কানাডায় চাকরি ক্ষেত্রে আমার অভিজ্ঞতা
জীবনে সফলতা আর ব্যর্থতা আশ্চর্যজনক চক্রাকারে আবর্তিত হয়। কর্মসংস্থানের সূচনালগ্ন এবং ক্রান্তিকাল হরহামেশাই মূল গতিপথ পালটে দেয়। যতই নিয়মনিষ্ঠা মেনে চলা ব্যক্তি আপনি হোন না কেন, একদিন সকালে অফিসে গিয়ে দেখলেন, একটি সাদা খামে যথাযথ সম্মানের সঙ্গে প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে ‘বিদায় বার্তা’। আপনার পরিবার, আপনি এবং অনাগত ভবিষ্যতের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল মুহূর্তেই। কীভাবে এমন ডিসমিসাল লেটার বা সমাপনী চিঠি আপনাকে নতুন পথের ঠিকানা পেতে সাহায্য করে তা-ও বেশ রোমাঞ্চকর! সবসময় মনের এক কোণে আশার আলোর সন্ধান খুঁজতে থাকা এক অদৃশ্য শক্তি ক্রমাগত আপনাকে নতুন দিগন্তের পথে ধাবিত করে। তুমুল ঝড়ের আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া এক জাহাজের শেষ সম্বল আগলে অসীম পাথারে ভাসতে থাকা আপনি অবাক বিস্ময়ে প্রত্যক্ষ করেন, বিশালাকৃতির তিমি সজোরে শব্দ করে আকাশছোঁয়া জলের ঢেউ খেলিয়ে পাশ ঘেঁষে চলে যাচ্ছে। অথচ আপনার কিছুই হলো না!
‘মবিডিক’ পড়েছেন? অযুত জীবনীশক্তির সঞ্চার হবে। হারমান মেলভেল জীবন আর মৃত্যুকে এত কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেছেন যে, বই শেষ করে ওঠার পর আপনি প্রাণভরে নিঃশ্বাস নেবেন আর বলবেন, “জীবন, তুমি কত অপূর্ব!”
১২ জুন ২০১৮, ডরচেস্টার স্ট্রিট, সিডনি, নোভাস্কোশিয়া
দুপুর দু’টোয় ইন্টারভিউ। কানাডায় আমার তৃতীয় সাক্ষাৎকার। এর আগে কখনও নর্থ সিডনি যাইনি। পনেরো কিলোমিটারের পথ। বাসে ওঠে দেখলাম দাঁড়ানোর জায়গা নেই! সব আমার মতো চাকরি প্রত্যাশীতে ঠাঁসা! সোনার হরিণের সন্ধান কে পাবে তা সময়ই বলে দেবে।
মুখোমুখি হলাম কোরির, ওয়ালমার্টের ম্যানেজার। বেশ কিছু প্রশ্ন করে মূলত দেখতে চাইলো, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা কেমন? বিপদে পড়লে কীভাবে উত্তর দিই? কোন বিষয়ে ঝোঁক প্রবল- নিজে বিপদ সামলানো, নাকি অন্যের সাহায্য নেওয়া? শারীরিক অঙ্গভঙ্গির পাশাপাশি বাচনভঙ্গিও বেশ ভালোই লক্ষ্য করছিল কোরি। কতটা স্পষ্টভাষি মানুষ আমি না মৃদুভাষি? বাংলাদেশ নিয়েও বেশ কিছু প্রশ্ন করেছিল। বেশ কৌতূহলী হয়েই। সাক্ষাৎকার পর্ব স্থায়ী হয়েছিল মিনিট বিশেকের মতো।
