শূন্য থেকে সফলতার পথে
মানুষ পরিবর্তনশীল, জীবন পরিবর্তনশীল, জীবনের গতি আর ধারাও পরিবর্তনশীল। জীবন বিবর্তিত হচ্ছে তার নিজস্ব গতিবেগে, আমরা কেবল ঘূর্ণিত হয়ে চলেছি সময়ের মোহনায়, জীবনের তাগিদে। এই জীবন পরিবর্তনের গতিবেগ আর রূপরেখা প্রত্যেকের জন্যই ভিন্ন। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আর অভিজ্ঞতালব্ধ অর্জিত জ্ঞান থেকে প্রাপ্ত সিদ্ধান্ত হলো, অনেকাংশেই এই ভিন্নতার মাপকাঠি নির্ভর করে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার যোগ্যতা, সাধ্য, ক্ষমতা, কিংবা দূরদর্শিতার ওপর। আমি এখানে আমার জীবনের পরিবর্তনের কিংবা অভিযোজনের গল্পটাই আজ তুলে ধরছি, আশা করি তা নতুন কোনো প্রবাসীকে কিংবা জীবন পথের পথহারা কোনো পথিককে নতুন পথের নির্দেশনা দিলেও দিতে পারে। এই গল্প আমার একেবারে ব্যক্তিগত জীবনের সত্যিকারের গল্প।
বাংলাদেশে আমি একজন ইংরেজি সাহিত্যের প্রভাষক ছিলাম। আমার পনেরো বছরের শিক্ষকতা জীবন শুরু হয় মাত্র আঠারো বছর বয়সে। নিজের লেখাপড়ার পাশাপাশি স্থানীয় স্কুলে শিক্ষকতা করা দিয়ে শুরু হওয়া শিক্ষকতার জীবনে ক্রমে ক্রমে যুক্ত হয় অনেক প্রাপ্তি। এক সময় পাড়ার স্কুল থেকে ইংরেজি মাধ্যমের সেরা স্কুলগুলোতে, আইইএলটিএস সেন্টারগুলোতে শিক্ষকতা করতে করতে, লেখাপড়া শেষে শিক্ষক নিবন্ধন করে এক পর্যায়ে প্রভাষক হিসেবে কর্মরত হই বিজ্ঞান কলেজে। বাংলাদেশের অস্থিতিশীল অবস্থা, আমার স্বামী ও দুই কন্যার নিরাপত্তা ইত্যাদি বিবেচনা করে, এরপর আমি পরিবারসমেত কানাডা প্রবাসী হই।
২.
এবারে আসছি মূলগল্পে। কানাডা এসে আমার বড়ো মামা, সাইদ যাদীদের বাসায় ওঠি এবং মামাই ছিলেন আশৈশব আমার ফ্যামিলি, ফিলোসফার অ্যান্ড ফ্রেন্ড বলতে যা বোঝায়, তা। সবকিছুতেই মামার উৎসাহ, নির্দেশনা, পরামর্শ চিরকাল আমাকে তাড়িত করেছে, করেছে নিয়ন্ত্রিত, আর পরিচালিত। সেটি ছিল ২০১৬ সাল। এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি পেরিয়ে শীতকালের শেষ লগ্নের বিমর্ষ একটা সময়। এয়ারপোর্ট থেকে আমাদের সাদরে অভ্যর্থনা জানিয়ে মামা তাঁর বাসায় নিয়ে যাচ্ছেন। তিনি গাড়ি চালাচ্ছেন, পাশে মামি, পিছনে বসা আমরা সবাই। এমনিতেই দেশ ছাড়ার সময় আম্মু, ভাই, শাশুড়িমা সবার কান্নাকাটির দৃশ্য বারবার মনের গহিন থেকে উঁকিঝুঁকি মারছিল, তার ওপর চিরসবুজের দেশ, বাংলাদেশ থেকে এসে, সবুজবিহীন এপ্রিলের মাঝামাঝিতে