আমার রাজনীতির দূরবীন
রাজনীতি এমন একটা বিষয়, আমরা কেউ-ই তার বাইরে নই। কথায় আছে, আমরা কেউ রাজনীতির টেবিলে, আর কেউ মেনুতে, কিন্তু আছি কোনো না কোনো ভাবে। আমি যখন কানাডায় আসি ২০০৬-এর মাঝামাঝি, স্টিফেন হারপার সবে ক্ষমতায়। এখনো পরিষ্কার মনে আছে সেই দিনের কথা, সেদিন মধ্য জুনে রাত ন’টায় প্লেন থেকে নেমে হঠাৎ মনে হয়, ভুল জায়গায় আসিনি তো! কারণ, তখনও সূর্য পুরোপুরি ডোবেনি।
সেই সময়ের কানাডা আর এই সময়ের কানাডার মধ্যে বিস্তর তফাৎ। তখন আক্ষরিক অর্থেই একটা শান্তিপূর্ণ দেশে ছিলাম, মুদ্রাস্ফীতি তেমন ছিল না, যেকোনো কাজ করেই মানুষ ঘরবাড়ি কিনতে পারতো। আর এখন, উল্টোটা বললেও কম বলা হয়।
তখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ছিল না, টরন্টোয় লাইব্রেরিতে গেলে খবরের কাগজ পড়তে পেতাম, বা ট্রেনের প্লাটফর্মে মেট্রো নামে টরন্টো স্টারেরই একটা ছোটো কাগজ পাওয়া যেতো, কাজে যাওয়ার সময় ট্রেনে ওঠে গোগ্রাসে পড়তাম।
এখন প্রায় দুই যুগ পর বুঝতে পারি, এখানকার মিডিয়া ল্যান্ডস্ক্যাপ। মূলধারার গণমাধ্যম কেন সব সময় রক্ষণশীল রাজনীতির বিরোধী। আমার মনে আছে, হারপারের সময়টায় কানাডার পত্র-পত্রিকা, টিভি প্রায় একই সুরে সরকারের বিরোধিতা করতো। সেই সময়কার এক মন্ত্রী বিদেশ সফরে গিয়ে ষোলো ডলার দিয়ে অরেঞ্জ জুস্ খেয়েছিল আর যায় কোথায়। এই খবর হারপারের পতনের আগে পর্যন্ত থামেনি। তো আমিও যথারীতি নতুন ইমিগ্র্যান্ট হিসেবে মিডিয়ার ন্যারেটিভ বা বয়ান আগাগোড়াই গিলতাম। অন্টারিওতে তখন ছিল ডাল্টন ম্যাকগিনটির লিবারেল সরকার। সবার কাছে শুনতাম, অন্টারিও হচ্ছে স্বর্গরাজ্য, এর চেয়ে ভালো প্রভিন্স হয় না। এর মধ্যে কম্যুনিটির মধ্যে কানাঘুষাও ছিল, কীভাবে সরকারের বিভিন্ন এজেন্সিকে বোকা বানিয়ে ধোঁকা দেওয়া যায়।
তারপর আসলো ২০১১-১২ সাল। আমি এর মধ্যে কম্যুনিটির পত্র-পত্রিকায় লিখতে শুরু করি। রাজনীতির পোকা আমাকে ছাড়ে না। রাজনীতির খবর, ভিতরের খবর জানবার অভিপ্রায় থেকে আমি এবার ‘সাপ্তাহিক আজকাল’-এর হয়ে মূলধারার রাজনীতিবিদদের ইন্টারভিউ করতে শুরু করি। আজকে এত বছর পর যখন পিছনে তাকাই, তখন বুঝতে পারি, এখানকার উদারনৈতিক লিবারেল, এনডিপির নির্বাচিতদের কথার মধ্যে খুব একটা তারতম্য ছিল না। দুটো দলের রাজনীতিবিদরাই স্ট্যাটাস কো বা প্রচলিত নীতিকে কখনো চ্যালেঞ্জ করেনি। দুটো দলই মোটামুটি সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার ইকোসিস্টেম বা সামাজিক কল্যাণ ব্যবস্থা নিয়েই কথা বলতেন, অর্থাৎ সবকিছু কীভাবে আরো সরকারের আওতায় নিয়ে আসা যায় কিন্তু প্রচলিত ব্যবস্থার বিপরীতে গিয়ে মৌলিক কোনো পরিবর্তনের কথা নয়।