কোরির অসাধারণ বন্ধুসুলভ আচরণ আর কথা বলায় মিষ্টি শব্দ চয়ন অনেকাংশেই ভিতরের যাবতীয় দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটাতে সাহায্য করেছে। সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে যে কোরিকে আমি ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে পেয়েছিলাম, জয়েন করার পর তার মধ্যে ওই একই ব্যক্তিত্বের মানুষকে খুঁজে পাইনি। বেশ কিছু চাকরির দরজায় ঘোরপ্যাঁচ খাওয়ার পর ওয়ালমার্টে গিয়ে ভাগ্যের চাকা ঘুরলো। কেপ ব্রেটন ইউনিভার্সিটিতে অধ্যয়নকালে আমার পাঁচবার ইন্টারভিউ কল এসেছিল। তন্মধ্যে ইন্টারন্যাশনাল অফিসে কাজ করেছিলাম টানা দুই মেয়াদে, কোর্স শেষ হওয়া পর্যন্ত। ওই কাজের জায়গা এতটা পছন্দের ছিল যে, ডিসেম্বরে এর মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও জানুয়ারি মাসে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে এক মাস কাজ করেছিলাম। প্রবাসী ছাত্র হিসেবে কোনো সদ্য আগত দেশের ছোট্ট শহরে যেখানে ২০১৮ সালে সন্ধ্যা ছয়টার পর অনেক রুটে বাসই চলতো না (নর্থ সিডনির ওয়ালমার্ট-সহ), সেই শহরে গিয়ে চাকরির জন্য একের পর এক ইন্টারভিউ কল পাওয়াই অনেক ভাগ্যের ব্যাপার বলে মনে করি। এসব ইন্টারভিউ না পেলে কখনোই পরবর্তী সময়ে টি.ডি বা স্কসিয়া ব্যাংক-সহ আরও প্রসিদ্ধ প্রতিষ্ঠানে কাজ করার যোগ্যতা অর্জন করতে পারতাম না।
১৭ মে ২০২৪, বেকার ড্রাইভ, ডার্থমাউথ, নোভাস্কোশিয়া
ম্যানেজারের নাম স্টেসি। ওইদিনের বার্তালাপের অভিজ্ঞতা অন্যান্য চাকরির মতোই ছিল। পার্থক্য এইটুকুই যে এখানে জানতে চাওয়া হয়েছিল সবিস্তারে। এত দীর্ঘ কথোপকথন এর আগে কোনো ইন্টারভিউতে করিনি।
বেশ কিছু পর্বে বিভক্ত ছিল ইন্টারভিউটা। ভূমিকা এবং কাজের অভিজ্ঞতায় জানতে চেয়েছিল, ওদের সম্পর্কে জেনেছি কীভাবে? কেন আমি ওদের সাথে কাজ করতে আগ্রহী? উত্তরে মায়ের সাথে কাজ করার কথা বলেছিলাম। ওনার স্ট্রোক হওয়ার পর হাসপাতাল থেকে বাসায় আনা এবং শরীরের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যাওয়া পর্যন্ত ছিলাম ছায়া সঙ্গী হিসেবে। মা’কে সময় করে ওষুধ খাওয়ানো। মুখের একপাশে অনুভূতি ছিল না, তাই খাওয়ার সময় চামচ দিয়ে বাঁকা ঠোঁট একটু আলতোভাবে উঁচু করে দিতে হতো। তখন থেকেই মায়ের ফোনে ওষুধ খাওয়ার এলার্ম সেট করে দিয়েছি যা এখন প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন করেছি। এসবই বিস্তারিত জানতে চেয়েছিল স্টেসি। শুধু তা-ই নয়, আচরণগত পরিবর্তন কী কী এসেছিল, কীভাবে সামাল দিয়েছি, সেটাও জিজ্ঞেস করেছিল।
