দেশান্তরে বসতি
বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ছবির মত নদীর বুকে ছিল এক বাঁশের সাঁকো। সেই বাঁশের সাঁকোতে চড়ে দু’টো খেলা ছিল আমাদের কাছে ভীষণ মজার! যার প্রথমটা ছিল, সাঁকো বেয়ে নদীর একেবারে মাঝখানে সাঁকোতে দাড়িয়ে নীচে দিকে তাকালে মনে হত, সাঁকোটা নিজেই ছুটে চলেছে! সেই ছুটন্ত সাঁকো দেখে আমাদের যে কি মজা লাগত, তা বলে বোঝানো যাবে না! দ্বিতীয়টা ছিল, নদীতে নামার সুযোগ পেলেই দলবেঁধে সেই সাঁকোতে উঠে বারংবার নদীতে ঝাঁপ দেওয়া ছিল সবচেয়ে প্রিয় খেলা! ঝাঁপ দিয়ে খানিক সাঁতরে আবার সাঁকোতে উঠে ঝাঁপ! সুযোগ পেলেই যে কতবার সেই সাঁকোতে উঠে একবার ওপার যেতাম, আবার এপার আসতাম! শিশু-কিশোর বয়সের সেই বাঁশের সাঁকো শুধুমাত্র খেলাধুলার জন্যই ছিল! সেই সাঁকো যে বিচ্ছিন্ন পথকে জুড়ে দিয়ে কত পথিকের চলার পথ ও গন্তব্যকে সহজতর করত, তা কেবলমাত্র এখন বুঝতে পারি! সেই সাঁকো পারাপার করতে করতে অনেকগুলো বড় শহরের চৌহদ্দি ঘেঁটেঘুঁটে কবে-কিভাবে যে এই প্রবাসে দেশান্তরী হলাম, সে এক ধাঁধা! ভিসা পেয়ে হাস্যরসখ্যাত ভানু বন্দোপাধ্যায়ের মতই ’দেখি না কি হয়’ ভেবে বিমানে চড়ে বসেছিলাম! সেই প্রবাস-দেশান্তর এখন বসতবাড়ি!
জন্ম মাটির যে সাঁকোর কথা বলেছিলাম, এই শীতলোকের ক্রুরতার মাঝে এসেও সেই সাঁকোর কথা আমার মনে গেঁথে রয়েছে! একটি ছোট্ট সাঁকো একজন মানুষকে কত এগিয়ে দিতে পারে! এদেশে আসার প্রথম পর্বেই আত্মীয়সূত্রে ভুল তথ্যের স্বীকার হয়ে প্রবাসী জীবনের বেশ খানিকটা সময় পিছিয়ে গেছি! এরপর বৃহত্তর বাঙালী কম্যুনিটির মধ্যে প্রবেশ ঘটলে যা জানতে পারলাম, তা এক জীবনেরও অধিক! দেশান্তরে আসা মানুষের জীবনে যে কত বিচিত্র রকম ঘটনা ঘটতে পারে, কম্যুনিটিসূত্রে তা জেনে বিস্মিত হবার ক্ষমতা পর্যন্ত রহিত হয়ে গেছে! মাঝে মাঝে মনে হয়, দেশের চেয়ে কি প্রবাসে আমাদের কম্যুনিটিতে অন্য কম্যুনিটির প্রভাব ও অপ্রত্যাশিত স্বাধীনতা অর্জন হেতু ঘটনাবাহুল্য চোখে পড়ে? এ বিষয়ে পেছনে রেখে আসা দেশের সমাজ বরঞ্চ অনেক বেশী সুস্থিত ও পরিবর্তনরহিত। সে সব অভিজ্ঞতা প্রবাসে আসার উপযোগীতা, পেছনে রেখে আসা সমাজের দার্ঢ্যতা থেকে ব্যক্তিত্ত্বের মুক্তি, আর্থিক স্বাধীনতার পাশাপাশি অপার সামাজিক স্বাধীনতা, ইত্যাদির মধ্যেও আমাকে