তারপর এলো ২০১৩ সাল। জাস্টিন ট্রুডো তখনো মন্ট্রিয়ল-এর বাংলাদেশি অধ্যুষিত পাপিনু বলে একটা রাইডিং-এর সংসদ সদস্য মাত্র, লিবারেল পার্টির উদীয়মান তারকা। সেই সময় টরন্টোয় এলেন পার্টির এক প্রাতরাশ সভায় যোগ দিতে, আমরা গেলাম। ফিরে আসবার সময় ওর মুখপাত্রকে বললাম, ট্রুডোকে একটা ইন্টারভিউ করতে চাই। বিকাল চারটার সময় দিলেন, টেলিফোন ইন্টারভিউ। ঠিক চারটায় সেদিন ফোন করতেই ওপার থেকে জাস্টিন ট্রুডোর কণ্ঠ ভেসে এলো। ঘণ্টাখানেক টেলিফোন সাক্ষাৎকারের শেষ দিকে বাংলাদেশ-এর জন্মের সময় তার বাবা তখনকার প্রধানমন্ত্রী পিয়ের ট্রুডোর বাংলাদেশকে স্বীকৃতির কথা বললেন। শুনে ভীষণ গর্ব হলো। আমার এখনো পরিষ্কার কানে বাজে, যখন জানতে চাইলাম, লিবারেল পার্টির নেতা হওয়ার কোনো ইচ্ছে আছে কি না। স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতেই সেদিন বলেছিলেন, এখনো বাচ্চারা ছোটো, ঠিক এই মুহূর্তে নেতা হওয়ার কোনো ইচ্ছে নেই।
তারপর বাকি সব তো ইতিহাস। লিবারেল পার্টির নেতা নির্বাচিত হলেন, তারপর ২০১৫ সালের অক্টোবরে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে লিবারেল পার্টিকে তৃতীয় স্থান থেকে একেবারে প্রথম স্থানে নিয়ে এলেন। নিচে ধাবমান চলন্ত সিঁড়ির উল্টো দিকে ওঠে আসার প্রাণান্তকর চেষ্টা করছেন ট্রুডো, নির্বাচনের প্রাক্কালে টিভিতে সেই বিজ্ঞাপন চিত্র এখনো চোখে লেগে আছে। আমি নির্বাচনের পরদিন প্রথম আলোয় লিখলাম, টেল অব টু ট্রুডোস।
তারপর তো ২০১৯-এ আবার নির্বাচন হলো। এবার আর সংখ্যাগরিষ্ঠ হলো না, মাইনোরিটি সরকার নিয়ে আবারো সেই বছরের অক্টোবরে এলো জাস্টিন ট্রুডোর সরকার। এর মধ্যেই পত্র-পত্রিকায় নানা স্ক্যান্ডালের খবর বেরুতে শুরু করলো। ২০১৫ সালের নির্বাচনের পর আগা খানের আতিথেয়তায় বিলাসবহুল দ্বীপ ভ্রমণ, আবার ২০১৯-এর নির্বাচনের আগে এসএনসি লাভালিন স্ক্যান্ডাল একেবারে দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে। এই কেলেঙ্কারিতে সেসময়ের আদিবাসী বিচারমন্ত্রী এবং এটর্নি জেনারেল জোডি উইলসন রেবোল্ড ট্রুডোর সাথে বিরোধের জেরে ওই বছরের ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। তারই একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়ে আট মাসের মাথায় সেই বছরের নির্বাচনে।
এলো ২০২০। করোনা চায়না থেকে শুরু হয়ে কানাডায় পৌঁছুতে বেশি সময় লাগেনি। জানুয়ারির শেষ সপ্তাহের দিকে কানাডায় প্রথম ধরা পড়ে। তারপর মার্চ-এর দিক থেকে আস্তে আস্তে মানুষকে লকডাউন বা ঘর বন্দি করার সরকারি ফরমান জারি হতে শুরু করে। একেবারে জরুরি সেবা ছাড়া বাকি সব অফিস আদালত বন্ধ করে দেওয়া হতে থাকে। ভ্যাকসিনের সরবরাহ শুরু হতে ২০২০ এর ডিসেম্বর লেগে যায়।
