অমলেন্দু ধরের ’উপলব্ধি’–দেশকে দেখার আয়না

অখিল সাহা

বইমেলা লেখকদের জন্য যে অতীব প্রয়োজনীয় ও মূল্যবান সুযোগটি দান করে, তা হলো সারা কানাডায় বসবাসরত বাঙালি লেখকদের পারস্পারিক দেখা সাক্ষাৎ ও সর্বসমক্ষে তাদের প্রকাশনা তুলে ধরা! লেখকদের কাছে এর চেয়ে ভাল আর কিছু ঘটতে পারে না! মিশিসাগায় অনুষ্ঠিত কানাডা লিটারেচর ফেস্টিভ্যালে ‘উপলব্ধি‘ বইয়ের লেখক অমলেন্দু ধরের সাথে সাক্ষাতের সুযোগ ঘটেছিল। সেদিন কাছে ক্যাশ ছিল না বলে বইটি কিনতে ইচ্ছে করলেও পারিনি! পরে বইমেলার অনুষ্ঠানে তার সাথে সাক্ষাৎ ও দীর্ঘক্ষণ আলোচনার সুযোগ ঘটে। সেদিন আমি একটি কপি কিনতে ইচ্ছা প্রকাশ করি, আমার সহজাত কৌতুহল থেকে যে, আমাদের জানাশোনা লেখক তালিকার বাইরে যারা লেখক, তারা কি নিয়ে লিখছেন, কিভাবে বা কেন লিখছেন! বইটি কিনতে চাইলে তিনি দিলেন, তবে মূল্য নিতে চাইলেন না এই শর্তে যে বইটি পড়ে যেন তাকে জানাই, কেমন লেগেছে! বইটি হাতে পেয়ে খুশী হলাম! ৪২২ পাতার বেশ বড় প্রকাশনা! বইটিতে দুটি অধ্যায় রয়েছে। প্রথম অধ্যায়ে তার স্মৃতিকথা এবং দ্বিতীয় অধ্যায়ে তার জীবনাভিজ্ঞতা উপলব্ধি তুলে ধরেছেন। প্রাককথন থেকে জানা গেল, লেখক হিসাবে তিনি একেবারে আনকোরা বা হঠাৎ হাজির নন, পত্রপত্রিকায় লেখার হাত বেশ আগে থেকেই রয়েছে! এছাড়াও তিনি আগাগোড়া একজন সাংগঠনিক ও সামাজিক মানুষ! বই পাঠান্তে নিশ্চিত, এই তাড়না থেকেই তিনি লেখালেখি করতেন এবং প্রবাসে বসে সেই তাড়না-ই তাকে বইটি লেখায় প্রবৃত্ত করেছে!

তখনই ভেবেছিলাম যে, বইটি পড়ে একটি পাঠ-প্রতিক্রিয়া লিখব। স্মৃতিকথামূলক বইগুলো সাধারণত পাঠকদের জন্য হিরার খনির মত মূল্যবান হয়ে থাকে! সে সব বইয়ে প্রায়শই অপ্রত্যাশিত অনেক তথ্য থাকে, যা কয়লার খনিতে হিরার টুকরো পাওয়ার মত ঘটনা! যা হোক, সেদিন ফেরার পথে গাড়িতে টুকটাক আলোচনা থেকে আমার প্রয়োজনীয় কিছু তথ্য বা তার মতামত জেনে নিয়েছিলাম। ঢাকা বা কলকাতার বাইরে অবস্থান করেও বর্তমানে প্রবাসী লেখকদের যে বিপুল পরিমাণ বই প্রকাশিত হয়ে চলেছে, সেখানে প্রবাসী ট্যাগে ঢাকা বা কলকাতায় এসমস্ত লেখকদের লেখা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা, প্রচার-প্রচারণা, বিজ্ঞাপন পরিচিতি, কিছুই ঘটে না! অথচ বাংলা সাহিত্যের স্বাস্থ্যরক্ষার খাতিরে কেন্দ্রবহির্ভূত এই সকল লেখকের বইয়ের পাঠ, পাঠ-বিপণন, ও পুস্তক বিপণন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ! আর তাই প্রবাসে বসে নিজেদেরই এই কাজে এগিয়ে আসার কোন বিকল্প আপাতত সূচনা হয়নি! পাঠক হিসাবে ভাগ্যবান যে, আলোচ্য বইটি দেখতে সুবিশাল মনে হলেও পড়তে বসে দেখি নিজের অজান্তেই কখন জানি বইয়ের অর্ধেকটা শেষ করে ফেলেছি! কানাডা প্রবাসী শিক্ষক-আইনজীবি ও লেখক অমলেন্দু ধরের লেখা স্মৃতিকথামূলক বই ’উপলব্ধি’ বইটি তার জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধির সার কথা। গ্রাম ও শহর – এই দ্বিপ্রান্তিক জীবনবোধ এবং রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংগঠনিক-প্রশাসনিক ভূমিকার পাশাপাশি বিভিন্ন দ্বিমেরুভিত্তিক একাধিক পেশাগত সম্পৃক্ততা থেকে অর্জিত উপলব্ধিসমূহ পরবর্তী প্রজন্মের কাছে হস্তান্তরের আকাঙ্ক্ষায় লেখকের এই প্রয়াস সন্দেহাতীত ধন্যবাদার্হ!

উপলব্ধি’র অভিমুখ বা দৃষ্টিভঙ্গিঃ

লেখকের পেশাগত পরিচয়ের বিষয়টি পুনরুক্তিবিধায় আমি বিস্তারিত উল্লেখে যাচ্ছি না, বিষয়টি প্রিয় পাঠকেরা বইয়ের ফ্লাপে দেখে নিতে পারবেন। তিনি একাধারে শিক্ষক, সমাজ-রাজনীতি-ধর্ম সচেতন সামাজিক সংগঠক, অন্যদিকে আইনজীবি, রাজনৈতিক দল ও প্রশাসন সংশ্লিষ্ট অভিভাবক হিসাবেও কাজ করেছেন। লেখকের জীবনের এই বৈশিষ্ট্যটি বেশ আকর্ষণীয়! তিনি শিক্ষকতা ও আইনব্যবসার পাশাপাশি সামাজিক ও রাষ্ট্রের সরকারী কাজের অনেক ক্ষেত্রে বিচরণ করছেন! যেমন সরকারী দায়িত্ব হিসাবে ঊনসত্তরের নির্বাচনে ভূমিকা, নির্বাচনোত্তর প্রশাসনে সহযোগিতা, শিক্ষক নিয়োগ কমিটি ভুক্তি, রিলিফবন্টনে দায়িত্ব পালন, ইত্যাদির পাশাপাশি বেসরকারী ও সামাজিক ক্ষেত্রে তার সংশ্লিষ্টতা অগুনতি! আবার মুক্তিযুদ্ধকালে ভারতে শরনার্থী জীবনে করিমগঞ্জে অবস্থানকালে তার আত্মীয়সুত্রে মুক্তিযুদ্ধ ও দেশের সরকারি কর্মকর্তার জীবন রক্ষা বা ঐরকম ভূমিকা খুবই কৌতুহলোদ্দীপক! মুক্তিযুদ্ধে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে শরণার্থীদের সহায়তা ও মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা বিষয়টি ভবিষ্যত প্রজন্মের মনে প্রভাব ফেলবে বলেই আশা করা যায়।

