স্বদেশে পূজ্যতে রাজা, বিদ্বান সর্বত্র পূজ্যতে
কানাডার ভ্যাঙ্কুভার-নিবাসী কবি, কথাসাহিত্যিক, অনুবাদক ও সম্পাদক শাহানা আকতার মহুয়া পেল কানাডার সম্মানজনক প্রথম ‘বাংলামেইল–কবি ইকবাল হাসান সাহিত্য পুরস্কার ২০২৬’।
কানাডার শিল্প-সাহিত্যের বিশিষ্টজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিত্রশিল্পী, লেখক ও সাপ্তাহিক বাংলামেইলের সম্পাদকীয় উপদেষ্টা সৈয়দ ইকবাল, বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক সুব্রত কুমার দাস, কবি ও সংগঠক দেলওয়ার এলাহী, কবি ইকবাল হাসানের পরিবারের পক্ষে কথাসাহিত্যিক তসলিমা হাসান এবং বাংলামেইলের পক্ষে সম্পাদক শহিদুল ইসলাম মিন্টু সমন্বিত জুরি বোর্ড ২০২৬ সালের পুরস্কারের জন্য শাহানা আখতার মহুয়াকে মনোনীত করেছেন। গত ১৬ মে টরন্টোতে অনুষ্ঠিত জাঁকজমকপূর্ণ বাংলাদেশ ফেস্টিভ্যালে আনুষ্ঠানিকভাবে এই পুরস্কার প্রদান করেন টরন্টো পোয়েট লরিয়েট লিলিয়ান অ্যালেন।
পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখিকা পেয়েছেন নগদ একহাজার ডলার এবং অন্টারিও প্রাদেশিক সরকার ও ফেডারেল সরকারের পক্ষ থেকে সম্মাননা। কানাডার সর্বাধিক পঠিত বাংলা সংবাদপত্র ‘সাপ্তাহিক বাংলামেইল’ পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখিকা শাহানা আখতার মহুয়াকে নিয়ে একটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করার উদ্যোগ নিয়েছে। সেই উদ্যোগে যুক্ত হতেই আজকের এই রচনা।
নাটোরের কৃতী সন্তান শাহানা আখতার মহুয়ার এই গৌরবে নাটোরবাসী মাত্রই গৌরবান্বিত। অভিনন্দন কন্যসমা মহুয়া।
মহুয়া স্কুলে আমার স্ত্রী, নাটোর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা সেবা সান্যাল এবং নাটোর নওয়াব সিরাজ-উদদৌলা সরকারি কলেজে আমার ছাত্রী ছিল। শুধু তাই নয়, নাটোরের সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গনে মহুয়া ছিল আমাদের খুব কাছের মানুষ। স্বভাবতই আমরা মহুয়ার এই সম্মান লাভে শ্লাঘা বোধ করছি এবং এই কারণেই মহুয়াকে নিয়ে কিছু কথা বলার আগ্রহ বোধ করছি।
শাহানা আখতার মহুয়ার জন্ম ১৯৭৪ সালের ৮ই জুন পুণ্যশ্লোকা রানী ভবানীর স্মৃতিবিজড়িত, জীবনানন্দ দাশের কাব্যে নন্দিত, সাহিত্য-সংস্কৃতির ঐতিহ্যে উজ্জ্বল নাটোর শহরের আলাইপুর মহল্লায় এক প্রগতিশীল মধ্যবিত্ত পরিবারে। পিতা জহিরউদ্দিন তালুকদার এবং মাতা রোকেয়া বেগমের দুইপুত্র ও তিনকন্যার মধ্যে মহুয়া তৃতীয়। বাসায় ছিল চমৎকার সাহিত্যিক পরিবেশ। বিত্তের ঘাটতি থাকলেও বিদ্যা ও মননশীলতার কমতি ছিল না।
মহুয়া ১৯৮৯ সালে নাটোর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ১৯৯১ সালে নাটোর নওয়াব সিরাজ-উদদৌলা সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি’র পর শিক্ষা বিষয়ে স্নাতক এবং সামাজিক বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর।
