ফ্রম টরন্টো উইথ লভ

নারগিস দোজা

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর। খানিক আগেই বিমান বাংলাদেশের টরন্টো থেকে আসা বিমানটি ল্যান্ড করেছে। রিসিভিং এরিয়ায় সাদাকালো চুলের এক বয়স্ক মহিলা অধীর আগ্রহে এরাইভ্যল লাউঞ্জের দিকে দেখছেন। ওর নাম আমেনা বেগম। একমাত্র ছেলে ইফতির একমাত্র সন্তান পিয়েরেকে রিসিভ করবেন বলে দাঁড়িয়ে আছেন। দুইচোখ ভিজে আছে। আরও একজন দাড়িয়ে আছেন রাগ আর অভিমান ভুলে খানিকটা পেছনে। উনি শাহাদাত সাহেব। ইফতির বাবা! একদিন রাগের মাথায় বলা কথাটাই আল্লাহ সত্যি করে দেবেন ঘুণাক্ষরেও ভাবেননি শাহাদাত সাহেব। যেদিন স্ত্রীর কাছে শুনলেন ইফতির ক্যান্সার হয়েছে – প্যানক্রিয়াশ ক্যান্সার – স্টেজ ফোর – সেদিন অভিমান ভুলে ছেলের কাছে ছুটে আসতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার আগেই ইফতি তদের সবাইকে ছেড়ে চলে গেল। ফ্লাইট বুকিং দেয়া পড়ে রইল। ইফতি আর ফিরে না আসলেও আজ তার সন্তান আসছে। ইফতির স্ত্রী স্যানন বেয়ারফুট আমেরিকায় থাকা ছোট ননদের সাথে যোগাযোগ করে জানিয়েছিল সে জরুরি কাজে পিয়েরেকে ঢাকা পাঠাচ্ছে। সে দাদার বাসায় উঠবে। বাবাকে যেন একটু জানিয়ে দেয় সে।

একদিন আগের কথা। স্যানন বেয়ারফুট শেষবারের মতো ছেলে পিয়েরের লাগেজ চেক করে লক করে দিল। দেশে যাচ্ছে পিয়েরে। দাদার দেশে, বাবার দেশে, ছেলেকে তাড়া দিল রেডি হবার জন্যে। মনটা ভালো নয় তার। এই প্রথম ছেলেকে একা এতো দূরে ছাড়ছে সে। আগে হলে কখনওই ছাড়তো না। স্বামীর শেষ ইচ্ছে পূরণ করবার জন্যেই ছাড়তে হচ্ছে। তার মৃত স্বামীর শেষ ইচ্ছে ছিল তার কবরে দেশ থেকে একমুঠো মাটি এনে যেন ছড়িয়ে দেয়া হয়। স্বামীর শেষ ইচ্ছে পূরণ করতেই পিয়েরেকে পাঠাচ্ছে সে। স্বাভাবিক অবস্থায় সাধারণত মানুষ লাশ দেশে নিয়ে যায়। ইফতেখার তালুকদার ওরফে ইফতির বেলায় সেটা করা সম্ভব হয়নি। কারণ ইফতির বাবা ডাকসাইটে তালুকদার বংশের শাহাদাত তালুকদার ছেলের সাথে একজন কানাডিয়ান অ্যাবরিজিন মেয়ের সাথে সম্পর্ক মেনে নিতে পারেননি। সবসময়ই ভেবেছেন একটা শান্ত নম্র দেশী মেয়ের সাথে ছেলের বিয়ে দেবেন। মেয়েও ঠিক করে রেখেছিলেন। আহমদ গ্রুপের মালিক বন্ধু আহমদ ইস্তিয়াকের একমাত্র কন্যা আরিয়ানার সঙ্গে। স্যাননের পরিবার একটু ইতস্তত করলেও পরে মেনে নিয়েছে। স্যাননের পরিবার মেনে নিলেও শাহাদাত তালুকদার কোন ভাবেই মানতে পারেননি ইফতি এক রেড ইন্ডিয়ান মেয়েকে বিয়ে করতে চাইছে – যে ওয়ান কোয়ার্টার মেতিস, টু কোয়ার্টার ফ্রেঞ্চ। বাকিটা কি মেয়ে নিজেই জানে না। তাই তিনি বলে দিলেন এ বিয়ে তিনি মানেন না। আজ থেকে ইফতির সাথে তার কোন সম্পর্ক নেই। তার বিষয়-আসয়ের উপর ইফতির কোন অধিকার থাকবে না। তিনি ইফতির মুখও দেখতে চান না আর। সেই সাথে আরও বলে দিলেন তিনি মারা যাবার পর ইফতিকে যেন ওনার লাশও দেখতে না দেয়া হয়।