ন্যাড়া বৃক্ষরাজি দেখে পৃথিবীটাকেই কেমন যেন বিমর্ষ লাগছিল। মামা ড্রাইভ করে এয়ারপোর্ট থেকে বাসায় নিয়ে যেতে যেতে বলছিলেন, ‘তুমি যদি পরিশ্রম করতে পারো, কানাডা তোমার কাছে একদিন স্বর্গ প্রতিপন্ন হবে, আর যদি পরিশ্রমী না হও, এ তোমাকে হতাশ করবে। আমি জানি, তুমি অনেক পরিশ্রমী, তুমিই পারবে’। এরপর মনে পড়ে গেল আব্বুর একটা কথা। ছোটোবেলা থেকেই আব্বু বলতেন, ‘ভেবো না, কেউ পারেনি বলে, আমিও পারবো না। বরং ভাবো, যদি একজনও পেরে থাকে, আমিও পারবো। আর যদি কেউ-ই কখনো না পেরে থাকে, তবে আমিই সেই একজন হয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করবো।’
গাড়ি ছুটে চলেছে হাইওয়ে দিয়ে তীব্র গতিবেগে। চারপাশে সব ফাঁকা। বেশ পরপর কিছু গাড়ি শাঁ শাঁ করে পার হয়ে যাচ্ছে। গাড়ি কিংবা জনমানবের চেয়ে বেশি চোখে পড়ছে দূর-দূরান্তের ন্যাড়ামাথা বৃক্ষরাজি। কেমন যেন মন খারাপ করা চার ধার। মামা বলে চললেন, ‘ভুলে যাও, তোমার জীবনের ফেলে আসা সকল অর্জনের কথা। মনে করো, আজ তোমার জীবনের প্রথম দিন। জীবনকে শূন্য থেকে গড়ে তুলতে হবে তোমায়’। মনে মনে ভাবছি, আমি কি পারবো? মামি বললেন, ‘আর হ্যাঁ, সবচে চ্যালেঞ্জিং হবে তোমার ঘর আর বাহির দুটো একসাথে সামলানো। এখানে তো আর তোমার বাবুর্চি ফারুখের মা, ড্রাইভার হাবিব, ক্লিনার রেখা, বাচ্চাদের ন্যানি সুখী নেই। তোমাকেই হতে হবে অল ইন ওয়ান।’ আমি জানতাম এগুলোর সবই, কিন্তু বাইরের ঐ সবুজবিহীন, জন-মানববিহীন দৃশ্যের কারণেই বোধ করি বারবার বিমর্ষ হয়ে পড়ছিলাম।
এরপর মামা বললেন, ‘যা-হোক, প্রথমেই বললাম, সবচে খারাপ কী কী হতে পারে, সেগুলোর কথা। এরপর এরচে একটু ভালো কিছু হলেই বুঝবে, ইউ আর অন দ্যা রাইট ট্র্যাক’। ততক্ষণে বাচ্চাদের বাবা কানের কাছে বড়ো বড়ো দীর্ঘশ্বাস ফেলা শুরু করেছে। প্রথম থেকেই দেশ ছাড়ার ব্যাপারে তাঁর আগ্রহ প্রায় শূন্য ছিল। হ্যাঁ, আমরা প্রতি বছরই দেশের বাইরে ঘুরতে যেতাম অন্তত দুইবার, কিন্তু তা ছিল কেবলই ঘোরার জন্য, ছয়-সাতটি দেশ ঘুরে তবেই কানাডা এসেছি। কিন্তু সে কিছুতেই এখানে স্থায়ী হতে রাজি ছিল না দেশের বিলাসবহুল জীবন ছেড়ে। যাহোক, আমি তখন আর পিছনে তাকাতে নারাজ। আমি খুবই কঠোর মনোবলের অধিকারী একটি মেয়ে ছোটোবেলা থেকেই। ঐ যে বললাম, আব্বু আর মামা ছোটোবেলা থেকেই আমার মাথায় গেঁথে দিয়েছিলেন যে, কেউ না পারলেও আমিই পারবো! যাহোক, মন শক্ত করলাম।
৩.
