সোনার হরিণ
নারগিস দোজা
কাওয়ার্থা লেক কাউন্টি। এখানেই অবস্থিত দা সেন্ট্রাল ইস্ট কারেক্সন সেন্টার। অন্টারিওর ম্যাক্সিমাম সিকিউরিটি কারেক্সন সেন্টার বা জেলখানা। লিন্ডসে সুপার জেল নামেও এটা পরিচিত। আজ একজনকে ছেড়ে দেয়া হবে জেল থেকে। জেলারের অফিসে বসে আছে সে। অনেকদিন ধরে ছিল এখানে। প্রায় দশ বছর। দুইজনকে খুন করার জন্যে বারো বছরের জেল হয়েছিল তার। গুড বিহেভিয়ারের জন্য দুই বছর রেয়াত দেয়া হয়েছে। নাম সামি ওরফে সামিউর। বাংলাদেশী। বয়স সাতচল্লিশ। যখন ঢুকেছিল তখন টগবগে মাথা গরম এক তরুণ ছিল। এখন কাঁচাপাকা চুলের এক প্রৌঢ়। সেন্টার থেকে তাকে একসেট পরনের কাপড় দেয়া হয়েছে। সাথে গরম কাপড়ও। জেলার তাকে তার পাওয়া মিটিয়ে দিলেন। যা সে প্রথম চার বছর কামলা খেটে আর বাকি ছয় বছর কাজ করে অর্জন করেছে। তাকে লিন্ডসে ট্যাসক্সি স্ট্যান্ডে পৌঁছে দেবে জেলখানা থেকে সরবরাহ করা গাড়ি। সেখান থেকে ট্যাক্সি নিয়ে যেতে হবে অশোয়া গো স্টেশনে। তারপর ট্রেনে করে টরন্টোতে ইউনিয়ন স্টেশনে। জেলারের কাছ থেকে জেনে নিয়েছে সে। একজন এসে জানালো, “সামি ক্যাব চলে এসেছে।“ সে উঠে দাঁড়ালো। জেলারের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল হ্যন্ডসেকের জন্যে। তারপর বের হয়ে গেল রুম থেকে। জেলার আস্তে করে বললেন, “হোয়াট এন ওসেটেড অফ লাইফ।“ জেলার সামিউরের কাহিনি জেনেছেন আসার পরপরই।
সামিউর ক্যাবে ওঠার আগে শেষবারের মতো তার দশ বছরে আবাসস্থলটাকে মাথা তুলে দেখলো। গো ট্রেনের সিটে বসে বাইরের দিকে চেয়ে আছে স্যাম ওরফে সামিউর রহমান। জানালার কাচের অপর পাশ দিয়ে সাই সাই করে চলে যাচ্ছে পাতাবিহীন ন্যাড়া গাছগুলো। মার্চমাসের অর্ধেকের বেশি চলে গেছে। মার্চ মাস বাংলাদেশের স্বাধীনতার মাস। তার একটু শীত লাগছে। জেলখানা থেকে দেয়া জ্যাকেটের চেনটা তুলে দিল গলা পর্যন্ত। কটা বাজে কে জানে! টরন্টোতে পৌছাতে পৌছাতে একটা বেজে যাবে। ট্রেনে ওঠার আগে দুটো রোস্টেড বেগল আর এককাপ কফি খেয়েছিল টিম হর্টন থেকে। ট্রেনের সাউন্ড সিস্টেমে ঘোষণা হচ্ছে ঘণ্টা খানেকের মধ্যে টরন্টোতে পৌছে যাবার।
আজ থেকে পনেরো বছর আগে সামিউর রহমান তিনবছরের ডাক্তারি করার অভিজ্ঞতা নিয়ে কানাডায় পা রেখেছিল স্বস্ত্রীক ইমিগ্রান্ট হয়ে। চোখে একগাদা স্বপ্ন নিয়ে। কানাডায় থিতু হবে নিজের নুতন পরিচয় গড়বে। এসে উঠেছিল স্ত্রী নাজমার মামার বাসায়। তারা থাকেন স্কারবরোতে। নিজেদের ফ্লাটে। একমাত্র ছেলে থাকে বৃটিশ কলাম্বিয়া বা বিসিতে। একমাত্র মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। সে থাকে অসোয়াতে।