তিনি সমাজের জন্য সম্প্রদায় নির্বিশেষে সকল রকম শুভবোধ ও কল্যাণ মুখীমূল্যবোধ বহন করেন, আবার প্রতিনিয়ত নিজের বিকাশোন্মুখ সামাজিক অবস্থানকে উচ্চতর অবস্থানে তুলে ধরার লক্ষ্যে একই সাথে চাকুরির পাশাপাশি কঠোর পরিশ্রম এবং শিক্ষাগ্রহণের কাজে সম্পৃক্ত থাকেন। যে প্রবণতাটি মূলত উপনিবেশিক শাসন-শোষণ থেকে বের হয়ে স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র গঠনের জন্য উপমহাদেশের আপামর মানুষের মনের গভীরে উপ্ত করা হয়েছিল, অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের আন্দোলন, স্বদেশী আন্দোলনের অনেকগুলো ধারা, সুভাষ বসুর স্বাধীনতা আন্দোলন, কিঞ্চিৎ তৎকালীন রাজনৈতিক দলসমুহের পক্ষ থেকে। কাজেই ব্রিটিশ উপনিবেশোত্তর ভগ্ন-স্বাধীনতায় সৃষ্ট পাকিস্তান ও ভারতের গ্রামীণ কৃষিভিত্তিক সমাজের যে বিকাশমান মধ্যবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণি স্বাধীন দেশে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা অর্জনের মাধ্যমে রাষ্ট্রযন্ত্রের ক্ষমতার কাছাকছি নিজেদের তুলে আনতে পেরেছিল, ’উপলব্ধি’ বইটির লেখককে তারই এক আদর্শ প্রতিনিধি হিসাবে মনে হয়েছে।

আত্মকথা বা স্মৃতিকথা লেখার পেছনে লেখক-লেখিকার অন্তর্গত যে অনুপ্রেরণা বা আকাঙ্ক্ষা কাজ করে, বিশেষজ্ঞদের মতে তা এরকম যে, একজনের জীবনে অর্জিত অনন্য ও বিচিত্র জীবন-বীক্ষার প্রকাশ ও অন্যদের মধ্যে তা সঞ্চার করা। এই বইটিও তার ব্যতিক্রম নয়। তিনি মূলত সমাজ ও রাজনৈতিক সচেতনতা থেকে পেশাগত জীবনের শুরু থেকেই লেখালেখিতে সংযুক্ত হয়েছিলেন। তারই ধারাবাহিকতায় প্রবাস জীবনের স্থিতিশীলতার মধ্যে লেখক অমলেন্দু ধর উত্তমপুরুষে প্রথম অধ্যায়ে স্মৃতিকথা ও দ্বিতীয় অধ্যায়ে প্রবন্ধাকারে নিজস্ব উপলব্ধির প্রকাশ ঘটিয়েছেন। বইটিতে নিজের বিপুল ও দীর্ঘ কর্মজীবনের ঘটনাবহুল অভিজ্ঞতা ও তজ্জাত নিজস্ব পর্যবেক্ষণ ও মতামত (লেখকের ভাষায় ’উপলব্ধি’) উত্তরপুরুষের জন্য রেখে যেতে সযত্ন প্রয়াস করেছেন! দেশের মানুষের  জন্য তার সেই উপলব্ধি তুলে ধরেছেন যে, তারাও যেন ভবিষ্যতে তার অভিজ্ঞতার আলোকে শুভবোধ ধারণ করেন। তারা যেন সুষ্ঠু ও সুশৃংখলভাবে সামাজিক ভূমিকা পালনে এগিয়ে আসতে পারেন। লেখকের প্রাক-কথনের একেবারে শেষের কয়েক লাইনে গ্রন্থটি লেখার অভিমুখ বা দৃষ্টিভঙ্গি তিনি নিজেই পাঠকের কাছে তুলে ধরেছেন। তার অন্তরে লালিত শুভবোধ ও কল্যানমুখী মূল্যবোধের প্রতি উন্মুক্ত আহ্বান জানানোর মাধ্যম হিসাবে বিপুল শ্রমসাধ্য আত্মকথন লেখার কাজে নিয়োজিত হবার জন্য লেখককে অভিবাদন জানাই। এ প্রসঙ্গে আরো উল্লেখ্য, বইয়ে বর্ণিত লেখকের জীবনাভিজ্ঞতার প্রায় সমস্তটাই দেশ, জাতি, রাষ্ট্র, সমাজ ও ইতিহাসঘনিষ্ট। তিনি আত্মকথনের মধ্যে থেকেও সর্বদা দেশ বা সমাজের নিকটতর থাকার চেষ্টা করেছেন। যেখানেই গেছেন, যে কাজেই গেছেন, অভিভাবকের মত সর্বদাই তিনি সমষ্টির কল্যাণবোধকে অগ্রাধিকার দিয়ে ভেবেছেন ও পদক্ষেপ নিয়েছেন। এ্ বিষয়টিই এই বইকে বিশেষত্ব দিয়েছে এবং ইতিহাস বই না হয়েও বইটিকে ঐতিহাসিক করে তুলেছে। ইতিহাস-নিষ্ঠ কৌতুহলী পাঠকমাত্রেই উপলব্ধি বইটি পড়তে পড়তে আমার মতই পৃষ্ঠাসংখ্যা জানার আগেই নির্বিবাদে বইয়ের শেষ পাতায় পৌছে যেতে পারবেন! দ্বিতীয় অধ্যায়ের প্রবন্ধ অংশে তিনি আবার আন্তর্জাতিকতা বোধের প্রকাশ ঘটিয়েছেন। সেখানে বিভিন্ন দেশের শাসনপদ্ধতি ও সেগুলোর ত্রুটিবিচ্যুতি নিয়ে বলিষ্ঠ মতপ্রকাশ করেছেন।

