চার দশকের কানাডা : সংগ্রাম, স্বপ্ন ও সৃজনের প্রতিচ্ছবি
চার দশকেরও বেশি সময় ধরে কানাডা আমার ঠিকানা। এই দেশের প্রকৃতি, সংস্কৃতি, শীতলতা, সুযোগ, সংবেদন, নিঃসঙ্গতা আর সম্ভাবনার সাথে জড়িয়ে গেছে আমার জীবনের প্রতিটি স্তর। বাংলাদেশে আমার পরিচয় ছিল একেবারে আলাদা- জাতীয় ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়ন, ন্যাশনাল ডিবেট চ্যাম্পিয়ন, টেলিভিশন, বেতার ও মঞ্চের উপস্থাপক। বাংলাদেশে থাকাকালীন দেশের বিভিন্ন ইংরেজি দৈনিকে গল্প, কবিতা, কলাম ও প্রবন্ধ লিখতাম। ‘মর্নিং নিউজ, ‘দ্য পাকিস্তান অবজারভার’, ‘দ্য পিপল’ ইত্যাদি পত্রিকায় আমার লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হতো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮১ সালে লোক প্রশাসন বিভাগে এমএসসি করার পর আমি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হই এবং পরের বছরেই বাকি সব পরিচয় পিছনে রেখে পাড়ি জমাই কানাডার উদ্দেশ্যে। শীতার্ত এক সকালে আমি যখন কানাডার বুকে পা রাখি, আমার চারপাশটা ছিল একেবারেই বরফে মোড়া ও নির্জন। শুরু হয় আমার সম্ভাবনাময় এক নতুন অধ্যায়।
শুরুতে কানাডার রাস্তাঘাট, জীবনধারা, সমাজব্যবস্থা ছিল আমার কাছে সম্পূর্ণ অজানা। ছিল নিজের শিকড় হারিয়ে না ফেলে এখানে নতুন শেকড় গজানোর সংগ্রাম। সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ ছিল নিজেকে নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া। এই দেশ আমাকে শিখিয়েছে ধৈর্য, আত্মবিশ্বাস এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- একান্তই নিজের মতো করে গড়ে ওঠার সুযোগ। এখানে তাপমাত্রা যখন মাইনাস ৩০ ডিগ্রিতে নামে, তখন শুধু শরীর নয়, মনও জমে যেতে চায়। নতুন অভিবাসীরা, যারা উষ্ণদেশীয় সন্তান, তাদের কাছে এই ঠান্ডা যেন এক অব্যক্ত আতঙ্ক। তবে তীব্র এই শীতের অপূর্ব এক সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে। ঝরে পড়া তুষারের গায়ে সূর্যের আলো পড়ে যখন হীরের মতো ঝিকমিকিয়ে ওঠে, তখন মনে হয়- এই দেশ নিজের মতো করে ভালোবাসে, শুধু বুঝতে জানতে হয়। তাই প্রবাস মানে শুধু একটি দেশ বদল নয়, বরং একটি পরিচয় পুনর্গঠনের জটিল, দীর্ঘ এবং গভীর প্রক্রিয়া। পরিচিত আবহাওয়া, সামাজিক বলয়, পরিবার-পরিজন, ভাষা, ঘ্রাণ, স্বাদ, উৎসব- সবকিছুকে পিছনে ফেলে এক নতুন ভূখণ্ডে পা রাখার মানে হলো, যেন আত্মা থেকে মাটি উপড়ে ফেলা। সকলের মতো আমার শুরুটাও ছিল ভীষণ নিঃসঙ্গ ও আত্মসন্দেহে ভরা।