কিন্তু কানাডায় পা রাখার পরে প্রথম বড়ো ধাক্কাটা খেলো যখন তার মামা শশুরের কাছে শুনলো বাংলাদেশী ডাক্তারি ডিগ্রি এখানে রেকগনাইজড নয়। এর আগে সে দুই বছর কাতারে জব করেছে। এপ্লাইও করেছে সেখান থেকেই। এখানে ডাক্তারি করতে হলে পরীক্ষা দিয়ে পাশ করতে হবে আগে। পরীক্ষা দেবে ভেবে খোঁজ খবর নিতে যেয়ে তার চক্ষু চড়ক গাছ হয়ে যাবার যোগাড়। পরীক্ষা একটা নয় দুটো দিতে হবে – ফেডারেল এবং প্রোভিন্সিয়াল। তবে সে পরীক্ষা নাকি খুব কঠিন। সেটা পরের কথা। আগে একটা চাকুরি দরকার । সংসার চালানোর জন্যে। বাসা ভাড়া নিতে হবে সবার আগে। কারণ কতোদিন আর মামা শ্বশুরের বাসায় থাকা যায়। যদিও তার স্ত্রী নাজমা ওরফে নাজুকে তার মামা মামি যতোদিন একটা চাকরি হচ্ছে সেখানেই থাকতে বলেছিল। মামা শ্বশুর আমির সাহেবের কথামতো তার সাথে গিয়ে একটা জয়েন্ট ব্যঙ্ক একাউন্ট খুলে এলো নাজু আর তার নামে। আমির সাহেবের স্ত্রী বাসায় বেবী সিটিং করেন। নাজু তাকে সাহায্য করা শুরু করলো। তাদের তিন বেডরুমের একটা সামিউরদের ছেড়ে দিয়েছেন। মামাতো বোনের সাথে নাজুর কথা হয়েছে । তারা লং উইকেন্ডে আসবে তাদের সাথে দেখা করতে।
ট্রেনের যাত্রীদের নড়াচড়া করতে দেখে সামিউর বুঝতে পারলো ইউনিয়ন স্টেশন পৌঁছনোর বেশি দেরি নেই। টরন্টোতে পৌঁছনোর পর কী করবে কোথায় উঠবে এখনো ঠিক করেনি। গত দশ বছর কারো সাথে ধরতে গেলে কোন যোগাযোগই ছিল না। খুনের কেস চলাকালীন যখন টরন্টো ইস্ট ডিটেনশন সেন্টারে ছিল তখন নাজুর মামা মাঝে মাঝে যেয়ে দেখা করতেন। যদিও পরিবারের সবাই সেটা পছন্দ করতো না। তবুও যেতেন। কাওয়ার্থাতে পাঠানোর পর দুই একবার গিয়েছেন। তারপর আস্তে আস্তে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এই নিয়ে তার কোন কষ্ট নেই। তাদের দোষও দেয় না সে। তাদেরকে ঝামেলায় ফেলতে চায় না বলে সে তাদেরকে তার রিলিজের খবরও জানায়নি। হাজার হলেও জেলখাটা খুনের আসামী সে।
ট্রেন ধীরে ধীরে স্টেশনে প্রবেশ করছে। সে নাজুকে দেখতে যাবে পিকারিংয়ে। আর সে জন্যেই মামা শ্বশুরের সাথে দেখা হওয়া দরকার। নাজুর ঠিকানাটা নেবার জন্যে। ইউনিয়ন স্টেশনে নেমে প্রথমে সে খোঁজ করে স্কারবরোর বাস কয়টায় ছাড়বে। আগেই জেনেছে রুট নম্বর। একঘণ্টা দেরি আছে দেখে পাশের ম্যাগডোনাল্ডসে ঢুকলো সে। একসময় হারাম হালালের দিকে নজর রাখতো খুব। দশবছর জেলে কাটিয়ে সে সবের বালাই নেই আর। তবে পর্কটা এখনও ছোঁয় না সে। একটা ডবল বিগ ম্যাক আর একটা জিঞ্জার বিয়ারের অর্ডার দিল সে। একটা মোবাইল দরকার। জেলখাটা আসামীদের বেলায় কী নিয়ম খবর নিতে হবে। এটা নিয়েও মামার সাথে কথা বলা দরকার। একটা কয়েন ফোন খুজে বের করে মামার মোবাইল নম্বরে ফোন দিলো। কেউ ধরছে না দেখে কেটে দিল সে। তারপর বাসার নম্বরে ফোন করলো সে। এবার ফোন ধরলো নাজুর মামি। সামিউর নিজের পরিচয় দিতে হকচকিয়ে গেলেন। কোথা থেকে ফোন করেছে জিজ্ঞেস করতে জানালো ইউনিয়ন স্টেশন