আর এই লকডাউনের মধ্যে কানাডার মানুষের দৈনন্দিন রুটিনের অংশ হয়ে গিয়েছিল, জাস্টিন ট্রুডোর প্রতিদিন সকাল এগারোটার প্রেস ব্রিফিং। তার স্ত্রীর করোনা ধরা পরে মার্চের মাঝামাঝি আর সেই সময় থেকে ট্রুডোও ঘর বন্দি হয়ে পড়েন। রিডো কটেজ থেকে প্রতিদিন সকালে একবার নেমে সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে প্রেস ব্রিফিং করতেন। বিরোধীরা ঠাট্টা করে বলতেন, ‘মর্নিং শো’! কেননা, ট্রুডো পার্লামেন্টের অধিবেশনের বদলে প্রেসকেই বেশি আরামদায়ক মনে করতেন। কানাডার রাজনীতি যারা অনুসরণ করেন, তারা জানেন, পার্লামেন্টারি প্রেস গ্যালারির অনেকেই সরকারের মুখপাত্রের মতো। পরে তো জানা গেলো, ‘সিবিসি’র জন্য বিলিয়ন ডলারের ওপরে তো বরাদ্দ ছিলই, এ ছাড়া পার্লামেন্টারি প্রেস গ্যালারিতে যে সাংবাদিকরা কাজ করে, তাদের নিয়োগকর্তা গণমাধ্যমগুলোর জন্য মিডিয়া গিল্ড-এর মাধ্যমে আরো ছয়শ মিলিয়ন ডলারের অনুদান বরাদ্দ করা হয়। তার মধ্যে ‘পোস্ট মিডিয়া গ্রুপ’ থেকে শুরু করে ‘টরন্টো স্টার’, ‘গ্লোব অ্যান্ড মেইল’, ‘সিটিভি’ কেউ বাদ পড়েনি। তাহলে কার এত ঠেকা পড়েছে, কষ্ট করে সরকারকে চ্যালেঞ্জ করে কিছু লিখব!
এই করোনার সময়ই আমার চোখ খুলে যায়- আমি বলি দিব্য দৃষ্টি লাভ করি আমি। আমি ততদিনে জর্জ অরওয়েলের লেখা ‘১৯৮৪’ উপন্যাসটি পড়ে ফেলি। এই উপন্যাসে অরওয়েল এমন এক সমাজ কল্পনা করেন যেখানে সর্বগ্রাসী এক সরকার বা দল মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা বলে কোনো বিষয়কে আর তোয়াক্কা করে না। এই উপন্যাসের বিখ্যাত একটি উক্তি ‘বিগ ব্রাদার ইজ ওয়াচিং ইউ।’ সর্বগ্রাসী শাসকদের মানুষের মনে সর্বক্ষণ ভয়ের অনুভূতি জাগিয়ে রাখার প্রবণতাকে বোঝাতে এই উক্তির ব্যবহার করা হয়।
২০২১ সালে ভ্যাকসিনকে কেন্দ্র করে সরকারের বড়ো ভাইয়ের মতো আচরণকে নিয়ে বিভিন্ন মহলে তুমুল বিতর্ক শুরু হয়ে যায়। ভাইরোলজিস্ট থেকে একাডেমিশিয়ান, পলিটিশিয়ান থেকে সিভিল সোসাইটি, টক্ শো হোস্ট অনেকেই এই ভ্যাকসিনের অতি ব্যবহারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া শুরু করে। নাম শুনে থাকবেন, গ্রেট ব্যারিংটন ডিক্লারেশন, এই সময়ের সেরা তিন দিকপাল জয় ভট্টাচার্য, সুনেত্রা গুপ্ত এবং মার্টিন কুলডর্ফ করোনা মহামারীর অহেতুক আতঙ্ক নিয়ে ২০২০-এর অক্টোবরে খোলা চিঠি প্রকাশ করেছিলেন। আমি টুইটারে এ-নিয়ে তর্ক বিতর্ক অনুসরণ করতে শুরু করি। ওখান থেকেই জানতে পারি, কানাডার ৩৫ মিলিয়ন লোকের জন্য ১০০ মিলিয়ন ভ্যাকসিন অর্ডার করা হয়েছে। ছেলে, বুড়ো, গর্ভবতী কাউকেই হিসেব থেকে বাদ দেওয়া হয়নি। তা না হলে কি ভ্যাকসিন কোম্পানিগুলোর এত পোয়াবারো অবস্থা হয়! মূলধারার গণমাধ্যমে এ নিয়ে তেমন উচ্চবাচ্য নেই। সরকারের প্রেস ব্রিফিংকেই তারা খবর বলে চালাতে থাকে। অধিকাংশ পত্রিকার কলামিস্টরা প্রাইম মিনিস্টারের অফিস থেকে দিক নির্দেশনা নিয়ে কলাম লিখতো। এটি আমার কথা নয়, এসএনসি লাভালিন নিয়ে যে সংসদীয় কমিটির শুনানি হলো, সেখানেই প্রাক্তন বিচার মন্ত্রী তার সাক্ষ্যে এই বিষয়টি অর্থাৎ আদিষ্ট হয়ে ওপিনিয়ন কলাম লেখার ব্যাপারটি ফাঁস করে দেন। আমি সরকারি, প্রাতিষ্ঠানিক বয়ান বিশ্বাস করা থেকে সরে আসি।
