কানাডায় একাত্তর বাঙালির অভিজ্ঞতা: শাহানা মহুয়ার ‘সুদূরপারের জীবন পুরাণ’ নিয়ে বেলা-অঞ্জন সংলাপ
আজকে অনেকদিন পর বেলার ফোন। ফোন করেই জানতে চায়, কী করছো। অঞ্জন মৃদু উত্তর দেয়, একটু ব্যস্ত আছি। বেলা ছাড়ে না। কী নিয়ে ব্যস্ততা। অঞ্জন ভাবে, না বলা পর্যন্ত ঠাঁই নেই। ও আর হেয়ালি না করে বলে, ‘কানাডায় একাত্তর বাঙালির অভিজ্ঞতা’ পড়ছি। বেলা চকিত হয়ে উঠে। অঞ্জন বুঝতে পারে, ওকে পুরোটা না বলা পর্যন্ত কথার পিঠে কথা চালিয়ে যাবে। অঞ্জন বলে, ‘সুদূরপারের জীবন পুরাণ’ পড়ছি, শাহানা আক্তার মহুয়া লিখেছেন। বেলার আর তর সয় না। চট করে বলে ওঠে, বইটা তো আমার কাছে নেই। একটু বলো, কী লিখেছেন তিনি।
অঞ্জন বলে, শোন তবে। কানাডায় তার অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখেছেন। একেবারে মৌলিক সব অভিজ্ঞতা, ধার করা কিছু নয়। ২০০৮ সাল থেকে তিনি পরিবার নিয়ে কানাডায় অভিবাসী হয়েছেন। শুরুতে সবারই তো থিতু হতে সময় লাগে। তারও লেগেছে। কিন্তু বড়ো অদ্ভুত, কোন অভিযোগ তার নেই। সবকিছুকেই বেশ স্পোর্টিংলি তিনি নেন। তাই ছেলে প্রমিত বলে, মা, তুমি ইউটোপিয়ায় বাস করো।
বেলার এবার কৌতুহল বেড়ে যায়, তিনি মূলত কী লিখেন? অঞ্জন টেলিফোনের এপ্রান্ত থেকে বলে, শাহানা মহুয়া মূলত কবি। তার বেশ কিছু কবিতার বই বেরিয়েছে, প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ধ্রুপদ সন্ন্যাসে’ বের হয় সেই ১৯৯৮ সালে। প্রায় তিন দশক ধরে তিনি লিখে চলেছেন। অনুবাদ গ্রন্থও আছে তাঁর। ২০০৫ সালে প্রথম অনুবাদ গ্রন্থ বের করেন ‘আর্মেনিয়ার ছোটগল্প’। ২০১৯ সালে বের করেন চতুর্থ অনুবাদ গ্রন্থ ‘উত্তুঙ্গ স্রোত বেয়ে’। এই বিদেশে বসেও নিয়মিত সম্পাদনা করে চলেছেন সাহিত্যের কাগজ ‘ছান্দস’।
বেলা মুহূর্তেই সব জানতে চায় অঞ্জনের কাছে। বলে, জীবনী না বলে তার রচনাটা নিয়ে একটু বলো।
অঞ্জন কথা না বাড়িয়ে বলতে থাকে, আসলে রবি ঠাকুর তাঁর পৃথিবী দর্শনটাকে উসকে দিয়েছেন। রবি ঠাকুরকে উদ্ধৃত করে তিনি লিখেছেন, ‘দেশে দেশে মোর দেশ আছে, আমি সেই দেশ লব যুঝিয়া।‘ সেই যুঝে নিতে গিয়ে ২০০৮ সালে মার্চের এক বিকেলে এসে পৌঁছান কানাডায়। উত্তরবঙ্গের একটি মফঃস্বল শহর নাটোর থেকে তিনি পরিবার নিয়ে চলে আসেন প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূলে ছবির মতো এক শহর ভ্যাঙ্কুভারে।
অন্য দশজনের মতোই তিনি এবং তার স্বামী এখানে পেশা বাছাই করতে গিয়ে মতদ্বৈততায় ভুগেছেন। দেশে ছিলেন শিক্ষক। চাইলেই তো এখানে সাথে সাথে শিক্ষা পেশায় যাওয়া যায় না। তার জন্য দরকার প্রস্তুতি। সব ভেবেচিন্তে শেষ পর্যন্ত ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট প্র্যাকটিশনার পেশাকেই বেছে নেন। তার জন্য কাঠখড়ও পোড়াতে হয়েছে যথেষ্ট।