লেখকের কলমে দেশের প্রশাসনিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নানা বিষয় প্রসঙ্গক্রমে উঠে এসেছে। কিন্তু সামাজিক-সাংগঠনিক কাহিনির কাছে তার ব্যক্তিজীবনের গল্প সম্পুরক কাহিনি হিসাবে বর্ণিত হয়েছে। এখানেই লেখকের সাফল্য যে ব্যক্তিগত স্মৃতিকথাকে তিনি ব্যক্তিজীবনের ঊর্ধ্বে উত্তরিত করতে পেরেছেন। যেমন স্থানীয় রাজনীতি, প্রশাসন, ছাত্রছাত্রী আন্দোলন, কিংবা জাতীয় রাজনীতির অনেক গুরুত্বপূর্ণ সময়ের কিছু কিছু কথা তার লেখায় এসেছে। লেখক সততার সাথে রাগদ্বেষ-বিরহিত হয়ে সে সব বিষয় তুলে ধরেছেন। যা একজন সামাজিক-সাংগঠনিক মানুষের অন্যতম শক্তি! তিনি কোথাও রাজনীতিসম্পৃক্ত বা সামাজিক প্রতিবাদ বিক্ষোভ কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে কাউকে লুকিয়ে বা আড়াল করে কিংবা ঘটনাকে বদলে ফেলেননি। সাধুবাদ লেখককে, এই বৈশিষ্ট্য বইটিকে ইতিহাসের বই না হয়েও ঐতিহাসিক করে তুলেছে। তিনি রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে তার ব্যক্তিগত মতামত, দৃষ্টিভঙ্গি ও উপলব্ধি প্রকাশে পিছিয়ে থাকেননি। বিষয়টি তার প্রাক-কথনেও এসেছে। এই বিষয়গুলো লেখক হিসাবে তার পরিপক্বতার প্রমাণ করে, আবার গ্রন্থটির একটি শক্তিশালী দিক প্রকাশ করে। শক্তির দিকটি হলো, বইটি ব্যক্তিগত স্মৃতিকথার গণ্ডি পেরিয়ে বৃহত্তর সমাজ বা দেশের সামাজিক-ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে সংযুক্ত হয়ে ইতিহাসের অমূল্য দলিল হয়ে রইল। এ প্রসংগে ভ্রমণ-কাহিনি রচনায় আমার নমস্য গুরু সৈয়দ মুজতবা আলীর দেশে-বিদেশের আফগানিস্তানের ঘটনাবলীর কথা মনে পড়ে। উপনিবেশিক শাসকের অধীনে থেকেও তিনি প্রশাসনের লোকের সামনে সুস্পষ্টভাবে তার দ্বিমত প্রকাশ করতে পিছপা হননি। আলোচ্য লেখকও বইটিকে নিঃশঙ্কচিত্তে পছন্দ-অপছন্দবিরহিত (যা লেখকের প্রাক-কথনে উল্লেখ করেছেন) হয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা পুর্ব ও উত্তর সময়পর্বের একটি রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক দলিল হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন!

বইয়ের আখ্যান ও লেখকের বার্তাঃ

এই বইয়ের মৌলিক আখ্যান বা বিষয়বস্তু পাঠক হিসাবে যা দেখতে পাই, তা হলো লেখকের শিশুবয়স থেকে বেড়ে উঠা ও তরুণ বয়সে চাকুরীতে প্রবেশ, ক্রমান্বয়ে ধাপেধাপে উপরের দিকে উত্তরণের প্রচেষ্টার কাহিনি। গ্রামের স্কুল, গ্রামের পরিবেশ থেকে শহরে যাওয়া, আইনজীবি হয়ে ওঠার কাহিনী, পেশাগত নানারকম প্রতিবন্ধকতা, রাজনৈতিক দল ও প্রশাসন সম্পৃক্ত হওয়া, বিভিন্ন দেশে যাওয়া-আসা, অবশেষে কানাডার টরন্টোতে সুস্থিত হওয়া অব্দি। দেশের একপ্রান্তে শুরু হয়ে তার আখ্যান ছড়িয়ে পড়েছে অন্য দেশে, অন্য মহাদেশে। একটিমাত্র বইয়ে, বাংলাদেশ, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডা ভ্রমণ সম্পন্ন হয়ে যায়। বইয়ে ঘটনাবলীর শুরু হয়েছে ১৯৫০ সালে লেখকের ছয় বছর বয়স থেকে। তবে ১৯৫০ সালে এই বই লেখার সূচনার ঘটনা উল্লেখের মধ্যে লেখকের মনের একটি গভীর অন্তরালের ক্ষতচিহ্নের দিক উন্মোচিত হয়, যা বস্তুত পাকিস্তান সৃষ্টির পর বাংলাদেশের এই অংশের হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি অতি সাধারণ অনুভূতি! এমনকি এই পাঠ-প্রতিক্রিয়ার নিবন্ধকারের পারিবারিক ইতিহাসে দেখা যায়, ১৯৫০ সালে তার পিতা বসতবাড়ি অট্টালিকা করার জন্য ইট-বালু-সিমেন্ট কেনার পর দেশে যে সাম্প্রদায়িক হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়, তার প্রতিক্রিয়ায় বসতবাড়ি পাকা করার কাজ বন্ধ হয়ে যায়, যা ১৯৯০ সালের আগে আর করা হয়ে ওঠেনি! তবে এখানে উপলব্ধি বইয়ের লেখকের ’দাঙ্গা’ শব্দটি ব্যবহারের সাথে দ্বিমত পোষণের অবকাশ আছে একারণে যে, দাঙ্গাসংঘটিত হয়, দুপক্ষের মধ্যে। ১৯৫০ বা ১৯৬৪/৬৫ যে হিন্দু বা বৌদ্ধ নিধন হয়েছিল, তাতে কিন্তু হিন্দু বা বৌদ্ধ সম্প্রদায় কোন আক্রমণে যায়নি। তারা রাষ্ট্রীয় সমর্থনে একপাক্ষিক আক্রমণ ও হত্যার স্বীকার হয়ে নিহত, নির্যাতিত, ও দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছিল! বিষয়টা একেবারেই একপাক্ষিক ছিল। সেরকম সাম্প্রদায়িক হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতন প্রক্রিয়া বস্তুত কমবেশী চলে এসেছে এবং এখনও অব্যাহত আছে। ফলশ্রুতিতে তৎকালীন পুর্ব পাকিস্তান ও বাংলাদেশে হিন্দু ও বৌদ্ধ জনসংখ্যার গ্রাফ ক্রমান্বয়ে নিম্নাভিমুখী হওয়া অব্যাহত রয়েছে।