কানাডা আসার পর থেকেই বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে খুব বেশি অনুভব করতে শুরু করলাম। মন্ট্রিয়ল শহরে প্রথম এসেছিলাম। তার তিন বছর পর প্রথম সন্তান ফারিয়াকে নিয়ে চলে এলাম টরন্টোতে। উত্তর আমেরিকার প্রথম বাংলা সংবাদপত্রের প্রধান সম্পাদক জনাব নজরুল ইসলাম মিন্টুর সাথে পরিচয় হলো। আমাকে অনুরোধ করলেন তার পত্রিকা ‘দেশে-বিদেশে’-তে একটি কলাম লিখবার জন্য। রাতারাতি আমার লেখার মাধ্যম ইংরেজি থেকে বাংলা হয়ে গেল। কলাম লেখা শুরু করলাম ‘সুখের কথা দুঃখের কথা মনের কথা’ শিরোনামে। এই কলামে আমি অভিবাসীদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক জীবনের প্রতিচ্ছবি আঁকতাম। পাঠকের ভালোবাসায় এই কলাম এতটাই জনপ্রিয় হয় যে, পরবর্তীতে তা গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় এবং একসময় আমি পত্রিকাটির নির্বাহী সম্পাদক হিসেবেও কাজ করি।
টরন্টো আসার পর আমার কোলজুড়ে এলো আরেকটি কন্যা- কানিতা, আমার হৃদয়ের দ্বিতীয় আলো। দুই কন্যার সঙ্গে তাদের শৈশবের প্রথম চারটি বছর আমি কথা বলেছি শুধুমাত্র বাংলায়, মায়ের ভাষায়, শিকড়ের ভাষায়। টিভিতে দুই বোন অবশ্য ইংরেজি কার্টুন দেখতো। যখন ওদের স্কুলে প্রথম প্যারেন্টস ডে-তে গেলাম, মৃদু উদ্বেগ নিয়েই জিজ্ঞেস করেছিলাম- এই দ্বিভাষিক পরিবেশে ওদের কোনো ভাষাগত অসুবিধা হচ্ছে কি না। শিক্ষকরা বললেন, “দুটি ভাষা জানে এমন শিশুদের আইকিউ বরং অন্যদের তুলনায় অনেক উঁচু হয়।” তখন যেন আমার বুক ভরে ওঠলো এক প্রশান্তির বাতাসে। আমি বিশ্বাস করতাম- ভাষাই জাতির আত্মা, আর মাতৃভাষার সুরেই সন্তানের মনুষ্যত্ব গড়ে ওঠে।
শুধু ভাষা নয়, ওদের মানসিক বিকাশও আমাকে বিস্মিত করেছে। কখনোই ওদের বাড়তি হোমওয়ার্ক দেওয়া হতো না। একদিন কারণ জানতে চাইলে শিক্ষকরা জানালেন- ওরা ক্লাসেই এত দক্ষতার সঙ্গে সব কিছু আয়ত্ত করে নেয় যে, আলাদাভাবে আর কিছু শেখানোর প্রয়োজন পড়ে না। আমি বিশ্বাস করি- এ কেবল জিনগত মেধা নয়, বরং শৈশব থেকেই বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির গভীর সংস্পর্শে থাকায় ওদের মনন গড়ে ওঠেছে এক অনন্য শুদ্ধতায়, যা প্রথাগত পাঠ্যক্রমের গণ্ডি পেরিয়ে যায় বহু দূর।
কানাডায় এসে একসময় আমি পেশাগতভাবে যুক্ত হই দোভাষী ও অনুবাদক হিসেবে। ১৯৯০ সাল থেকে আমি কানাডা সরকারের অধীনে একজন লাইসেন্সপ্রাপ্ত অনুবাদক ও দোভাষি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। এই ভূমিকায় কাজ করতে গিয়ে আমি শুধু ভাষা নয়- মানুষ, সংস্কৃতি এবং বিচারের সংবেদনশীল দিকগুলোকে গভীরভাবে চিনতে শিখেছি। এই যাত্রার সবচেয়ে মূল্যবান দিক হলো, আমি কখনো নিজের সাহিত্যিক-সত্তা হারিয়ে ফেলিনি। বরং এই প্রবাস, এখানকার বহুত্ববাদী, সংবেদনশীল ও সহনশীল সংস্কৃতি আমার কলমকে দিয়েছে এক নতুন প্রেরণা। যারা লেখেন, তারা জানেন- কলমই আত্মার ভাষা। প্রবাসে আমার সাহিত্যচর্চা যেন জীবনের অক্সিজেন ছিল।