পিয়েরে দূর থেকে দাদীকে দেখে হাত নাড়ছে। হাতে ছোট একটা ক্যামরি অন ব্যাগ। শাহাদাত সাহেব এবার সামনে এগিয়ে গেলেন। পিয়েরের দিকে তাকিয়ে ওর মনে হলো ইফতিকেই যেন দেখছেন। শুধু চুলগুলো একটু লালচে। পিয়েরে এসে দাদীকে জড়িয়ে ধরলো। দাদীর সাথে তার আগে থেকেই পরিচয়। নিউইয়র্কে ছোট ফুপুর বাসায়। ফুপুর বেবী হবার সময় তারা সবাই গেছিল। দাদী ফুপুর বাসায় আসলেই তারা যেয়ে দেখা করতো। দাদীর ভিসা না থাকায় টরন্টোতে আসতে পারত না।

শাহাদাত সাহেব ড্রাইভার মফিজকে গাড়ি নিয়ে আসতে বললেন। সে গাড়ি নিয়ে এলে পোর্টারকে দিয়ে পিয়েরের লাগেজ গাড়ি ওঠালেন।

আমেনা বানু তার পিয়েরেকে তার রুম দেখানোর জন্য নিয়ে আসছিল যাতে সে ফ্রেশ হয়ে নিতে পারে। লম্বা জার্নি করে এসেছে ছেলেটা। রুমের ভেতরে শাহাদাত সাহেবকে চুপচাপ ইফতির ছবির সামনে দাড়িয়ে থাকতে দেখে থতমত খেয়ে গেলেন । শাহাদাত সাহেব পায়ের শব্দে পেছন ফিরে তাকালেন। পিয়েরেকে দেখে বললেন, “এসো দাদাভাই। এটা তোমার আব্বার রুম ছিল। এখন থেকে তোমার রুম এটা!”

আমেনা বানু পিয়েরে বাথরুম দেখিয়ে ফ্রেশ হয়ে বলে শাহাদাত সাহেবকে বললেন, “পিয়েরে বের হলে ওকে ডাইনিং রুমে নিয়ে এসো।” তারপর রুম থেকে বের হয়ে গেলেন পিয়েরে বাথরুম থেকে বের হয়ে দেখে শাহাদাত সাহেব চেয়ারে বসে আছেন। পিয়রেকে বের হতে দেখে উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “ডু ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড বেঙ্গলি ডিয়ার।” ইয়েস আই ডু। ইন ফ্যাআক্ট আই ক্যান স্পিক টু। বাবাই আমারে শিখাইসে।“
তাহলে আমরা বাংলাই বলবো! চল দাদাভাই। তোমার জন্য বসে আছি আমি।

খাবার টেবিলে পোলাও ,মুরগির রোস্ট, ভাজা মাছ দেয়া হয়েছে। এছাড়াও নুডলস, ফ্রাইড চিকেন আর সুপ আছে। আমেনা বানু পিয়েরেকে বললেন, “খেয়ে নে দাদাই। প্লেনে কি না কি খেয়েছিলি! আর কী কী খেতে মন চায় দিদাকে বলিস।“

“পিঠা খাইবো। বাবা বলসিল তুমি অনেক মজার পিঠা বানাইতে পারো। আমেনা বানু পিয়েরেকে জড়িয়ে হাউহাউ করে কেঁদে দিলেন। তারপর চোখ মুছে বললেন, “বানাবো দাদাই, সব বানাবো। যা তুমি খেতে চাইবে সব বানাবো।“

“বাবা না তোমার কুক করা লেন্টিল সুপ দিয়া ভাত খাইতে চাইছিল। মম সবাইকে বলে রাখসিল ঢাকা থেকে কেউ গেলে জানাতে। বাট বাবা তো তার আগেই মরে গেল!”