এরপর দেখা যাক, এই দীর্ঘ বইয়ে লেখক মূলত কি বিষয়ে গুরুত্ত্বারোপ করেছেন বা কি বার্তা দিতে চেয়েছেন পাঠককে? লেখকের অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধির সুদীর্ঘ আলোতে তিনি তার জীবনসংগ্রাম, নিজেকে গড়ে তোলা, সামাজিক-সাংগঠনিক-প্রশাসনিক জীবনে নিজস্ব পরিচয় প্রতিষ্ঠা ও সে সবের আভ্যন্তরীণ বাঁধাবিঘ্ন মোকাবিলা করা, সেই জীবনের সফলতা-ব্যর্থতার নিরিখে উদযাপন করা, সর্বোপরি নিজস্ব পর্যবেক্ষণ ও উপলব্ধি প্রকাশ করেছেন। লেখক বইয়ের সর্বত্র তার জীবনসংগ্রাম ও জীবনাকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। লেখক তার ও লেখার মধ্যে ঢুকে পড়া অগুণতি চরিত্রের সংগ্রাম-অর্জন, সাফল্য-ব্যর্থতা, পরিচয়-ভালবাসা, ইত্যাদির মত আবহমান মানবিক গুণাবলীর এক যৌথ সমাবেশ ঘটিয়েছেন। এসব কিছু তুলে ধরার পেছনে লেখকের ব্যক্তিগত লাভালাভ, আত্মপ্রচারণা কিংবা নিজের সাফল্য-বীরত্বগাঁথা প্রচারের প্রচেষ্টা আছে বলে মনে হয়নি। বরঞ্চ তার এই দীর্ঘ গ্রন্থ রচনার পেছনে প্রাতিষ্ঠানিক বা দেশ-জাতির জন্য কল্যাণ ও মঙ্গল  কামনা প্রকাশ করার আকাংখা লেখকের অন্তরে কাজ করেছে। বলা চলে, এটাই পাঠকের জন্য লেখকের মূলবার্তা। লেখক মনে করেন, তার অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধিজাত মতামত উত্তর প্রজন্মের জন্য সুফলদায়ক হবে! উত্তর প্রজন্ম দেশ ও জাতিসংক্রান্ত সুস্থ চিন্তা-চেতনায় ঋদ্ধ হয়ে তার প্রয়োগ ঘটাবে। সুদীর্ঘ বইয়ের নানান আখ্যানের মাধ্যমে বস্তুত লেখক তার সেই বার্তাই পাঠকের জন্য রেখেছেন। সামগ্রিকভাবে বইটিকে লেখকের আত্মজৈবনিক ঘটনার ঘনঘটাপূর্ণ মহাউপাখ্যান হিসাবে বর্ণনা করা যায়। তার বার্তাগুলো বাংলাদেশের জাতীয় প্রেক্ষাপটে যথেষ্ট গুরুত্ববাহী, শক্তিশালী এবং অর্থবহ।

লেখার গাঠনিক সংস্থান ও ধারবাহিকতাঃ

লেখকের দীর্ঘ কর্মজীবনের সুবিপুল অভিজ্ঞতার নির্যাস এই বিপুলায়তন স্মৃতিকথা ও নিজস্ব মতামত সমৃদ্ধ নিবন্ধ বইটি। লেখক নিজেই অনুভব করেছেন, এই বইটির বিষয়বস্তু নিয়ে একাধিক বই হতে পারত। সেটি পাঠকের পক্ষে খুবই সহায়ক হত! বইটি পড়তে যেয়ে চোখে পড়েছে, বইয়ের ঘটনাপ্রবাহ ক্রমিকভাবে সাজানো না হলেও সময়ক্রমটা অনেকখানি রক্ষিত হয়েছে, যদিও সর্বাংশে নয়। যেমন আগে হয়ত কোন বছরের ঘটনা বলা হয়েছে, পরবর্তিকালে অন্য কোন বছরের ঘটনার সাথে সেটি আবার বিবৃত হয়েছে। বইয়ের কাহিনির লেখক প্রথমবার কানাডা ভ্রমণের আগপর্যন্ত দেশের রাজনীতি ও সামাজিক বিষয়াদি নিয়ে যে লেখা তা বেশ আটোসাটো ও পাঠকের গভীর অভিনিবেশ দাবী করে। আর বক্তিগতস্মৃতিকথার মধ্যে মুফতে কত যে ঐতিহাসিক ও রাজনৈদিক উপাদান পেয়ে যান, তা সত্যিই বিস্ময়ের!

লেখকের স্মৃতিকথার গল্পে যদিও অজস্র-অসংখ্য ঘটনার সমষ্টি ভিড় ঘটেছে, তবে ঘটনাসমষ্টির মধ্যকার সংযোগ খুবই শিথিলভাবে রক্ষিত হয়েছে। দুই অধ্যায়েই আরো যেটা চোখে পড়েছে, তা হলো, ঘটনার ঘুর্নিপাক! এক বিষয়ের বর্ণনার মধ্যে নানাবিধ বিষয়ের উল্লেখ খুব সাধারণ। লেখা শুরু হয়েছে এক বিষয়ে, মধ্যবর্তী আলোচনায় ভিন্নতর বিষয় এসেছে, শেষ হয়েছে অন্য আরেকটি বিষয়ে! পাঠক হিসাবে ঘটনার এমন গোলকধাঁধাঁ ও সুবিশাল কাহিনীক্রম অনুসরণ করা বেশ আয়াসসাধ্য কাজ! আরেকটি বিষয় বার বার মনে এসেছে, তা হলো, বইয়ের ঘটনাপ্রবাহ, গল্পকথনের বিভিন্ন অংশ, ও লেখাপ্রবাহের ঘনসন্নিবিষ্টতা। আর সেটি লেখকের অনিচ্ছাসত্ত্বেই ঘটেছে, তিনি সময়, লেখার প্রতি নিবিষ্টতা বা প্রকাশের তাগাদা, এরকম নানান চাপে এটির সমাধান করতে পারেননি! প্রাক-কথনে তিনি তা স্বীকার করেছেন। তবে তার লেখার গতিশীলতা ও প্রবাহ দেখে বেশ বোঝা যায় তিনি লেখায় অভ্যস্ত। লেখার মধ্যে বরাবরই দার্শনিক ও জীবনের গভীর অর্থকে ধরার প্রচেষ্টা প্রকাশ পেয়েছে!

