তালপাতার পুথি- পনেরোই আগস্ট এবং বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আখ্যান

মনীষ পাল

তালপাতার পুঁথি হলো প্রাচীন ভারতীয় ও দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় সভ্যতায় তালগাছের শুকনো পাতার ওপর হাতে লেখা পাণ্ডুলিপি। কাগজ আবিষ্কারের আগে সাহিত্য, ধর্মীয় গ্রন্থ, জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং চিকিৎসাশাস্ত্র সংরক্ষণের প্রধান মাধ্যম ছিল এটি। কিন্তু যে বইটি আমি আলোচনা করছি, এটি সেরকম কিছু নয়। এটি একটি আধুনিক কালের কাগজে ছাপানো উপন্যাস। আমার মনে হয়, হয়তো লেখক ভেবেছেন, তালপাতায় লেখা বা খোদাই করা প্রাচীন পাণ্ডুলিপি যেমন আমাদের ইতিহাস ও সাহিত্যকে ধারণ করে, তাঁর এ উপন্যাস যেহেতু ইতিহাসকে ঘিরে, সেহেতু এ নামটি দেয়া যায়।

প্রথমে বলে রাখি, অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী লেখক মহিবুল আলম-এর উপন্যাস ‘তালপাতার পুথি’

পড়ে আমি দারুণভাবে বিস্মিত হই। লেখক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে ফিকশন লিখেছেন, কিন্তু ফিকশনের আড়ালে লুকিয়ে আছে মর্মন্তুদ কাহিনি। এটি বঙ্গবন্ধুর জীবনী নয়। লেখক দাবি করেননি গবেষণা প্রসূত কোনো জীবনীগ্রন্থ তিনি লিখেছেন। বরং শুরুতেই পরিষ্কার করে বলেছেন,  উপন্যাসটা লিখতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু ও তৎকালীন রাজনীতির উপর হাজার খানেকের বেশি বই তিনি পড়েছেন কিন্তু ইতিহাস থেকে নিয়েছেন খুব সামান্য। তিনি ভূমিকাতে আরও স্পষ্ট করে দিয়েছেন, বঙ্গবন্ধুকে বৃত্ত করে রাজনৈতিক চরিত্রগুলো বাদে বাকি যত চরিত্র, সেগুলো তাঁর সৃষ্টি।  ঘটনাপ্রবাহে তিনি প্রচুর কল্পনার আশ্রয় নিয়েছেন। এটি একটি উপন্যাস – তবে সত্য ঘটনার ছায়া অবলম্বনে রচিত উপন্যাস। তিনি রাজনৈতিক বা ইতিহাস-নির্ভর উপন্যাস লিখতে যাননি, লিখেছেন নিটোল এক সামাজিক উপন্যাস। তাই ইতিহাসের বই পড়লেও লম্বা তালিকা দিয়ে উপন্যাসকে ভারাক্রান্ত করতে চাননি। বরং ব্যক্তি বঙ্গবন্ধু যিনি একজন পিতা, একজন স্বামী, তাঁর পঞ্চান্ন বছরের জীবনে বেগম  ফজিলাতুন নেছার সাথে পঁয়তাল্লিশ বছরের মধুর বিবাহিত জীবন সব মিলিয়ে বঙ্গবন্ধুকে আবর্ত করে যে একটা সমাজ, সেই সমাজ এবং সেই সমাজের দিনলিপি হচ্ছে এই উপন্যাস। তবে মনে রাখতে হবে বঙ্গবন্ধু ইতিহাসও বটে। তাই সামাজিক উপন্যাস হলেও ইতিহাসকে পরিহার করা যায়নি এই বইতে। লেখক ইতিহাস থেকে নিয়ে নিজের মতো করে গল্প সাজিয়েছেন। তবে এটি করতে গিয়ে নিজে ইতিহাস বানাননি। এই উপন্যাস লিখতে গিয়ে তিনি আর্মচেয়ার রাইটিং বা কাল্পনিক বা তত্ত্বগত প্রক্রিয়ার আশ্রয় নেননি।  ইতিহাসকে বুঝতে গিয়ে তিনি বরং ইতিহাসের সাক্ষ্যগুলো সরেজমিন দেখতে যান। বাস্তব ধারণা নেবার জন্য তাঁর বর্তমান প্রবাস জীবন থেকে বাংলাদেশে এসে টুঙ্গিপাড়া-সহ বিভিন্ন জায়গায় মাঠপর্যায়ে ঘুরে বেড়ান।