মহুয়ার মানসিক গঠনে সহায়ক হয়েছে বাড়িতে থাকা বিপুল এবং বিচিত্র বইয়ের সমারোহ। শিশু বয়স থেকেই আগ্রাসী পাঠাভ্যাস নিয়ে বড় হয়ে উঠেছে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা কথাসাহিত্যিক ডা. জাকির তালুকদারের উৎসাহ নিয়ে। জ্যেষ্ঠ ভ্রাতৃবধূ অধ্যাপিকা সায়েমা চৌধুরীও একজন কবি ও ছড়াকার। মহুয়ার লেখালেখির শুরু ছোটো থেকেই।
শিশু-কিশোর সংগঠন ‘চাঁদেরহাট’ এবং ‘ঊষা খেলাঘর আসর’ তাকে লেখালেখি এবং সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে সদা সক্রিয় থাকার এবং জীবনকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণের পাঠ দিয়েছে। দাদিমা সাবিরননেছা তাকে দিয়েছেন মানুষ আর প্রকৃতিকে নিষ্কলুষভাবে দেখা এবং ভালবাসার শিক্ষা।
সংসার জীবনে স্বামী ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক এবং নাটোরের শতাব্দীপ্রাচীন পাঠাগার ‘ভিক্টোরিয়া পাবলিক লাইব্রেরি’র সম্পাদক আলী আশরাফ নতুন, মুক্তমনা শ্বশুর মোঃ নওশের আলী এবং শ্বশ্রূমাতা, আজীবন নারী অধিকার ও নারীমুক্তি আন্দোলন নেত্রী দিলারা বেগম পারুলের প্রেরণাও পেয়েছে অকুণ্ঠভাবে। দিলারা বেগম ছিলেন মহুয়ার সহযোদ্ধাও। ১৯৮৮ সাল থেকে কানাডায় আসার আগে পর্যন্ত দিলারা বেগমের হাত ধরে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ নাটোর জেলা শাখার সাথে যুক্ত ছিল মহুয়া। শেষে ছিল জেলা শাখার সহ-সম্পাদকের দায়িত্বে।
পেশায় শিক্ষক ছাত্র-ছাত্রীদের প্রিয় দিদিমণি মহুয়া নাটোর মরিয়ম জুনিয়র মিশন স্কুলে বেশ কয়েক বছর শিক্ষাদান করে। প্রসঙ্গত, এই স্কুলে শহুরে ছেলে-মেয়েদের পাশাপাশি সুবিধাবঞ্চিত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ছেলেমেয়েরা আবাসিক ছাত্রছাত্রী হিসেবে পড়াশোনা করে। নাটোরে কালেক্টরেট পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ স্থাপিত হলে জেলা প্রশাসকের আগ্রহে কর্মস্থল পরিবর্তন করে জনপ্রিয় শিক্ষিকা মহুয়া প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে দেশ ছাড়া পর্যন্ত সেখানে নিয়োজিত থেকেছে।
কর্মজীবনে মহুয়া ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে নাটোরের সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনে। অশীতিপর বয়সে এসে মনে পড়ে নাটোরের সাহিত্য-সংস্কৃতি মুখর সেইসব দিনের কথা। মনে পড়ে ‘ভিক্টোরিয়া পাবলিক লাইব্রেরি’তে সম্পাদক আলী আশরাফ নতুনের অত্যন্ত নিয়মিতভাবে আয়োজিত প্রতিটি মাসিক ‘সাহিত্যসভায়’ আমার ছাত্র-ছাত্রী জাকির তালুকদার ও মহুয়ার সাথে আমার অংশগ্রহণের স্মৃতি। মনে পড়ে নতুনের উদ্যোগে নাটোরের ‘সাকাম’ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান মিলনায়তনে ঋতুভিত্তিক ধারাবাহিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কন্যাপ্রতীম প্রিয়ভাষিণী প্রিয়দর্শিনী মহুয়ার সাথে আমার অংশগ্রহণের মধুর স্মৃতি। নতুন-মহুয়া সেসময় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সাঁওতালসহ আদিবাসী নারী-পুরুষের অংশগ্রহণের আয়োজন করেছে। তখন থেকেই পশ্চাৎপদ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের জন্য সহমর্মিতা এবং দায়িত্ববোধের সঞ্চার হয়েছে মহুয়ার মননে।
