তাসমিনা খানের “বসন্ত ও বিষাদ”- তাৎক্ষণিক মূল্যায়ন

ড. দিলীপ চক্রবর্তী

সম্প্রতি এক সন্ধ্যায় কানাডার জনপ্রিয় বাঙালি লেখিকা তাসমিনা খান আমার বাড়ি এসে তার সাম্প্রতিকতম পুস্তক ‘বসন্ত বিষাদ’  আমাকে উপহার দিয়ে কৃতজ্ঞতা পাশে আবদ্ধ করে গেলেন। পরদিন সকালে আমি কিছুটা সৌজন্যবশত “দেখি কী লিখেছে” এই মানসিকতা নিয়ে বইটা পড়তে শুরু করি। বইটি কিছুটা পড়ার পরেই আমার ভুল ভাঙ্গে। আমার মনে হল এটি একটি সাধারণ বা সামান্য পুস্তক না। এটি একটি মণিপূর্ণ খনি। আমি বইটি পড়তে পড়তে এতোটা বিভোর হয়ে গেলাম যে বলতে গেলে সকাল থেকে একভাবে বসে বইটা শেষ করে ফেললাম। অবশ্য মাঝে একবার ঘন্টা দুয়েকের জন্য উঠে স্নান আর এবং দিবানিদ্রা সেরে নিয়েছিলাম।

মাত্র ১৪৪ পৃষ্ঠার এই বইয়ে লেখিকা এমন সব দুরুহ এবং গুরুতর বিষয় অবতারণা করেছেন এবং প্রাঞ্জলভাবে তার বিশ্লেষণ করেছেন যে ভাবতে অবাক হতে হয়। তিনি অনেক সময় এমন সহজ সমাধানের হিসাবে দেখিয়েছেন যে এইসব বিষয় নিয়ে যুগে যুগে বিশ্বব্যাপী চিন্তাবিদগণ অনেক বিবেচনা করেও সুসংহত এবং সর্বজনগ্রাহ্য সিদ্ধান্তে আসতে পারেননি। লেখিকা ভালোবাসা, প্রেম, মোহ ,সুখ, কাম, বন্ধন ইত্যাদি স্পর্শকাতর বিষয়ে এমন সাবলীল ভঙ্গিতে এবং হৃদয়গ্রাহী ভাষায় আলোচনা করেছেন যে লেখিকার মেধা এবং মননশীলতার প্রতি শ্রদ্ধাবণত না হয়ে পারা যায় না। 

‘ফাদার অব ইংলিশ এসেজ’ অভিধায় খ্যাত ফ্রন্সিস বেকন বলেছেন “studies serve for delight, for ornament and for ability.” তাসমিনার বইটি পড়ে এই কথার সারবত্তা আবার উপলব্ধি করলাম। যে পুস্তক একসাথে জ্ঞান বর্ধন এবং আনন্দ বর্ধন করে তাকে আমরা সার্থক পুস্তক বলি। আলোচ্য পুস্তক এই শ্রেণিভুক্ত। আমরা অনেক কিছুই জানি না এবং জানি না যে সেটাও জানি না এই কথাটা নতুন করে অনুভব করলাম। 

বেকন সাহেব আরো বলেছেন, “some books are to be tested, others to be swallowed and few to be chewed and the digested.” আলোচ্য পুস্তক নিঃসন্দেহে “chewed and digested” হওয়ার দাবিদার। বইটি পড়তে পড়তে এতটাই বিভোর হয়ে গিয়েছিলাম যে ভুলেই গিয়েছিলাম সামনে যা ধরা আছে তা সাদা কাগজে কিছু অক্ষর। ঠিক এই কথাটাই বলেছেন আমেরিকান সাহিত্যিক Richard Yansi,” One of the joys of a really good book is that you are so into the one of the book, you forget what you was looking at is words only paper.” 

পুস্তকের বিষয়বস্তু গুরুগম্ভীর, কিন্তু লেখিকার লিখনশৈলী সহজ, আর ভাষা সাবলীল। লেখিকা তার আলোচনার পরিসর সীমিত এবং একটিমাত্র স্থানে সীমাবদ্ধ রাখেননি। এর পরিসরের ব্যাপ্তি প্রায় বিশ্বব্যাপী – বাংলাদেশ থেকে কানাডা। 

“সোনার হরিণ ” ভগ্নাংশের নায়িকা লীনা মেধাবী, সংবেদনশীল, আত্মমর্যাদা সম্পন্ন। লীনার কাছে প্রেম পবিত্র – অনেকটা প্লেটোনিক লাভের মতো। যাকে বলা যায় ডিভাইন লাভ। বাংলায় বলতে গেলে “রমণীর প্রেম নিকশিত হেম, কামগন্ধ নাহি তায়।” লীনার যে প্রেমিক, “জন” – তিনি আবার লীনার সন্তানের বায়োলজিক্যাল ফাদার। তার অবস্থান বিপরীত মেরুতে। তার কাছে platonic love is that love which is “play” for the boy and “tonic” for the girl. লীনার আরাধ্য প্রেম, জনের আরাধ্য কাম। এই দুই-এর পার্থক্য সাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসু সুন্দরভাবে বলেছেন, “তুমি মোরে দিয়েছ কামনা, অন্ধকার অমা-রাত্রি সম, / তাহে আমি গড়িয়াছি প্রেম, মিশাইয়া স্বপ্ন সুধা মম।” 

সব বস্তুই দান করলে কমে যায়। ব্যতিক্রম বিদ্যা। এ ধন সে ধন নয়, কেউ নেবে কেড়ে, যতই করিবে দান তত যাবে বেড়ে। বেদের শ্লোকের ভাষায় বলতে গেলে, 

“পূর্ণমদঃ, পূর্ণমিদং, পূর্ণাৎ, পূর্ণমুদচ্যতে, পূর্ণস্য পূর্ণমাদায় পূর্ণমেবাবশিষ্যতে।” অর্থাৎ পূর্ণ থেকে পূর্ণ নিয়ে গেলেও পূর্ণই অবশিষ্ট থাকে। এক রত্তিও কমে না। যেমন আলোচ্য পুস্তকের বিতারিত জ্ঞান। 

লেখিকা বয়সে আমার অর্ধেকও নন। কিন্তু কানাডার বাঙালি সমাজে তাঁর প্রতিষ্ঠা  আমার চেয়ে অনেক বড়। তিনি উচ্চশিক্ষিতা, পেশাগত জীবনে একজন লব্ধ প্রতিষ্ঠা বিহেভিয়ার এনালিস্ট। আর কানাডার বাংলা সাহিত্য আকাশে তিনি এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।

আমি তাসমিনা খানের সর্বাঙ্গীন মঙ্গল কামনা করি।