মামার বাসায় পৌঁছে সব ভুলে গেলাম। মামা, মামি, কাজিনদের ভালোবাসা, স্বনির্ভরতা, আর ছিমছাম জীবনযাপন দেখে ভাবলাম, অন্তত বুয়াদের সাথে চেঁচামেচি করে মাথাটা তো আর ধরাতে হবে না। নিজের সময় সুযোগ মতো নিজের হাতেই ঘরকন্না করবো। মামিকে দেখে আরও শিখলাম, কীভাবে চাকরি করেও সুন্দর করে ঘর সামলানো যায়, মনে মনে শুধু আউড়েছি, ‘আমি পারবো, পারতে আমাকে হবেই, আমি কিছুতেই হারবো না।’ বাচ্চাদের বাবা প্রতি মুহূর্তেই দিন গুনছে ফিরে যাওয়ার, হুমকি ধামকিও দিচ্ছে। বাচ্চাদের বয়স তখন সাত আর সাড়ে চার বছর সবে। মামা রোজ কাজ থেকে ফিরে জিজ্ঞেস করতেন কোথায় কোথায় ঘুরলে? রিজুমি বানানো শুরু করেছ? আর আমি তখন আমার পাশে শোয়া মানুষটার কাছ থেকে প্রতিনিয়ত হুমকি খাচ্ছি যে সে আর বিশ দিন… পনেরো দিন… দশদিন পর দেশে যাবে। আমি জানি, আবার শূন্য থেকে শুরু করবার ধৈর্য তাঁর নেই, উপরন্তু, দেশের স্ট্যাটাস বজায় রাখবার মতোন সুযোগ করতেও হিমশিম খাবে। সারাজীবন সে ব্যবসা করেছে, ঐ ‘বস ফিলিংস’ নিয়ে এখানে টিকে থাকা বড্ড কঠিন। আর তাছাড়া যে হারে ট্যাক্স দিতে হয় ব্যবসায়ীদের, দুর্গম পথ। ইতোমধ্যে সে আমাকে মানসিকভাবে নির্যাতন করতে লাগলো। যে আমি দেশে থাকতে হিসাব ছাড়া নিজের কামানো টাকা দু’হাতে খরচ করেছি পনেরো বছর, সেই আমাকে ডলার স্টোরের সাধারণ কিছু কেনার জন্যও তাঁর কাছে হাত পাততে হচ্ছে আর সুযোগে সে-ও দু’কথা শোনাচ্ছে! একবার তো ডলারমাতে কিছু একটা কিনতে যেয়ে, তাঁর কাছে টাকা চাইতেই এমন বিব্রতকর একটা কথা শুনতে হলো, সেই মুহূর্তেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যতই কষ্ট হোক, আমি নিজে কামাই করেই চলবো, এবং যত শীঘ্র হয়, কিছু একটা শুরু করবো। এরপর ভাবলাম, যদি সে ফিরেই যায়, আর ফিরে না আসে কষ্টের এই জীবনের ভয়ে? তার আগে অন্তত থাকার একটা জায়গা চূড়ান্ত করে নিই। মামা-মামির তীব্র বাধা ডিঙিয়েও তাঁকে বললাম, যাওয়ার আগে যেন আমাকে আর বাচ্চাদেরকে অন্তত একটা এপার্টমেন্টে ওঠিয়ে দিয়ে যায়।
মামার বাড়ির কাছেই একটা এপার্টমেন্টে ওঠিয়ে, হাতে মাস তিনেক চলবার মতোন সামান্য কিছু টাকা দিয়ে, এই নতুন দেশে ছোট্ট দুটো বাচ্চাসহ একা রেখেই সে চলে গেল। হ্যাঁ, ফিরেছে সে, কিন্তু বছরে দু’তিনবার করে সে ব্যবসা সামলাতে দেশে যেতো, আর শীত-গ্রীষ্ম-বসন্তে বাচ্চাদের নিয়ে আমার একাই সংগ্রাম করতে হতো। এরপর থেকে আর টাকা পয়সাও দিত না। বলত, ‘এদেশে থাকলে, নিজে কামাই করে চলো, আর দেশে ফিরে গেলে, কিছুই করতে হবে না, আমি সব চালাবো’। আমার সিদ্ধান্তে অটল রইলাম।
আর্থিক কষ্ট প্রথম বছরটাতে আমাকে ভীষণ কাঁদিয়েছে, কারণ বিগত জীবনে সেই অর্থকষ্ট কখনো আমাকে পোহাতে হয়নি। আর সে ভাবতো, কষ্ট পেতে পেতে একপর্যায়ে আমি রাজি হবো তাঁর সাথে দেশে ফেরত যেতে। কিন্তু আমার সিদ্ধান্ত ততদিনে পাথরসম অনড় হয়ে গিয়েছে, ‘পারতে আমাকে হবেই।’
৪.