ট্রুডো ২০২০-এর করোনার সময় থেকে সরকারি কোষাগার থেকে যথেচ্ছ টাকা বিলি করেন। মানুষের হাতে অনেক টাকা, মুদ্রাস্ফীতিও বাড়তে থাকে, কিন্তু কে শোনে কার কথা? বিরোধীরা সতর্ক করেছিল অপচয় না করবার জন্য কিন্তু ট্রুডোর মাথায় ভোটের হিসেব। ভেবেছিল, টাকা বিলির জনপ্রিয়তার স্রোত কাজে লাগিয়ে নির্বাচনি বৈতরিণী পার হবে, সংখ্যালঘু সরকার দিয়ে কাহাতক আর শাসন করা যায়, বিরোধীরা বড্ড হৈচৈ করে। তাই মেয়াদ ফুরোবার আগেই গভর্নর জেনারেলকে অনুরোধ করেন সংসদ বিলুপ্ত করে দিতে। স্ত্রী সোফিয়া আর ছেলে-মেয়েদের হাতে হাত ধরে ২০২১-এর মধ্য আগস্টে রিডো কটেজ থেকে ট্রুডোর সেদিন সকালের পায়ে হেঁটে যাত্রা একটা দর্শনতুল্য বিষয় হয়ে আছে। ২০২১-এর সেপ্টেম্বরে নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা করে দেন গভর্নর জেনারেল।
আমি সেই ছাত্র অবস্থা থেকেই, বিশেষ করে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন পড়তে শুরু করি, সেই সময় থেকেই কথিত সাম্যবাদী আদর্শে বিশ্বাস করতাম। উত্তর আমেরিকার একটি দেশে বসবাসের পর এই নতুন পৃথিবীর রাজনৈতিক গতিপথ পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে একটি ভাবনা আমার মাথায় আসে, আমাকে আমার বিশ্বাসের জন্য দায়িত্ব নিতে হবে এবং ভাবতে হবে- আগের রাজনৈতিক বিশ্বাসগুলো কতটা সত্যিই স্বাধীনভাবে বেছে নিয়েছিলাম আমি? আমাদের আশেপাশের পরিবেশটাকে দেখে এটুকু বুঝতে পারি, এই পরিবেশ কতটা পরিকল্পিতভাবে সাজানো, ইচ্ছাকৃতভাবে একটি ন্যারেটিভ বা আদর্শের দিকে আমরা অনেকেই ধাবিত হয়েছিলাম। যখন মূলধারার সংবাদমাধ্যম, সেলিব্রিটি এবং সুশীলেরা একসাথে একই বার্তা প্রচার করে, তখন কি সন্দেহ হয় না, কেন তারা সবাই কাকতালীয়ভাবে একই বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করছে? যখন প্রতিদিন কিছু নির্দিষ্ট বক্তব্য চাপানো হয়, তখন আমরা কি টের পাই, সেগুলো কীভাবে ধীরে ধীরে আমাদের বিশ্বাস ও মূল্যবোধকে তৈরি করে দিচ্ছে? এটির একটা সুন্দর নাম আছে- ইল্যুশন অব চয়েস, পছন্দের মায়া।
তবে এর মানে কি এই যে, আমাকে উল্টো দিকে হাঁটতে হবে? না, তা মোটেই নয়। তবে আমি বুঝেছি, প্রশ্ন করাটা খুব জরুরি। কেন আমাকে বলা হচ্ছে একটি নির্দিষ্টভাবে ভাবতে? কেন বিকল্প মতামতগুলোকে সবসময় অপতথ্য বা মিথ্যা তথ্য হিসেবে চিহ্নিত করতে বলা হচ্ছে, অথচ প্রমাণ সাপেক্ষে নিজের সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না? আমি মনে করি, এই ইকোচেম্বার বা প্রতিধ্বনির গোয়াল থেকে বাইরে বের হওয়া খুব দরকার; অন্তত আমার দরকার ছিল সত্যটাকে আরো খুঁটিয়ে জানা। যদি কখনো প্রশ্ন না করি, যদি চিন্তা না করি, তাহলে কি আমি স্বাধীন?