বইটি প্রথম অধ্যায়, যার শিরোনাম আত্মবৃত্তের কাহিনী এবং দ্বিতীয় অধ্যায়, যার শিরোনাম কাহিনী নয়, উপলব্ধি – এই দুই অংশে ভাগ করেছেন। দুটি অধ্যায়ের অধীনে আবার শিরোনামভুক্ত অনেকগুলি নিবন্ধ আকারে এনেছেন। এই শিরোনাম বিভাজন বিপুলায়তন বইটিকে অনুধাবন ও অনুসরণের জন্য কিছুটা হলেও ভাল। প্রথম অধ্যায়ে আছে লেখকের আত্মবৃত্ত মানে জীবনকথা। দ্বিতীয় অধ্যায়ে আছে লেখকের উপলব্ধি। এ অংশে দেশ, জাতি, সমাজ, আন্তর্জাতিক রাজনীতিসহ নানাবিধ বিষয়ে লেখকের নিজস্ব পর্যবেক্ষণ ও অভিমত প্রকাশ পেয়েছে। লেখকের বহুমুখী পেশাসঞ্জাত অভিজ্ঞতা, বিশেষত শিক্ষকতা,  আইনব্যবসা ও কিছু কিছু সরকারি কাছে সম্পৃক্ততা, সর্বশ্রেণির সাধারণ মানুষের সংশ্লিষ্টতা, এবং বহুবিচিত্র সামাজিক-সাংগঠনিক-প্রশাসনিক কার্যক্রমসঞ্জাত অভিজ্ঞতা, এই  নানাবিধ অভিজ্ঞতা লেখককে আমাদের দেশের ও সমাজের গড় মানুষের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে সামাজিক-আইনগত-রাষ্ট্রীয় বিষয়ে পর্যবেক্ষণের দৃষ্টি প্রদান করেছে। আমাদের দেশে বস্তুত এরকম একজন মানুষের পক্ষে বৈচিত্র্যময় পেশা সংশ্লিষ্টতা খুব কম দেখা যায়!

লেখকের স্মৃতিকথার ঘটনার উঠানামার গতি, কাহিনির পরিণতি এগুলো বেশ সরল। তবে আমার কাছে লেখকের পেশাগত জীবনের প্রথমদিকে স্কুলের শিক্ষকতার সময় এবং উপজেলায় ও জেলায় আইনব্যবসা চর্চার সময়টাকে মনে হয়, তার জীবনকাহিনির পরিণতির একটা পর্যায়। সেই পর্যায় থেকে ঘটনাবলী আবার বেশ সমতলে নেমে একই পর্যায়ে প্রবাসজীবন পর্যন্ত বয়ে গেছে। এই পর্যন্ত তার নেতৃত্বের গুণাবলী আমরা লক্ষ করি। যে পাঠকবৃন্দ তার এই অতিসমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ ও উপলব্ধির অন্তর্গত হতে পারবেন, আমার অনুমান, তাদের সকলেই অতি স্বল্পমূল্যে একটি স্বল্পকালীন শিক্ষাপ্রক্রিয়া বা স্কুলে থাকার অনুভূতি লাভ করবেন। একটি বইয়ের দামে এই বিষয়টি যে কারো জন্য খুবই উচ্চমানের পাওনা! সেখানে পাঠক শিখতে পারবেন, কীভাবে নিজেকে নানান রকম প্রতিকুলতার মধ্যেও গড়ে তোলা যায়, কীভাবে নানারকম স্বার্থ ও দ্বন্দ্ব সংশ্লিষ্ট জনসমষ্টির ভিড়ে নিজেকে রক্ষা করতে হয় (ফেঞ্চুগঞ্জ স্কুলের ছাত্রছাত্রী আন্দোলন উদাহরণ), কোথায় কীভাবে নিজেকে উপস্থাপন ও নিজের মত প্রতিষ্ঠিত করা যায়, ইত্যকার সমস্ত পরামর্শমূলক বিষয়। সর্বোপরী বিপুলা পৃথিবীতে আমাদের প্রত্যেকের নিজস্ব জীবনবৃত্ত-বহিস্থ একাধিক জীবনবৃত্তের শিক্ষা অর্জন করার সুযোগ এই স্মৃতিকথামূলক বইটি। পাঠক হিসাবে বইটি পড়ার সুযোগ লাভ আমার জন্য যারপরনাই আনন্দদায়ক! ঘটনাকীর্ণ ও দীর্ঘ বর্ণনার বেড়া পেরিয়ে বইটি পাঠ সম্পন্ন করলে বোঝা যায়, পাঠক বই পাঠকালে নিজের মধ্যে একপ্রকার নিজস্বতা বা আপনা অনুভূতি অনুভব করতে পারবেন। এখানেই লেখকের কৃতিত্ব! তবে লেখক স্মৃতিকথনে সময় ও বিষয়ভিত্তিক ধারাবাহিকতা রক্ষার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে গেছেন, কতটা সফল হয়েছেন, তা পাঠকের বিচার্য।

লেখার প্রেক্ষাপট ও পরিবেশ রচনাঃ

লেখক গ্রন্থটি রচনাকালে যেমন নিজের চরিত্র গড়ে তুলছেন ও উপস্থাপন করেছেন, পাশাপাশি আরো অসংখ্য চরিত্র সৃষ্টি করেছেন এই বইয়ে। তিনি চরিত্রসমূহের স্থানিক প্রেক্ষাপট, ভৌগলিক অবস্থান ও পারিপার্শিক পরিবেশ, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রেক্ষাপটসহ মানসিক ও আবেগ-সম্পৃক্ত প্রেক্ষিতগুলো বেশ মুনশিয়ানার সাথে ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি তার জন্মস্থানের গ্রামীণ আবহ, জীবনের বিভিন্ন পর্বের বাসস্থান, পড়াশোনা ও বিদেশ ভ্রমণকালে সে সব স্থানের প্রেক্ষিত ও স্থানগত বর্ণনাসহ দেশের ও প্রবাসের যাবতীয় পরিস্থিতি সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষিতসহ ব্যক্তিগত ও মানসিক বিষয়ে অনায়াসে ফুটিয়ে তুলেছেন। লেখক বইয়ে জীবন সম্পর্কে তার আশা-আকাঙ্ক্ষা, ব্যথা-বেদনা, ভয়ভীতি, দ্বন্দ্ব-সংঘাত, উদ্বেগ, উৎকন্ঠা, সবকিছু অবলীলায় আন্তরিকভাবে পাঠকদের কাছে জন্য তুলে ধরেছেন, যা পাঠক হিসাবে কম প্রাপ্তি নয়! একজন মানুষের বিপদে-আপদে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা জানতে পারা, তা যে কোন মানুষের জন্য শিক্ষণীয়। এর বাইরে ভৌগলিক প্রেক্ষাপট হিসাবে তার জন্মস্থান সিলেটের প্রত্যন্ত অঞ্চল, জেলা সদর, দেশের রাজধানী ছাড়িয়ে ভারতের বিভিন্ন স্থান। অবশেষে তার রচনার প্রেক্ষাপট অন্য মহাদেশ অবধি পৌঁছে যায়। যে সব ঘটনাস্থল, তাদের প্রেক্ষাপট তিনি যোগ করেছেন, তা অত্যন্ত জীবন্ত। এই বিষয়টি বইটিকে পাঠকের কাছে পাঠযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে।