সবাই শুয়ে পড়েছে। শাহাদাত সাহেব অন্ধকারে বারান্দা বসে আছেন। বারে বারে কানে বাজছে আমেনা বেগমকে পিয়েরের বলা কথাগুলো “জানো দিদা ড্যাড তোমার রান্না করা লেন্টিল সুপ দিয়ে ভাত খেতে চাইছিল।“ তিনি নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করলেন। আমি কি খুব বেশি বাড়াবাড়ি করেছিলাম? বিধাতা কি সেইজন্য আমার একমাত্র সন্তানের শেষ সময়টুকু আমায় তাই পাশে থাকতে দিলেন না! উপরওয়ালা আমার রাগটাই শুধু দেখলেন আমার কষ্টটা দেখলেন না! এ কেমন বিচার তার! এক সময় চেয়ার থেকে উঠে রুমের ভেতরে গেলেন। নাদিরা বানু গভীর ঘুমে তলিয়ে আছেন। শুধু তারই ঘুম নেই চোখে। ইফতি মারা যাবার পর মাঝে মাঝেই ঘুম আসে না তার। পুরনো কথা মনে হয়। আত্মীয়স্বজনের বারবার আনুরোধের কথা। ছেলেমানুষ একটা ভুল করে ফেলেছে। মাফ করে দাও, মেনে নাও। সে কথা শুনে তিনি বলেছিলেন মাফ করা তো দূরের কথা ছেলের মুখও দেখতে চান না তিনি। স্ত্রীকে পর্যন্ত বলে দিয়েছিলেন ছেলের সাথে যেন কোন যোগাযোগ না রাখেন। রাশভারী গুরুগম্ভীর স্বামীর কথা সেই মুহূর্তে অমান্য করার সাহস করেননি তিনি। তবে আমেরিকায় ছোট মেয়ের বাচ্চা হবার সময় ছেলের সাথে দেখা হবার পর সে নিষেধাজ্ঞা আর মানেননি। ছেলে, ছেলের বৌ আর নাতিকে সামনাসামনি দেখার পর কান্না থামাতে পারেননি। শাহাদাত সাহেব ছেলের সাথে কোন যোগাযোগ না রাখলেও ইফতি বন্ধুদের মারফত ঠিকই খবর রাখতো। ছোটবোন মাহিরার আমেরিকা প্রবাসী ছেলের সাথে বিয়ের খবর জেনেছিল। নাদিয়ার কাছ থেকে মাহিরার ফোন নম্বর সেই জোগাড় করে দিয়েছিল তাকে। মহিরার ডেলিভারির সময় মা আসবে শুনে বৌ বাচ্চা নিয়ে বোনের বাসায় আগেই চলে গিয়েছিল সে। এয়ারপোর্টে ছেলেকে মাহিরার জামাইয়ের সাথে দেখে হাউহাউ করে কেঁদেছিলেন আমেনা বেগম। সকালবেলা ব্রেকফাস্টের পর পিয়েরে দাদার হাতে শ্যেরনের লেখা একটা চিঠি দিল। স্যারন লিখেছে তার লেট হাসবেন্ড মারা যাওয়ার আগে তাকে বলে গিয়েছিল তার কবরে যেন তার জন্মভূমির দুমুঠো মাটি সে দেশ থেকে আনিয়ে ছড়িয়ে দেয়। সে জন্যে সে তাদের সন্তান পিয়েরেকে দেশে পাঠাচ্ছে। তিনি যদি বাংলাদেশের কিছু মাটি সংগ্রহ করে পিয়েরের হাতে পাঠান তাহলে সে চিরকৃতজ্ঞ থাকবে। তার এতোদিনের চেপে রাখা কষ্ট এবার অশ্রু হয়ে ঝরতে লাগলো।

পিকারিং কবরস্থান। ইফতির কবরে আজ নুতন করে বাংলাদেশ থেকে আনা মাটি ছড়িয়ে দেবার ব্যবস্থা করা হয়েছে খানিকটা ঘাস সরিয়ে। মাটি এনেছেন স্বয়ং শাহাদাত সাহেব। তিনি গত সপ্তাহে পিয়েরের সাথে টরন্টোতে এসেছেন। স্যানন যথাসাধ্য চেষ্টা করেছে বাঙালি বৌয়ের মত শশুরের যত্ন করতে। শাহাদাত সাহেব এখনো ততটা নমনীয় না হলেও স্যাননের সাথে খারাপ ব্যবহার করেননি। অদৃশ্য একটা রেখা এখনো আছে তাদের মাঝখানে। তবে মুছে যওয়ার লক্ষণ দেখা যেতে শুরু করেছে কিছুটা। আগামী সোমবার তারা সবাই একটা বাড়ি দেখতে যাবার কথা আছে। শাহাদাত সাহেব ছেলের বৌ আর নাতির জন্যে একটা বাড়ি কিনবেন ঠিক করেছেন। ওকে তিনবেডরুমের বড়ো বাড়ি দেখতে দেখে স্যানন মৃদু আপত্তি করার চেস্টা করেছিল। তাকে বলেছেন, “কেন তুমি চাও না আমরা ছেলের বৌয়ের কাছে এসে মাঝে মাঝে থাকি?” স্যানন কিছু উত্তর দিতে পারেনি।

মাস খানেক পরের কথা। পিয়েরেদের বাড়ির ক্লোজিং হয়েছে আজ। শাহাদাত সাহেব ডাউন পেমেন্টের পুরো টাকা পরিশোধ করে দিয়েছেন। বাড়ির চাবি হাসিমুখে স্যাননের হাতে দিয়েছেন। রাতে সবাই ডিনারে এসেছে সেই উপলক্ষে। তার আগে শ্যননের একাউন্টে পাঁচ হাজার ডলার জমা দিয়ে বলেছে বাসায় ওঠার আগে বাড়ির কাজে ব্যবহার করতে। আগামী পরশু তিনি দেশে ফিরে যাবেন। পরের বার যখন আসবেন ইফতির মাকে সাথে আনবেন বলেছেন। আর ইফতির প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী স্যাননসহ সবাই মিলে ঢাকায় করবেন সেটাও জানিয়েছেন।