পরের পর্ব ছিল সিচুয়েশনাল বা বিভিন্ন অবস্থার প্রেক্ষিতে আমার প্রস্তুতি কেমন হওয়া উচিত। এর মধ্যেও আবার প্রশ্নের বিভক্তি ছিল। অর্থাৎ পর্বের ভিতরে উপপর্ব। যেমন- Service excellence (clients first) এক্ষেত্রেও জানতে চেয়েছিল, এমন সময় যখন কোনো ব্যক্তির দৃষ্টিকোণ এবং প্রয়োজনীয়তা বুঝে পদক্ষেপ নিতে পেরেছিলাম। এখন পর্যন্ত অসংখ্য জায়গায় কাজ করার সুবাদে কোনো সমস্যা হয়নি উত্তর দিতে। ওয়ালমার্টের এক ক্রেতার সাথে অভিজ্ঞতার আলোকে বলেছিলাম।
Effective communication, যখন কেউ আমাকে বুঝতে পারছে না বা ভাষাগত দক্ষতার অভাবে যোগাযোগে ত্রুটি রয়েছে। আমার ভার্সিটির ইন্টারন্যাশনাল অফিসে কাজ করার সময় এক সদ্য আগত চাইনিজ মেয়েকে লিখে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম। কাজ না হওয়ায় চেষ্টা করেছিলাম ম্যাপ এঁকে ওকে অন্য একটা ডিপার্টমেন্টের পথ খুঁজে দিতে। তবে শেষ পর্যন্ত আমাকেই গন্তব্যে পৌঁছে দিয়ে আসতে হয়েছিল যা এ-পর্যায়ে বলার প্রয়োজন ছিল না। ওই চেয়ারে বসে কোন ঘটনার কতটুকু বলতে হবে সেটারও রয়েছে সূক্ষ্ম মাপকাঠি।
Continuous learning – স্টেসি জানতে চাইলো স্বল্প সময়ে রপ্ত করেছি এমন কোনো বিষয়ে। সাক্ষাৎকারের প্রস্তুতি হিসেবে অনলাইনে করেছিলাম dementia course। সেটা জানাতেই কোর্সের ভিতরের কিছু খুঁটিনাটিও জিজ্ঞেস করেছিল। কয় ঘণ্টার কোর্স, কী কী অধ্যায় ছিল- এসব।
Achieving results & accountability– এখানে নিজস্ব অর্জন নিয়ে বলতে হয়েছিল। বেছে নিয়েছিলাম সেরা কাজের জায়গাটা। অবধারিত ভাবেই ইন্টারন্যাশনাল অফিস। ইউনিভার্সিটির সকলের কাছে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেছিলাম চাকরিতে জয়েন করার পর থেকেই। আমাদের ইউনিভার্সিটিতে প্রথম কোনো ছাত্র-ছাত্রী এলে সকলেরই গন্তব্যস্থল থাকে সেই জায়গা। চাকরিতে আমার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে এ-কারণেই যে, ওদের অভিবাসন সংক্রান্ত তথ্যের ভাণ্ডার হয়ে উঠতে হয়। বিভিন্ন অ্যাপ্লিকেশন যেমন- স্টাডি পারমিট, ওয়ার্ক পারমিট, স্টাডি পারমিট এক্সটেনশন, কো-অপ, স্পাউস ওয়ার্ক পারমিট থেকে শুরু করে আরও অসংখ্য প্রশ্নের উত্তর দিতাম প্রতিদিন। ওয়েবসাইটের খুঁটিনাটি জানা থাকতে হয়। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বলবো, যখন কোনো ছাত্র-ছাত্রী অভিবাসন সংক্রান্ত তথ্যের খোঁজ নিতে আসে বা অ্যাপ্লিকেশন সাবমিট করে তখন মানসিকভাবে ভীষণ স্নায়ুদৌর্বল্য অনুভব করে। কারণ এই প্রতিটি ক্লিকের সাথে কানাডায় তার থাকা, না থাকা, জীবনের পরবর্তী ধাপসহ সর্বোপরি অস্তিত্ব নির্ভর করে। এখন পর্যন্ত কীভাবে শত-শত ছেলেমেয়েরা