থেকে। জানতে চাইলেন কবে ছাড়া পেয়েছে সে। আজকেই শুনে বাসায় যেতে বললেন। সামিউর মামা শ্বশুরের নম্বরটা লিখে নিল। বাস ছাড়ার সময় হয়ে এসেছে দেখে সে বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে দাড়ালো। তার আগেই টিকিট করে নিয়েছে। পৌঁছনোর পর আপাতত বেড অ্যান্ড ব্রেকফাস্ট মোটেলে উঠবে। বাস সময় মতোই পৌঁছে গেল। স্কারবরো টাউন সেন্টারে ওয়ালমার্ট থেকে একটা ছোট হ্যান্ডব্যগ আর কয়েকটা টি-শার্ট, একজোড়া জিন্স, আন্ডারঅয়ার, দুটো সর্টস কিনলো। সাথে একটা টাওয়েল কিনলো সে। পেস্ট আর ব্রাশ, সেভিং ক্রিম রেজারও কিনলো। তারপর মামা শ্বশুরকে ফোন করলো সে। উনি অলরেডি স্ত্রীর কাছ থেকে সামিউরের ফোন করার কথা শুনেছেন। সামিউরের ফোন পেয়ে জানতে চাইলেন সে কোথা থেকে ফোন করেছে। টাউন সেন্টারের কথা শুনে তাকে ওখানেই থাকতে বলে বললেন উনি আসছেন। দেখা হবার সাথে সাথেই সামিউরের কথায় কান না দিয়ে ধরে বাসায় নিয়ে গেলেন। সে রিলিজ পেয়েছে না জানানোর জন্যে বকাবকি করলেন খানিকটা। সামিউর খেয়াল করলো আমির সাহেব দশ বছরে অনেক বুড়িয়ে গেছেন। বাসায় পৌঁছে দেখে মামী শাশুড়ি টেবিলে খাবার দিয়ে রেখেছেন অলরেডি। খাওয়ার পর আমির সাহেব জানতে চাইলেন সামিউর কী করার কথা ভাবছে। সামিউর জানালো তার একটা মোবাইল দরকার। কিন্তু ক্রেডিট না থাকায় কী করবে বুঝতে পারছে না। এছাড়াও একটা থাকার জায়গাও দরকার। থাকার জন্য সে কোন মোটেলে ওঠার কথা ভাবছে। মোটেলে থাকার কথা শুনে দু জনেই আপত্তি জানালো। সামিউর বুঝিয়ে বললো এটাই ঠিক হবে। সে জেলখাটা মানুষ। অন্যরা জানলে ওদের সমস্যা হবে। আমির সাহেব গুগল করে মোবাইলের খবর বের করলেন। লাকি মোবাইলের প্রি পেইড টপআপ সার্ভিস আছে। বাসার কাছেই একটা বিএন্ডবি মোটেলের ঠিকানাও খুজে বের করলেন। নাজুর কবরের সব কাগজপত্র সামিউরকে বুঝিয়ে দিলেন। বললেন পিকারিং তিনি নিয়ে যাবেন। অতদূর ড্রাইভ করা কোন দরকার নেই; সে বাসে বা ট্রেনে চলে যাবে বলে সামিউর নিরস্ত করলো তাকে। তারপর তাকে নিয়ে আমির সাহেব লাকি মোবাইলের দোকানে গেলেন। আপাতত সামিউর রিফারবিশ মোবাইল একটা কম দামে কিনলো। আমির সাহেব তাকে একটা এক শো ডলারের প্রি পেইড কার্ড কিনে দিলেন। সামিউরের কোন কথাই শুনলেন না। পরে একটা মোটেলে তাকে নামিয়ে দিয়ে গেলেন। ব্যাগ থেকে শর্ট আর টি-শার্ট বের করে গোসল সেরে বিছানায় গা এলিয়ে দিল। কখন ঘুমিয়ে গেছে টের পায়নি। ঘুম ভাঙতে টের পেল সন্ধ্যা হয়ে গেছে। জামাকাপড় পরে বের হলো সে। কাছেই একটা ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট দেখতে পেয়ে ঢুকে পড়লো সেখানে। বের হয়ে কিছক্ষণ রাস্তায় হেঁটে বেড়ালো। বুক ভরে মুক্তবাতাসে নিশ্বাস নিল সে। একটা বেঞ্চে বসে এক সময় এর পরিচিত শহরটাকে দেখতে লাগলো।