প্রথম দুটি অধ্যায় শুরু হয়েছে বঙ্গবন্ধুর সাথে তাঁর স্ত্রী রেনুর অতীত স্মৃতি নিয়ে। এই দুটো অধ্যয়ে লেখক  আমাদের নিয়ে যান ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে। উপন্যাসের আবহ তৈরি হয়ে যায় প্রথম দিককার এই অধ্যায়গুলোতে। যেমন, বঙ্গবন্ধু খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠতেন, ৩২ নম্বরে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের সেই সময়টায় বিউগলের সুর শোনা তাঁর একটা অভ্যাস হয়ে যায়। লেখক যেহেতু ইতিহাস লিখেননি, সেইজন্য কোনো দিনপঞ্জি বা তারিখ সেভাবে উল্লেখ করেননি। তবে ধরে নেয়া যায়, এই উপন্যাসের মূলভাবনা যেহেতু বঙ্গবন্ধু হত্যাকে কেন্দ্র করে, তাই তাঁর স্ত্রীর সাথে ভোরবেলার এই কথোপকথন নিশ্চয়ই ১৫ই আগষ্টের আগের দিন, কারণ এই কথোপকথনে উঠে আসে সেই সময়ের রাজনীতির টালমাটাল অবস্থা। বঙ্গবন্ধু আক্ষেপ করে স্ত্রীকে বলছেন, ‘দেশ স্বাধীনের পর  আমি যা ভেবেছিলাম, দেশ এখন সেই ভাবে চলছে না।’ স্ত্রী যখন পরামর্শ দেন, ওদেরকে ঝেটিয়ে বিদায় করবার জন্য, তখন বঙ্গবন্ধু বলেন, চাইলেও এখন বিদায় করা যাচ্ছে না। বঙ্গবন্ধুর সেই উক্তি তো ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে, যখন তিনি বলেছিলেন, ‘আশেপাশে যারা আছে , তারা সব চাটার দল।‘

লেখক বঙ্গবন্ধুর সাথে স্ত্রীর কথোকথনের মধ্য দিয়ে আবারো ৩২ নম্বরের সেই বাড়ির সূচনালগ্নের ইতিহাসের কথা লেখেন, কীভাবে পাকিস্তান আমলে শহীদ সোহরাওয়ার্দী সাহেব পাকিস্তান সরকার থেকে পাওয়া তিনটা বাড়ির একটি শেখ মুজিবকে উপহার হিসেবে দেন। সেই দিনের টিনের ঘর থেকে আজকের ৩২ নম্বরের বাড়ি হয়ে উঠার গল্প কল্পকাহিনিকেও হার মানায়। লেখক উপন্যাস যেহেতু লিখেছেন, তাই বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী বঙ্গবন্ধুর সাথে যে মধুর খুনসুটি করতেন, সেই ছোট ছোট বিষয়গুলো খুব চমৎকারভাবে এঁকেছেন। তবে বঙ্গবন্ধু যেহেতু আপাদমস্তক রাজনীতির লোক, তাই ঘুরে ফিরে রাজনীতিই মুখ্য আলাপ হয়ে দাঁড়ায়। যেমন, সেই ভোরে স্ত্রীর সাথে কথার এক পর্যায়ে বলেন, দেশ স্বাধীনের পর, সেই সময়ের ছাত্রনেতা সিরাজুল আলম খান, আ স ম আব্দুর রব, শাহজাহান সিরাজদের আগের মতো তিনি আর পাচ্ছেন না।  সেই সকালের কথোপকথনে সবচেয়ে বেশি যে মানুষটির কথা তাঁদের মনে পড়ে, তিনি আর কেউ নন, তাজউদ্দীন আহমেদ – বঙ্গবন্ধুর স্ত্রীর প্রিয় তাজ ভাই। বঙ্গবন্ধু বলতেন, ‘আমার তাজ, আমার মাথার তাজ।‘

বঙ্গবন্ধু নিজেই বুঝতে পারেন, তাজউদ্দীন আহমেদ শুধু নয়, সৈয়দ নজরুল ইসলামও তাঁর প্রতি অসন্তোষ ছিলেন। তাঁরা কেউ বাকশাল পদ্ধতিকে পছন্দ করেননি। তাঁদের হারিয়ে বঙ্গবন্ধুর উপায় ছিল না, খোন্দকার মোশতাকের উপর নির্ভর করা ছাড়া। তাই সুযোগ বুঝে মোশতাক বাগিয়ে নেন গুরুত্বপূর্ণ পদ ও পদবি। বঙ্গবন্ধু শুধু অপেক্ষা করছিলেন, আসন্ন সেপ্টেম্বরে গভর্নরদের দায়িত্ব নেয়ার জন্য। তাঁর আশা ছিল, তৃণমূল পর্যায়ে বাকশালে বিশ্বাসীদের বসিয়ে দিয়ে কাজ শুরু করতে পারলে দেশের অস্থির পরিস্থিতির লাগাম টানা যাবে। কিন্তু সেই সুযোগ আর আসে নি। তাই বারবার স্ত্রীর সাথে কথার মধ্যে এই বিষয়টি তিনি নিয়ে আসেন। বলেন, ওসব ষড়যন্ত্র করে টরে মোশতাক কিছুই করতে পারবে না, একবার নতুন সিস্টেমটা দেশে পুরোপুরি চালু হোক, তারপর দেখবে এসব নেতাদের ষড়যন্ত্র কোথায় যায়। বঙ্গবন্ধু মোশতাককে পুরোটা অবিশ্বাস করেছেন তাও নয়। ভেবেছিলেন , মানুষ তো বদলায়।  কিন্তু তাঁর স্ত্রী বরাবরই মোশতাককে নিয়ে স্বামীকে সতর্ক করতেন। বারবার বলতেন, তাজউদ্দীনকে ডেকে নিয়ে আসতে, বলেন, ‘আমার মনে হয় , এখনই ফাটল জোড়া লাগানোর সময়। এখনও কোনোকিছু শেষ হয়ে যায়নি। বঙ্গবন্ধু স্ত্রীকে জানান, তাজউদ্দীনকে বাকশাল গঠনের আগে তিনি ফোন করেছিলেন, কিন্তু তাজউদ্দীন সাড়া দেননি। তারপরও বেগম  ফজিলাতুন নেছা বলেন, ‘তারপরও আপনি যান। একবার না হয়, দশবার যান। আপনার জন্য না হলেও দেশের জন্য হলেও যান।’