আমার প্রথম ৩০টি বই প্রকাশিত হয় বাংলাতে। তারপর একদিন ভাবলাম এই যে বাংলাতে লেখা গল্প, কবিতা, উপন্যাস ও প্রবন্ধ; সেটা তো বাংলা ভাষাভাষিরা ছাড়া আর কেউ পড়তে পারবে না। তখন থেকে শুরু করলাম বাংলার সাথে সাথে ইংরেজি অনুবাদ। বাংলা ও ইংরেজিতে অনুবাদসহ কবিতা, গল্প ও প্রবন্ধ মিলিয়ে আরও বেশ কিছু সংখ্যক বই প্রকাশিত হলো। বর্তমানে আমি সরাসরি ইংরেজিতেই লিখছি। মূলধারায় বাংলাদেশের শিল্প, সাহিত্য, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে বিশ্বের দুয়ারে পৌঁছিয়ে দিতে চেষ্টা করছি ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে। আমার বইয়ের সংখ্যা এখন হয়েছে ৫৫টি। এগুলো শুধু বই নয়- প্রতিটি পৃষ্ঠায় রয়েছে কানাডা ও বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা, নিঃসঙ্গতা, বৈচিত্র্য, সংস্কৃতি সর্বোপরি আমার আত্মার কথা। বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় লেখা আমার গ্রন্থগুলো বাংলাদেশ, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডা থেকে প্রকাশিত হয়েছে। আমার বিশ্বাস লেখালিখির এই দীর্ঘ সফর শুধু আমাকে নয়, বিভিন্ন স্থানের অসংখ্য পাঠককে দিয়েছে আত্মপরিচয়ের খোঁজ।
২০২১ সালে কানাডার ইনানা পাবলিকেশনস থেকে প্রকাশিত আমার ইংরেজি গল্প সংকলন ‘Dusk in the Frog Pond and Other Stories’ আমার জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় বদলের সূচনা করে। এ বইটি যুক্তরাষ্ট্রে IPPZ Award (Independent Publishers’ Award 2022) লাভ করে মাল্টিকালচারাল ফিকশন বিভাগে এবং একইসাথে ২০২২ সালে কানাডার অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ‘Governor General’s Literary Award’-এ মনোনীত হয়। একজন অভিবাসী নারীর কলমে লেখা গল্প যে মূলধারার স্বীকৃতি পেতে পারে- এটি তারই অনন্য উদাহরণ।

তবে যদি বলতে হয় এমন কোনো কাজের কথা- যা আমাকে আজও গভীর তৃপ্তি, আত্মস্বীকৃতি এবং নীরব গর্বে ভরে দেয়, তাহলে নিঃসন্দেহে আমি বলবো, উত্তর আমেরিকার বুকে সর্বপ্রথম ভাষা শহিদদের স্মরণে নির্মিত শহিদ মিনার প্রকল্পের সঙ্গে আমার সক্রিয় সম্পৃক্ততার কথা। মায়ের ভাষা বাংলা আমাদের অস্তিত্ব, আমাদের শিকড়। আমরা আজও যে বাংলা ভাষায় কথা বলি, লিখি, অনুভবের কথা বলি- তা সম্ভব হয়েছে ১৯৫২ সালের এক ঐতিহাসিক আত্মত্যাগের ফলে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের ফলেই UNESCO ১৯৯৯ সালে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। সেই ভাষা শহিদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাতে টরন্টোতে একটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ ছিল কেবল একটি স্থাপনা নির্মাণ নয়, বরং এক আত্মিক দায়বোধ, এক প্রজন্মান্তরের আহ্বানে সাড়া দেওয়া।