একমাত্র সন্তান অনিরুদ্ধ আশরাফ প্রমিত এবং স্বামী আলী আশরাফ নতুনকে নিয়ে ২০০৮ সালে কানাডার ভ্যাঙ্কুবারে আসে মহুয়া। নূতন দেশে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কঠোর সংগ্রামের মাঝেও প্রথম থেকেই সংশ্লিষ্ট থেকেছে বিবিধের মাঝে মহামিলনের দেশ কানাডার মিশ্র সংস্কৃতির সাথে। প্রবাসী হয়েও বাংলা সাহিত্য চর্চা থেমে থাকেনি।
ভ্যাঙ্কুভারে মাল্টিকালচারাল নানা প্রতিষ্ঠানে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে মহুয়ার। বিশেষ করে মাল্টিকালচারাল হেল্পিং হাউস সোসাইটি (MHHS) এবং প্রোগ্রেসিভ ইন্টারকালচারাল সার্ভিসেস সোসাইটি (PICS) তাকে কানাডার জীবন এবং অভিবাসীদের অভিজ্ঞতার বিষয়গুলো নানাদিক থেকে জানার সুযোগ করে দিয়েছে। বর্তমানে সে একটি প্রতিষ্ঠানে নির্বাহী প্রধান হিসেবে কর্মরত।
ভ্যাঙ্কুভারের সাহিত্য-সংস্কৃতি এবং ভাষা নিয়ে যেসব সংগঠন কাজ করে, মহুয়া ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে তাদের সাথে। বাংলার ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’কে যাঁরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পৌঁছে দিয়েছেন, ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে’র স্বপ্নদ্রষ্টা এবং অন্যতম রূপকার রফিকুল ইসলাম (প্রয়াত) ও আব্দুস সালাম এবং সংগঠন ‘মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ লাভার্স অব দ্যা সোসাইটি (MLLWS)’র সাথে তার আত্মিক সংযোগ রয়েছে। ‘মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ লাভার্স অব দ্যা সোসাইটি’র জেনারেল সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেছে ২০২৪ সাল পর্যন্ত। ‘গ্রেটার ভ্যাঙ্কুভার বাংলাদেশ কালচারাল এসোসিয়েশনে’র (GVBCA) জেনারেল সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করেছে মহুয়া। তার গড়ে তোলা সংগঠন Charcha (চর্চা) – Literature, Language and Heritage Society নানামুখী কাজ করে চলেছে।
শাহানা আখতার মহুয়া এবং আলী আশরাফ নতুন দম্পতির জীবনের দুঃসহতম অধ্যায় নিকট অতীতে একমাত্র সন্তান প্রমিতকে অকালে হারানোর কষ্ট। বাঙালির সাংস্কৃতিক অভিভাবক রবীন্দ্রনাথও নিয়ত বিদ্ধ হয়েছেন স্ত্রী-আত্মজ-আত্মজার অকাল বিয়োগ বেদনায়। হাস্যমুখে অদৃষ্টেরে পরিহাস করে লিখতে পেরেছেন –
আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহ দহন লাগে। তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে।।
শাহানাও শোককে জয় করে এগিয়ে চলেছে সাহিত্যের শুভকর্ম পথে। সমৃদ্ধ করে চলেছে বাংলা সাহিত্য-সরস্বতীর ভাণ্ডার।
মহুয়ার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘ধ্রুপদ সন্ন্যাসে’ (১৯৯৮), ‘কাচের কোকিল’ (২০০০), ‘প্রত্নপিপাসার জল’ (২০০৫), ‘মনঘর’ (২০১২), ‘শতপদ্য মলাটের ভাঁজে’ (২০১৮) এবং ‘নিষিদ্ধ সিম্ফনি’ (২০২৪)। তার অনুবাদকর্মের তালিকায় রয়েছে ‘আর্মেনিয়ার ছোটগল্প’ (২০০৫, পুনর্মুদ্রণ ২০১৮), ভারতীয় নারী-লেখকদের গল্পের সংকলন: ‘জেনানা জবান’ (২০১০), কানাডীয় আদিবাসী কবিতার অনুবাদ গ্রন্থ ‘দূরের ক্যানভাস’ (২০১৬) এবং ‘উত্তুঙ্গ স্রোত বেয়ে’ (২০১৯)।