আমার কাজে খুশি হয়ে বাসে, রাস্তায়, শপিং মলে, যেখানেই দেখা পেয়েছে ধন্যবাদ জানিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। তবে এমন জনপ্রিয়তা অর্জনে নিজের জীবনে কীভাবে উপকৃত হয়েছিলাম তার উত্তরে বলেছিলাম ইউনিভার্সিটি এবং শহরে সামগ্রিক পরিচিতি যেটা পেশাগত জীবনে কোনো সফলতা এনে না দিলেও স্নিগ্ধ মানসিক প্রশান্তি এনেছিল। প্রবল আত্মবিশ্বাসী করেছিল তা আর কোনো জায়গায় কাজ করে পেয়েছি বলে মনে হয় না।
Role specific/Technical questions (CSA position)- ক্লায়েন্ট সার্ভিস এসিস্ট্যান্ট পজিশনে কী কী কাজ করতে হয়, এই বিষয়ে আমার ধারণা কেমন। আগেই ওদের ওয়েবসাইট থেকে পড়ে নেওয়ায় উত্তর করতে কোনো অসুবিধা হয়নি। তবে কিছু প্রশ্ন ছিল যেমন, অ্যালজেইমার্স রোগে আক্রান্ত একজন ব্যক্তি শারীরিকভাবে অসুস্থ বোধ করলেও তোমাকে বলতে পারছে না। কীভাবে বুঝবে? অনলাইনে অ্যালজেইমার্সের ওপর কোর্স করায় বলেছিলাম রোগীর অঙ্গভঙ্গি দেখে। বেশ কিছু বিশেষ শারীরিক লক্ষণ রয়েছে। যখন কেউ তোমাকে সেবা নিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে তখন করণীয় কী, এক্ষেত্রে সর্বপ্রথম তার প্রতি সহানুভূতি দেখাতে হবে। কথা মনোযোগ দিয়ে শোনার পাশাপাশি সহকর্মীদের সহযোগিতা নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে। কীভাবে কর্মস্থলের পরিবেশ কোনো ক্লায়েন্টের জন্য স্বস্তিদায়ক জায়গা হিসেবে পরিগণিত হয়? একতাবদ্ধ হয়ে কাজ করলে অনেক জটিল সমস্যারও সমাধান হয়ে যায় সহজেই। কাজের জায়গার অন্যতম প্রধান শক্তি হচ্ছে পারস্পরিক ঐক্য। এভাবেই ইতি টেনেছিলাম শেষ প্রশ্নের।
ওরও বেশ পছন্দসই হয়েছিল উত্তরগুলো যা অভিব্যক্তিতে স্পষ্ট দেখেছি। কিন্তু তারপরও ‘স্বর্ণ মৃগ’ অধরাই রয়ে গেল। অগত্যা কনসিয়ার্জকে যোগাযোগ করেছিলাম কারণ ওর কাছ থেকে কল পেয়েই ইন্টারভিউ দিতে যাই। ও সরাসরি কোনো উত্তর না দিলেও এইচআর থেকে জবাব পেতাম। বিষয়টা এমন ছিল আমি এইচআরকে ইমেইল করলে কোনো রিপ্লাই আসতো না। অথচ যখনই কনসিয়ার্জকে নক করতাম তখনই এইচআরের সাড়া মিলতো। আড়াই মাস ধরে যোগাযোগ অব্যাহত রাখার পর অবশেষে একটা অস্থায়ী পোস্টে হাউস কিপিং এবং মেইনটেইন্যান্স বিভাগে যোগ দিই। আগ্রহী ছিলাম না। প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলাম। তখন এইচআর থেকেই আমাকে বলা হয়েছিল জয়েন করতে। কারণ, পরে অন্য বিভাগে পদোন্নতি হওয়ার সুযোগ থাকবে। সেটাই হয়েছিল। যেখান থেকে মূলত আমার কপালে সসম্মানে ‘বিদায়ী পত্র’ মেলে!
