরেজি শেখাটা বা তার ব্যবস্থা করাটা বেশ জনপ্রিয় ব্যাপার ছিল তখন (২০০৫-৮)। প্রাইভেট স্কুলগুলো আমাদের মতো নর্থ আমেরিকায় প্রশিক্ষিত ইংরেজির শিক্ষক নিয়োগ করতো। সুতরাং আমি যে স্কুলে পড়াতাম তার আশেপাশে অন্যান্য স্কুলেও আমার মতো ‘বিদেশি’ শিক্ষক ছিলেন, যারা প্রায় সবাই-ই শ্বেতাঙ্গ। তারা নিজেরা তাইওয়ানের গনগনে গ্রীষ্মে পরতেন ‘ইন্ডিয়ান’ কটনের সালওয়ার কামিজ কিন্তু আমার প্রতি মঙ্গল কামনায় আমায় বলতেন জিন্স আর টপ পরতে, যাতে আমায় ‘আমেরিকান দেখতে লাগে’। সেই প্রথম আমার জাতিবৈষম্যের অভিজ্ঞতা হয়। যেটা কানাডায় থাকাকালীন কখনও হয়নি। এখানে আমি মনের সুখে শাড়ি সালোয়ার সব পরেছি, আমার বাদামি ত্বক নিয়ে দিব্যি ইউনিভার্সিটিতে ইংরেজি পড়িয়েছি, শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গ-পীতাঙ্গ সকলের লেখা শুধরে দিয়েছি, কোনো টিপ্পনী শুনতে হয়নি কখনও।
৫.
আমি তাইওয়ানের পর দেশে ফেরত যাই এবং সেখানে কয়েক বছর কাজ করার পর ফিরে আসি আমার এই ‘চোজেন ল্যান্ডে’। এবার আর একা নয়; সপরিবারে- কর্তা ও কন্যার সাথে। কানাডা আবারও আমায় সুযোগ করে দিয়েছে তার সেই সুন্দর বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে কাজ করার, অর্থাৎ বিভিন্ন জাতির মানুষের সঙ্গে কাজ করা। আমি পেশাগতভাবে বাংলা-ইংরেজি দোভাষি (ইন্টারপ্রেটার) ও অনুবাদক (ট্রান্সলেটর) আর আমি কাজ করি এমন একটি সংস্থায় সেটির কাজই হলো এই দেশের এই সুন্দর বৈচিত্র্যকে সুস্থভাবে বজায় রাখা ও ব্যবহার করতে থাকার ব্যবস্থা করা- অর্থাৎ আমরা কেনেডিয়ান সরকারকে প্রায় ৩০০টি ভাষায় অনুবাদক সরবরাহ করি। কোর্টে মামলা আছে কিন্তু ইংরেজিতে আইনজীবীর সাথে কথোপকথন চালাতে পারবেন না? ডাক্তারকে গুছিয়ে বলতে পারবেন না, ঠিক কী অসুবিধে? বাচ্চার স্কুলে শিক্ষক কী বলছেন, আপনি ঠিক বুঝতে পারছেন না? অনুরোধ করুন, সরকারি খরচায় অনুবাদক হাজির হয়ে যাবে। আমাদের সংস্থা কানাডার বৃহত্তম ভাষা-পরিষেবা প্রদানকারীদের মধ্যে অন্যতম। পেশাদার অনুবাদক হওয়ার প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়। আমাদের সংস্থা কানাডায় ভাষাগত সমতা ও আইনি অধিকার দাবিতেও অগ্রগণ্য। মাতৃভাষা রক্ষা, সংরক্ষণ, চর্চা ও প্রতিদিনের ব্যবহারে তাকে ধারণ করে রাখা ও পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া আমাদের যৌথ দর্শন।
সমতা ও বৈচিত্র্যকে উদযাপন করার সুযোগ দিয়েছে এই দেশটি, যার জন্য আমি কৃতজ্ঞ।
লেখক পরিচিতি
শ্রেয়সী বোস দত্ত কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় এবং কানাডার ইউনিভার্সিটি অফ উইন্ডসরে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। অনূদিত সাহিত্য নিয়ে তাঁর বিশেষ আগ্রহ। তিনি নিজেও সাহিত্যভিত্তিক নন-ফিকশন, সাক্ষাৎকার এবং প্রবন্ধ অনুবাদ করেছেন, যেগুলো বই আকারে ও বিভিন্ন সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। বাংলা থেকে ইংরেজিতে প্রকাশিত গ্রন্থ তিনটি।