তার রচনার গুণে এক বইয়েই লেখকের নিজদেশ থেকে শুরু করে  ভারত, কানাডা আবার লেখার প্রেক্ষাপট রচনার জন্য অনেক ক্ষেত্রে তিনি আইজীবীর দৃষ্টিকোণ থেকে অনেক বিষয়ে পরামর্শের মত কথা তোলেন, যা খুবই প্রায়োগিক। যেমন পৃষ্ঠা ১৮৪-এ ফ্লোরিডা বেড়ানোকালে তিনি প্রবাসীদের মামলা-মোকদ্দমা সংক্রান্ত বেশ ভাল পরামর্শ রয়েছে, পড়ে দেখতে পারেন। আবার পরবর্তিকালে পৃষ্ঠা ২১১-এ বলেন, প্রবাসী হবার দ্বৈততা নিয়ে তিনি যে উদ্বেগ প্রকাশ করেন, তা সকল প্রবাসীর ক্ষেত্রেই ঘটে!

চরিত্রসৃজন ও উপস্থাপনঃ

স্মৃতিকথা লেখার মধ্যে সক্রিয় চরিত্র সৃষ্টির গুণাবলী, নিজের বা অন্যের চরিত্র উপস্থাপনের দক্ষতার বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উত্তমপুরুষে লেখা আত্মজীবনী বা স্মৃতিকথামূলক রচনার প্রথমেই পাঠককে লেখক-লেখিকার কৃত্রিমতা বা কোন প্রকার মিথ্যার আশ্রয় নেননি মর্মে লেখকের গ্রহণযোগ্যতা তৈরির কাজ সারতে হয়। এতে আলোচা লেখকের মুনশিয়ানা লক্ষ করা যায়। খুব বিনম্র্রভাবে লেখক যেমন নিজের চরিত্র গড়ে তুলেছেন ও উপস্থাপন করেছেন, পাশাপাশি আরও অসংখ্য চরিত্র সৃষ্টি করেছেন। লেখক নিজেকে সৎভাবে, কৃত্রিমতা বর্জিত ও স্বাভাবিক ব্যক্তিচরিত্র হিসাবে পাঠকের কাছে উপস্থাপন করেছেন, পাঠকের কাছে এই বিষয়টিই বইয়ের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু! কারণ লেখকচরিত্রকে অবলম্বন করেই স্মৃতিকথা পাঠক বইয়ের ভিতরে অভিযাত্রা করেন।

অপরদিকে লেখকের উপস্থাপন কৌশল একেবারে প্রত্যক্ষ ও লেখার গতিবেগ সাতিশয় দ্রুত। পাঠককে তার কাহিনীর সাথে বিরতীহীন ছুটিয়ে নেন। কিন্তু তিনি তার স্মৃতিকথাগুলো একেবারে সরাসরি তুলে ধরেছেন। বর্ণনার মধ্যে তিনি কোনরকম অপ্রত্যক্ষ ভাব বা ভিন্নতর বর্ণনার আশ্রয় যেমন হাস্যরস কৌতুক, ঠাট্টা-বিদ্রুপ প্রকাশ করেননি। এমনকি লেখক কোথাও বাস্তবানুচিত কল্পনাপ্রবণতা বা ভাবুকতা-সম্পন্ন চরিত্র হিসাবে নিজেকে উপস্থাপিত করেছেন, সে কথাও বলা যাবে না। লেখক স্বাভাবিক পারিবারিক জীবনের বাইরে কোন রকম রোমান্টিকতার বহিঃপ্রকাশও দেখাননি! লেখকের নিজের পাশাপাশি আরও যে সব প্রধান চরিত্র এ বইয়ে এসেছে, সেগুলিরও নিজস্বতা, গাম্ভীর্য ও চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করেছে। সেই বিচিত্র চরিত্রবলয়ে যেমন নিতান্ত ব্যক্তিগত সম্পর্কের সাধারণ মানুষ অবস্থান করছে, তেমনি সেখানে দেশ-জাতি-রাষ্ট্রের অতি উচ্চ পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রও হাজির হয়েছে। এটাও পাঠক হিসাবে একটি উপরি পাওনা! বিভিন্ন চরিত্রের মধ্যে লেখকের স্ত্রী কন্যাদের চরিত্র বেশ উজ্জ্বল হয়ে ধরা পড়েছে। লেখকের মা-বাবা এবং বাংলাদেশ ও ভারতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য আত্মীয়স্বজনের চরিত্র এসেছে। সময় ও পরিবেশের সাথে সাথে লেখকের ও পাশ্ববর্তী বিভিন্ন চরিত্রের মানসিকতার পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তনও আমরা বেশ লক্ষ করি।

এগুলো ছাড়াও অসংখ্য অনেক ঐতিহাসিক চরিত্র এসেছে, যেমন তার বইয়ে দেশের সকল গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রপ্রধান বা সামরিকবাহিনী প্রধান, অনেক মন্ত্রী, সাংসদের কথা বেশ ঋজু ও মোহমুক্তভাবে এসেছে। যেমন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল আতাউল গনি ওসমানী, মুক্তিযুদ্ধকালীন ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ, মুক্তিযুদ্ধকালীন সেক্টর কমান্ডার ও  পরবর্তীকালে ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে সামরিক প্রশাসক ও রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমান, ক্ষমতাদখলকারী সামরিক শাসক ও রাষ্ট্রপতি লেফটেন্যান্ট জেনারেল হোসাইন মোহম্মাদ এরশাদ প্রমুখের নাম ও দেশগঠনে তাদের ভুমিকার কথা এসেছে। এটা পাঠক হিসাবে খুব সুখের অনুভূতি এনেছে যে, লেখক তার দীর্ঘজীবনের কোন এক পর্বের অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চরিত্রের কথা মনে রেখেছেন, যা তার স্মৃতিশক্তির কথা মনে করিয়ে দেয়। উদাহরণ হিসাবে ’লোকটা আসলে কে’ নামক লেখাটার কথা বলা যায়, তবে এর বাইরেও অনেক অনুল্লেখযোগ্য মানুষের সাক্ষাৎ তার লেখায় পাওয়া যায়!