আমি নিয়মিত বিভিন্ন সেমিনারে যাওয়া শুরু করলাম। ট্রেনিং নিতে লাগলাম। হাতের সঞ্চয় ফুরাবার আগেই কিছু একটা করতে হবে। বাচ্চাদের সকালে স্কুলসংলগ্ন ডে-কেয়ারে রেখে যেতাম, ওখান থেকেই ওরা স্কুলে যেতো, এরপর আবার ডে-কেয়ারে ফিরতো। ওখান থেকে ঘণ্টা হিসেবে ডলার গুনে, আমাদের এপার্টমেন্টের এক অ্যান্টি ওদেরকে নিয়ে গিয়ে রাখতো আমি না ফেরা পর্যন্ত। রাতে বাচ্চাদেরকে ঘরে এনে, গোসল করিয়ে, খাইয়ে, ঘুম পাড়িয়ে, ল্যাপটপ নিয়ে বসে চাকরি খুঁজতাম, ইন্টার্ভিউয়ের প্রস্তুতি নিতাম, ইন্টার্ভিউ দিতাম। যদিও সবই ছিল ভুলভাল, কিন্তু ঠকে ঠকেই শিখেছি প্রচুর। সবচে বেশি যে জিনিসটা করতাম তা হলো, বিভিন্ন দেশি বিভিন্ন মানুষের সাথে আমি অনেক কথা বলতাম হাটে, মাঠে-ঘাটে, সাবওয়েতে, সবখানেই। জিজ্ঞেস করতাম তাদের অভিজ্ঞতা। মার্কেট রিসার্চ করে ততদিনে বুঝে গিয়েছি যে, চাকরির যে দুরবস্থা, একমাত্র হেলথ সেক্টরেই সবসময় চাকরি থাকে, অন্যান্য সেক্টরে খুব কম। মামা বলতে লাগলেন, এদেশি সার্টিফিকেট থাকলে, চাকরি পাওয়া সহজ। আর তাছাড়া মামা জানতেন যে, আমি লেখাপড়া করতে ভালোবাসি। অবশেষে মামার পরামর্শ অনুযায়ী জর্জ ব্রাউন কলেজে ভর্তি হলাম। বাচ্চাদের বাবার দিয়ে যাওয়া মাস খরচের সামান্য কিছু টাকা আর আমার জমানো টাকা তখন প্রায় শেষের দিকে। স্রষ্টার ইচ্ছেতে তক্ষুনি ওসাপের টাকা পেলাম। সেই থেকে আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি।
সেপ্টেম্বরেই ক্লাস শুরু হলো। ভেবেছিলাম, ডিপ্লোমা করবো। কিন্তু ডিপ্লোমা থেকে এডভান্স ডিপ্লোমা, এরপর আমার একে একে ডিন্স অনার্স লিস্টে নাম আসতে লাগলো প্রতি সেমিস্টারেই, প্রফেসররাই বললেন, ব্রিজিং করে অনার্স করে ফেলতে এপ্লাইড বিহেভিয়ার এনালাইসিসে। কলেজে ভর্তি হয়ে প্রথম সেমিস্টার শেষ হবার পরই, প্লেসমেন্ট করতে গেলাম একটি ট্রিটমেন্ট সেন্টারে। প্লেসমেন্ট শেষে, ওরাই আমাকে কাজের প্রস্তাব দিলো। একেবারে লুফে নিলাম সুযোগটি। জব পেয়ে গেলাম আমার ফিল্ডেই। স্রষ্টার অশেষ রহমতে, অড্ যব করতে হয়নি একদিনের জন্যও।
৫.