চিনিয়ে দিয়েছিল প্রবাসের কিছু অন্তঃসারশূন্য দিক! নিজেকে ও নিজের মধ্যে দৃঢ় প্রোথিত সামাজিক-সাংষ্কৃতিক পরিচয় বিনষ্ট হয়ে যাবার আতংক থেকেই শুরু হয়েছিল নিজ স্বত্ত্বা ও লেখালেখির অভ্যাস বাঁচিয়ে রাখার প্রয়াস। পাশাপাশি আবার জানতে পেরেছি, অনেক প্রতিভাশালী ও শক্তিশালী লেখক বা শিল্পীর সৃজনশীলতা প্রবাসের মাটিতে শুকিয়ে গেছে! বিপরীতে অনেকে সেই সৃজনশীলতা বাঁচিয়ে রাখার তাগিদে প্রবাসে থেকে যাবার সুযোগ অবহেলা করে নিজস্ব মৃত্তিকায় ফিরে গেছেন! এসব ভালোমন্দের মধ্যে দিয়ে নিজেকে ভাল রাখার প্রচেষ্টার মধ্যে একবার গ্রীষ্মাবকাশে সপরিবারে কানাডার কয়েকটি শহর ও আমেরিকার কয়েকটি শহরে ভ্রমণ করেছিলাম। সেই দীর্ঘ ভ্রমণকাল প্রবাসের মাটিকে আরো বেশী করে জানতে ও চিনতে যেমন সাহায্য করেছিল, তেমনি দেশান্তরের মৃত্তিকায় শিকড় দৃঢ় করতে আত্মবিশ্বাস যুগিয়েছিল!
সে গ্রীষ্মে বেড়ানোর জন্য তিন অংশে বিচ্ছিন্নভাবে মোট পাঁচ সপ্তাহের জন্য ঘুরেছিলাম। হ্যামিল্টন থেকে রওনা দিয়ে প্রথমে জুলাই মাসে দুই সপ্তাহের ভ্রমন ছিল অটোয়া, মন্ট্রিল ও কুইবেক অঞ্চলে। সেখান থেকে ফিরে বাড়িতে সপ্তাহ দুয়েক বিরাম নিয়ে এক সপ্তাহের জন্য কানাডার উইন্ডসর সীমান্ত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অংগরাজ্যের ডেট্রয়েট ও শিকাগো শহরে বেড়ানো। শিকাগো শহরে যাবার আগ্রহ মূলত বাঙালীর সুপরিচিত আইকন স্বামী বিবেকানন্দ ও প্রখ্যাত স্থাপত্যবিদ প্রকৌশলী এফ আর খানের শহর হিসাবে। জীবদ্দশায় যতটা মূল্যায়িত হয়ে থাকুন না কেন, স্বামী বিবেকানন্দকে এখন পৃথিবীর কোথাও চিনিয়ে দিতে হয় না। অপরদিকে উত্তর আমেরিকার প্রকৌশলী সমাজের ও বহুতল ভবন নির্মাণ প্রকৌশলবিজ্ঞানের অগ্রদূত এই ফজলুর রহমান খানকে (এফ আর খান) নিয়ে বাংলাদেশে কোন প্রকার চর্চার চিহ্নমাত্র নেই, যা জাতি হিসাবে সত্যিই লজ্জাষ্কর। ঐ একই গ্রীষ্মের আগষ্ট মাসে দু’সপ্তাহের শেষ পর্যটন পরিকল্পনা ছিল, নায়াগ্রা হয়ে নিউইয়র্ক সিটি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসি হয়ে উত্তর ক্যারোলাইনা অংগরাজ্যের রাজধানী শার্লোট শহর ও অতলান্তিক মহাসাগরের বুকের কাছে দক্ষিণ ক্যারোলাইনা অংগরাজ্যের অন্তর্গত পর্যটকপ্রিয় সমুদ্র-সৈকতের শহর মার্টল বীচ ভ্রমণ।