১০ এপ্রিল ২০২৫, স্যানেক্স, ডার্থমাউথ, নোভাস্কোশিয়া
সকালে অন্য যেকোনো দিনের মতো অফিসের কাজ শুরু করেছি। কিন্তু দেখলাম কোথাও ইমেইল করতে পারছি না। ভাবলাম কোনো কারিগরি ত্রুটি হয়তো। আইটি বিভাগে মেইল করলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই রিপ্লাই দিলো, “দ্য ইস্যু হ্যাজ বিন রিসলভ!” অথচ আমার অবস্থা তখনো তথৈবচ। ফিরতি ইমেইল করলাম। এর মধ্যেই ম্যানেজারের কল। অন্য একটা কক্ষে দেখা করতে বলেছে। সন্দেহ যে একদম হয়নি, তা নয়। কারণ, যার কক্ষে দেখা করতে বলেছে তার সাথে আমি কখনোই কোনো কাজ করি না! ওখানে যাওয়ার আগে দেখলাম আরেক কর্মকর্তা এসে হাজির। পরে সহকর্মী বন্ধু জানিয়েছিল সে নার্স ইউনিয়নের মেম্বার। আমার কাজ অ্যাডমিনে। বুঝলাম, সমস্যা কিছু একটা হয়েছে, তবে তার তীব্রতা আঁচ করতে পারিনি। সবাই বসলো। বেশ হাসিমুখেই গল্প করলো। মনে হলো- এরা জানে, কী হতে চলেছে, শুধু আমি ছাড়া! একটা কথা এক্ষেত্রে বলা প্রয়োজন, আমি ওইদিন সবেমাত্র দুই সপ্তাহের ছুটি কাটিয়ে জয়েন করেছি। এই ছুটি আবার এক মাস আগেই ডিপার্টমেন্ট থেকে অ্যাপ্রুভাল নিয়ে রেখেছিলাম। একই মাসের ১০ তারিখে আমাকে আরেকটা চিঠি দেওয়া হয়েছিল এই মর্মে যে, আমার চাকরির ক্ষণস্থায়িত্বকালীন মেয়াদ বাড়ানো হলো। অবশ্য সেই নির্দেশনা (মন্ত্রণা) এসেছিল বিদায়কালীন মিটিংয়ে অংশগ্রহণ করা নার্স ইউনিয়নের মেম্বারের কাছ থেকে। তখনও ঠিক বোধগম্য নয়, কেন আমার ম্যানেজারকে- অন্য ডিপার্টমেন্টের কোনো ম্যানেজারকে নয় বরং একজন মেম্বারকে ডেকে অনুমতি বা পরামর্শ চাইতে হবে? ম্যানেজার একটা চিঠি পড়ে শোনালো, যাতে স্পষ্ট লেখা রয়েছে, প্রবেশনাল পিরিয়ডের মধ্যে দায়িত্বে অযোগ্যতার কারণে এই মুহূর্তে চাকরিচ্যুত করা হলো! এতক্ষণে বোধগম্য হলো সকাল থেকেই কেন ইমেইল কোথাও যায়নি? আগেই সব ব্যবস্থা করা হয়েছে। আজ যা হচ্ছে সেটা একটা নিছক আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া কিছুই নয়।
মহাঘোরের মধ্যে আছি। রুম থেকে বের হয়ে বাড়ি ফেরার জন্য ট্যাক্সির টিকেট দিতে চাইলে ম্যানেজারকে বললাম, ‘টিকেটের কোনো প্রয়োজন নেই। তুমি আমাকে অথৈ মহাসাগরে পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছ!’
পদচ্যুতি পত্র
অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, সঠিক কোন কারণে আপনার চাকরি চলে গেছে, তা যিনি চিঠিটি দিয়েছেন তিনিও বলবেন না। বড়োসড় কিছু (চুরি, অমার্জিত আচরণ, প্রাতিষ্ঠানিক আইনভঙ্গ) কারণে চাকরিচ্যুতি খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। এসব ক্ষেত্রে কোনো সতর্কতামূলক চিঠি দেওয়ার প্রয়োজন নেই। সরাসরি বার্তালাপ বা ইমেইল করেও মানা করা হতে পারে। আমার ক্ষেত্রে বিষয়টা এমন মোটেও ছিল না। এটা তিন মাস ধরে চলা একটা প্রক্রিয়া (ষড়যন্ত্র!) যা ধীরে ধীরে বাস্তবায়নের পথে এগিয়েছে।
যেমনটা আগেই লিখেছিলাম চাকরির ক্ষণস্থায়িত্বকালীন মেয়াদ বাড়ানোর নির্দেশনামূলক চিঠি এসেছিল ঠিক এক মাস আগে। ছুটিতে থাকাকালীন সময়ের অনেক আগেই সসম্মানে বিদায় জানানোর সব কাজ করা হয়েছিল। ওই মাসেই আমি তিনজন মেয়েকে ট্রেন করেছিলাম। সকলেই ফিলিপাইনের। আমার ম্যানেজারও। কর্মরত আছেন তার মা, স্বামী এবং পে-রোলের প্রধান কর্তা, তার স্বামী, তাদের পরিচিত নার্স-সহ স্বদেশীয় আরও অনেকেই। প্রতিদিন সকালে সাড়ে আটটায় যখন আমি কাজ শুরু করতাম তখন সাইটের প্রধান কর্তা ঠিক সামনের অফিস রুমে আসতো, বেশ সময় ধরে চলতো ম্যানেজারদের বার্তালাপ। শুধুমাত্র যেদিন আমার জব চলে যায়, সেদিন তাকে দেখিনি!