ভাষা ও লিখনশৈলীঃ

আত্মকথা বা স্মৃতিকথা রচনার জন্য লেখকের একধরনের সৎ সাহস লাগে। একজন মানুষের ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখ, সাহস-ভয়ভীতি, শক্তি-দুর্বলতা, প্রশংসা-সমালোচনা, ইত্যাদিকে সবার সামনে নির্দ্বিধায় উন্মুক্ত উপস্থাপন আমার কাছে অন্তত সহজ কাজ নয়! আলোচ্য লেখক অমলেন্দুর সেই সাহস বেশ ভালই। তিনি এখনো সামাজিকভাবে দেশে ও প্রবাসে সক্রিয় ব্যক্তি। এই বইয়ের অনেক চরিত্রই এখনো তার সমাজ জীবনের অংশ! কাজেই বইয়ে তাদেরকে তুলে ধরার কাজটি বাস্তবিকই দুঃসাহসিক!

লেখকের লেখাপ্রবাহ পড়তে সহজ-সাবলীল লেগেছে! লেখার ভাষা ঝরঝরে, চলিত ভাষার কথ্যগদ্য! কোথাও কোথাও শব্দচয়নে আড়ষ্টতা থাকলেও তা বইপাঠকে বাঁধাগ্রস্থ করেনি। তবে যে কোন গদ্যলেখকের পক্ষে পাঠক আঁটকে রাখতে সক্ষম এরকম অবিরাম গদ্যসৃষ্টির সক্ষমতা আশীর্বাদ স্বরূপ! লেখকের গল্পকথন বর্ণনাধারা বা স্টাইল অতিব দ্রুত লক্ষ করা গেছে। বইটি পড়তে গিয়ে আমার ভ্রমণকাহিনীর গুরু সৈয়দ মুজতবা আলীর ’দেশে-বিদেশে’র ঘটনাক্রমের কথা মনে পড়েছে। সেই বইটি পড়তে গিয়ে কিন্তু কখনো মনে হয় না যে, বইয়ের ঘটনাপ্রবাহ বা বর্ণনার ধারা টগবগিয়ে চলছে! সেখানে ঘটনাপ্রবাহ ও বর্ণনার ধারা স্বাভাবিক গতিসম্পন্ন। একেকটি ঘটনা বা বর্ণনার ক্রমের মধ্যে বিরতি বা বিরাম আছে। যা পাঠককে একদিকে যেমন বিরাম-বিশ্রাম দেয়, তেমনি তাকে বইয়ের ঘটনাবলী নিয়ে ভাববার অবকাশ দেয়।

স্মৃতিকথারসত্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাঃ

পাঠকের কাছে স্মৃতিকথা বা আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থের লেখক-লেখিকার একটি অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়, তা হলো তিনি যা লিখছেন, তার বাস্তবতা, সত্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা কতখানি, তা সঠিকভাবে প্রতিপন্ন করা। পাঠক ভাবেন, বইয়ের ঘটনাবলী কতটা বাস্তব, তিনি কোনরকম বাড়িয়ে-কমিয়ে বা ঘটনা বদলে বলছেন কি না, তার ভুলত্রুটি-দুর্বলতার দিকগুলো স্বীকার করেছেন কি না! এখানে লেখকই পরীক্ষার হোতা ও সনদপত্র দাতা! আলোচ্য উপলব্ধি বইয়ে আমরা যে ঐতিহাসিক বা স্থানীয় ঘটনাবলীর মুখোমুখি হই, সেখানে লেখক চরিত্রের নামোল্লেখসহ দ্বিধাহীনভাবে ঘটনার বর্ণনা করে যান। ঐতিহাসিক বিষয়ে মিলিয়ে দেখলে সেগুলোর সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়। তাই বলা চলে, লেখক এই পরীক্ষায় বেশ সফল। তার আগাগোড়া গল্পের প্রেক্ষাপট ও কাহিনি সবকিছুই সমাজ, সংগঠন ও ইতিহাস সংশ্লিষ্ট। লেখক তার সকল রকম ঘটনাক্রমের প্রেক্ষাপট, অগ্রপশ্চাৎ, সম্ভাব্যতা-অসম্ভাব্যতা, গোপন পারিবারিক বা ব্যক্তিগত কথাও অনায়াসে ও নির্দ্বিধায় তুলে ধরেন। একইসাথে তিনি ব্যক্তিগত, সামাজিক ও সাংগঠনিক ঘটনাবলীর বর্ণনায় তথ্যনির্ভর সৎ উপস্থাপন ও নিজের ভুল-ত্রুটি, সাফল্য-ব্যর্থতার সালতামামি বা আত্মবিশ্লেষণ করেছেন, যা পাঠকদের কাছে তার স্মৃতিকথাকে অবধারিতভাবে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে। বইটি লেখকের ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ এবং দেশ ও জাতির ইতিহাসের প্রতি ঋণশোধের এক অনন্য প্রকাশ! 