সেই ভ্রমণ পরিকল্পনার সর্বশেষ অংশের কিছু শিহরণ জাগানো, সততা শিক্ষামূলক, ও আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা প্রবাসের কাঠিন্যের মাঝে মাথা উঁচু রেখে আত্মসম্মান নিয়ে চলতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। সেই অভিজ্ঞতার কিছু অংশ এখানে তুলে ধরেছি। ২০১৪ সালের ঐ গ্রীষ্মের পুরো তিন মাসের সবগুলো ভ্রমনই কিন্তু আমি সড়কপথে করেছিলাম। আমি যে গাড়ি ব্যবহার করেছিলাম, তা ছিল আমার পুরোনো ১৯৯৭ মডেলের ক্যামরি গাড়ি। কোন ভাড়া করা গাড়ি নয়। সফরগুলো ছিল খুবই কম বাজেটের। এই দীর্ঘ সফরগুলোতে সেই গাড়িটা কখনো কোন অসুবিধা সৃষ্টি করেনি। সে বার আগষ্টের প্রথম সপ্তাহে হ্যামিল্টন থেকে রওনা দিয়েছি নিউইয়র্কের উদ্দেশ্যে। তখন আমেরিকায় ট্রাম্প জামানা শুরু হয়নি। প্রেসিডেন্ট পদে ছিলেন বারাক ওবামা। সীমান্ত পার হতে পেরেছিলাম নির্বিঘেœ! যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সার্ভিসের কর্মকর্তাদের কড়া দৃষ্টি ছিল, কোন রকম ফল যেন আমাদের মারফতে যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকে না যায়! সীমান্ত পাড়ি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত শহর বাফেলো, কৃষিকাজ, ফল ও ফুল চাষের জন্য বিখ্যাত ফিংগার লেক এলাকা, ফুলের শহর বলে খ্যাত সিরাকিউজ শহর পার হয়ে দীর্ঘ এপালোচিয়ান পর্বতমালা মধ্য দিয়ে যখন আমাদের গাড়ি চলছে, তখন সন্ধ্যা গড়িয়ে রাতে আঁধার নামতে শুরু করে দিয়েছে। সকলেই জানেন, এই এপালোচিয়ান পর্বতমালা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে উত্তর ও দক্ষিণে ভাগ করেছে। সিরাকিউজ এর পর বিংহ্যাম্পটন ও স্ক্রানটন এলাকা পার হয়ে এসেছি। এটি পার্বত্য এলাকা। গাড়ি নিয়ে চলার জন্য টরন্টো থেকে নিউইয়র্ক যাতায়াতকারী বাস সার্ভিসের চলাচলের পথটা আমি নিয়েছিলাম, কারণ সেটি তুলনামূলক জনবহুল।
ঘটনার সমসয় আমাদের গাড়ি চলছিল পেনসিলভেনিয়া অংগরাজ্যের মাউন্ট পকোনো নামে একটি পাহাড়ী এলাকার উপর হাইওয়ে আই-৮০-পুর্ব দিয়ে। এই অঞ্চলে মহাসড়কটি জে এইচ কনফেয়ার মেমোরিয়াল হাইওয়ে নামে পরিচিত। পকোনো পাহাড়ের এই এলাকাটির নাম স্ট্রাউডসবার্গ। পাহাড় ও গভীর বনাঞ্চলে ঘেরা এলাকা। পর্যটনের জন্য যে কত রকম আয়োজন ও সুযোগ সুবিধা সেখানে