পিকারিং মুসলিম কবরস্থানে নাজু আর তার অনাগত সন্তানের কবরের সামনে হাটু গেড়ে বসে আছে সামিউর। দুই গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু। হাতের গোলাপগুলো নামিয়ে রাখলো কবরের উপর। একবার আকাশ পানে তাকালো। কোন অভিযোগ কি জানালো! কে জানে।
অন্টারিও লেকের সামনে একটা পাথরের উপর বসে আছে সানিউর। শুন্যদৃষ্টিতে চেয়ে আছে বিশাল জলরাশি পানে। মনের আয়নাতে রিপ্লে হচ্ছে সে দিনটা যে দিন তার জীবনের সব আলো মুছে গিয়েছিল।
সেদিনের পর আর কাঁদেনি সে। আজ আবার দুচোখে ঢল নেমেছিল নুতন করে। তখন নাজু চারমাসের প্রেগনেন্ট। সন্ধ্যার পর নাজুকে নিয়ে বাড়ির কাছেই দোকানে গিয়েছিল। ফেরার পথে ধাক্কা লাগে দুইমাতালের সাথে। কথা কাটাকাটির এক পর্যায় একজন ছুরি বের করে তাকে মারতে আসে। নাজু বাধা দিতে যায় লোকটাকে। সে হাতের ছুরি দিয়ে হৃৎপিণ্ড বরাবর এফোড় ওফোড় করে দেয় নাজুকে। তার চিৎকারে আশেপাশের মানুষ ছুটে আসে। ধরে ফেলে লোকদুটোকে। কেউ নাইন ওয়ান ওয়ানে কল করে। এমবুলেন্স আসে।প্যরামেডিকরা রক্ত বন্ধ করে। স্টেচারে তোলার সময় মনিটর চেক করে বলে নাজুর ভাইটাল সাইন পাওয়া যাচ্ছে না। সি ইজ নো মোর। সামিউর নাজু নেই আর শুনে ঝাপিয়ে পড়ে লোক দুটোর। নিমিষেই মাটিতে পড়ে থাকা ছুরি তুলে নিয়ে এলোপাথাড়ি আঘাত করতে থাকে ওদের। ততক্ষণে আরো এমবুলেন্স আর পুলিশ এসে পড়ে। সামিউরের হাতে ছুরি দেখে তার উপর স্টান গান ব্যবহার করে। এমবুলেন্সগুলোতে নাজু আর লোকদুটোকে তোলা হয়। সামিউরকে পুলিশের গাড়িতে। সামিউর পুলিশকে নাজুর মামার ফোন নম্বর দিয়ে ওনার সাথে ফোনে যোগাযোগ করতে বলে। তারপর জ্ঞান হারায়।
সামিউরের জ্ঞান ফেরে টরন্টো ইস্ট ডিটেনশন সেন্টারে। পুলিশের ফোন পেয়ে নাজুর মামা নাজুকে যে হাসপাতালে নিয়ে গেছে সেখানে তাড়াতাড়ি ছুটে যান। হাসপাতাল নাজুকে মৃত ডিক্লেয়ার করে। সামিউর পুলিশ কাস্টডিতে থাকায় নাজুর লাশ আমির সাহেবকে বুঝিয়ে দেয়া হয়। তিনি নাজুর কবর কেনা থেকে মাটি দেয়া সব দায়িত্ব নিজের উপর তুলে নেন। সব কাজ শেষ হলে তিনি জেলে সামিউরের সাথে দেখা করতে আসেন।
দেশে নাজুর মৃত্যুর খবর এবং তার মামলার খবর দেয়া হয়েছে জানান। মাথা গরম করার জন্যে সামিউরকে বকাঝকা করেন। মেয়েটা স্বামীর হাতের মাটি পেল না বলে আক্ষেপ করেন।
একবছর পর সামিউরের কেসের রায় হয়। বারো বছরের জেল। তাকে ট্রানসফার করা হয় কাওয়ার্থা জেলে। এই দশবছর জেলখানায় সে ক্রমাগত পুড়েছে নাজুকে আর তার অনাগত সন্তানকে সুরক্ষা দিতে পারার ব্যর্থতায়। যদি কখনও দেখা হয় কী জবাব দেবে সে নাজুর বাবাকে। সোনার হরিণ ধরার স্বপ্ন নিয়ে সে এসেছিল এই দেশে। সোনার হরিণ ধরা তো দূরে থাক। নিজের হরিণটাও খুইয়ে ফেলেছে সে চিরদিন মতো। সাথে নিজের জীবনটাও।