তাঁর স্ত্রীর নিশ্চয়ই কোথাও খটকা লেগেছিলো। তিনি হয়তো আশংকা করেছিলেন দৈব দুর্বিপাকের। হয়তো সেদিনের ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি তার হয়তো অলক্ষুণে লেগেছিল। ১৪ই আগস্টের সেই সকালকে লেখক ধরেছেন এভাবে, ‘প্রকৃতিতে ধোঁয়াশা স্তব্ধতা। নারিকেল গাছের ডগায় টিয়ে পাখি দুটো আর নেই।  দূরে কোথাও কাক ডাকছে।’

ঔপন্যাসিক লিখেছেন জীবনের গল্প – রাজনীতি ও সমাজনীতির গল্প। কিন্তু সেই গল্পের ছলে তিনি পাঠককে তিনি নিয়ে যান বঙ্গবন্ধুর কৈশোর-যৌবনের দিনগুলোতে। ফজিলাতুন নেছা, যাকে বঙ্গবন্ধু আদর করে ডাকতেন রেনু বলে, সেই রেনুর স্মৃতি-কথনের ভেতর দিয়ে লেখক পাঠককে নিয়ে যান বঙ্গবন্ধুর গোপালগঞ্জের মিশনারি স্কুলে। সেই দিনগুলোতে কীভাবে তিনি সবার মুজিব ভাই হয়ে উঠেন, সেই গল্পে। সেই সময় ১৯৩৮ সালে স্থানীয় হিন্দু-মুসলিম বিবাদের সময় হিন্দু মহাসভার দায়ের করা মামলায় পুলিশ শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করে।  সেই সময় জীবনে প্রথমবারের মতো তিনি কারাগারে যান। সেদিন যদিও শেখ মুজিবের স্ত্রী বুঝতে পারেননি  কেন স্বামী জেল খেটেছেন। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় স্বামীর গ্রেফতার এবং কারাবাস তাঁর সওয়া  হয়ে যায়। লেখক বঙ্গবন্ধুর ভাষ্যে গল্পের প্রয়োজনে ওই বিষয়টি উল্লেখ করেন, ‘রেনু হলো আমার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।‘ সেটি বঙ্গবন্ধু দেখেছেন বাকশাল তথা দ্বিতীয় বিপ্লব কায়েমের সময়। স্ত্রী বাকশাল গঠন তেমন পছন্দ করেননি কিন্তু স্বামীর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের শেষ পর্যন্ত সমর্থন দিয়ে যান। তবে  ফজিলাতুন নেছার ভাষ্যে লেখক জানান, স্বামীর জন্য তিনি সেই ছোটবেলা থেকেই টাকা পয়সা জমাতেন যাতে স্বামীকে তাঁর শ্বশুরের কাছ থেকে লুকিয়ে সিগারেটের জন্য টাকা দিতে পারেন।

৩২ নম্বরের সেই বাড়ির ভেতরে একটি পরিবারের সদস্যদের সকালের আটপৌরে সংলাপ অথচ পরতে পরতে জানা হয়ে যায় ইতিহাস। শেখ কামালের সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী সুলতানা কীভাবে রেহানার অবর্তমানে শিশু রাসেলের যত্ন নিতেন, শেখ রেহানা যখন বড় বোন শেখ হাসিনার শিশু পুত্র জয় আর কন্যা পুতুলকে দেখভাল করবার জন্য সেই সময়ে জার্মানি যান, শেখ জামাল আর তাঁর দূর সম্পর্কের আত্মীয়া স্ত্রী রোজীসহ পরিবাবের সবাই ৩২ নম্বরের স্বল্প পরিসরের বাড়িটিতে একসাথে সকালের নাস্তা করতেন, সেইসব জীবনের গল্প সাবলীলভাবে লিখে যান লেখক, পাঠককে নিয়ে যান বঙ্গবন্ধু আর পরিবাবের প্রতিদিনের সকালের গল্পে। একেবারে সাদামাটা সেই গল্প। কোনো নাটকীয়তা নেই হাল হামলের রাজা রাজন্যদের মতো – পারিষদবর্গ পরিবেষ্টিত হয়ে থাকতে যারা পছন্দ করেন। ১৪ই আগস্টের সেই ভোরে শেখ কামালের সাথে তাঁর মায়ের শুধু একটা সংলাপ থেকে আমরা জানতে পাই, শেখ মুজিব পরদিন যাচ্ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে , স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো অন্যতম সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে রাষ্ট্রপতির প্রথম সফর।  সেই উপলক্ষে কামালের কথাটি ছিল এরকম, ‘জী আম্মা, কাল আব্বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছেন না? আব্বার যাওয়া উপলক্ষে একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে।’ মা ফজিলাতুন নেছা শুধু জিজ্ঞেস করেন , ‘কী, তুই সেতার  বাজাবি?’ বাইরের কালো মেঘ ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি হয়ে ঝরছে, ফজিলাতুন নেছার মনে ও জমে উঠে কালো মেঘ।  তিনি বারান্দার বাইরে বড় গাছের মগডালে বসা কাকটা তাড়াতে চাইছেন কিন্তু কাকটা নড়ছে না, ডেকেই চলেছে কিন্তু এবার আরো জোরে।