রয়েছে, তা বলে শেষ করা যাবে না! নিউইয়র্ক তখনো গাড়ির গতিতে ঘন্টা দুই বা কিছুটা কম দুরত্ত্বে। মহাসড়কের দুই পাশে স্উুচ্চ পর্বত মাথা উঁচু করে দাড়িয়ে আছে। ঘন বনাঞ্চল ঘেরা পার্বত্য এলাকা বিধায় যতটা না রাত নেমেছে, মহাসড়ক তার চেয়ে বেশী অন্ধকার ঢেকে গিয়েছে। মহাসড়কে আলোর ব্যবস্থা নেই। পাহাড়ী আঁকাবাঁকা মহাসড়কে গাড়ি ছুটছে একশ’ কিলোমিটারের উর্ধ্বে। আমার সাবধানী চোখ মহাসড়কে নিবদ্ধ। গাড়িতে আমার পুরো পরিবার মানে, আমার দুই শিশু মেয়ে, স্ত্রী এবং চালকের আসনে আমি। এমন সময়, চালকের পাশের সিটে বসা স্ত্রী হঠাৎ বললো, গাড়ির ড্যাশবোর্ডের আলো কমে যাচ্ছে কেন? যেহেতু গাঢ় অন্ধকারে উচ্চগতিতে গাড়ি ছুটছে, সে জন্য আমার চোখে বিষয়টা পড়েনি। প্রথমে আমি বললাম, ড্যাশবোর্ডের আলো কমবে কেন! ঠিক আছে, গাড়ি চলছে তো। তবু আমি ড্যাশবোর্ডে চোখ রাখলাম, একি! সত্যিই তো ড্যাশবোর্ডে আলো কমে যাচ্ছে! ব্রেক প্যাডে পা দিয়ে দেখি, ব্রেক কোন কাজ করছে না! তখন মাথা যেন হাজার কম্পিউটারের গতিতে চিন্তা শুরু করলো! সর্বনাশ! বাড়ি থেকে হাজার হাজার মাইল দুরে উত্তর আমেরিকার মাটিতে আমার পুরো পরিবার উচ্চগতিতে ছুটতে থাকা এই গাড়ির মধ্যে। কোন রকম দূর্ঘটনা ঘটলেই সপরিবারে আমি হারিয়ে যাব চিরতরে! দুই মেয়ে আর স্ত্রীকে সে সব বলিনি! দ্রুত কর্তব্য স্থির করে নিলাম, হাইওয়ে থেকে বের হয়ে যেতে হবে! গাড়িতে জিপিএস ছিল। কপাল ভাল যে তখনি সামনে একটা বহির্গমন পথ (এক্সিট নং ৩০৭) দেখতে পেলাম। মহাসড়ক থেকে বের হলে বামপাশে হোটেল ও মার্কেট এলাকা। ডানদিকে পাহাড় ও বসতবাড়ি এলাকা। বামদিকে ম্যাকমাইকেল ক্রিক নামক গভীর পাহাড়ী খাঁড়ির উপর দিয়ে গেলে মার্কেট এলাকাটি। বামদিকেই যাব, কারণ গাড়ি ওয়ার্কশপে নিতে হবে, যা ওদিকেই থাকার সম্ভাবনা বেশী।
আমাদের চারজনের জীবনই তখন চূড়ান্ত নিরাপত্তাহীন! এখন একটিই মাত্র উপায়! গাড়ি নিয়ে বহির্গমন র্যাম্পে ঢুকলাম। গাড়ি একই গতিতে ছুটে চলেছে। ব্রেক কাজ করছে না! মাথায় একটাই ভাবনা, রাস্তায় যেন কোন গাড়ি মুখোমুখি বা সামনাসামনি না পড়ে। রাস্তাটি যেন ফাঁকা থাকে! এরই মধ্যে বহির্গমন র্যাম্প থেকে আমাদের গাড়ি একটি ছোট্ট শহরের পথে এসে পড়ল, গাড়ির গতি একই রকম আছে। রাস্তাটির নাম পার্ক এভিনিউ। মহাসড়কের