এই উদ্যোগ সহজ ছিল না। প্রশাসনিক অনুমোদন থেকে শুরু করে অর্থ সংগ্রহ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে ছিল অনিশ্চয়তা ও অজস্র চ্যালেঞ্জ। তবুও টরন্টো সিটি কর্পোরেশনের অনুমোদন এবং আমাদের কমিউনিটির সম্মিলিত প্রচেষ্টায়, অর্থ সংগ্রহের দীর্ঘ অভিযাত্রার মধ্যদিয়ে গড়ে ওঠলো সেই স্মৃতিসৌধ। আমি ছিলাম এই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য গঠিত ২০ সদস্যের পরিচালনা কমিটির একজন গর্বিত সদস্য। এই দায়িত্ব পালন করতে পেরে আমি আজও নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি। এখানে না বললেই নয়- আমার প্রয়াত স্বামী জনাব এনামুল হক চৌধুরী এই কমিউনিটি তহবিলের জন্য আমাকে অনেক উৎসাহ প্রদান করেছিলেন এবং তাঁর উৎসাহেই আমি উদ্বুদ্ধ হয়েছিলাম এই ঐতিহাসিক কাজে অংশ নিতে।
অবশেষে, সকল প্রচেষ্টা ও ভালোবাসার সম্মিলিত ফসল হিসেবে ডেন্টোনিয়া পার্কে নির্মিত হলো Toronto International Mother Language Day Monument (IMLD Monument)। ২০২০ সালের নভেম্বর মাসে এর নির্মাণ কাজ শুরু হয়ে ২০২১ সালের ২৭ নভেম্বর এটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন টরন্টোর তৎকালীন মেয়র জন টরি। এই স্মৃতিস্তম্ভ শুধু ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন নয়, এটি একটি সময়াতীত বার্তা- ভাষার অধিকারের জন্য লড়াই, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের স্বীকৃতি এবং মানবাধিকারের সর্বজনীন প্রতিষ্ঠা।

টরন্টো শহর, যেখানে ১৮০টিরও বেশি ভাষা ও উপভাষা সহাবস্থান করছে, সেই বৈচিত্র্যের বুকে দাঁড়িয়ে এই মনুমেন্ট হয়ে ওঠেছে এক অনন্য প্রতীক। এটি বাঙালির গর্ব তো বটেই, একইসাথে বিশ্বের সব ভাষাভাষি মানুষের মর্যাদা, অধিকার এবং সংস্কৃতির প্রতি সম্মানের জ্বলন্ত স্মারক।
এই স্মৃতিস্তম্ভ আজ প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের কাছে কেবল ইতিহাসের একটি প্রতিচ্ছবি নয়, বরং একটি জীবন্ত পাঠশালা, যেখানে ভাষার মর্ম বুঝে তারা নিজের শিকড় খুঁজে পায়। এই মিনার আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি আত্মপরিচয়ের মূল, আত্মার গভীরতম সুর।
তবে এই সকল যাত্রাপথ শুধুই গৌরবের আলোয় ভরা ছিল না। অনেক সময় নিজেকে একা, প্রান্তিক ও উপেক্ষিত মনে হয়েছে- বিশেষ করে তখন, যখন চারপাশে মাতৃভাষার প্রতিধ্বনি পাওয়া যেতো না। তবুও আমি কখনোই বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চা থেকে বিচ্যুত হইনি। বরং প্রবাসের নিঃশব্দ আকাশে বাংলা শব্দের একটি উচ্চারণ, একটি ছন্দ, একটি আবৃত্তি কতখানি গভীরভাবে কারও শিকড়কে নাড়া দিতে পারে- তা আমি অনুভব করেছি বারবার। আবৃত্তিকার ও লেখক হিসেবে আমি সেই নাড়ার স্পন্দন ছড়িয়ে দিতে চেয়েছি, কানাডার পাঠাগার থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক সাহিত্যমেলা, সাংস্কৃতিক আয়োজন আর আবৃত্তির আসরগুলোতে। মাতৃভাষার প্রতি এই দায়বোধই যেন আমার প্রবাস জীবনের এক অনন্ত আরাধনা হয়ে ওঠেছিল।