ষষ্ঠ অধ্যায়ে লেখক আমাদের সাথে এই প্রথম পরিচয় করিয়ে দেন উপন্যাসের অন্যতম চরিত্র মেজর ফারুকের সাথে। ফারুক অভ্যুথানের সামরিক নীল নকশার অন্যতম প্রধান পুরুষ। তবে যে বিষয়টি উল্লেখ করার মতো, তা হচ্ছে মেজর ফারুকের সাথে ১৪ই আগস্টের সকালে তাঁর বাবার কথোপকথন। তাঁর বাবা ডাঃ রহমান নিজেও সেনাবাহিনীতে ছিলেন। মেডিকেল কোরে চাকরির সুবাদে অবসরেও সেনাবাহিনীর ব্যাপারে তাঁর কৌতূহল থেকে যায়। তাই ছেলের সাথে সেদিনের সেই সকালের আলোচনায় ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে , খালেদ মোশাররফ নিয়ে তাদের দুজনের আলাপচারিতা। ব্রিগেডিয়ার মোশাররফ সম্পর্কে ফারুকের মামা। ফারুকের বাবা রহমান সাহেবের ধারণা ছিল, জেনারেল শফিউল্লাহর পর খালেদকেই সেনাপ্রধান করা হবে। কিন্তু তিনি জানতেন না, শেখ মুজিব শফিউল্লাহকে আবারও পরের তিন বছরের জন্য সেনাপ্রধান নিয়োগ দিয়ে দেন। সেই সকালের  পিতা-পুত্র সংলাপে  দেশের সেসময়কার পরিস্থিতি থেকে শুরু করে সেনাবাহিনীর মধ্যে অস্থিরতা ইত্যাকার নানান বিষয় এবং সে সব বিষয়ের কুশীলবকে লেখক তুলে আনেন। পিতা-পুত্রের মধ্যে খুব যে সহজাত সম্পর্ক ছিল, তা নয় কিন্তু সেদিনের সকালটাতে দুজনেই বেশ খোলামেলা আলাপ করেন এবং সেই আলাপে লেখক দেখান, সেনাবাহিনীর বাসভবনে থাকার সুবাদে সেনা অভ্যন্তরে কতিপয় অফিসারের নানান তৎপরতা নিয়ে কানাঘুষা পিতার কানে আসে এবং সেই বিষয়ে পুত্রকে তিনি সুযোগ বুঝে সতর্ক করেন। সেই সতর্ক পুত্র যে কানে তোলেননি, সেটি তো এখন ইতিহাসের বিষয়। কানে তুললে আজকে বাংলাদেশের ইতিহাস হয়তো ভিন্ন হতো।

এই বইটি পড়তে গিয়ে আমার বারবার মহাভারতের যুধিষ্ঠিরের কথা মনে পড়ে যায়। যুধিষ্ঠির কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে জয়ী হন, কিন্তু সেই জয়ের জন্য চরম মূল্য দিতে হয় তাঁকে। হারাতে হয় আত্মীয়স্বজন, বন্ধু, উত্তরসূরি এবং অসংখ্য প্রজার জীবন। এদিকে বঙ্গবন্ধুর ক্ষেত্রে রক্তক্ষয়ী বিজয়ের পর কাঁধে এসে পড়ে বাংলাদেশ নামের যুদ্ধবিধ্বস্ত এক জনপদের দায়িত্ব। যুধিষ্ঠিরের জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডিগুলোর একটি ছিল আপনজনের বিশ্বাসঘাতকতা। কৌরবরা ছিলেন তাঁরই আত্মীয়। ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁকে নিজের আত্মীয়দের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করতে হয়। এদিকে বঙ্গবন্ধু পরিবারসহ নিজের জীবন দিয়ে দেন। ১৯৭৫ সালের হত্যাকাণ্ডে তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে অংশ নেয় সেনাবাহিনীসহ রাষ্ট্রযন্ত্রের একটি অংশ এবং খন্দকার মোশতাক, তাহের উদ্দিন ঠাকুর-সহ তাঁর ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের কিছু ব্যক্তি। এই দিক থেকে দুজন মহাচরিত্রের জীবনেই সবচেয়ে বড় আঘাত আসে বাইরের শত্রুর চেয়ে ভেতরের বিভীষণদের কাছ  থেকে।