র্যাম্প থেকে বামে মোড় নিয়েই ডানপাশে আলো ঝলমল একটি খাবারের দোকান চোখে পড়ল। তখনো সেটি খোলা। দোকানের সামনে বেশ কিছু গাড়ি ও ভিতরে খরিদ্দারও দেখতে পেলাম। দোকানের নাম কম্পটনস প্যানকেক হাউজ। সামনে যে টুকু চোখে পড়ল, তাতে স্থানটি একটা স্ট্রিপ মল বা মার্কেট এলাকা বলেই মনে হল। বেশিরভাগ দোকানপাট বন্ধ হয়ে গেছে। রাস্তাটা এক ব্লক অব্দি ফাঁকা দেখতে পেলাম। কপাল ভাল, অন্য কোন গাড়ি সামনে ছিল না! বাম পাশের মার্কেটের সামনে দু’টো পুলিশের গাড়ি দাড়ানো দেখতে পেলাম। গাড়ির ব্রেক যেহেতু কাজ করছে না, যে কোন ভাবে গাড়ি থামাতে হবে! কি করি, দুশ্চিন্তায় মাথায় জট পাকিয়ে যাচ্ছে! গাড়িতে বাচ্চাসহ পুরো পরিবার! যা হয় হবে ভেবে, গায়ের সমস্ত শক্তি একত্রিত করে ব্রেকের উপর পা দিয়ে ’কিক’ স্টাইলে খুব জোরে চাপ দিলাম! বোমা বিষ্ফোরণের মত বিকট ধাতব শব্দ হয়ে প্রচন্ড ঝাঁকুনি খেয়ে গাড়ি থেমে গেল! বুকের ভিতরে বসে থাকা চাপটা বড় নিঃশ্বাস হয়ে বেরিয়ে গেল! আমাদের কারো কোন শারীরিক ক্ষতি হলো না। খুব সম্ভবত যান্ত্রিকভাবে ব্রেকে কন্ট্রাক্ট হয়েছিল। গাড়ির দরজা খুলে বাইরে খোলা বাতাসে যেয়ে দাড়ালাম! চারপাশে তাকালাম। ওরাও গাড়ি থেকে বাইরে এলো।
পুলিশের গাড়ির দিকে যেয়ে পরিচয় দিয়ে ঘটনা খুলে বললাম। ওরা সাথে সাথে একটা ’টো’ ট্রাক ডেকে দিল। আমাকে বলে দিল, ওয়ার্কশপ থেকে সকালে যোগাযোগ করবে। কাছাকাছি কোন হোটেল আছে কিনা জিজ্ঞাসা করলে, সাথে সাথে একটা ট্যাক্সি ডেকে নিকটস্থ হোটেল হলিডে ইন্-এ নিয়ে যেতে বলে দিল। হোটেলটি মেন রোড ওয়েস্ট ও জেন স্ট্রিটের কোণায় অবস্থিত। তখন রাত ন’টা বা সাড়ে ন’টা।
পরের দিন সকালে দশটার দিকে ওয়ার্কশপ থেকে ফোন আসার অপেক্ষা করছি। প্রথমবার তারা জানালো, গাড়ীতে কোন সমস্যা নেই।’ আমিতো অবাক! গাড়ির সমস্যার জন্য জীবন যায় যায়, আর তারা বলে কিনা, গাড়িতে কোন সমস্যা নেই! গত রাতের সমস্যা তাদেরকে খুলে বললে তারা আবার বার দুয়েক ফোনে জানালো সব ঠিক আছে। কিন্তু গাড়ী স্টার্ট হচ্ছে না। আমি ততক্ষণে পরিকল্পনা বদলে নিয়েছি, গাড়ি ওদের জিম্মায় রেখে ভাড়া গাড়ি নিয়ে নিউইয়র্ক যাব, গাড়ি নেবার জন্য আবার এই পথেই হ্যামিল্টন ফিরব। আপাতত উত্তর ক্যারোলাইনা যাবার বিষয় বাতিল। হোটেল থেকে চেকআউট