আমি বিশ্বাস করি- প্রবাস জীবন মানে শুধু অভিবাসনের গল্প নয়, বরং এক ‘নতুন জন্মের’ প্রক্রিয়া। প্রতিদিন আমরা একটু একটু করে গড়ে ওঠি- কখনো পুরোনো শেকড় ধরে, কখনো নতুন পাতা গজিয়ে। কানাডা আমাকে দিয়েছে এক মুক্ত ক্ষেত্র, যেখানে আমি নারী, মা, লেখক, অনুবাদক, ক্রীড়াবিদ, সংস্কৃতিকর্মী- সব ভূমিকায় একসাথে দাঁড়াতে পেরেছি।

আজ যখন পিছনে ফিরে তাকাই, অনুভব করি- এই চার দশক শুধুই ক্যালেন্ডারের পাতা নয়, বরং এক জীবন্ত ইতিহাস, যেখানে একজন বাংলাদেশি নারী তার স্বপ্ন, সংগ্রাম, সৃজনশীলতা ও আত্মপরিচয়ের অক্ষরে অক্ষরে ছাপ রেখে গেছে এক বহুজাতিক সমাজের বুকে। ডায়াস্পোরিক সাহিত্য আজ যেন হয়ে ওঠেছে এক দ্বিমুখী আলো- যেখানে বাংলার সাহিত্য পৌঁছায় আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছে, আর প্রবাসী জীবনের কথা ফিরে আসে বাংলাভাষি পাঠকের হৃদয়ে। এটি কেবল একটি সাহিত্যধারা নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক সেতু, যা দুই ভূখণ্ডের মাঝে নির্মাণ করার চেষ্টা করেছি আমি, অকৃত্তিম ভালোবাসা আর ভাষার শক্তিতে।
চার দশকের পথ পেরিয়ে দাঁড়ালে মনে হয়- এই দীর্ঘ প্রবাস জীবন যেন এক শিল্পকর্ম, যার প্রতিটি রঙে মিশে আছে দুই দেশের মাটি, ভাষা, যন্ত্রণা ও প্রেম। কানাডা আমাকে দিয়েছে বিস্তৃত আকাশ, নতুন পরিচয়, কিন্তু আজ এই বয়সে এসে মনের গভীরে জন্মভূমির ডাকে এক অদ্ভুত টান অনুভব করি। কানাডাকে ভালোবেসে ফেলেছি ঠিকই, কিন্তু এখন জন্মভূমি বড়ো বেশি টানে। শেষ বয়সে এসে ভাবছি চিরতরে আমার জন্মভূমিতেই ফিরে যাবো। আত্মজিজ্ঞাসা জাগে- এই দীর্ঘ অভিযাত্রার শেষে আমি কি সত্যিই আমার মাতৃভূমির ঋণ শোধ করতে পেরেছি? যদি না-ও পেরে থাকি, তবে সেই চেষ্টার স্বাক্ষর হয়তো থেকে যাবে আমার প্রতিটি শব্দে, প্রতিটি লেখায়, প্রতিটি নিঃশ্বাসে।
লেখক পরিচিতি
কানাডায় চার দশকের বেশি সময় ধরে বসবাসরত। মোট ৫৫টি গ্রন্থ প্রকাশিত। বহু পুরস্কারের অর্ঘমাল্য ও সম্মাননা পেয়েছেন দেশে-বিদেশে। ইংরেজি গল্প সংকলন ‘Dusk in the Frog Pond’ বইটির জন্য যুক্তরাষ্ট্রে IPPZ Award (Independent Publishers’ Award 2022) লাভ করেন মাল্টিকালচারাল ফিকশন বিভাগে এবং ২০২২ সালে কানাডার অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ Governor General’s Literary Award-এ মনোনীত হন।