এছাড়াও মহুয়া সম্পাদনা করছে সুরুচি সম্পন্ন সাহিত্য পত্রিকা ‘ছান্দোস’।
কবিতায় মৌলিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৪ সালে মহুয়া পশ্চিমবঙ্গ থেকে লাভ করেছে ‘যতীন্দ্রমোহন বাগচী সম্মাননা পদক’।
নিবন্ধের কলেবর কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও যার জাজ্বল্যমান দৃষ্টান্ত সম্মুখে থেকে শাহানা আখতার মহুয়াকে সাহিত্য পথে মুখ্য প্রেরণা যুগিয়েছে সেই পথিকৃৎ জ্যেষ্ঠভ্রাতা ডা. জাকির তালুকদার সম্পর্কে দু’টি কথা এই অবসরে উল্লেখ না করলে মহুয়ার কাহিনি পূর্ণতা পাবে না। সমকালীন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথাসাহিত্যিক জাকির তালুকদারের রয়েছে অদ্যাবধি প্রকাশিত ছেচল্লিশটি পাঠকপ্রিয় গ্রন্থ। অগ্রজের বিশাল সাহিত্যকর্ম ও সম্মান প্রতিনিয়ত অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে মহুয়াকে।
আত্মপ্রচার বিমুখ মহুয়া বহুমুখী কাজের সাথে জড়িত। মাটির কাছাকাছি মানুষের সাথে মিশে থাকতে পছন্দ করে মহুয়া। প্রান্তিক মানুষদের জীবন বৈচিত্র্য তার লেখনি, মনন এবং দৃষ্টিভঙ্গিকে নানাভাবে ঋদ্ধ করেছে। ‘সাহিত্য’ শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থের দিকে লক্ষ্য রেখে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন- ‘সাহিত্য তা-ই যা জগতের সঙ্গে আমাদের নিবিড় সহিতত্ব বা সংযোগ ঘটায়। গভীর অথচ অনুত্তরঙ্গ তার আনন্দ, তার চেয়ে পরিশুদ্ধ আর-কোনো আনন্দের কথা আমরা জানি না।“ মহুয়ার সাহিত্যকর্মে আমরা সেই আনন্দের ছোঁয়া পাই।
ভৌগোলিকভাবে দূরত্ব থাকলেও দেশের মানুষ, ভাষা ও সংস্কৃতি থেকে সে দূরে নয়। মহুয়া-নতুন দম্পতি সবসময়ই সাধ্যানুযায়ী জনসেবা এবং জনসচেতনতামূলক কর্মের সাথে জড়িত। বর্তমানে ‘অনিরুদ্ধ আশরাফ ফাউন্ডেশনে’র মাধ্যমে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন, বৃক্ষরোপণ, শিক্ষাবৃত্তিপ্রদান, পাঠাগার এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন, প্রতিবন্ধী পুনর্বাসন ইত্যাদি কাজগুলো করছে সম্পূর্ণভাবে নিজেদের ভালবাসা থেকে।
পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখিকা শাহানা আখতার মহুয়াকে নিয়ে কানাডার সর্বাধিক পঠিত বাংলা সংবাদপত্র সাপ্তাহিক বাংলামেইলে প্রকাশিতব্য বিশেষ সংখ্যার জন্য টরন্টোর বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক সুব্রত কুমার দাসের সৌজন্যে আমার এই অকিঞ্চিৎকর লেখা। তাঁকেও ধন্যবাদ জানাই এই সুযোগে।
এই পুরস্কার আগামীতে শাহানা আখতার মহুয়াকে সাহিত্যপথে আরও উৎসাহ দেবে।
লেখক পরিচিতি
নাটোরের সন্তান প্রফেসর শেখর কুমার সান্যাল পাবনা সরকারি এডওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের একজন অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক। বর্তমানে কানাডার ক্যালগেরী শহরে প্রবাসী।