যুধিষ্ঠির যুদ্ধ জিতলেও তাঁর উত্তরসূরি প্রজন্ম প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধুর ক্ষেত্রে ট্র্যাজেডিটি আরও নির্মম। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট তিনি তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে নিয়ে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। তাঁর স্ত্রী, তিন ছেলে, পুত্রবধূ এবং পরিবারের আরও অনেক সদস্য সেইদিন গুলির আঘাতে প্রাণ হারান।

একেবারে শেষ অধ্যায়ে লেখক ১৫ই আগস্টের নির্মমতার এক বেদনাবিধুর দৃশ্যকল্প আঁকেন। নির্মমতার প্রথম শিকার হয় শেখ কামাল। কামাল ঘটনার আকস্মিকতায় পরিস্থিতি অবলোকনের জন্য নিচে নেমে আসেন। আর সেই নেমে আসাটাই তাঁর কাল হয়ে দাঁড়ায়। তারপর তো এলোপাতাড়ি গুলি ধেয়ে আসে সারা বাড়ি জুড়ে। বঙ্গবন্ধু শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আশা করেন, শফিউল্লাহর নেতৃত্বে সেনাবাহিনী চলে আসবে যে কোনো সময়। সেই সাথে কর্নেল জামিলের নেতৃত্বে গার্ড রেজিমেন্ট। এসব গোলাগুলির মধ্যেও তিনি তোফায়েল আহমেদের সাথে কথা বলার সুযোগ পান। তোফায়েল তাঁকে আশ্বস্ত করেন, ‘আপনি কোনো চিন্তা করবেন না।’ দুধর্ষ পরিস্থিতি, উচ্ছৃঙ্খল অফিসার বেষ্টিত হয়ে আছেন তিনি। বুঝতে পারছেন, হাতে সময় ফুরিয়ে আসছে। তারপরও  টেলিফোনে চেষ্টা করছেন সামরিক বেসামরিক অধস্থনদের, শেষমেশ পেয়ে যান তাঁর সামরিক সচিবকে। সামরিক সচিব তাঁকে আশ্বস্ত করেন, ‘এভরিথিং উইল বি আন্ডার কন্ট্রোল, জাস্ট ম্যাটার অফ টাইম স্যার।’ কিন্তু সেই সময় আর আসে না। লেখক টানটান উত্তেজনার এই কয়েকটি ঘন্টা খুব বিস্তারিত তুলে এনেছেন। সেদিন এই অল্প কয়েক ঘন্টার মধ্যে জামিল, শফিউল্লাহ, শাফায়াত জামিল ফোনে একেকজন একেক কথা বলেন বঙ্গবন্ধুকে। কেউ বলেন ঘরে থাকতে, কেউ বলেন বাঁচার জন্য আপাতত ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে। এদিকে বজলুল হুদা, ল্যান্সার মহিউদ্দিন-সহ একঝাঁক সৈন্য বাজপাখির দৃষ্টি নিয়ে বঙ্গবন্ধুকে তাড়া দেয়। তাদের সাথে যাওয়ার জন্য বলে, আপনি বন্দি , আপনি চলুন।‘ লেখক বঙ্গবন্ধুকে চরম হেনস্থার এই দৃশ্যগুলো বোঝাতে হুদা আর বঙ্গবন্ধুর মধ্যকার কথোপকথন পুঙ্খানুপুঙ্খ লিখেছেন। ৩২ নম্বরের সিঁড়ি দিয়ে যখন বঙ্গবন্ধুকে নামিয়ে আনে তারা, তখন দৃশ্যপটে মেজর নূরের আগমন এবং বঙ্গবন্ধুকে নূরের স্টেনগান দিয়ে গুলির শব্দ ট্যা , ট্যা , ট্যা যেন সময়কে চিরদিনের মতো থমকে দিয়ে যায়। এই উপন্যাসের  উপজীব্য বঙ্গবন্ধুর নির্মম  হত্যাকান্ড। লেখকের মুন্সিয়ানায়  ছয়শোরও অধিক পৃষ্ঠা জুড়ে জীবন্ত হয়ে উঠে বাঙালির আত্মঘাতের এই অধ্যায়।