করে ভাড়া গাড়ির জন্য হোটেলের নিকটবর্তী এন্টারপ্রাইজ রেন্ট এ কার কার্যালয়ে যেয়ে দিন হিসাবে গাড়ি ভাড়া বুকিং দিয়ে ফেলেছি। এরই মধ্যে আবার ওয়ার্কশপ থেকে ফোন এলো, গাড়ির ত্রুটি পাওয়া গেছে এখন গাড়ি একদম ঠিক। হুর রে! আনন্দ আর ধরে না! এদিকে দু:খের বিষয়, গাড়ি বুকিং দিয়ে ফেলেছি, একদিনের চার্জ কেঁটে নেবে। যাক গে! রেন্ট গাড়ি নিয়ে গ্যারেজে গেলাম। গাড়ির সমস্যা আর কিছু নয়, ব্যাটারির সাথে ক্লাম্প কন্টাক্ট লস করেছিল! ওরা সেটা পরিস্কার করে নতুন ক্লাম্প লাগিয়ে দিয়েছে। এদিকে গাড়ির বিল কত হবে তা নিয়ে উদ্বেগে আছি! ওরা বিল দিল, ৪৮ ইউএস ডলার! তাকে অসংখ্য ধন্যবাদ দিয়ে করমর্দন করে বিদায় নিলাম নিউইয়র্কের পথে। এই ঘটনাটা লিখলাম শুধূ এই বিল ও সেই সৎ মেকানিকের কথা বলার জন্য! পাহাড়ী একটি নিভৃত শহরে একজন মেকানিক কতটা সৎ হলে, কয়েক ঘন্টা গাড়ি চেক করে ক্লাম্প এর দাম ও তা লাগানোর মজুরি মাত্র ইউএস আটচল্লিশ মানে কানাডিয়ান ষাট ডলার নিতে পারে! এই সময়ের পৃথিবীতে দাড়িয়ে তা ভাবাই যায় না! আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে জানি যে, নিজের শহরের কোথাও কোন আউটসাইডারের এরকম আপদ হলে কমপক্ষে পাঁচশ’ ডলার সেলামী না দিয়ে গ্যারেজ থেকে গাড়ি বের হতো না! এই যে, স্থান-কাল-পাত্র নিরপেক্ষ হয়ে সততা বজায় রাখা, এই প্রবাসে জীবন চলার পথের তা ছিল একটা বড় শিক্ষা!
নিউইয়র্কে বেড়ানোর মধ্যে আরেকটা বিষয় এই প্রবাসের মাটিতে নিজেকে শক্ত হয়ে দাঁড়াতে প্রভাবিত করেছিল। সেখানে কয়েকটা দিন দেশের এক বড় শিল্পপতির বাসা ও বাড়িতে যাবার সুযোগ হয়েছিল। দেশে থাকতে তাঁর গ্রুপ অব কোম্পানিতে আমি দীর্ঘদিন চাকুরী করেছিলাম। সেখানে বাঙালী অধ্যুষিত জ্যামাইকা এলাকা এবং ধনীদের বাড়ির জন্য বিখ্যাত লং আইল্যান্ড এলাকায় তাঁর একাধিক বাড়ি আছে। আমি যেদিন তাঁর লং আইল্যান্ড এলাকার বাসায় যায়, সেদিন সেখানে যুক্তরাজ্য থেকে বেড়াতে আসা তাঁর স্ত্রীর বোন সপরিবারে অবস্থান করছিল। লং আইল্যান্ডের বাড়িগুলো সাধারণত অনেকখানি জমি নিয়ে এবং বাড়িতে অতিথি, কাজের লোকজনের থাকার জন্য পৃথক পৃথক বন্দোবস্ত থাকে। নিজ বাড়ির ভিতরে পার্টি দেওয়া বা কোন প্রকার ইভেন্ট আয়োজনের জন্য মঞ্চ থাকে, গাছপালা-ফুলবাগানের