এখন আসা যাক ক্ষণস্থায়ী চাকরির মেয়াদ বাড়ানোর লেটারে। কী লেখা ছিল তাতে? আগে কিছু কথা বলে নিই। ফিলিপাইনের ওই তিন মেয়ের শিক্ষানবিশকাল শেষ হওয়ার পরপরই আমার ম্যানেজারের ব্যবহারে, নিয়ম-কানুনে অদ্ভুত একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করছিলাম। হয়তো সে কোনো লিস্ট চেয়েছে, ওইদিন দিতে পারিনি। কাজের অতিরিক্ত চাপের কারণে। ঠিক কেন দিতে পারলাম না, এটা ওর অজানা থাকার কোনো কারণ নেই। দেখতাম, ডেকে বকাঝকা করছে! ওর এমন ব্যবহার কখনোই ছিল না। হঠাৎ করেই সবকিছুর জন্যই ওর অযথা তাড়াহুড়ো বাড়তে লাগলো। আমার কাছেও বিষয়গুলো খুব একটা স্বাভাবিক মনে হয়েছে তা নয়। কিন্তু বিশ্বাস করারও একটা সীমানা রাখতে হয়। মনে রাখা প্রয়োজন ছিল যে, সে ম্যানেজার। যার কাজ ম্যানেজ করা। সে বহাল তবিয়তে ধরে রেখে, না বের করে দিয়ে ম্যানেজ করবে তা সময়ের সাথে সাথেই ক্রমশ প্রকাশ্য। তবে এই চাকরি অনেককিছুই বুঝতে সাহায্য করেছিল। প্রবেশনারী পিরিয়ড বাড়ানোর লেটারে লেখা হয়েছিল কয়েকটা বিষয়ে আমার উন্নতি করা প্রয়োজন। ব্যাস, এটুকুই! এর জন্য আমাকে দিক নির্দেশনা দেওয়া হবে। ম্যানেজারকে নিয়মিত রিপোর্ট করতে হবে। তখনো ঠিক বুঝতে পারছিলাম না যে, ম্যানেজারকে তো সবকিছু আপডেট করা হয়, তাহলে আবার নতুন করে কী জানাতে হবে? আসলে আপনাকে বের করে দিতে চাইলে কোনো একটা ছুতা প্রয়োজন, আর কিছু না। জানেন তো- ‘বস ইস অলওয়েজ রাইট!’ এই ধারণা আরও মজবুত হলো লেবার কানাডার সাথে যোগাযোগ করে। বেশ কয়েকবার ওদেরকে ইমেইল করার পর উত্তরে সন্তুষ্ট না হতে পেরে কল করে জানতে পারলাম ওরা কিছুই করতে পারবে না। যদি ওই প্রতিষ্ঠান থেকে আপনাকে অন্যায়ভাবেও চাকরিচ্যুত করা হয়, তাহলেও না! এর জন্য আপনাকে কোনো জায়গায় কমপক্ষে দশ বছর কর্মরত থাকতে হবে। কর্মচারীদের জন্য আদ্যোপান্ত গলাকাটা নিয়ম! নোভাস্কোশিয়ার সরকারি ওয়েবসাইটে গিয়েও একই নিয়ম দেখলাম। অনেক সুযোগ সুবিধার বন্দোবস্ত করা আছে। তবে আপনার আমার মতো কোনো সাধারণ মানুষের জন্য নয়, সব মালিক বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জন্য। ফিরতি পথ ধরে কীভাবে লক্ষ্যে যাওয়া যায় সেটা ভাবছিলাম। এরপর গেলাম সরকারি সহায়তা প্রতিষ্ঠান নোভাস্কোশিয়া ওয়ার্কস-এ। ওরা জব খুঁজে পেতে সহায়তা করে। দীর্ঘ পঁয়ত্রিশ বছরের অভিজ্ঞতাপ্রাপ্ত কেস অফিসারের