অন্য অনেকের ক্ষেত্রেও বিষয়টি অভিন্ন। এই যেমন সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক বয়ানের কথা বলছিলাম। এবার খোদ ট্রাভিস ধানরাজ বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দিলো। যারা কানাডিয়ান ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন সংক্ষেপে ‘সিবিসি’, যেটা এখানে পাবলিক ব্রডকাস্টার অর্থাৎ ট্যাক্সের টাকায় যে মিডিয়াকে পোষা হয়, দেখেন বা শোনেন, তারা ট্রাভিসকে দেখেছেন অথবা নামে চেনেন। ওর শোতে যখন কনজারভেটিভ ভাবাপন্ন অতিথিকে আমন্ত্রণ জানাতে গেল, তখন সিবিসির কর্তাব্যক্তিরা বেঁকে বসলো। ট্রাভিস ক্যারিবিয়ান বংশোদ্ভূত, ওরা ভেবেছিল, ট্রাভিসকে নিয়োগ দিয়ে ডাইভারসিটি কোটা পূরণ করা হলো আর সে যেহেতু শ্বেতাঙ্গ নয়, তাই নিশ্চয়ই রক্ষণশীল রাজনীতির ধারে কাছে সে ঘেঁষবে না। ওকে দিয়ে সিবিসির একপেশে পাতানো বয়ান বলিয়ে নেওয়া যাবে। কিন্তু ট্রাভিসকে ওরা চেনেনি। ট্রাভিস চেয়েছিল সত্যিকার অর্থে কাজ করতে, সততার সাথে, পক্ষপাতিত্ব ছাড়া, তাকে সেই কাজ করতে দেওয়া হয়নি। আর তাই সে একেবারে জানান দিয়ে চাকরি থেকে পদত্যাগ করে। পদত্যাগ করে যে ব্যোমশেল চিঠি সে সিবিসিকে লিখেছে, তার খবর মিডিয়াতে চাউর হয়ে যায়।
এই যে আমরা যারা বাদামি রঙের, আমাদের ধরেই নেওয়া নয়, আমরা তথাকথিত লিবারেল উদারনৈতিক বা প্রগতিবাদের বিপণনের রাজনীতির ধ্বজা ধরবো সব সময়, যেখানে রাষ্ট্রের নীতির বেলায় আমরা কেইনেসিয়ান অর্থনীতি অনুসরণ করবো চোখ বুজে, আমাদের ব্যক্তি অর্থনীতির ব্যবস্থাপনায় সরকারি হস্তক্ষেপ মেনে নেবো। এটার একটা নাম আছে ‘ট্যাক্স এন্ড স্পেন্ড’ অর্থাৎ সোজা বাংলায় সরকার যত খুশি ট্যাক্স নেবে আর তাদের ইচ্ছেমতো খরচ করবে। একধরনের গোষ্ঠীচিন্তা এর পিছনে কাজ করে, যাতে ব্যক্তির মেরিট বা ভূমিকাকে দেখা হবে গৌণ করে, আর সরকার মহাশয় থাকবেন মুখ্য।
প্রগতির বিপণনকারীদের নিয়ে আমার মোহ কেটে যায় ২০২২-এর ফেব্রুয়ারিতে। আগে প্রেক্ষিতটা বলি। আগের বছর ভ্যাকসিন ম্যান্ডেট নিয়ে সরকারের বাড়াবাড়িতে ট্রাক চালকদের জীবন দুর্বিসহ হয়ে ওঠতে থাকে। অনেকেই নানান শারীরিক জটিলতায় বা ধর্মীয় কারণে ভ্যাকসিন নিতে অপারগতা প্রকাশ করে কিন্তু সরকার সেই অজুহাতে তাদের জীবিকা বন্ধ করে দিতে উদ্যত হয়। এই ট্রাকগুলো বেশিরভাগ ছিল দূরগামী পরিবহণ, মালামাল বহন করতো কানাডা থেকে আমেরিকায় বা আমেরিকা থেকে কানাডায়; এই হাজার হাজার মাইল দূর যাত্রায় অন্য কারো সংস্পর্শে আসার সুযোগ চালকদের ছিল না। তাছাড়া, ভ্যাকসিন নিয়ে আমেরিকায় যখন