আবেগ ও অনুভূতিঃ

লেখক যে পরিণত বয়সে পৌছে বইটি লিখছেন, সে বয়সে মানুষ সেই কিশোর বা যুবা বয়সের আবেগ প্রকাশ থেকে অনেক দুরে সরে আসেন। পরিণত বয়সে মানুষ অতিরিক্ত আবেগপ্রকাশে খুবই মিতব্যয়ী হয়ে থাকেন। পাঠক হিসেবে তাই দেখতে পাই, বইয়ের লেখাগুলোতে রয়েছে নিয়ন্ত্রিত আবেগ, তা সেই ব্যক্তিগত, সামাজিক বা সাংগঠনিক যে পর্যায়েরই হোক। উত্তমপুরুষে লেখা স্মৃতিকথার অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য হলো লেখক-লেখিকার জীবনগল্পে কতখানি ব্যক্তিগত বা সংশ্লিষ্ট চরিত্রসমূহের আবেগ-অনুভূতি সঞ্চারিত করতে পারেন। যে কোন শিল্পমাধ্যমেরই লক্ষ্য থাকে, মানুষের আবেগানুভূতির সেই গভীরতম বিন্দুকে স্পর্শ করার, যা সেটিকে গ্রহণযোগ্যতা বা জনপ্রিয়তা দেয়। স্মৃতিকথাকে পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্য করতে গেলে লেখার মধ্যে সেই আবেগের সঞ্চার আবশ্যক। আলোচ্য বইটিতে আমরা দেখতে পাই, চরিত্রসমূহের মধ্যে ও উত্তম পুরুষে লেখকের চরিত্রের সুখ-দুঃখ, ভাললাগা-ভালবাসা, অনুপ্রেরণা দেওয়া বা নিরুৎসাহিত করার মত অসংখ্য আবেগ-অনুভূতি সংক্রান্ত বিষয়াদি বার বার এসেছে।

ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়া ও মতামতঃ

অমলেন্দু ধরের লেখা স্মৃতিকথামূলক ’উপলব্ধি’ বইটি তার জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার অন্তরঙ্গ প্রকাশ। বইটি পাঠশেষে আমার মনে হয়েছে, তিনি যেন পাশে বসে খুব আপন ভেবে কাউকে তার জীবনাভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি জানাচ্ছেন! লালসবুজের প্রেক্ষাপটে আঁকা প্রচ্ছদ ’উপলব্ধি’ বইয়ের মূল বিষয়বস্তুকে পাঠকের সামনে যথোচিত উন্মোচিত করেছেন প্রচ্ছদ শিল্পী ইশরাত খলিল। প্রচ্ছদ দেখে মনে হয়, প্রচ্ছদশিল্পী প্রচ্ছদ আঁকার আগে পান্ডুলিপি পড়ে দেখেছেন। বইটির প্রকাশক সিলেটের সুরমা প্রকাশনী। প্রকাশকাল ডিসেম্বর ২০২৪। ঢাকার বাইরে ছাপা ও প্রকাশিত হলেও, বর্তমানে ঢাকার প্রকাশনার সাথে তারা সমানে প্রতিযোগিতা করছেন। ব্যক্তিগত আমি আলোচ্য লেখকের ’উপলব্ধি’ বইটির বহুল প্রচার কামনা করি একারণে যে, ব্রিটিশ ভারতের সর্বনাশা ভাগ ও বাংলাদেশের জন্মের অনেক এতিহাসিক তথ্য ও তৎসংক্রান্ত লেখকের মন্তব্য সম্বলিত হয়ে বইটি একটি ঐতিহাসিক পুস্তকও বটে! রাজনৈতিক ও এতিহাসিক তথ্যের ক্ষেত্রে লেখকের কোন পক্ষপাত আমার চোখে পড়েনি। পাঠক হিসেবে মনে হয়নি, দেশ-বিদেশের নানাবিধ ঐতিহাসিক ঘটনা বর্ণনার মধ্যে কোথাও কোন বাহুল্য ঘটেছে বা মনে হয়নি যে তিনি এটুকু না লিখলেও পারতেন। এত বিপুল কলেবর বইয়ে কিছু বানান ভুল চোখে পড়েছে। কিছু বানান আঞ্চলিকতার কারণে পাঠকের চোখে ভুল মনে হয়েছে। এগুলো ভবিষ্যত সংস্করণে সংশোধন বাঞ্ছনীয়।

যে কাজটি স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাজ ছিল, সেই কাজের সাথে যুক্ত একগুচ্ছ মানুষের সাথে অমলেন্দু ধর নামটিও এবার যোগ হয়ে রইল। পাঠকহিসাবে জোর সওয়াল করি, বইটি বাংলাদেশের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ও লাইব্রেরীতে অবশ্যপাঠ্য হিসাবে স্থান পাওয়ার যোগ্য। বাংলাদেশের জন্মের তথা স্বাধীনতা অর্জনের সঠিক ইতিহাস চর্চা ও সামাজিক সম্প্রীতি ও পরিবেশরক্ষার কাজ বেগবান করার প্রয়োজনে সাধারণ মানুষের কাছে বইটি যত বেশী পৌছাতে পারে, তার প্রচেষ্টা নেবার প্রয়োজন। আবার লেখকের কলমের যে শক্তি, ধারাবাহিকতা ও গতিশীলতা লক্ষ্য করা যায়, তা তিনি পরিকল্পিতভাবে সাহিত্যের অন্যান্য ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করতে পারেন, যদি তিনি সৃষ্টিকাজের শ্রমে নিয়োজিত হতে রাজী থাকেন। লেখক তার জীবনব্যাপী অর্জিত অমূল্য অভিজ্ঞতা, নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও ভুয়োদর্শনের যে সমাবেশ এই বইটিতে ঘটিয়েছেন, তা বাংলা সাহিত্যে তথাকথিত মূলধারার লেখকদের বইয়ের তালিকার মধ্যে বইটিকে মূল্যবানতর করে তুলেছে। সন্দেহাতীতভাবে, আমার কাছে এই বই ছিল আনন্দদায়ক পাঠের অভিজ্ঞতা!

এজাতীয় গ্রন্থ ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে অত্যন্ত আনন্দদায়ক, এর আগে লিখেছি যে, হিরার খনির মত! অমলেন্দু ধরের বইটি থেকে আমি ইতিহাসের নিরপেক্ষতা যেমন খুঁজে বের করতে পারি, তেমনি আবার আমার নিজস্ব সাহিত্যচর্চার অনেক উপাদান বা আখ্যান আবিষ্কারের সুযোগও আমার কাছে অবারিত হয়। তার ঘটনাপ্রবাহের কোন অংশ থেকে হয়ত একটি ছোটগল্প বা একটি উপন্যাসের আখ্যান, কিংবা তার বা কোন চরিত্রের কোন পরিস্থিতি-প্রতিক্রিয়া হতে পারে একটি কবিতা সৃষ্টির কারণ! এরকম বই দেশের যত অধিক সংখ্যক পাঠকের কাছে পৌঁছাবে, ততই দেশে স্বাধীনতার মূল্যবোধ গভীরতর হবে ও দেশ একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের সমীপবর্তী হবে! প্রবাসে বসে বইটি দেশের সাধারণের কাছে পৌঁছানোর কাজটি কঠিন তবুও বইটির বহুল প্রচার কামনা করি।