তবে এই অভ্যুত্থান সামরিক বাহিনী করেছে বললে ইতিহাসের প্রতি পুরো ন্যায়বিচার হয় না। লেখক তাঁর উপন্যাসে ঘটনা পরম্পরার প্রতিটি মুহূর্ত খুব চমৎকারভাবে সাজিয়েছেন যাতে পাঠক মাত্রই বুঝতে পারবেন, এটি ছিল সিভিল মিলিটারি ক্যু-এর টেক্সটবুক কেস বা পাঠ্যপুস্তক উদাহরণ। খোন্দকার মোশতাক ছিলেন বেসামরিক ষড়যন্ত্রের নেতৃত্বে। তারই ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠে তাহের উদ্দিন ঠাকুর, মাহবুবুল আলম চাষী , শাহ মোয়াজ্জেম সহ বাদবাকিরা। লেখক দেখান, খোন্দকার মোশতাককে নিয়ে তাহেরউদ্দিন ঠাকুরের মানসিক দ্বন্দ্ব। তাহেরউদ্দিন ভাবেন, সম্রাট জুলিয়াস সিজারকে যেমন হত্যা করে তার বন্ধু ব্রুটাস, বঙ্গবন্ধু হত্যার ষড়যন্ত্রে খোন্দকার মোশতাকের ভূমিকাও তাই। লেখক লিখেছেন, বাকশাল নিয়ে খোন্দকার মোশতাকের আদিখ্যেতা দেখে যখন ষড়যন্ত্রের সহযোগী রাজনীতিকরা ভড়কে যান, তখন রহস্য ফাঁস করেন মোশতাক। গুরুজনদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, ‘যাকে  তোমরা ঘায়েল করতে চাও, তার ভেতরেই তুমি আপনজন – বন্ধু হয়ে ঢোকো। দ্যান ইউ উইল এচিভ সামথিং।’

খোন্দকার মোশতাক এই ষড়যন্ত্রের নেপথ্য কারিগর। কিন্তু তার চরিত্রে ছিল প্রচন্ড মানসিক দ্বন্দ্ব আর সেই দ্বন্দ্বের দৈন্য প্রকাশ পেয়েছে এই উপন্যাসের পাতায় পাতায়। শেখ মুজিবকে সরিয়ে দেবার ষড়যন্ত্র সফল হবে কি না, সেই বিষয়ে তিনি সবসময় সন্দিহান থাকতেন। আর সেই সন্দেহ থেকেই অভ্যুথান ব্যর্থ হলে কাকে কীভাবে ফাঁসিয়ে দেবেন, সেই ছকও মনে মনে এঁটে রাখেন। মোশতাক তাঁর ষড়যন্ত্রের সহযোগি অনেককেই ভাবতেন ছোট জাতের। আর মনে পুষতেন, তারা কেউ কখনো বন্ধু হতে পারে না। তাই তাহেরউদ্দিন ঠাকুরকে কাজে লাগান কিন্তু তার সাথে অভ্যুথানের বিস্তারিত পরিকল্পনা ভাগাভাগি করেন না। এদিকে কোলকাতার প্রবাসী সরকারের সময় থেকে এ যাবৎ শেখ পরিবাবের অন্যতম সদস্য ফজলুল হক মনিকে খন্দকার মোশতাক ব্যবহার করেছেন। অস্থায়ী সরকারে তাজউদ্দীন আহমেদ প্রধানমন্ত্রী হবেন, এটা মোশতাক মানতে পারেননি। খোন্দকার মোশতাকের যাবতীয় চাতুর্য একমাত্র তাজউদ্দীন আহমেদ বুঝতে পেরেছিলেন আর সেকারণে তাজউদ্দীন এর প্রতি মোশতাকের প্রতিহিংসা বরাবরই থেকে যায়।   উপন্যাসে তাহেরউদ্দিন ঠাকুরের সাথে মোশতাকের সংলাপে এই বিষয়টি বেশ পরিষ্কার উঠে আসে। শেখ মনিকে ব্যবহার করেই খোন্দকার মোশতাক বঙ্গবন্ধুর সাথে তাজউদ্দীন আহমেদের সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করে দেন।

এ বিষয়টি নিয়ে উপন্যাসে বিশদ কথা হয়েছে। ১৪ই আগস্ট সন্ধ্যায় শেখ মনি হন্তদন্ত হয়ে গণভবনে যান। আসলে মনি গণভবনে ছুটে যান গুরুত্বপূর্ণ কারণে। শেখ মুজিবকে তিনি বলেন, তাঁর কাছে গোপন সংবাদ আছে, সিআইএ-র নেতৃত্বে খোন্দকার মোশতাক ক্যু করবার পরিকল্পনা আঁটছে। যুগোস্লাভিয়ার কূটনৈতিক সূত্রে এই খবর মনি পান। কিন্তু শেখ মুজিবকে বলতেই তিনি স্বভাবসুলভ ভঙ্গিমায় এই আশংকা উড়িয়ে দেন। সেই একই উচ্চারণ, ‘পাকিস্তানী আর্মি আমাকে মারতে পারেনি, বাংলার মানুষ কি আমাকে মারবে?’ তারপরও মনি একটু মিনমিনিয়ে বলতে চান, বাংলার মানুষ মারতে যাবে না, কিন্তু সমস্যাটা মোশতাক আর সিআইএ-কে নিয়ে। এবার বঙ্গবন্ধু তাজউদ্দীনের বিষয়ে মনিকে সরাসরি জিজ্ঞেস করেন। মনির সাথে বঙ্গবন্ধুর কথোপকথনে এই বিষয়টি উঠে আসে যে মনির কারণেই বঙ্গবন্ধু তাজউদ্দীনের বিষয়ে বিভ্রান্ত হয়েছিলেন। অকপটে মনি স্বীকার করেন, তাজউদ্দীনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন কুমন্ত্রণা দিয়ে মোশতাকই তাকে ইন্ধন যোগাত। সেদিন গণভবনে একটু পর আসেন তোয়াব খান। তোয়াব খান জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাবলিক লাইব্রেরি এলাকায় বেশ কিছু শক্তিশালী বোমা বিস্ফোরণের খবর। এবার মনি সাহস করে সেনাবাহিনী এই কাজ করতে পারে বলে তাঁর সন্দেহের কথা বলেন। আবারও বঙ্গবন্ধু ব্যাপারটি আমলে নেন না। কর্নেল তাহেরকে ততদিনে সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত করে দেয়া হয়। তিনি তাহেরের উপর সন্দেহের তীর ছুড়ে দেন।