প্রচণ্ড কষ্ট হতো। আমার কায়িক পরিশ্রম করবার অভ্যাস ছিল না কোনো কালেই। বাজার থেকে একটা আলুর ব্যাগও আগলে আনতে পারতাম না। গাড়ি ছাড়া জীবন… অপেক্ষায় থাকতাম সপ্তাহে কোন দিন মামার একটু সময় হবে, মামার সাথে গিয়ে গ্রোসারি করে আনতাম পুরো সপ্তাহের। এরপর শুরু করলাম সাহস করে একাকী যাওয়া। খুব কষ্ট হতো, আমি ঠিক বাসে করে গিয়ে বাজার করলেও, বাজার আগলে বাসা পর্যন্ত আনতে পারতাম না। আমার ছোট্ট বাচ্চা দুটোই সেদিন আমাকে সামলানো শুরু করলো! তারা দেখেছে যে, দেশে থাকতে ড্রাইভার হাবিব ভাই অথবা ওদের বাবা সবসময়ে বাজার আগলাতো। এমনকি অনেক সময় আমার পার্টসটাও সে সামাল দিতো। আমার সাত বছরের বাচ্চা আরিয়ানা বললো, ‘মামণি, তুমি আর একা যেয়ো না, আমি আছি তো। আমি ভাবলাম, ছোট্ট বাচ্চা, ওকে কেন কষ্ট দেবো? কিন্তু সে খুবই সিরিয়াস ছোটোবেলা থেকেই।
পরদিন শনিবার। স্কুল বন্ধ। ঘুম থেকে ওঠে নাস্তা করেই বললো, ‘মামণি, চল, গ্রোসারিতে যাই।’ আমি বললাম, আরেকদিন যাবো। সে বললো, ‘না, আজকে আমি আর আরিশা বাসায় আছি, আজকেই চলো। অন্যদিন তোমার কষ্ট হবে একা।’ ভেবেছিলাম, হয়তো একদিন না হয় নিয়েই যাই, কষ্ট পেলে ও নিজেই হয়তো আর যেতে চাইবে না। কিন্তু আমি নিজেই আমার মেয়েকে চিনতে পারিনি তখনো। সে হাল ছাড়বার মেয়েই নয়। দুইবোন জেদ করেই গেল আমার সাথে। বাসে করে গেলাম, ভালোই ছিল আবহাওয়া। রোদ-রোদ আকাশটা, মে মাস। কিন্তু ফেরার পথেই ঘটলো বিপত্তি। তখনো আমরা এলাকাতে নতুন। জীবনে প্রথম প্রথম পাবলিকে ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করছি, নিয়ম-কানুন, পথঘাট ঠিক মতোন চিনি না। ফেরার পথে অসংখ্য ভারি ভারি বাজারের ব্যাগ নিয়ে ভুল করেই আগের স্টপে নেমে গিয়েছি। বাস আমাদের ছেড়ে চলে যাওয়ার পরই ভুলটি বুঝতে পারলাম, আর পরের বাসের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। সেই আবাসিক এলাকাতে খুব ঘনঘন বাস আসতো না। কাজেই, দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া উপায় নেই। মুহূর্তেই আকাশ কালো করে তুমুল বৃষ্টি এলো। রোদ দেখে আমরা বের হয়েছি বলে ছাতা কিংবা গরম কাপড় কিছুই আনিনি। আমার মনে আছে, প্রচণ্ড ঠান্ডা ছিল সেই বৃষ্টির পানি। আমার বাচ্চা দুটো ঠান্ডায় কুঁকড়ে ছিল। ঠোঁট দুটো ঠান্ডায় কালো হয়ে গিয়েছিল। বাজ পড়ার শব্দে আর ঠান্ডায় সাড়ে চার বছর বয়সের আরিশা চিৎকার করে ভয়ে কাঁদছিল। তার মনে হচ্ছিল, বাস যেহেতু চলে গিয়েছে, এই ঠান্ডায় জমে হয়তো-বা আমাদের মরেই যেতে হবে। আরিয়ানা তাকে আদর করে বোঝালো। বললো, ‘আমরা কাঁদলে, মামনির আরও কষ্ট হবে, কাঁদবে না, আমি আছি তো!’