সন্নিবেশ থাকে। অনেকটা দেশের জমিদার বাড়ির কায়দা! তো আমরা সকালের দিকে সেখানে পৌঁছালে বাচ্চাসহ আমার স্ত্রীকে ভিতরে নিয়ে দীর্ঘ পথযাত্রার ক্লান্তি অপনোদনের ব্যবস্থা করেন। আমি নীচে বৈঠকখানা এলাকায় আপ্যায়িত হয়ে প্রাকৃতিক সন্নিধানে থাকতে চাইলাম। ঘুরে ঘুরে বিশাল বাড়ি ও বাগান সম্পর্কে পরিচিত হচ্ছিলাম। কিছুক্ষণ পর দুপুরের খাবারের আগে সেই শিল্পপতি, তাঁর স্ত্রী এবং যুক্তরাজ্য থেকে আগত বোন জামাইসবাই নীচে আসলেন। বসার জায়গায় এসে আমার গাড়ি দেখে তো তাঁদের বিস্ময়ের শেষ নেই! এরকম পুরোনো মডেলের গাড়ি নিয়ে এতদুর আসার সাহস কিভাবে করলাম, সে সব কথা আলোচনার ফাঁকে শিল্পপতির স্ত্রী তাঁর আত্মীয়কে উদ্দেশ্য করে বললেন, দেখেছ উনি এই গাড়ি নিয়ে হাজার কিলোমিটার চালিয়ে চলে এসেছেন। আর তুমি কিনা সব সময় বলো লাখ ডলারের গাড়ি না হলে চালানো যায় না! ইচ্ছে থাকলে স্বল্প বাজেটেও চলাফেরা যায়! সে কথা শুনে যুক্তরাজ্য থেকে আগত তাঁর আত্মীয়, যিনি দেশের একটি সংবাদপত্রে চাকুরী করতেন, যা বোঝার নিশ্চয় বুঝেছেন! কথাগুলো আমার কাছে দু’রকম অর্থবাহী ছিল। প্রথমত হলো, বিদ্রুপাত্মক প্রশংসা, দ্বিতীয়ত হলো, প্রকৃত প্রশংসা বা তারিফ করা। আমার সাথে তাদের যে পর্যায়ের সম্পর্ক তাতে আমাকে বিদ্রুপ করার কোন কারণ আমি অন্তত খুঁজে পাইনি। বরঞ্চ সেই কথাগুলো আমার আত্মসম্মাানকে দৃঢ় করেছিল এবং নিজের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করেছিল! শুরুতে যে সাঁকোর কথা তুলেছিলাম, দেশ-বাড়ি-সমাজ-আত্মীয়স্বজন থেকে দুরে থেকে নিজের আবেগ-ভালবাসা-বুদ্ধিবৃত্তির সাথে বাজি ধরে প্রবাসের মাটিতে আমরা যারা থাকি, তাদেরকে শক্তভিতের উপর দাঁড়িয়ে উপরে উঠার সেই সিঁড়ি বা সাঁকোর মত যে আত্মবিশ্বাস-আত্মসম্মান, তা দৃঢ় করতে এরচেয়ে ভাল কোন সাহায্য হয় কিনা, আমার জানা নেই! সন্দেহ নেই, সেই সব অভিজ্ঞতা আমার প্রবাস জীবনের কাঠিন্যের মাঝে জীবনকে নতুন করে পরিকল্পনা ও এগিয়ে নিতে সাহায্য করেছিল॥
অখিল সাহা বিভিন্ন ছোটকাগজে নিয়মিত লেখালিখি করেন। একমাত্র প্রকাশিত কবিতার বই ’পেরেক ঠোকার উপাখ্যান’। বর্তমানে টরন্টো, নিউইয়র্ক, ঢাকার পত্রিকায় সংবাদ-পরিবেশ-বিজ্ঞানভিত্তিক লেখার পাশাপাশি গল্প-উপন্যাস-কবিতা ও সংশ্লষ্ট প্রবন্ধ চর্চা করেন।