এই উপন্যাসে লেখক আমাদের নিয়ে যান মোশতাকের মনোরাজ্যে। মোশতাকের আফসোস, তাজউদ্দীনকে কোনঠাসা করতে পারলেও শেখ মুজিবের কিছু করতে তখনও পারেননি। আমরা দেখতে পাই, তিয়াত্তর সালের মার্চ থেকে শুরু হয় মোশতাকের মনোবাঞ্ছা – শেখ মুজিবকে সরিয়ে দেবার। চুয়াত্তরে দুর্ভিক্ষ আসে কিন্তু মোশতাকের আশা পূরণ হয় না। তারপর পঁচাত্তরের আগস্ট আসে। মোশতাক ভাবেন, ‘প্রতীক্ষার অবসান হবার কি এখনই সময় নয়?’

লেখক যেহেতু ইতিহাসের ঘটনা অবলম্বনে লিখেছেন, তাই উপন্যাসের কথোপকথন হয়তো কল্পনাপ্রসূত। কিন্তু ঘটনার চরিত্র এবং ধারাবাহিকতার দৃশ্যকল্প পড়ে এটুকু বুঝতে অসুবিধা হয় না আমাদের। ১৪ই আগস্ট রাতে খোন্দকার মোশতাকের বাসভবনেই চক্রান্তকারীদের চূড়ান্ত সভা হয়। লেখক আমাদের নিয়ে যান সে রাতে মোশতাকের বাসায়। যেখানে জড়ো হন তাহের উদ্দিন ঠাকুর, মাহবুবুল আলম চাষী। তারা তিনজন সেদিন  তিয়াত্তর সালের মার্চে তাদের প্রথম ষড়যন্ত্রের স্মৃতিচারণে মেতে উঠে। তখন থেকেই খোন্দকার মোশতাকের চেষ্টা ছিল সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান মেজর জেনারেল জিয়াকে কাছে ভেড়াতে। কিন্তু জিয়া কিছুতেই মোশতাকের ফাঁদে পা দেননি। চুয়াত্তর সালে দ্বিতীয় দফায় সেসময়কার মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সাথে মিলে আবারও ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনা হয়। সেবারও জিয়াকে ভেড়াতে তারা কম চেষ্টা করেনি। পরদিন ভোরে অপারেশন। তাই আগের সন্ধ্যায় তারা রাতের খাবারের জন্য মিলিত হয়। তাদের কথোপকথনে বোঝা যায়, পরদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবার উচ্ছ্বাসে বঙ্গবন্ধু ১৪ই আগস্টের যাবতীয় সতর্কবাণী উপেক্ষা করে যান। আবার সেই রাতেই খোন্দকার মোশতাক শেষবারের মতো বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করবার অভিপ্রায় ব্যক্ত করে। কী পরিহাস-প্রবণ হিংস্রতা তার! তাদের ডিনারের হাঁসের মাংস তিনি সাথে করে বঙ্গবন্ধুর জন্য নিয়ে যান।

১৫ই আগষ্টের সকাল তার সকল নির্মমতা নিয়ে একেবারে জ্বলজ্বল করে ধরা দিয়েছে এই উপন্যাসে। শেষ মুহূর্তগুলোতে ক্যাপ্টেন বজলুল হুদা আর সাঙ্গপাঙ্গদের উদ্ধত আচরণ সেদিন বঙ্গবন্ধুকে কীভাবে আঘাত করে, তার বর্ণনা নিদারুণভাবে ফুটে উঠে শেষের পৃষ্ঠাগুলোতে। ফ্যালফ্যাল দৃষ্টি মেলে তিনি তাকিয়ে থাকেন রক্তচক্ষু খুনিদের দিকে। মুহূর্তেই তাঁর মানসপটে ভেসে ওঠে পাকিস্তান এর জেনারেলদের কথা। বিশেষ করে আইয়ুব খান এবং ইয়াহিয়া খান যারা তাঁকে শেষ দিন পর্যন্ত সমীহ করে কথা বলতেন। অথচ পঁচাত্তরের সেই কালরাতে সদ্য স্বাধীন দেশের উচ্ছৃঙ্খল অফিসার আর জওয়ানরা কি দুর্বিনীত ছিল! শেষ পর্যন্তও তিনি চেয়েছিলেন তাঁদেরকে নিবৃত্ত করতে। কিন্তু সিঁড়ির গোড়ায় নেমে আসতেই মেজর নূর স্টেনগান দিয়ে তাঁর বুক ঝাঁঝরা করে দেয়। শেষ মুহূর্তের ঘটনাপঞ্জির অসাধারণ খুঁটিনাটি ঔপন্যাসিকের দক্ষতা ও কল্পনায়  নির্মাণ করেন মহিবুল আলম।  

বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ড নিয়ে রচনা বা গবেষণা শেষ হবার নয়।  তবে ইতিহাসের এই সময়টিকে নিয়ে ফিকশনের আদলে আরও কোনো উপন্যাস লেখা হয়েছে কি না আমার জানা নেই। এই একটি দিনকে উপজীব্য করে বড় আকারের এই উপন্যাসটির প্রচার প্রসার সেভাবে হয়েছে কি না, সেই বিষয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। কেননা, কোথাও কোন আলোচনায় এই উপন্যাস নিয়ে কারো কাছে শুনিনি। আমি মনে করি, এই উপন্যাসটির বহুল প্রচার দরকার শুধু বঙ্গবন্ধুর হত্যার পুঙ্খানুপুঙ্খ ঘটনা জানবার জন্য নয়, নয় উপন্যাসের রস আস্বাদনের জন্য শুধু, এটির প্রচার দরকার বৃহৎ পরিসরে জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি বিষয়টিকে বুঝবার জন্যও। সামরিক বাহিনীর অভ্যুথানের ধরন, গতিবিধি বা এর সক্ষমতা, দুর্বলতা বুঝবার জন্য ফিকশনের ভূমিকা অনেক সময় দামি গবেষণাধর্মী বইয়ের চেয়েও বেশি।

আন্তর্জাতিক কথাসাহিত্যে রাষ্ট্রনায়কদের হত্যা বা হত্যা চেষ্টা নিয়ে অনেক কাজের সন্ধান মেলে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট চার্লস দ্য গল-এর হত্যা-চেষ্টা নিয়ে রচিত হয় কালজয়ী উপন্যাস ১৯৭১ সালে ‘দ্য ডে অফ দ্য জ্যাকল’, তারও এক দশক আগে ১৯৬৩ সালে বেন অবরো লেখেন ‘এসাসিনেশন! জুলাই ১৪’। বহুল আলোচিত আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির হত্যাকান্ড নিয়ে রচিত হয়েছে অনেক কাজ। উপন্যাসের মধ্যে আছে ১৯৯৫ সালে লেখা জেমস এলরয়-এর ‘আমেরিকান ট্যাবলয়েড’, ২০১১ সালে লেখা স্টিফেন কিং-এর ‘১১/২২/৬৩’।

আমাদের অনেকের জানা, বঙ্গবন্ধুর মতো নির্মম হত্যার শিকার হইয়েছিলেন, চিলির রাষ্ট্রপ্রধান সালভাদোর আলেন্দে। সেই হত্যাকান্ডকে বিষয় করে তাঁরই আত্মীয় ইসাবেল আলেন্দে ১৯৮২ সালে লিখেছেন ‘দ্য হাউস অব দ্য স্পিরিটস’ – সেটি এমন একটি সাহিত্যকর্ম, যেখানে বিংশ শতাব্দীর চিলির ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে বিষয় করে তিনি লিখেছেন কাল্পনিক আখ্যান। লেখক ১৯৭০ সালে সালভাদর আলেন্দের সমাজতান্ত্রিক সরকারের নির্বাচিত হওয়া এবং পরবর্তী সময়ে স্বৈরাচারী শাসনের মাধ্যমে সেই সরকারের উৎখাতের ঘটনাকে চমৎকারভাবে কথাসাহিত্যে রূপ দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের সাথে আলেন্দের হত্যাকাণ্ডের মিল পাওয়া যায়। আলেন্দের হত্যাকান্ড নিয়ে রচিত কথাসাহিত্য আন্তর্জাতিক পরিসরে পৌঁছে গেছে। আমাদের দুর্ভাগ্য, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ড নিয়ে কথাসাহিত্য ইংরেজিতে তো নয়ই, বাংলাভাষাতেও বিরল। মহিবুল আলম এই কাজটি করে রাষ্ট্রনায়কদের হত্যাকান্ড নিয়ে কাল্পনিক আখ্যান রচনার দুর্ভিক্ষ অনেকটা ঘুচিয়েছেন।

অভিনন্দন মহিবুল আলম। আপনার অসামান্য সৃষ্টি ‘তালপাতার পুথি’ বিশ্বজুড়ে বাঙালিদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ুক।