আমি ভীষণ অসহায় বোধ করছিলাম সেই পরিস্থিতিতে। পরের বাস আসতেই বাচ্চাদের নিয়ে বাসায় ফিরে শুধু উপরওয়ালাকে ডাকছিলাম, যে, বাচ্চা দুটোর যাতে নিউমোনিয়া না হয়ে যায়। এভাবেই দিন যাচ্ছিল। সপ্তাহে পাঁচদিন সকাল থেকে রাত অবধি কলেজ, আর শনি-রবি রোজ বারো ঘণ্টা করে কাজ। এরপর বাজার, রান্না, বাচ্চাদের সব কাজ, ওদের দেখাশোনা, পড়াশোনা। প্রায় চার বছর আমার কোনো সামার ব্রেক ছিল না, ছিল না নিজের জন্য কোনো সময়। রোবট হয়ে গিয়েছিলাম। হয়তো বাচ্চাদের বাবা আরেকটু সহযোগিতা করলে, কষ্টটা কম হতো। সে যে সময়টা থাকতো, চেষ্টা করতো, অন্তত ভাতটা রান্না করে রাখতে- আমি ফিরে যাতে গরম ভাত খেতে পারি। ক্রমে ক্রমে আমি তাঁকে ভাত, ডাল, বেগুন ভাজা, ডিম ভাজা করতে শিখিয়েছিলাম। কিন্তু তাঁর পিছুটান তাঁকে কখনোই এখানে সুখে থাকতে দেয়নি।
৬.
রোজ আট ঘণ্টা ঘুমানো আয়েশি জীবনের এই আমি, সেই প্রথম চারটি বছরমাত্র চার-পাঁচ ঘণ্টা ঘুমাতাম। বাকি সময়টা লেখাপড়া করতাম, ঘরের আর বাইরের কাজ করতাম। আর আমার একটা বাজে অভ্যাস ছিল যে, আমি বাসি খেতে পারতাম না। কাজেই রোজ রান্না-বান্না করতাম। বাচ্চাদের বাবা বলতো, আমার রান্নার জন্যই নাকি সে দেশে গিয়ে থাকতে পারে না আমাকে ছাড়া। সে যাই হোক, আজ সে পারে, আমাকে ছাড়াই সব পারে।
কষ্ট অনেক থাকলেও, আমার জীবনে আত্মতৃপ্তি ছিল সবসময়েই। আমি খুব সুখী, কারণ আমাকে কখনো অড্ যব করতে হয়নি, লেখাপড়ায় সবসময় কলেজ, ইউনিভার্সিটিতে সেরা রেজাল্ট করেছি, আর কখনো মাথা গরম করে যদি একটা চাকরি ছাড়ি তো, পরদিনই নতুন কাজের অফার পেয়েছি। এভাবেই কাটতে লাগলো দিন। ইন্সট্রাক্টর থেরাপিস্ট থেকে লিড থেরাপিস্ট, এরপর সিনিয়র থেরাপিস্ট হয়েছি, তা-ও প্রায় তিন বছর পেরিয়ে গিয়েছে। এবারে কলেজ অব সাইকোলজিস্টের রেজিস্ট্রেশনটা হয়ে গেলেই নিজের ক্লিনিক খুলে, স্বনির্ভরভাবে বিহেভিয়ার এনালিস্ট হিসেবে প্র্যাকটিস করতে পারবো, পূরণ হবে আমার সকল স্বপ্ন।