নিয়ম-কানুন শিথিল হতে শুরু করে তখন কিন্তু কানাডা কিছুতেই ছাড় দিতে চায় না। তাই তামারা লিচ নামে আলবার্টার এক আদিবাসী নারী জনমত তৈরি করতে শুরু করে সরকারের ভ্যাকসিন ম্যান্ডেট-এর বিরুদ্ধে। ট্রাকার কনভয় নামে পরিচিত সেই আন্দোলন ছিল কানাডার বিভিন্ন জায়গা থেকে ট্রাক চালিয়ে এসে সংসদের যে কেন্দ্র, সেই অটোয়াতে ঘাঁটি করা। মাত্র কয়েক সপ্তাহে জনমত তৈরি করে এত বড়ো আন্দোলন কীভাবে দানা বেঁধে ওঠে, সেই এক আদিবাসী আটপৌরে নারীর নেতৃত্বে, কানাডার রাজনীতির সম্পর্কে ধারণা না থাকলে আন্দাজ করা কঠিন। এই আন্দোলন এক উৎসবে পরিণত হয়, অনেকেই এটাকে দেখাতে চায় শ্বেতাঙ্গদের আন্দোলন, কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে তারা এসেছিল দেশজুড়ে নানা প্রান্ত থেকে। কেউ টিকা নিয়েছে, কেউ নেয়নি; কেউ শ্বেতাঙ্গ, কেউ কৃষ্ণাঙ্গ, কেউ চীনা, কেউ শিখ, কেউ ভারতীয়; কেউ একা, কেউ স্ত্রী-সন্তান নিয়ে। নেচে গেয়ে তারা এক মাসের এই আন্দোলন উৎসবে শামিল হয়। কিন্তু ঝামেলা বাধে তখন, যখন সরকার মহোদয় এই বিষয়টি নিয়ে জনগণের মধ্যে এমন আতঙ্ক তৈরি করে, আর সেই আতঙ্কের দোহাই দিয়ে জনগণের টাকার নয় ছয় করতেও দ্বিধা করেনি। একশো মিলিয়ন ভ্যাকসিন-এর ক্রয়াদেশ তার প্রমাণ। কেউ কি কখনো ভেবেছে, এই এক কনভয় নিয়ে সরকার জরুরি অবস্থা জারি করবে, যেখানে একটি গুলিও ছোঁড়া হয়নি, একজন মানুষের গায়েও টোকা লাগেনি অথচ এই কনভয়কে উচিত শিক্ষা দিতে সেই সময়ের অর্থমন্ত্রী মানুষের ব্যাঙ্ক একাউন্ট জব্দ করে দেয়। এসব তৃতীয় বিশ্বে হয় জানি, কিন্তু কানাডার মতো উন্নত বিশ্বের দেশে এসব দেখে সরকার মহোদয়ের কারবার নিয়ে আমার মোহ কেটে গেছে সেই থেকে।
অর্বাচীনদের অনেকেই বলে, আমি সরকারের সবকিছুতে দোষ খুঁজে পাই কিন্তু আমার কাছে বিষয়টা আরো বড়ো- যদি সরকারের সব অপকর্মে আস্থা রাখি, জর্জ অরওয়েল-এর সতর্কবাণী ফলে যেতে পারে। আপনার ভাষা, আপনার ব্যক্তি-স্বাধীনতা একদিন কেবল কল্পলোকের বিষয় হয়েই থাকবে। জানবেন, বিগ ব্রাদার ইজ ওয়াচিং ইউ।
লেখক পরিচিতি
জন্ম বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলায়। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক। ২০০০ সালে সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন। কর্পোরেট সেক্টরে মনীষের কাজের অভিজ্ঞতা প্রায় দীর্ঘ তিরিশ বছরের। মনীষ কানাডায় রেগুলেটেড অভিবাসন উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন। মনীষের প্রথম প্রকাশিত বই ‘কথায় কথায়’। তিনি ২০০৬ সাল থেকে টরন্টোয় বসবাস করছেন।