সাথে কথা বলতে গিয়ে জানতে পারলাম ওনার সাথেও একই কাজ করা হয়েছিল এবং হুবহু একই ঢঙে। ছুটি কাটিয়ে জয়েন করার দিন ওনাকেও কোম্পানি থেকে ছাঁটাই! তিনি ওই পদবিতে প্রায় বারো বছর ম্যানেজার ছিলেন। অসম্ভব জেদ চেপে যায় আর কোম্পানির বিরুদ্ধে কেস করেন। উকিলের আইনি সহায়তা নেন। সেই মামলা কোর্টে চলমান থাকাকালীন এক বছরেরও অধিক সময় কোনো কর্মস্থলে যোগদান করেননি। একটাই দাবি ছিল- উনাকে চাকরিচ্যুত করাতে কোম্পানির দোষ ছিল। তিনি নির্দোষ- এই মর্মে একটা লিখিত চিঠি কোম্পানিকে দিতে হবে। অনেক লোভনীয় অফার প্রত্যাখান করেন। অবশেষে কোর্টে শুনানির আগের দিন নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে হেড অফিস থেকে উনার কাছে চিঠি আসে। অঢেল ক্ষতিপূরণও দেওয়া হয়, যার পুরোটাই উকিলের খরচে চলে যায়। তাই মুখে বলা হলেও আইন, অধিকার, সকলের জন্য সমান- কথাটা নেহাত মিথ্যা কথা বা মনের সান্ত্বনা ছাড়া আর কিছু না! এমন হলে আমিও উকিলের সাহায্য নিতাম। আর যা-ই হোক, অর্থ না থাকলে দুনিয়ায় আমরা নিথর।
হন্তদন্ত হয়ে চাকরি খুঁজতে থাকা আমি এক সহপাঠীর মারফত জানতে পারি আরেকটা কোর্সের বিষয়ে। কোর্স শেষ হওয়ার পরপরই চাকরি নিশ্চিত। ভর্তি হতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া শুরু করলাম। সরকারি তরফেও সহায়তা পাওয়া যায়। পথ হড়কে না গেলে নতুন পরিকল্পনার কথা মাথায় আসত না। তাই জীবনে পথভ্রষ্ট হওয়া সবসময় অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেওয়া বোঝায় না। কলম্বাসও পথভ্রষ্ট হয়ে ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ বা ওয়েস্ট ইন্ডিজ আবিষ্কার করেছিলেন। একইভাবে নোভাস্কোশিয়া আবিষ্কারও বেশ রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার ছিল জন ক্যাবোটের জন্য। বহুবার পথ হারিয়ে শেষমেশ তিনি কোনো এক অজানা দেশে এসে পড়েন। সেটাই আজকের নোভাস্কোশিয়া প্রদেশ। জীবনের মন্দ অভিজ্ঞতা সবসময় আমাদের জন্য অভিশাপ বয়ে আনে না, আশীর্বাদও নিয়ে আসে।
লেখক পরিচিতি
জন্মস্থান বাংলাদেশের চট্টগ্রাম। বাংলাদেশে ডেন্টাল সার্জন থাকলেও বর্তমানে ম্যানিটোভায় পাবলিক হেলথ ইন্সপেক্টর। লেখক হিসেবে প্রথম আত্মপ্রকাশ ২০১৬ সালে ‘দুর্গমপথের অভিযাত্রীরা’ গল্প দিয়ে। প্রকাশিত গ্রন্থ: ‘গল্পে সল্পে কিছুক্ষণ’ (২০২৩), ‘কানাডার পথ ও রথের বৃত্তান্ত’ (২০২৪)।