পাশাপাশি, আমার শখের কাজগুলোও নিয়মিত চালিয়ে যেতে পারছি, আর তাতেই আমার তৃপ্তি পূর্ণতা পায়। ছোটোবেলা থেকেই আমি ছিলাম বাংলাদেশ বেতারের তালিকাভুক্ত কণ্ঠশিল্পী। বেতার, টেলিভিশনে গান গাওয়া, উপস্থাপনা করা, বিতর্ক করা ছিল আমার শখ। এখানে আসবার পরপরই ফেইসবুকে আমার লেখা নানান পোস্ট দেখে, একদিন শহরের সেরা গুণীলেখক, গবেষক, অনুবাদক, টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব সুব্রত কুমার দাস আমার সাথে দেখা করেন। আমাকে উৎসাহ আর অনুপ্রেরণা দেন লেখাকে সিরিয়াসলি নিতে, দেন কিছু এসাইনমেন্ট। সেই থেকে দাদার নির্দেশনাতে কবে যে একটি-দুইটি করে চারটি প্রকাশিত বইয়ের লেখক হয়ে গেলাম, নিয়মিত বাংলামেইল পত্রিকাতে লেখা শুরু করলাম, বুঝে ওঠতেই পারিনি। তবে লেখালিখি আর পড়াশোনা দুটোই আমার বেশ ভালো লাগে। মামা একদিন মনে করিয়ে দেন, ব্যস্ততা, কাজ, সবই থাকবে জীবনে, কিন্তু ছোটোবেলা থেকে চর্চা করে আসা গানটা যদি এভাবে ছেড়ে দিই, পরে অনেক মন খারাপ হবে। কিছুটা সময় পেলে মামাকে গান শোনাতাম। মামা ফোন করে রোজ শুনতেন নতুন কি গান তুলেছি, সেগুলো; কিন্তু টেলিভিশন কিংবা মঞ্চে ফেরার কথা তখনো তেমনভাবে ভাবিনি। আবার সুব্রত’দা আর আমাদের এনআরবি টেলিভিশনের কর্ণধার, শহিদুল ইসলাম মিন্টু ভাইয়ের অনুপ্রেরণাতেই বাংলাদেশ ফেস্টিভ্যাল, পথমেলা, ফোবানা, ইত্যাদি মঞ্চে আবার গান পরিবেশন করছি, গাইছি, অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করছি প্রথম চব্বিশ ঘণ্টার বাঙালি-কেনেডিয়ান চ্যানেল, এনআরবিতে।
লেখক পরিচিতি
সাহিত্যিক, বিহেভিয়ার এনালিস্ট। প্রকাশিত বই ‘অটিসম কোন অভিশাপ নয়’, ‘আপনি কি মানসিকভাবে সুস্থ?’, এবং ‘আমি আমারই মতন’। ‘People Skills for Behavior Analysis’ বইয়ের একটি অধ্যায়ের লেখক তিনি যা উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন ইউনিভার্সিটিতে মাস্টার্স ক্লাসে পড়ানো হয়। টরন্টোর সর্বাধিক জনপ্রিয় সাপ্তাহিক বাংলা মেইল এবং বিভিন্ন সাময়িকীতে তাসমিনা নিয়মিত লেখক।