বেলা অপর প্রান্ত থেকে এবার বলে উঠে, কী রকম কাঠখড়। অঞ্জনের উত্তর, আবার নতুন করে পড়াশোনা করতে হয়েছে। এমন নয় যে , অন্য কোনো বাংলাদেশী সেই সময়টিতে আগে এটি করেছেন। তাই নতুন চ্যালেঞ্জ , কিছুটা তো বেগ পেতে হয়েছেই। তবে সহপাঠী আর শিক্ষকদের কথা তিনি এখনো স্মরণ করেন , যাদের সহযোগিতা সেই সময় খুব কাজে আসে। তিনি বেশ লড়াকু আছেন। দেশের শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে একেবারে নতুন করে শুরু থেকেই শুরু করেছেন এবং সেই পেশাকে রীতিমতো উপভোগ করছেন। সেই সুবাদে কতো নতুন অভিবাসীকে পরামর্শ যুগিয়েছেন। নিজের অভিজ্ঞতাকে শেয়ার করেছেন তাদের সাথে।
বেলা বলে ওঠে, বেশ ভালো তো। তার ক্ষেত্রে প্রফেশন এবং প্যাশন এক হয়ে গেছে। সেইজন্য তিনি কাজটাকে উপভোগ করছেন আর তাবৎ পৃথিবী তার কাছে ইতিবাচক হয়ে ধরা দেয়।
অঞ্জন বলে, দুজন মানুষের সান্নিধ্যের কথা লিখেছেন তিনি, যারা এখানকার আদিবাসীদের নিয়ে তার আগ্রহ উস্কে দিয়েছেন। বেলার তর সয় না। কাদের কথা বললেন তিনি? অঞ্জন ভাবে, পুরোটা না বললে বেলার কৌতুহল থেকেই যাবে। তাই একটু বিস্তৃত করে বলে, একজন হচ্ছেন , আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের অন্যতম রূপকার রফিকুল ইসলাম আর অন্যজন হচ্ছেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক রবি আলম। দুজনই খুব নিভৃতে থাকেন কিন্তু দুজনই খুব গুণী। রফিকুল আলমকে তো জাতিসংঘে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের এডভোকেসির কারণে সবাই চেনেন, আর রবি আলম এর আরেক পরিচয় হচ্ছে তিনি কানাডার আদিবাসী আর সরকারের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর কাজ করেন। তাই আদিবাসীদের নিয়ে আলম সাহেবের কথা, পর্যবেক্ষণ সবকিছুর প্রতিই লেখকের খুব আগ্রহ। বেলা টেলিফোনের অপর প্রান্ত থেকে শুধু বললো, বেশ তো।
এবার অঞ্জন বলে, শাহানা আরও বেশ কিছু নিজের অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন, যেমন তার ছেলে প্রমিত একবার অসুস্থ হয়ে পড়লে ডাক্তার পরম মমতা আর পেশাদারিত্ব নিয়ে যত্ন করেছেন, নিজের গাড়ি হবার আগে ঠান্ডার মধ্যে পাবলিক বাসে যখন যাতায়াত করতে হতো, বাসস্টপে আসতে দু এক মিনিট দেরি হয়ে গেলেও ড্রাইভার দূর থেকে দেখে বাসের গতি কমিয়ে দিতেন। এইসব টুকরো টুকরো গল্পে তিনি কানাডায় তার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন।
বেলার কন্ঠে এবার প্রশংসার সুর। মহুয়ার অভিজ্ঞতা বেশ চমকপ্রদ মনে হচ্ছে। বইটা পেলে প্রথমে তার লেখাটিই পড়ে নেব। অঞ্জন বলতে চায় না, বইতে শাহানা মহুয়ার লেখাটিই প্রথম।
বরং অঞ্জন বলে, বেশি আর বলছি না, তাহলে তোমার পড়বার আকর্ষণ থাকবে না। ওদিক থেকে কপট রাগে বেলা বলে, রেখে দেই তাহলে। অঞ্জন বলতে চেয়েছিলো, শাহানা মহুয়া এবছর বাংলামেইল প্রবর্তিত কবি ইকবাল হাসান সাহিত্য পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন। আর সেই পুরস্কারের জন্য তিনি উড়ে আসেন সুদূর ভ্যাঙ্কুভার থেকে টরন্টোয়। ১৬ মে বেশ জাঁকজমকভাবেই টরন্টোয় বাংলাদেশ ফেস্টিভ্যালে হাজারো দর্শক অতিথিদের সামনে তার হাতে পুরস্কার তুলে দেন পোয়েট লরিয়েট লিলিয়ান অ্যালেন।
কিন্তু বেলার আর শোনা হয়নি, তার আগেই বেলা ফোন কেটে দেয়।